দুঃস্বপ্নের করোনা

নতুন স্বাভাবিকতার জীবন

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

--

করোনা-পূর্ব জীবন এবং পরবর্তী জীবনে আমরা বর্তমানে 'নিউ নরমাল' বা নতুন স্বাভাবিকতার জীবনের সঙ্গে ধীরে ধীরে খাপ খাইয়ে নিচ্ছি নিজেদের। করোনার পর পুরো পৃথিবীতেই স্বাস্থ্য সচেতনতার নতুন তরঙ্গ তুলেছে। এটাই এই মহামারি থেকে তাৎক্ষণিক সামাজিক লাভ। আবার কবে মানুষ উদ্বেগহীনভাবে আনন্দে অপরকে জড়িয়ে ধরবে, কবে মুখোশ খুলে মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেবে সবাই, সেও অনুমান করা দুঃসাধ্য। এটা হতে পারে কয়েক মাস; বছরও। তবে নিশ্চিত যে মানুষ আবারও উঠে দাঁড়াবে। নতুন অভিজ্ঞতায়, নতুনভাবে।

খাবার নিয়ে সচেতনতা বাড়ছে। ফলে চাঙ্গা হয়ে উঠছে অর্গানিক ফুডের বাজার। বিশেষ করে যেসব খাবার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, সেগুলোর দিকে মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। শরীরে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি থাকা যে অধিক জরুরি, তা করোনা জানিয়ে দিয়ে গেছে। ভোগের ধরন যেমন পাল্টাচ্ছে, তেমনি বদলে যাচ্ছে জীবনযাপনের ধরনও।

নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষায় শক্তিশালী অনেক দেশকে এবার মাস্ক ও সাধারণ মেডিকেল যন্ত্রপাতির জন্য অন্য দেশের দিকে হাত বাড়াতে হয়েছে। এ শিক্ষা মনে রেখে গতানুগতিক ধাঁচের প্রতিরক্ষা বাজেটের কিছু অংশ স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতের সামর্থ্য বাড়াতে ব্যয় করবে অনেক দেশ। দৃশ্যমান শত্রুর বদলে অদৃশ্য শত্রু প্রতিটি দেশকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। সুতরাং বিশ্বজুড়ে শত্রু-মিত্রের পুরোনো ধারণাও পাল্টাতে বাধ্য। নাগরিকদের জাতীয় নিবন্ধনের মতোই অনলাইনের স্বাস্থ্যতথ্য সংরক্ষণ ভবিষ্যতে বাধ্যতামূলক হয়ে উঠবে অনেক অঞ্চলে।

মিসাইল সংগ্রহের চেয়ে একজন ডাক্তার তৈরি যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তা আমাদের বিশ্ব পরাশক্তিধর দেশগুলো হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। করোনার আগে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয় যে প্রয়োজনীয় মনোযোগ পাচ্ছিল এবং তার মোকাবিলা যেভাবে মানবসমাজের অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছিল, সেই স্থানটি করে নিতে পারে এখন সরাসরি স্বাস্থ্য প্রশ্ন। ইউরোপের দেশগুলো ইতোমধ্যে শিল্প ও ব্যবসা খাতকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার সহায়তার ঘোষণা দিচ্ছে।

করোনাভাইরাস কেবল বিশ্ব ব্যবস্থার ধরনই নয়, অনেক সামাজিক মূল্যবোধই আমূল পাল্টে দিতে পারে। মহামারির অতীত ইতিহাস অন্তত আমাদের তেমন ধারণাই দেয়। তবে সামাজিক পরিবর্তনের ভবিষ্যৎটি অনুমান করা এখনও কঠিন। কারণ, ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নের অতিপ্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে বিশ্ব।

করোনামুক্ত থাকতে গোলার্ধজুড়ে মানুষ প্রতিদিনকার জীবনধারা স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে পাল্টে প্রমাণ দিল- উন্নত ও নিরাপদ জীবনদর্শনে তাদের প্রণোদিত করা মোটেই দুরূহ নয়। ইতোমধ্যে করোনা রাষ্ট্রীয় নজরদারি বাড়ার ইঙ্গিত দিয়ে যাচ্ছে। চলাচল ও সমাবেশে স্বাধীনতার ধারণা আগের মতো আর শর্তহীন থাকবে না। মানুষের নিরাপত্তা এবং 'নিরাপদ সমাজ' গড়ার কথা বলেই মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। তাদের শারীরিক সঙ্গ এড়িয়ে অনলাইনভিত্তিক করার উদ্যোগ চলবে। অনেক ভাষ্যকার করোনা-পরবর্তী বিশ্বে বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের দিকে মানুষের বাড়তি মনোযোগেরও ইঙ্গিত করছেন। এটা বিজ্ঞানসম্মত চিন্তাভাবনার নতুন এক যুগের দিকে নিয়ে যেতে পারে সভ্যতাকে। উপাত্ত-বিশ্নেষণই যখন মানুষকে প্রতিদিনকার করণীয় সম্পর্কে জানাবে।

মানবসভ্যতা এক ভয়াবহ ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে মানুষ বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইন পালন করছে। ঘরে কিংবা বাইরে যেখানেই হোক, ভাইরাস প্রতিরোধ বা সতর্কতার উপায় হিসেবে নিয়মিত মাস্ক ব্যবহার করছে। গ্লাভস বা স্যানিটাইজার ব্যবহার তো হয়ে গেছে নিত্যদিনের সঙ্গী। অনেকে এখন ভিড় এড়িয়ে চলছেন। কারও জ্বর-সর্দি হলেই তার ধারেকাছেও ভিড়ছেন না। পাশাপাশি সামাজিক দূরত্বের বিষয়টিও বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে নানা মহলে। অর্থাৎ, সবাই একটি নিয়মিত অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে উঠছেন। হয়তো এক দিন করোনা ঝড় থেমে যাবে। কিন্তু মানবসভ্যতায় যে আঁচড় পড়েছে, তা হয়তো থেকে যাবে চিরকাল। অর্থাৎ, লোকেরা আজ যে অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে উঠছেন, তা হয়তো থেকে যাবে চিরকাল।