করোনা বাস্তবতায় এই সময়

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থা স্থিতিশীল, ইংরেজিতে যাকে বলে 'স্টেবল'। তবে এই স্থিতিশীলতা বেশ কৃত্রিম। দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু আছে কিন্তু সরকারি দল ছাড়া অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কর্মতৎপরতা তেমন দেখা যায় না। বলা হয় সেরকম পরিবেশ নেই। বিরোধী দলগুলো সাংগঠনিকভাবে ঝিমিয়ে পড়া অবস্থায়। স্বস্তির বিষয়, দেশে বর্তমানে বড় রকমের সন্ত্রাস বা রাজনৈতিক সংঘাত নেই। কিন্তু সামাজিক ইস্যুতে তরুণদের আন্দোলন অরাজনৈতিক হলেও সরকার দক্ষতার সঙ্গে সেসবের শান্তিপূর্ণ মোকাবিলা করতে পেরেছে। অন্তত স্বল্প মেয়াদে হলেও। সার্বিকভাবে বলা যায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে সরকার পরিচালনা করছেন এবং ভৌত ও আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক উন্নয়ন সম্ভব করেছেন। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সম্পর্কের ভারসাম্যও রক্ষা করেছেন। তাঁর অর্জন প্রশংসনীয়। এমনকি করোনা-পরিস্থিতিতেও রাজনৈতিক পরিবেশ স্থিতিশীল রাখতে পারছেন। অবশ্য বহু ক্ষেত্রেই দেশে সুশাসনের অভাবের কথা শোনা যায়।

সব মিলিয়ে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ বা পরিস্থিতি অনেকটাই দুর্বোধ্য- এর ব্যাখ্যা বা বিশ্নেষণ মোটেই সহজ নয়। দেশে এক ভিন্ন ধরনের 'গণতান্ত্রিক' রাজনীতি বিদ্যমান। সরকার তাকে উন্নয়নের রাজনীতি বলেন। তবে এটা ঠিক যে, দেশে গ্রেনেড হামলার রাজনীতি বা শাপলা চত্বরের 'হেফাজতি' রাজনীতি আপাতত বন্ধ আছে।

করোনা মহামারিতে দেশের নাগরিকদের সামাজিক সচেতনতা ছিল মিশ্র ধরনের ও বিভিন্ন মাত্রার। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সচেতনতা ও আচরণ বিভিন্ন রকম। শহর ও গ্রামের মানুষের সচেতনতার মাত্রাও ভিন্ন। এমনকি রাজধানী ঢাকার নাগরিকদের মধ্যেও সচেতনতার ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। প্রথম দিকে সবার মধ্যে এক ধরনের ভীতি কাজ করেছে। ক্রমশ ভীতির মাত্রা কমেছে বলে মনে হয়। রাজধানীর শিক্ষিত বিত্তবান নাগরিকদের অধিকাংশই বেশ কঠোরভাবেই করোনা মোকাবিলায় সবরকম সাবধানতা মানছেন। তাদের বাইরে বেরোবার অর্থনৈতিক চাপ নেই। নিম্নবিত্তদের সেরকম সুযোগ ছিল না, নেই, তারা সব স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না, মানতে পারছেন না। সচেতনতা থাকলেও শ্রমজীবী মানুষের বাইরে না যাওয়ার সুযোগ কম, করোনা আচরণবিধি মানার সুযোগও কম। ঢাকার খুব ঘনবসতির বস্তি এলাকার মানুষ মনে হয় আচরণবিধি মানতে আগ্রহী নন। একটা ধারণা জন্মেছিল যে, একধরনের ইম্‌মিউনিটির কারণে ঢাকার বস্তিবাসীর মধ্যে করোনা-আক্রান্ত হার কম। কিন্তু আইসিডিডিআর,বি ও আইইডিসিআরের সাম্প্রতিক গবেষণায় এমন ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। বস্তিতে আক্রান্তের হার বেশ উঁচু। তবে সৌভাগ্যক্রমে মৃত্যু সংখ্যা খুবই সীমিত।

গণমাধ্যম তার ভূমিকা মোটামুটি ভালোই পালন করছে বলে মনে হয়, বিশেষ করে টেলিভিশন। ঘরবন্দি বিত্তবানদের জন্য মাধ্যমটি কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। শ্রমজীবীদের জন্য হয়তো ততটা নয়। শিক্ষিত মধ্যবিত্তরা অধিকাংশই খবরের কাগজ পড়া কমিয়ে দিয়েছেন।

২.

করোনা মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগ নিয়ে যদি বলি, সরকারের উদ্যোগ মাঝারি গোছের ছিল বলে মনে করি। শুরুতে বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবনে দেরি করেছে সরকারের সংশ্নিষ্ট মহল। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্ব ছিল দুর্বল। তবে দ্রুতই প্রধানমন্ত্রীর তৎপরতা দৃশ্যমান হয়েছে এবং সরকারের পক্ষ থেকে নানারকম প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে। তাঁর আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ় প্রত্যয় মানুষকে আশ্বস্ত করেছে। মাঠপর্যায়ে ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ দেখা গেছে। অবশ্য দ্রুতই বোঝা গেছে দেশের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যেমন দুর্বল, তেমনই দুর্নীতিগ্রস্ত ও অদক্ষ। তা ছাড়া এমন একটি মহামারির কথা কেউ কল্পনাও করেনি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ যে পরিমাণ দক্ষতা ও তৎপরতা দেখায়, করোনা মহামারিতে তার সামান্যই দৃশ্যমান হয়েছে, বরং দুর্বলতাই বেশি ধরা পড়েছে। ক্রমশ সরকারের উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনায় কিছুটা কার্যকারিতা চোখে পড়েছে।

দেশের বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাও যে কতটা দুর্বল ও অস্বচ্ছ, সে বিষয়টিও করোনাকালে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে বহু অভিজ্ঞ চিকিৎসক প্রাণ হারিয়েছেন, এটা অত্যন্ত পরিতাপের।

করোনার পুরো বিষয়টি এতটাই অভাবনীয় ছিল যে, সরকার কিংবা বেসরকারি খাত, কারও পক্ষেই এর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ সহজ ছিল না। এমনকি উন্নত ধনী পশ্চিমা দেশগুলোও রীতিমতো পর্যুদস্ত হয়ে পড়েছে। মহাপরাক্রমশালী যুক্তরাষ্ট্রের কী অসহায় অবস্থা!

করোনা সহায়তা ও ত্রাণ বিতরণে আত্মসাতের ঘটনার খবর প্রথম দিকে কিছুটা শোনা গেছে, তবে পরে ব্যবস্থাপনার মোটামুটি উন্নতি হয়েছে বলে মনে হয়। বেসরকারি বা নাগরিক পর্যায়ে ত্রাণ তৎপরতা আরও দৃশ্যমান হওয়া উচিত ছিল, সম্ভবত করোনা বা কভিড-১৯-এর সংহারী চরিত্রের ভীতি সেরকম তৎপরতায় অভাব বা কমতি হচ্ছে। দুর্নীতি আমাদের দেশে অত্যন্ত সর্বগ্রাসী ও গভীর। এ থেকে মুক্তি সহজলভ্য হবে না। কিছুদিন আগে বিবিসি রেডিওর এক অনুষ্ঠানে একজন বিজ্ঞ বিশ্নেষক জি-৮-এর সদস্য দেশ ইতালির দুর্নীতির কথা যেমন বলছিলেন, 'দুর্নীতি আমাদের রক্তে মিশে গেছে'। হয়তো এমন কথা আমাদের জন্যও প্রযোজ্য। তবে চিকিৎসা ব্যবস্থা ও ত্রাণ বিতরণে দুর্নীতি হ্রাস করার উদ্যোগ সরকারের পক্ষ থেকে নিতেই হবে। সেরকম তাগিদ কিছুটা দৃশ্যমান হচ্ছে, কিন্তু আরও বেশি শক্তিশালী হওয়া জরুরি। এ ক্ষেত্রে নাগরিক বা সামাজিক উদ্যোগেরও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। সর্বক্ষেত্রে সুশাসন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত দুর্নীতি রোধ অনেকটা তাত্ত্বিক পর্যায়েই থেকে যাবে।

 ৩.

দেশে রাজনৈতিক বিরোধী দলগুলো বস্তুত খুবই দুর্বল ও গন্তব্যহীন। বলা উচিত রীতিমতো নেতৃত্বহীন ও আদর্শহীন। তারা সাংগঠনিকভাবেও দুর্বল। কোনো কোনো দল আছে প্রগতিশীল আদর্শে সমর্পিত, তবে সাংগঠনিকভাবে অতিমাত্রায় দুর্বল, প্রায় অস্তিত্বহীন। জনপ্রিয় বড় বিরোধী দল মহা বিভ্রান্তিতে আচ্ছন্ন। সঠিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় অবশ্য সরকারি দলেরও বিরাট ভূমিকা থাকার কথা। বড় দল পরমতসহিষ্ণু না হলে গণতান্ত্রিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠা দুরূহ। অথচ আমাদের কাম্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। দুঃখজনক যে, দলের মধ্যেও গণতন্ত্র চর্চার অভাব রয়েছে। 'গণতন্ত্র' সংজ্ঞা নিয়েও ঐকমত্য নেই। জনগণ অবশ্যই 'সুশাসন' আশা করে, আবার সুশাসনের অন্যতম সূচক হচ্ছে গণকর্মকাণ্ড তথা উন্নয়নে নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য নিঃসন্দেহে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন। ইতোমধ্যে অনুন্নত দেশের পর্যায় থেকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের সারিতে উঠে এসেছে। বিশ্বের প্রায় ২০০ দেশের মধ্যে জিডিপির মাপে ৪২তম স্থান অর্জন করেছে। জিডিপির বার্ষিক বৃদ্ধি হার অব্যাহতভাবে ৬ শতাংশের ওপর, এমনকি ৮-এর কাছে। করোনাকালে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে প্রবৃদ্ধি হার ছিল সর্বোচ্চ। সরকারি হিসাবে ৫.৫, এডিবির হিসেবে ৬.৫, বিশ্বব্যাংক যদিও কম বলতে চায়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে সামাজিক উন্নয়নও সম্ভব হয়েছে। ১৪ অক্টোবরের খবরে জানা গেল, 'মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ'। নিঃসন্দেহে শ্নাঘার বিষয়। দারিদ্র্য পরিস্থিতির প্রশংসনীয় উন্নতি হয়েছে। তবে, একই সঙ্গে সামাজিক বৈষম্য প্রচণ্ডভাবে বেড়ে গেছে। ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় সাফল্য দেখিয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক অমর্ত্য সেন সব সময় বাংলাদেশের সামাজিক উন্নয়নের প্রশংসা করেন। নারীশিক্ষার অগ্রগতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। স্কুলগামী মেয়েশিশুদের শিক্ষাবৃত্তির আর্থিক প্রণোদনা খুবই প্রশংসা অর্জন করেছে। অবশ্য এতসব অর্জনের পরও কোনো কোনো ক্ষেত্রে সামাজিক সমস্যা খুবই দুশ্চিন্তার বিষয়, যেমন নারী ও শিশু নির্যাতনের বিষয়টি। ধর্মাশ্রয়ী সন্ত্রাস ও সহিংসতা হ্রাস করা গেছে, কিন্তু সাম্প্রদায়িকতার অশুভ শক্তি এখনও ক্রিয়াশীল। সমাজের একটি বড় অংশকে প্রতিক্রিয়াশীল বা রক্ষণশীল মানসিকতাসম্পন্ন রেখে প্রকৃত সামাজিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।

৪.

করোনাকালেও উন্নয়নের চাকা সক্রিয় রাখতে বাংলাদেশ সরকার মোটামুটি সঠিক পথে এগিয়েছে। উৎপাদন খাতকে প্রণোদনা দিয়েছে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী বস্ত্র খাত ও কৃষিতে। কৃষি উৎপাদনে আরও শক্তিশালী প্রণোদনা দেওয়া আবশ্যক। খাদ্য উৎপাদনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। শহর ও গ্রামে মাঝারি ও ক্ষুদ্র উদ্যোগ তথা 'ইনফরমাল সেক্টর' বা অপ্রাতিষ্ঠানিক ও ক্ষুদ্র ব্যক্তি খাতকে সহায়তা করা জরুরি। এখানেই কর্মসংস্থান বেশি। প্রবাসী কর্মীদের স্বার্থ সুরক্ষা জরুরি। স্বাস্থ্য খাতে আরও প্রণোদনা দান ও ব্যবস্থাপনার উন্নতি প্রয়োজন। শিক্ষা খাতে নতুন পদ্ধতি (ডিজিটাল) কার্যকর করার কথা ভাবতে হবে। ভৌত অবকাঠামোর মেগা প্রকল্পে দুর্নীতি দূরীকরণ ও ব্যবস্থাপনার উন্নতির দিকে কঠিন দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। নতুন মেগা প্রকল্প গ্রহণ না করাই শ্রেয় হবে। মেগা প্রজেক্টে মেগা দুর্নীতির সুযোগ থাকে। রূপকল্প ২১-৪১ ও অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা করোনা প্রাসঙ্গিক বাস্তবমুখী করা প্রয়োজন। সর্বস্তরে সুশাসন নিশ্চিত হওয়া আবশ্যক। অর্থাৎ, পরিকল্পনা প্রণয়ন ও প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, সংশ্নিষ্ট সবার অংশগ্রহণ, দুর্নীতিমুক্ত, দক্ষতাসম্পন্ন ও পরিবেশবান্ধব হতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়নকে দুর্নীতিমুক্ত করার ব্যবস্থা করা, সর্বস্তরে সুশাসন নিশ্চিত করা।

বর্তমানে ঘটে যাওয়া নারী নির্যাতন, ধর্ষণ ইত্যাদি সামাজিক ব্যাধির দীর্ঘমেয়াদি প্রতিকার ও প্রতিরোধ দাবি করে। এ ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব সর্বোচ্চ, একই সঙ্গে জনগণেরও দায়িত্ব রয়েছে। স্বাধীন ও দক্ষ বিচার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই সর্বোচ্চ প্রয়োজন। রাজনৈতিক দল ও নাগরিকদের দায়িত্বও কম নয়। গোটা সমাজ ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর কথাও বলা হয়, শিক্ষা ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস, নৈতিক শিক্ষার গুরুত্বের কথা ভাবা হয়। সরকার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে ধর্ষণবিরোধী আইন পাস করেছে, তবে এটাই যথেষ্ট নয়। পাশাপাশি বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত করা ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি। বস্তুত প্রশাসন ও শিক্ষা ব্যবস্থার সব পর্যায়ে অসামাজিক কর্মকাণ্ড, ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতনবিরোধী জনসচেতনতা বৃদ্ধির কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

৫.

সর্বক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া কোনো জাতীয় সমস্যার সমাধানই সম্ভব নয়। অর্থনৈতিক সমস্যা, সামাজিক-রাজনৈতিক সমস্যা যা-ই বলি না কেন।

সুশাসন প্রতিষ্ঠাই সবচেয়ে জরুরি, কিন্তু কাজটি না সহজ, না তাৎক্ষণিক। স্বাস্থ্য খাতসহ নানা খাতেই দুর্নীতির রাশ টেনে ধরতে হবে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য প্রণোদনামূলক সহায়ক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। কৃষি উৎপাদনে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে সব উৎপাদন খাতকে উৎসাহিত করতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বর্তমানে চরম বৈষম্যমূলক, স্বল্প আয়ের দেশ হওয়া সত্ত্বেও। বৈষম্য হ্রাসের উদ্যোগ আগামী অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাতেই গ্রহণ করতে হবে। কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে কৃষি খাতে- বিশেষ করে বাজারমুখী শস্যবহির্ভূত কৃষি খাতগুলোতে, শিল্প খাতে বিশেষ করে মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পে এবং সেবা খাতেও। সেবা খাতে শ্রম সংস্থানের সুযোগ বেশি অপ্রাতিষ্ঠানিক ব্যক্তি খাতে অর্থাৎ ইনফরমাল সেক্টরে- এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ-প্রণোদনা, প্রযুক্তিগত বা বাজারজাতকরণেও আর্থিক সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন। সংগঠিত এনজিও খাত এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। ব্যক্তিগত সেবা খাত যেমন পর্যটন, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য ক্ষেত্রে সম্ভব কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা। আধুনিক প্রযুক্তি খাত যেমন সফটওয়্যার উদ্ভাবন ও নির্মাণ ব্যাপক প্রণোদনা ও সহায়তা দাবি করে।

গৃহনির্মাণ খাত অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখতে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। এ ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগ, বেসরকারি বাণিজ্যিক উদ্যোগ (রিয়েল এস্টেট খাত) ও ব্যক্তিগত বা পারিবারিক উদ্যোগকে প্রণোদনা দেওয়া সংগত। 'এ দেশে একজন মানুষও গৃহহীন থাকবে না'- প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণার বাস্তবায়নে অর্থপূর্ণ উদ্যোগ নিলে অর্থনীতির উন্নতি হবে। এ বছরের ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য আশ্রয়/গৃহ নির্মাণের মধ্য দিয়ে শুরু হতে পারে। কিছু অতি সুদূরপ্রসারী অধিক ব্যয়বহুল মেগা প্রকল্প কয়েক বছরের জন্য স্থগিত রাখা যায়। তবে চলমান ও অনেকটা এগিয়ে যাওয়া প্রকল্প, যেমন পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেল কিংবা ঢাকার মেট্রো রেল প্রকল্প ইত্যাদি দক্ষতার সঙ্গে সময়মতো, এমনকি সম্ভব হলে আরও দ্রুততার সঙ্গে শেষ করতেই হবে।

করোনাকালেই সংঘটিত হয়েছে ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও দীর্ঘস্থায়ী বন্যা, ভয়াবহ নদীভাঙন- উপদ্রুত এলাকার মানুষের জন্য বিশেষ সাহায্যের ব্যবস্থা জরুরি। নদী রক্ষা ও পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্ব পাচ্ছে বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ প্রকল্পে। করোনা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি ১১ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর সমস্যাও চিন্তার বিষয়।

৬.

করোনা-উত্তর বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের প্রাধান্য-দাবিদার করণীয় বহুবিধ, তার মধ্যে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য হলো :

বিশ্বশান্তি ও আঞ্চলিক রাজনীতির মঞ্চে বাংলাদেশ সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও আত্মস্বার্থ সংরক্ষণের জন্য বিশ্বের বৃহৎ শক্তির সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা জরুরি। রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা সমাধান প্রচেষ্টা অবশ্য অগ্রাধিকার পায়। প্রায় ১১ লক্ষাধিক শরণার্থীর বোঝা বাংলাদেশের জন্য এক বিশাল ও জটিল সমস্যা।

প্রবাস-কর্মসংস্থান অব্যাহত রাখা ও বিস্তৃত করার যথাযথ কৌশল নির্ধারণ আবশ্যক। সংশ্নিষ্ট দেশসমূহের সঙ্গে কার্যকর সুসম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি।

রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানা পূর্ণমাত্রায় সচল রাখার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ আবশ্যক।

খাদ্য উৎপাদনসহ কৃষি খাতের সব বিষয়েই বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। সব দেশ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাইবে, সেক্ষেত্রে নিজেদের খাদ্য মজুদ নির্ভরযোগ্য রাখা জরুরি।

সারা বিশ্বের জন্যই জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি খুবই চিন্তার। বাংলাদেশ শুরু থেকেই জলবায়ু পরিবর্তন আলোচনায় কার্যকর নেতৃত্ব অর্জন করেছে, যথাযথ পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে নিজেদের দেশের স্বার্থ রক্ষাকারী পদক্ষেপ জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ও মানুষের স্বার্থ সংরক্ষণে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। আন্তর্জাতিক সহায়তা দাবি করতে হবে।

দেশের ভৌত ও আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য যেসব ভৌত ও অবকাঠামোগত প্রকল্প বা কার্যক্রম নেওয়া হবে, সেগুলো যেন শতভাগ পরিবেশবান্ধব ও ভূমি সাশ্রয়ী হয় তার খেয়াল রাখতে হবে। সরকার অনুমোদিত 'বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০' বাস্তবায়নের সময় কথাটি খেয়াল রাখতেই হবে।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে উন্নতি করছে যেমন সত্য, তেমনি সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক বৈষম্যও প্রচণ্ডভাবে বেড়ে গেছে। সুষম বণ্টনের নীতি অনুসরণ করে এই বৈষম্য হ্রাস করার উদ্যোগ নিতেই হবে।

বাংলাদেশ ভৌগোলিক আয়তনে ছোট, অথচ দেশের জনসংখ্যা বিশাল, এই বাস্তবতা মনে রেখেই সব উন্নয়ন পরিকল্পনা ও প্রকল্প গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। জনসংখ্যাকে দ্রুত জনশক্তিতে রূপান্তর করা ছাড়া বিকল্প নেই। সে জন্য শিক্ষা, প্রায়োগিক শিক্ষা, আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক শিক্ষা অপরিহার্য। দক্ষতার কথাও এসে যায়।

দেশ থেকে দারিদ্র্য দূরীকরণ যেমন জরুরি, দুর্নীতি নির্মূল করা আরও জরুরি। সে কারণে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সর্বোচ্চ দৃষ্টি স্থাপনের অঙ্গীকার প্রয়োজন। এই উদ্দেশ্যে আবার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার কথা বলা যায়। আসলে বিষয়গুলো একটির সঙ্গে আরেকটি সম্পর্কিত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলেই এখন গণতন্ত্র প্রশ্নবিদ্ধ। তা সত্ত্বেও দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের কাছে একটি গ্রহণযোগ্য শাসন ব্যবস্থার আকাঙ্ক্ষা থাকেই। এবং তা গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা, বাংলাদেশের জন্য।

লেখক, প্রাবন্ধিক, নগর পরিকল্পনাবিদ, সাবেক চেয়ারম্যান ইউজিসি