অবহেলাকে শক্তিতে পরিণত করে সফল উদ্যোক্তা নাটোরের একডালা চাঁদপুর গ্রামের রুবিনা খাতুন। নারী উদ্যোক্তা হিসেবে পেয়েছেন কৃষি পদক ও জয়িতাসহ বেশ কয়েকটি সম্মাননা। সংসারে এনেছেন সমৃদ্ধি। রুবিনা এখন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে সমাজের চোখে যুদ্ধজয়ী এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। রুবিনা তার বাড়ির আঙিনায় হাঁস-মুরগি, মাছ আর কৃষি উদ্যান তৈরি করে সফলতা পেয়েছেন। নিজে হয়েছেন স্বাবলম্বী আবার অন্যদেরও দেখিয়েছেন স্বপ্ন। তাদের সেই স্বপ্ন পূরণেও করেছেন সহযোগিতা।
পিতৃহীন রুবিনা খাতুন স্বপ্ন দেখেছিলেন সুন্দর সংসার গড়ার। ২০১২ সালে দাম্পত্য জীবনও শুরু করেছিলেন সৌদি প্রবাসী এক যুবকের সঙ্গে। কিন্তু গায়ের রং কালো হওয়ায় সেই স্বপ্ন স্থায়ী হয়েছিল মাত্র ৩৪ দিন। স্বামী প্রবাসে ফিরে গেলে শুরু হয় শ্বশুরবাড়ির নির্যাতন। সাঁতার না জানায় রুবিনাকে পানিতে ডুবিয়ে মারারও ষড়যন্ত্র করে তারা। যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে একসময় রুবিনা নিজে থেকে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। কোনো উপায়ান্তর না দেখে ফিরে আসেন মায়ের সংসারে। চারদিক থেকে আসা দুয়োধ্বনিতে বেঁচে থাকাটা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছিল তার। কিন্তু তবুও ভেঙে পড়েননি রুবিনা। অদম্য ইচ্ছে থেকে নতুন করে শুরু করেন স্বাবলম্বী হওয়ার যুদ্ধ। কৃষির ওপর জ্ঞান না থাকায় বাবার প্রায় ১০ বিঘা জমি ছিল অনাবাদি। মায়ের সঙ্গে সেলাইয়ের কাজ করে সংসার খরচ জোগাতে থাকেন। কিন্তু অভাব পিছু ছাড়ছিল না। ২০১৪ সালে একটি এনজিও থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে বাড়ির আঙিনায় গড়ে তোলেন ব্রয়লার মুরগির খামার। কিন্তু প্রাথমিক অবস্থায় লোকসান গুনতে হয়। এমন সময় ভাগ্য খোলার বার্তা নিয়ে আসে ফেয়ার অ্যান্ড লাভলীর প্রতিযোগিতা 'তোমার স্বপ্ন কর সত্যি'। ২০১৫ সালে ওই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে দুই লাখ টাকা পুরস্কার পান রুবিনা। ওই টাকাও বিনিয়োগ করেন খামারে। এরপর আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। রুবিনা খাতুন জানান, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও হর্টিকালচার সেন্টার থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে শুরু করেন কৃষি খামার। বাবার রেখে যাওয়া ১০ বিঘা জমিতে গড়ে তোলেন কুল, আম ও পেয়ারা বাগান। বাড়ির পাশের পুকুরে শুরু করেন মাছের চাষ। ওই পুকুরেই শুরু করেন সমন্বিত পদ্ধতিতে হাঁস চাষ। শুরুতে দেড় বিঘা জমিতে ফলের বাগান করলেও এখন আরও সাড়ে পাঁচ বিঘা জমি লিজ নিয়ে ফলের চাষ করছেন। এ ছাড়া বাড়ির আঙিনায় দেড়শ কবুতর পালন করছেন। এর বাইরেও রয়েছে লাভ বার্ড আর কোয়েল পাখি। কম্পোস্ট ও জৈব সার তৈরি করছেন। বর্তমানে পুষ্টি বাগান শুরু করেছেন। সবজি ও ড্রাগন ফলের বাগান করেছেন। রুবিনা বলেন, নিজেকে একসময় যে অসহায় পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে, তেমন পরিস্থিতিতে যেন অন্য নারীদের পড়তে না হয়। বর্তমানে তাদের জন্যও কাজ করছেন। নিজে নাটোর হর্টিকালচার সেন্টারে বছরব্যাপী 'ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন' শীর্ষক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। সেই প্রশিক্ষণ এখন ছড়িয়ে দিচ্ছেন অন্যদের মধ্যে। প্রশিক্ষণ শেষে প্রত্যেককে অন্তত ১০টি করে বিভিন্ন ফলের গাছও দেন তিনি। এ ছাড়া আইএফএমসি স্কুল পরিচালনা করে অবহেলিত নারীদের গরু, হাঁস, মুরগি পালনের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। তিনি নিজেও গরু পালন করেন। রুবিনা 'ইয়ুথ উইমেন্স ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি থেকে নিবন্ধন নিয়েছেন। নির্যাতনের শিকার নারীদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন সেলাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। এতে মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর থেকে সহায়তা করা হয়। এরই মধ্যে রুবিনার হাতে প্রশিক্ষিত নারী উদ্যেক্তাদের মধ্যে সফল হয়েছেন রাশেদা বেগম, মর্জিনা খাতুন ও আয়েশা সিদ্দীকাসহ বেশ কয়েকজন।
মর্জিনা খাতুন ও রাশেদা বেগম বলেন, রুবিনা আমাদের নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছেন। তার অনুপ্রেরণায় গরু ও হাঁস-মুরগি পালন করে এখন আমরা স্বাবলম্বী।
রুবিনার এই বিশাল কর্মযজ্ঞে সহযোদ্ধা হিসেবে পেয়েছেন ছোট ভাই রুবেল এবং ছোট বোন রিমিকে। এ ছাড়া চারজন নিয়মিত শ্রমিকসহ প্রায় ৩৫ জন কাজ করছেন। রুবিনার কর্মযজ্ঞের স্বীকৃতি দিয়েছে সরকারি বিভিন্ন দপ্তর। তাদের আঙিনায় আইপিএম স্কুল পরিচালনা করে এলাকার ২৫ পরিবারের ৫০ সদস্যকে হাঁস-মুরগি পালন, গরু মোটাতাজাকরণ, সবজি চাষ, বসতবাড়ির বাগান প্রভৃতি বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও অর্থ সহায়তা দিয়েছে নাটোর কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ। মুরগির বিষ্ঠা দিয়ে তৈরি করছেন উৎকৃষ্ট জৈব সার-রিং কম্পোস্ট। প্রতি মাসে এখান থেকে তিন হাজার টাকা উপার্জন করেন। পাশেই উৎপাদন করছেন আরও একটি জৈব সার-ভার্মি পোস্ট। বাড়ির শোভা বাড়িয়েছে একঝাঁক কবুতর। এর বাজার দামও কম নয়। শুধু মুরগির খামারই নয়, বাড়িসংলগ্ন পুকুরে মাছ চাষ করেন। সঙ্গে চালু করেন হাঁসের খামার। পর্যায়ক্রমে জমি ইজারা নিয়ে ফলের ছয়টি বাগান তৈরি করেন। এসব বাগানে ফলছে নানা জাতের আম, লেবু, পেয়ারা, কলা, কুল, পেঁপে, মরিচ প্রভৃতি। আমের তালিকায় আছে গৌরমতি, ব্যানানা ম্যাঙ্গো, বারি-৪ ও কাটিমনসহ নাবি জাতের বারোমাসি আম। তৈরি করছেন ড্রাগন ফলের বাগান। ড্রাগন ফলের বাগানে সাথি ফসল হিসেবে চাষ করেছেন টমেটো, কফি, শিম ও মরিচ। এখন প্রতি মাসে সংসার খরচ বাদ দিয়ে আয় হয় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। রুবিনা কৃষিতে অবদান রাখায় নারী খামারি হিসেবে গত বছর রাষ্ট্রপতির হাত থেকে কেআইবি কৃষি পদক-২০১৮ নিয়েছেন। নারী উদ্যোক্তা হিসেবে পেয়েছেন জয়িতাসহ বেশ কয়েকটি সম্মাননা। নিজের আয় করা অর্থে মেরামত করেছেন বাড়িঘর। সুউচ্চ পাকা সীমানা প্রাচীর দিয়েছেন। এখন মা, ভাই ও বোনকে নিয়ে সুখেই দিন কাটছে রুবিনার। নাটোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সুব্রত কুমার সরকার বলেন, রুবিনার মেধা আর কৃষি বিভাগের প্রয়োজনীয় সমর্থন এবং সহযোগিতায় তিনি এখন সফল উদ্যোক্তা। সারাদেশে তার মতো উদ্যোক্তা তৈরি হলে দেশ সমৃদ্ধ হবে।

লেখক: নাটোর প্রতিনিধি

মন্তব্য করুন