জলবায়ু পরিবর্তন এবং ভবিষ্যতের চিন্তাভাবনা

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

আইনুন নিশাত

সারাবিশ্ব কভিড-১৯ এর প্রকোপে পর্যুদস্ত। প্রায় বছরখানেক আগে এই রোগের আবির্ভাব ঘটে। প্রথমে চীনের উহান প্রদেশে এই রোগের আক্রমণ ধরা পড়ে। সেখান থেকে ইউরোপের ইতালি ও স্পেনে প্রবেশ করে। পরবর্তী সময়ে এই রোগটি মহামারি আকারে পৃথিবীর প্রায় প্রত্যেকটি দেশেই আক্রান্ত লোকের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে। কেবল প্রশান্ত মহাসাগরের ছোট দেশগুলো যেখানে বহিরাগতদের আনাগোনা নেই, সেখানে এই ভাইরাসটির উপস্থিতি নেই। বেশ কয়েকটি দেশে কভিড-১৯ এর আক্রমণ অত্যন্ত মারাত্মক রূপ নিয়েছে। এর মধ্যে প্রধান দেশগুলো হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও ব্রাজিল এবং এই ভাইরাসের আক্রমণ থেকে অত্যন্ত ক্ষমতাধর ব্যক্তিরাও রেহাই পাননি। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট কিংবা যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী প্রাণে রক্ষা পেয়েছেন বলা যায়।

এই রোগের টিকা বা প্রতিষেধক এখনও আবিস্কার হয়নি। গবেষণা এখনও চলছে। রোগের মাত্রা এবং লক্ষণের ভিত্তিতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু তা ব্যয়বহুল এবং উন্নত প্রযুক্তিভিত্তিক। রোগটির বিস্তার রোধের জন্য যে প্রধান দুটি কাজ করা হচ্ছে, তাহলো মাস্ক ব্যবহার করা এবং মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা। পাঁচ থেকে ছয় মাস আগে যখন রোগটি তীব্র আকার ধারণ করেছিল, তখন লকডাউনের মাধ্যমে মানুষকে ঘরে থাকতে বাধ্য করা হয়েছিল। বলা যায় চীনে সার্থক লকডাউনের মাধ্যমেই রোগটি নিয়ন্ত্রণে এসেছিল। প্রাথমিকভাবে মনে করা হয়েছিল যে, রোগটির বিস্তার বন্ধ করা গেছে এবং তা কয়েক মাসের মধ্যেই পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। কিন্তু বিধাতার ইচ্ছে মনে হয় অন্যরকম। পৃথিবীর অনেক দেশে কভিড-১৯ এর প্রকোপ বাড়ছে এবং তা নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য কারফিউ ঘোষণা করে বাড়িতে থাকতে বাধ্য করা হচ্ছে।

বাংলাদেশও মার্চ মাস থেকে লকডাউন শুরু হয়েছিল। অফিস আদালত বন্ধ; স্কুল-কলেজ বন্ধ; কল-কারখানা বন্ধ; ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ তথা দোকানপাট বন্ধ। বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশে যেখানে সাধারণ মানুষের সঞ্চয় খুবই সামান্য, সেখানে তাদের আয়-রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে গেলে তারা চলবে কীভাবে। স্কুল-কলেজ বন্ধ হয়ে গেলে লেখাপড়ার কী হবে। ঘরের চৌহদ্দিতে বন্ধ হয়ে থাকলে পারিবারিক তথা সামাজিক অশান্তি বৃদ্ধি পেতে পারে।

কভিড-১৯ এর পাশাপাশি আমরা অন্য একটি যন্ত্রণায় ভুগছি। সেটি হলো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। এ বছর উত্তরবঙ্গে কোথাও কোথাও চার থেকে পাঁচবার প্রলয়ঙ্করী বন্যা হয়েছে। উপকূল অঞ্চলে আম্পানের মতো অন্তত তিনটি ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস আঘাত হেনেছে। নদীভাঙন তীব্রতর হচ্ছে। প্রবল বৃষ্টিপাতের ঘটনা বারবার ঘটছে। কয়েকদিন আগে রংপুরে প্রায় সাড়ে চারশ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল। পুরো শহর ছিল পানির তলায়। এই পরিমাণ বৃষ্টিপাত ঢাকা শহরে হলে অনুমান করছি শহরের ৮০ ভাগ এলাকায় নৌকাই হতো যানবাহনের প্রধান অবলম্বন। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে খাবার পানির তীব্র সংকট পরিলক্ষিত হচ্ছে। জমিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে কৃষি উৎপাদন কমেছে এবং মানুষ দেশান্তর হচ্ছে। কাজের সন্ধানে শহরগুলোতে এসব দেশান্তরী মানুষ আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু শহরগুলোতে রয়েছে কর্মসংস্থানের তীব্র ঘাটতি। এতে প্রত্যক্ষভাবেই হোক আর পরোক্ষভাবেই হোক সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। খবরের কাগজ খুললেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

কভিড-১৯ নামের মহামারি কবে দূর হবে জানি না। হয়তো ছয় মাসের মধ্যে এর প্রতিষেধক আবিস্কার হবে। হয়তো এক-দুই বছরের মধ্যে কভিড-১৯ বিদায় নেবে। এর কতদিন পরে নতুন অন্য একটি মহামারি উদয় হবে তাও আমরা জানি না। পৃথিবীর ইতিহাস ঘাটলে বিভিন্ন মহামারি আক্রমণের তথ্য জানা যায়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো লক্ষণ দেখছি না। পৃথিবীর সব দেশ মিলে ২০১৫ সালে প্রতিজ্ঞা করেছিল যে, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের কারণ ২০৩০ সালের মধ্যে নির্মূল করা হবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি এটা তো হবেই না বরং এই শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত এই অবস্থার অবনতি হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন- বন্যা, খরা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি তো বাড়বেই এবং এর ফলে দরিদ্র দেশগুলোতে খাদ্য ঘাটতি এবং এসব দেশ থেকে মানুষের দেশান্তরী হওয়ার ঘটনা আরও বৃদ্ধি পাবে।

এ সবকিছু মিলিয়েই আমরা অত্যন্ত চিন্তিত। দুশ্চিন্তার প্রধান কারণগুলো চিহ্নিত করার চেষ্টা করছি। প্রথমত, শিক্ষার গুণগত মান। একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে এই বিষয়টি আমাকে প্রচ ভাবে ভাবাচ্ছে। বাংলাদেশের মতো গরিব দেশগুলোতে এ ব্যাপারে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। স্কুল-কলেজ বন্ধ করে দিয়ে গণহারে উচ্চতর শ্রেণিতে প্রমোশন দেওয়া হচ্ছে। আমরা কি অন্য দেশ থেকে একটু শিক্ষা নিতে পারি না। তারা ইন্টারনেটের মাধ্যমে পাঠদান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা দেশজুড়ে শিক্ষাদান কেন্দ্র তৈরি করে পড়াশোনা চালানোর প্রয়াস নিতে পারতাম। আমি বিশেষভাবে চিন্তিত হয়েছি এইচএসসি পরীক্ষা না নেওয়ার সিদ্ধান্তে। সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিয়ে অবশ্যই পরীক্ষা নেওয়া উচিত ছিল। শিক্ষার গুণগত মান রক্ষার সঙ্গে কোনোভাবেই আপস করা উচিত নয়। দরকার হলে ব্যাচভিত্তিক কয়েক সেট প্রশ্নপত্র তৈরি করে পরীক্ষা নেওয়া যেত। শিক্ষা প্রশাসন সংক্রান্ত কর্মকর্তারা পরীক্ষা বন্ধ করার মতো একটা সহজ সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজেদের দায়িত্ব এড়িয়েছেন; বরং তরুণদের ভবিষ্যতের ওপর প্রশ্নবোধক চিহ্ন বসিয়ে দিয়েছেন। সারাবিশ্ব যে ১৭টি টেকসই উন্নয়নের নির্দেশনা নিয়ে কাজ করছে, তার একটি হচ্ছে শিক্ষার গুণগত মান উন্নত করা। আমরা কোয়ান্টিটির দিকে নজর দিতে গিয়ে কোয়ালিটিকে বিসর্জন দিচ্ছি।

আমার দ্বিতীয় দুশ্চিন্তার বিষয় হচ্ছে খাদ্য ঘটতির আশঙ্কা। একটি বছরে বারবার বন্যা অথবা খরার প্রভাবে খাদ্য ঘাটতির আশঙ্কা বৃদ্ধি পাবে। বাজারে বর্তমানে তরিতরকারির দাম অস্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এক কেজি শিমের দাম একটি এক কেজির মুরগির দামের চেয়ে বেশি। পেঁয়াজ আমদানি করতে হচ্ছে ইউরোপ থেকে। কাঁচামরিচ আনতে হচ্ছে প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ফসলের পর্যায়ক্রম বদলাতে হবে। নতুন প্রজাতির বীজ উদ্ভাবন করতে হবে। বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত জলবায়ু সহিষুষ্ণ ফসলের বীজ কৃষকের কাছে পৌঁছানোর সময় কমাতে হবে। বিপণন এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থা ঠিক থাকলে এ বছর পেঁয়াজের ঘাটতি হতো না।

আমার তৃতীয় ভাবনার বিষয় হচ্ছে মানুষের জীবিকার সমস্যা। কভিড-১৯ এর প্রভাবে স্বল্প আয়ের মানুষের যে দুর্গতি হয়েছে তা অবিলম্বে মূল্যায়ন করা দরকার। কলকারখানাগুলো বন্ধ করে দেওয়ায় লাখ লাখ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। লকডাউনের কারণে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ফেরিওয়ালার মতো ব্যবসায়ীরা তাদের জীবিকা হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছে। ছোট অথবা মাঝারি ধরনের শিল্পপতি এবং ব্যবসায়ীরা তাদের ক্ষয়ক্ষতি আদৌ কাটিয়ে উঠতে পারবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে। বড় শিল্পপতিদের সহায়তায় সরকার এগিয়ে এসেছে। কিন্তু যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায় তাদের কথা কেউ ভাবছেন কি। অনেকেই ব্যবসায়ের মূলধন ভেঙে জীবন ধারণ করেছে। তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সরকার কী ব্যবস্থা নিচ্ছে।

আমার আর একটি দুশ্চিন্তার কথা তুলে ধরে লেখা শেষ করছি। তা হলো সামাজিক অস্থিরতা। বিশ্বজুড়ে সামাজিক অস্থিরতা বাড়ছে। খবরের কাগজের পাতা উল্টালেই কেন যেন মনে হয় দরিদ্র দেশগুলোতেই এই অস্থিরতা বেশি বাড়ছে। হয়তো এদের সহনশীলতা বা জবংরষরবহপব অনেক কম। সামান্য চাপে পড়লেই এরা দিজ্ঞ্বিদিক শূন্য হয়ে পড়ে। আমি মনে করি এ বিষয়ে এখন থেকেই ভাবা উচিত। আমি সমাজবিজ্ঞানী কিংবা মনোবিজ্ঞানী নই; তবে এই সমস্যার সমাধানে তাদের এগিয়ে আসতে হবে। বিশ্বজুড়ে অসামাজিক কার্যকলাপ বেড়েই চলেছে। নারী নির্যাতনের বিষয়ে প্রতিদিনের খবরের কাগজে প্রকাশিত সংবাদগুলো পড়লে নিজেকে অনেক অসহায় মনে হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কালো মানুষের প্রতি সাদা মানুষের ব্যবহার অত্যন্ত নিচু সামাজিক অবস্থাকে নির্দেশ করে। আমাদের দেশে রাজনৈতিকভিত্তিক সবলের অত্যাচার যেন ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। অনৈতিক ব্যবহার যেন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হচ্ছে।

বিশ্বজুড়ে প্রকৃতির যে অস্থিরতা, কভিড-১৯ এর আগমন অথবা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রকোপের মাধ্যমে যা পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা আমাদের স্বাভাবিক নিরাপত্তাকে ব্যাহত করছে। আমরা চাই প্রতিটি নাগরিকের খাদ্য নিরাপত্তা, জীবিকার নিরাপত্তা, খাবার পানি ও বিদ্যুতের নিরাপত্তা এবং সুশিক্ষা প্রাপ্তির নিরাপত্তা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দীর্ঘদিন থাকবে এবং কভিড-১৯ এর প্রভাবও বেশ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। কাজেই প্রতিটি নাগরিকের জন্য প্রভাবমুক্ত একটি নিরাপদ জীবন-জীবিকা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এখন থেকেই তৎপর হতে হবে।

লেখক, পরিবেশবিদ, শিক্ষাবিদ