অন্যায়-অনিয়ম বা বঞ্চনা দেখতে দেখতে আমাদের অনেকেরই গা-সহা হয়ে যায়। কিন্তু সমাজে কেউ কেউ থাকে, তারা প্রতিবাদ করে এবং ন্যায় ও সমতার লক্ষ্যে কাজ শুরু করে দেয়। সেই সামনের সারির একজন, ফরিদপুরের তারুণ্যের অহংকার তাহিয়াতুল জান্নাত যাকে সবাই চেনে রেমি নামে।
না, কোনো রজনৈতিক দলের ব্যানারে নয় অথবা কোনো এনজিওর সহায়তায়ও নয়; সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাসেবার ভিত্তিতে ফরিদপুরের সরকারি সারদা সুন্দরী মহিলা কলেজের এই শিক্ষার্থী গড়ে তুলেছেন 'নন্দিতা সুরক্ষা' নামে একটি ব্যতিক্রমী সংগঠন। উদ্যমী একঝাঁক তরুণীর এই সংগঠন গত দুই বছর জুড়ে নারী, শিশু ও সমাজের অবহেলিত পিছিয়ে পড়া মানুষের কল্যাণে নিরলসভাবে কাজ করছে।
জন্ম ফরিদপুরে হলেও রেমির শৈশব ও কৈশোরের একটা বড় অংশ কাটে ঝালকাঠি জেলার গড়ইয়া গ্রামে। গ্রামের একটি কম্বাইন্ড বিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই রেমি নারীদের নানা সামাজিক সমস্যা নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ছাত্রীদের মাসিকবান্ধব করে তোলার চিন্তা রেমির সেই সময় থেকেই ছিল, কিন্তু সুযোগ এবং সহযোগিতার অভাবে সাহস পাননি তিনি। সেই চিন্তাভাবনা থেকেই ফরিদপুর জেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নন্দিতা সুরক্ষার স্বেচ্ছাসেবী কর্মীরা শুরু করেছেন মাসিক সুরক্ষা ব্যাংক। রেমির স্বপ্ন, দেশজুড়ে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে একদিন।
তাদের উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম ও লক্ষ্যের মধ্যে রয়েছে- * ফরিদপুরের ৩০টি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারীদের জন্য মাসিকবান্ধব করতে তুলতে মাসিক সুরক্ষা ব্যাংক সার্ভিস চালু, যৌন সহিংসতা প্রতিরোধ, অনলাইন হ্যারাসমেন্ট প্রতিরোধ, নারী-পুরুষ সমতা, মাসিক সচেতনতা, বাল্যবিয়ে-যৌতুক প্রতিরোধ ও বন্ধে সচেতনতা সৃষ্টি, মানষিক স্বাস্থ্য ও বডি শেমিং নিয়ে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নারীদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি; যার ফলে তারা নারী-পুরুষ সমতা এবং নারীর ক্ষমতায়নে আগ্রহী ও প্রতিবাদী হয়ে উঠতে পারে।
* ফরিদপুর জেলার চারটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা ও ২৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের নিরাপদ, অনিরাপদ স্পর্শ বিষয়ে ধারণা দেওয়া এবং শিক্ষক-অভিভাবকদের মাঝে এই বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে সচেতনতা সৃষ্টি।
* শহরের সুইপার কলোনির শিশুদের জন্য বিনামূল্যে হাসিমুখ পাঠশালার মাধ্যমে তাদের প্রতিভার সঠিক বিকাশে সাহায্য করা এবং মেথর সম্প্রদায়কে সমাজের মূলধারার সঙ্গে সংযুক্ত করা।
* বেদে সম্প্রদায়ের নারীদের মাসিক সুরক্ষা ও তাদের শিশুদের উন্নয়নে কাজ করার পাশাপাশি কর্মমুখী হতে আগ্রহী করে এগিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে সমাজের মূলধারার সঙ্গে মেলবন্ধন সৃষ্টি করা।
* ৫০ জন নারীকে আত্মরক্ষা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সাহসী ও আত্মবিশ্বাসী করে তোলা।
* অনলাইনে বিভিন্ন জেলা-উপজেলার নারীদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি ও তথ্যসেবা দেওয়ার ফলে কভিড-১৯-এর সময়ে ঘরে বসেও তারা সচেতন থাকতে পারছে।
* ৪৭০ পরিবারে মানবিক সহায়তা দেওয়া এবং ৬৫০ অসহায় মানুষকে ইফতারি বিতরণ।
* কভিড-১৯-এর সময়ে ৫০০ নারীর স্যানিটারি ন্যাপকিন দেওয়ার মাধ্যমে তাদের নিরাপদ মাসিককালীন সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা।
* ফরিদপুরের বানভাসি ৭০০ নারীর স্যানিটারি ন্যাপকিন দেওয়ার মাধ্যমে তাদের গৃহহীন অবস্থায় মাসিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
* ২০০ পরিবার ও ১০০ শিশুকে মানবিক সহায়তা এবং ওষুধ সরবরাহ করার মাধ্যমে বানভাসি অসহায় মানুষের পাশে থাকা।
* পাঁচজন নারীকে স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি ও নারীর ক্ষমতায়নে তাদের ভূমিকা পালনে আগ্রহী করে তোলা।
রেমির কাজের অন্যতম একটা অংশ বেদে সম্প্রদায়। দেশের অন্যতম নিগৃহীত জনগোষ্ঠী বেদেরা। বেদে নারী ও

শিশুদের উন্নয়নে রেমি ও তার দল প্রায়ই ফরিদপুর শহরতলির বেদেপল্লিগুলোতে যান এবং তাদের স্বাস্থ্য-শিক্ষাসহ নানা বিষয়ে কাজ করেন। ইতোমধ্যে বেদে নারীদের মাসিক সুরক্ষা নিয়ে কাজ শুরু করেছেন রেমি।
পরিচ্ছন্নতা কর্মী (মেথর) ও ডোমদের মানবেতর জীবনযাপন কারোরই অজানা নয়। শহরের আলীপুরে বান্ধব পল্লিতে এই নিগৃহীত জনগোষ্ঠীকে সমাজের মূল ধারার সঙ্গে চলতে সাহায্য করছে নন্দিতা সুরক্ষা। এই নিগৃহীত জনগোষ্ঠীর নারী ও শিশুদের উন্নয়নের মধ্যমে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে তারা।
বাল্যবিয়ে ও যৌতুকের ভয়াবহতার প্রভাব কিছুটা হলেও কমিয়ে আনতে চেষ্টা করে যাচ্ছে নন্দিতা সুরক্ষা। বিভিন্ন স্কুলের মাধ্যমিক পর্যায়ের মেয়েদের সাথে বাল্যবিবাহ ও যৌতুকের কুফল ও প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করে তাদের ভেতরে সচেতনতা তৈরি করতে ভূমিকা পালন করছে তারা। অধিকাংশ মেয়ের বাল্যবিবাহের জন্য পারিবারিক কিংবা সামাজিক নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া হয় এবং তাদের অনুমতি নেওয়ারও প্রয়োজন মনে করা হয়না। এক্ষেত্রে নন্দিতা সুরক্ষা আইনি নিরাপত্তার জন্য জরুরি মোবাইল নম্বর সরবরাহ করছে যাতে করে বাল্যবিবাহ দেওয়া হচ্ছে বা যৌতুকের শিকার হচ্ছে দেখলে আইনি সহায়তা নিতে পারে। ইতোমধ্যে নন্দিতা সুরক্ষা টিম শহরের মধ্যে আইনের সহায়তা নিয়ে কয়েকটি বাল্যবিবাহ বন্ধ করেছে। বাল্যবিবাহ এবং যৌতুক মুক্ত দেশ গঠন করতে এই তরুণরা অঙ্গীকারাবদ্ধ।
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নন্দিতা সুরক্ষার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তাহিয়াতুল জান্নাত রেমীর মতে, আমাদের দেশে প্রতিনিয়ত নারী ও শিশুরা যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছে। কিন্তু সেখানে খুব কম সংখ্যক ব্যক্তি এদের পাশে দাঁড়ানোর সাহস পায়। তরুণ-তরুণীরা সমাজের নানা বিষয়ে এগিয়ে এলেও নারীর মাসিকের মতো স্বাভাবিক অথচ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের কথা বলতে বা বলাতে সংকোচ থেকেই যায়। কিন্তু এর ফলে পিছিয়ে যাচ্ছে দেশ ও নারীরা। তাই একটি দেশের ভবিষ্যৎ শিশু ও মূল চালিকাশক্তির অর্ধেক নারীকে হাত ধরে সামনে এগিয়ে নিতে কাজ করার মাধ্যমে দেশটা সমৃদ্ধ করা সম্ভব। দেখা যায়, দেশের বেশির ভাগ নারী এখনও মাসিকের সময় কাপড় ব্যবহার করে এবং মাসিক সম্পর্কে তারা অজ্ঞ। যার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্য। মাসিককালীন নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন তারা। আমার স্বপ্ন, এই অজ্ঞতা দূর করে নারীর ক্ষমতায়নের মাধ্যমে মাসিক সচেতন দেশ গড়ে তোলা। স্যানিটারি ন্যাপকিন সকল নারীর ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে এনে সুস্থ প্রজনন স্বাস্থ্য নিশ্চিত করাতে আমরা কাজ করছি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে হঠাৎ মাসিক সমস্যার সম্মুখীন হওয়া একটি নারী জীবনের স্বাভাবিক সমস্যা। এর ফলে স্কুল বা কলেজের ক্লাস বর্জন করে অস্বস্তিদায়ক পরিস্থিতিতে পড়েন নারীরা। তাই প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে মাসিকবান্ধব করে তোলা আমাদের কাজ।
রেমি বলেন, বিষণ্ণতা হচ্ছে মানসিক স্বাস্থ্যের একটি গুরুতর সমস্যা। বিষণ্ণতা মানুষকে সীমাবদ্ধ করে ও গুটিয়ে ফেলে। এর প্রতি যথাযথ দৃষ্টি না দিলে এর প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে। বিষণ্ণতায় ভোগেননি এমন খুম কম মানুষই পাওয়া যাবে। আমরা স্কুল-কলেজের নারীদের মাঝে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ধারণা দেওয়ার পাশাপাশি শারীরিক গঠন নিয়ে এবং কটূক্তির প্রভাব নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে হাসি আনন্দে উচ্ছল জীবন দিতে চাই নারীদের। নারীর ক্ষমতায়ন, যৌন সহিংসতা প্রতিরোধ, অর্থনীতিতে নারীর ভূমিকা পালন, নারী-পুরুষ সমতা বৃদ্ধি, নারীর জন্য মাসিক সচেতনতা দেশ গড়ে তোলাই আমাদের উদ্দেশ্য। এসব কাজ করতে গিয়ে সম্মুখীন হওয়া প্রতিকূল পরিস্থিতি সম্পর্কে এই সংগঠক বলেন, প্রতিটা ভালো কাজেই বাধা থাকে। সুইপার কলোনির শিশুদের নিয়ে হাসিমুখ পাঠশালা শুরু করা থেকে ফরিদপুরের ৩০টি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারীদের এক বছরের স্যানিটারি ন্যাপকিন এর দায়িত্ব নেওয়া সব প্রজেক্টই ছিল আমাদের জন্য এক একটা চ্যালেঞ্জ। গ্রামের স্কুলের সেমিনারগুলোতে যৌন সহিংসতা সংক্রান্ত কথা বলার জন্য বহুবার অপমান করা হয়েছে আমাদের। মাসিককে স্বাভাবিক বিবেচনা করে কাজ করার জন্য কাজ এলাকা থেকে শুরু করে আত্মীয়স্বজন পাড়া-প্রতিবেশী সবার কাছে বাঁকা চোখের ইশারার শিকার হওয়া খুবই পরিচিত ঘটনা। বাল্যবিবাহ বন্ধ করার জন্যও হুমকির সম্মুখীন হতে হয়েছে। বন্ধুবান্ধব অথবা পরিচিতজন অসংখ্যবার 'ধুর, এসব বাদ দে, নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে ভাব', 'এসব কেবল শো অফ' এসব কথা শুনিয়েও অদম্য নন্দিতা সুরক্ষা টিমকে কেউ থামাতে পারেনি। কারণ এসব কিছুর পেছনে আমার মায়ের অবদান অনেকখানি। নিন্দুকের কথার দাপটে যতবার ভেঙে পরেছি, মা ততবার মা আমাকে সাহস দিয়েছে। রেমি বলেন, নারীর স্বাধীনতার জন্য কাজ করতে হলে আগে নিজের জায়গায় শক্ত থাকতে হবে। তাই শত বাধা সহ্য করেও ফরিদপুরসহ দেশের অন্য জেলার নারীদের মাঝে সচেতনতার আলো ছড়ানোর চেষ্টা করছি আমরা। যেখানে নারীরা বখাটেদের দিকে চোখ তুলতে ভয় পায়, সেখানে কর্মজীবী ও গৃহবধূদের জন্য চালু করেছি আত্মরক্ষা প্রশিক্ষণ কোর্স। যেখানে নারীরা হতাশায় নিজেদের শেষ করে দিতে চান, সেখানে নন্দিতা সুরক্ষা অনলাইনে নারীদের নানা সমস্যার সমাধান দিতে কাজ করছে 'নন্দিতাদের কথা' অনলাইন প্রজেক্টে। আমাদের তরুণ প্রজন্ম যদি নিজেদের এভাবে ভালো ভালো কাজে জড়িত করে, তাহলে তাদের আর হতাশার অতলে ডুবে যেতে হবে না। আর দেশের নারীরা যদি নারীর সমস্যা সমাধানে এগিয়ে না আসেন, তাহলে কখনোই নারীমুক্তি সম্ভব নয়।

লেখক: ফরিদপুর প্রতিনিধি

বিষয় : তারুণ্যের অহংকার : রেমি ও তার নন্দিতা সুরক্ষা

মন্তব্য করুন