'চাকরি করা মানে অন্যের কাছে নিজের মেধা বিক্রি করা। নিজের মেধা অন্যের কাছে বিক্রি করব কেন? আমার মেধায় মালিকরা ধনী হবে; আমি কিন্তু নিজের জায়গাতেই থাকব। তার চেয়ে ভালো নিজের মেধা নিজের পেছনে বিনিয়োগ করা। নিজে অন্যের চাকরি না করে অন্যকে চাকরি দেবো।' কথাগুলো বলছিলেন রাজশাহীর তরুণ উদ্যোক্তা ইয়াসির আরাফাত। যিনি আরাফাত রুবেল নামে পরিচিত।
নগরীর রামচন্দ্রপুর কালুমিস্ত্রি মোড়ের বাসিন্দা রুবেল ১৯৯৯-২০০০ শিক্ষাবর্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে ভর্তি হন। ২০০৬ সালে স্নাতকোত্তর শেষ করেন। পরে ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করেন। উচ্চশিক্ষিত রুবেল কখনও ছোটেননি চাকরির পেছনে। তার ভাষায়- তিনি কখনও চাকরি করার চিন্তাও করেননি। তার কাছে চাকরি করা মানে অন্যের কাছে নিজের মেধা বিক্রি করা। তাই ছাত্রজীবন থেকেই করেছেন অভিনব সব কাজ। এখন তিনি গরুর খামার, ঘাসের চাষ ও প্লাইউডের ব্যবসায় ব্যস্ত।
আরাফাত রুবেল জানান, ছাত্রাবস্থায় তিনি টিউশনি করতেন। চারুকলার ছাত্র হওয়ায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দেয়াল চিত্র আঁকার কাজ পেতেন। সেই টাকা দিয়ে নিজের খরচ মিটিয়ে বাড়তি টাকা দিয়ে প্লাইউডের ব্যবসা শুরু করেন। সাইকেলে করে বিভিন্ন দোকানে তার ব্যবসার পণ্য পৌঁছে দিতেন। পরিবারের কারও কাছ থেকে কোনো টাকা না নিয়েও ব্যবসায় হয়েছেন সফল। শূন্য থেকে এখন তিনি কোটিপতি। তাকে অনুসরণ এবং তার সঙ্গে যোগাযোগ করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের অসংখ্য তরুণ উদ্যোক্তা হয়েছেন বলেও জানান তিনি।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, এখন নগরীর অলোকার মোড়ে রুবেলের রয়েছে প্লাইউডের ব্যবসার জন্য বিশাল শোরুম। শ্যামনগর আবহাওয়া অফিসের পেছনে রয়েছে 'সওদাগর এগ্রো' নামে গরুর খামার। সেখানে ব্রাহামা, শাহিওয়ালের মতো উন্নত জাতের গরু পালন করছেন তিনি।
কীভাবে সমপরিমাণ খাবার ও পরিচর্যা করে দেশি গরুর চেয়ে অধিক মাংস উৎপাদন করা যায়, নিজের খামারের গরুকে খাওয়ানোর পাশাপাশি কীভাবে ঘাস থেকেও আয় করা যায়- সেসবও ভেবেছেন উদ্যোক্তা রুবেল। মাঠে চাষ করছেন চীন থেকে আনা উন্নত ও দ্রুতবর্ধনশীল জারা-১ জাতের ঘাস। যেটি দিয়ে তিনি নিজের খামারের চাহিদা পূরণ করেও ঘাস ও ঘাসের বীজ বিক্রি করে বাড়তি আয় করছেন। এ ছাড়া মাটি ছাড়াই নিজের বাসায় ঘাস চাষে সফল হয়েছেন। তার ঘরে ট্রেতে হাইড্রোফনিক ঘাসের চাষ হচ্ছে।
আরাফাত রুবেল জানান, তিনি চারুকলার ছাত্র ছিলেন। শিল্পী হিসেবে নিজের সৃজনশীলতা কাজে লাগিয়ে গড়ে তোলেন আসবাব তৈরির প্রতিষ্ঠান। সেই প্রতিষ্ঠানের আয় থেকে তিনি গরুর খামার ও ঘাস উৎপাদন শুরু করেন। খামার শুরুর আগে তিনি বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। গাজীপুরে ন্যাশনাল লাইভস্টক ট্রেনিং ইনস্টিটিউট থেকে ঘাস চাষ ও পশু পালনের ওপরে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।
শিক্ষিত তরুণরা চাকরির পেছনে ছোটে। আপনি চাকরির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা কেন হলেন? এমন প্রশ্নের জবাবে আরাফাত রুবেল বলেন, 'চাকরি করা মানে অন্যের কাছে নিজের মেধা বিক্রি করা। নিজের মেধা অন্যের কাছে বিক্রি করব কেন? আমার মেধায় মালিকরা ধনী হবে; আমি কিন্তু নিজের জায়গাতেই থাকব। তার চেয়ে ভালো- নিজের মেধা নিজের পেছনে বিনিয়োগ করব। আমার সংকল্প ছিল অন্যের অধীনে চাকরি করব না। বরং অন্যকে আমি চাকরি দেবো। এখন আমার প্লাইউডের ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে ৫০ জন কাজ করে, খামারে ১০-১২ জনকে কাজ দিয়েছি। সব মিলিয়ে ৬০ জনের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান করেছি আমি। দেশের বিভিন্ন এলাকার অসংখ্য তরুণ আমার পরামর্শ নিয়ে উদ্যোক্তা হয়েছে। তারা চাকরির আশা ছেড়ে উৎপাদনে নিজেকে নিয়োজিত করেছে।'
প্লাইউডের ব্যবসা থাকার পরও গরুর খামার করার বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের দেশে গরুর মাংসের চাহিদা ব্যাপক। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশের গরুর মাংসের কদর অনেক বেশি। কৃষিপ্রধান দেশে গরু পালন করা অনেকটা সহজ। তা ছাড়া ভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা থেকেই গরুর খামার তৈরি করা।
উদ্যোক্তা তৈরি করতে সরকারের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি আরও বলেন, অনেক তরুণ আছে যাদের উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন; তবে মূলধনের কারণে সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারছে না। ব্যাংকগুলো বিত্তবানদের ঋণ দেয়, বিত্তহীনদের ঋণ দিতে চায় না। আমার মতে শিক্ষিত মেধাবী তরুণদের ব্যাংক ঋণ দিতে হবে। তাহলে তারা চাকরির পেছনে না ছুটে, সেই ঋণের টাকা দিয়ে উদ্যোক্তা হতে পারবে।

লেখক: রাজশাহী প্রতিনিধি

বিষয় : নিজ মেধায় উজ্জ্বল উদ্যোগ

মন্তব্য করুন