গেল বছর রোজার শুরুতে পেশাগত কাজ শেষে নামুজা-বারবাকপুর সড়ক ধরে শহরে ফিরছিলাম। শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে ঘড়িতে তখন রাত ৮টা। দু-একটি দোকান খোলা থাকলেও চারদিকের গ্রামগুলো যেন ঘুমিয়ে গেছে। শশীবদনী গ্রামের কাছাকাছি পৌঁছাতেই ওই গ্রামের ভেতর থেকে অন্ধকার ভেদ করে আসা আলোকরেখা দেখে বিস্মিত হয়ে পড়ি। বাইক থামিয়ে খেয়াল করলাম আলোর উৎস থেকেই বিপুল সংখ্যক সেলাই মেশিনের একটানা ঝনঝন শব্দও ভেসে আসছে। এত রাতে প্রত্যন্ত গ্রামে কীসের এই কর্মযজ্ঞ?
কৌতূহল মেটাতে সেই আলোর সন্ধানে মূল সড়ক থেকে ডান দিকে আঁকাবাঁকা সড়ক ধরে আধা কিলোমিটার যেতেই একতলা পাকা ভবনের সামনে চোখে পড়ে 'শশীবদনী যুব আত্মকর্মসংস্থান সংস্থা ((SYSO)  লেখা একটি সাইনবোর্ড।

কর্তব্যরত নৈশপ্রহরীকে পরিচয় দিয়ে ভেতরে ঢোকার পর দেখা যায় সেটি একটি পোশাক তৈরির কারখানা। ৩৭টি ইলেকট্রিক সেলাই মেশিনে নারীরা শার্ট, প্যান্ট, থ্রিপিস, শিশুর পোশাক আর পাঞ্জাবি তৈরির কাজ করছেন। আরেক দল পুরুষ ব্যস্ত সেগুলো ইস্ত্রি এবং প্যাকিংয়ে। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক আশরাফুল ইসলাম রাসেল জানান, ঈদের আগে বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে যেসব অর্ডার পাওয়া গেছে সেগুলো সরবরাহ করতে হলে শুধু দিনের বেলা কাজ করে চাহিদা শেষ করা যাচ্ছে না। তাই রাতেও কাজ করতে হচ্ছে। তার সঙ্গে কথা বলে বের হওয়ার সময় কারখানার বাইরে নজরে পড়ল কর্মজীবী নারীদের সঙ্গে আসা তাদের বাবা ও ভাইসহ অন্য অভিভাবকদের। রাত ৩টায় কাজ শেষ হওয়ার পর তারা বাড়ি ফিরে যাবেন। কথা বলে জানা গেল কারখানার বাইরেও ওই গ্রামসহ আশপাশের পাঁচ গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে ব্লক-বাটিকের কাজ করেন আরও প্রায় ২৫০ নারী। উৎপাদিত পণ্য প্রদর্শনী এবং বিক্রির জন্য কারখানার পাশে সংস্থাটির পক্ষ থেকে একটি শোরুমও দেওয়া হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, বগুড়া শহর থেকে ১১ কিলোমিটার দূরে প্রত্যন্ত একটি গ্রামে বিশাল কর্মযজ্ঞের পেছনে যুক্ত রয়েছেন শশীবদনী গ্রামেরই ৯ যুবক। যাদের মধ্যমণি হলেন আশরাফুল ইসলাম রাসেল। অন্যরা হলেন- উজ্জ্বল হোসেন, আব্দুল মজিদ, জাফরুল হাসান, মাহফুজার রহমান, আব্দুর রউফ, মামুনুর রশিদ, আব্দুস সালাম ও লিটন চন্দ্র। তবে প্রত্যন্ত একটি গ্রামে উৎপাদনমুখী একটি প্রতিষ্ঠান এক দিনে গড়ে ওঠেনি। এর পেছনের গল্প প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম উদ্যোক্তা আশরাফুল ইসলাম রাসেলের মুখ থেকেই শুনি।
রাসেল বলতে শুরু করেন- তখন আমি দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র। সহপাঠীর সঙ্গে গড়ে ওঠা প্রেমের সম্পর্কটা এতটাই গভীর হয়ে পড়ে যে, পড়ালেখা শেষ হওয়ার আগেই বিয়ে করে ফেলি। সংসার ও পড়ালেখা চালিয়ে নেওয়া এতটাই কষ্টকর হয়ে উঠেছিল যে, তিন বেলা খাবার জোগাতে ধারদেনা করে চলতে হচ্ছিল। একদিকে যেমন ঋণের বোঝা বাড়ছিল, তেমনি তা পরিশোধের চাপও বাড়তে থাকে। মানসিকভাবে এতটাই ভেঙে পড়েছিলাম যে, জীবনটাকে অর্থহীন মনে হতো।
সেই পরিস্থিতিতে ঘনিষ্ঠ আট বন্ধু তখন আমার পাশে দাঁড়ায়। তাদের কথায় আমি যেন ভরসা খুঁজে পাই। আমরা সিদ্ধান্ত নিই- এমন কিছু করতে হবে যাতে গ্রামে যারা ঋণের জালে আটকা পড়েছি তারা যেন মুক্ত হতে পারি। এমন চিন্তাভাবনা থেকে ২০১৪ সালের শুরুতে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে যোগাযোগ করি। তাদের পরামর্শে সমমনা নারী-পুরুষদের নিয়ে গ্রামের নাম অনুসারে 'শশীবদনী যুব আত্মকর্মসংস্থান ফাউন্ডেশন' নামে একটি সংগঠন দাঁড় করানো হয়। ওই সংগঠনের সমন্বয়কের দায়িত্ব পড়ে আমার ওপর। সংগঠনের নিয়ম অনুযায়ী সদস্য হিসেবে প্রতি মাসে কিছু অর্থ সঞ্চয় শুরু করা হয়।
রাসেল জানান, ২০১৫ সালে চার নারীসহ তারা মোট ১১ জন বগুড়া শহরে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে গিয়ে পোশাক তৈরির ওপর ২১ দিনের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। গ্রামে ফিরে নারীদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেন। সদস্যদের সঞ্চিত অর্থ দিয়ে তারা প্রথমে ১৬টি সেলাই মেশিন কেনেন। এরপর প্রশিক্ষণ গ্রহণকারী নারীরা তাদের স্বজনদের মাধ্যমে বিভিন্ন জায়গা থেকে আরও ১৫টি সেলাই মেশিন সংগ্রহ করেন।
আশরাফুল ইসলাম রাসেল বলেন, যদিও সব ধরনের কাপড় সেলাইয়ের ওপর আমাদের প্রশিক্ষণ নেওয়া ছিল। কিন্তু আমরা বাজার যাচাই করে দেখলাম 'থ্রি কোয়ার্টার' প্যান্টের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। তাই আমরা প্রথমে 'থ্রি কোয়ার্টার' প্যান্ট তৈরি করা শুরু করলাম। প্রথম বছর বেশ সাড়া পাওয়ার পর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর আমাদের ২০১৬ সালে প্রথমে তিন লাখ টাকা এবং পরের বছর আরও চার লাখ টাকা ঋণ দেয়।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে পাওয়া ঋণের সেই টাকায় তারা অন্যান্য পোশাক যেমন মেয়েদের থ্রিপিস, শার্ট, প্যান্ট, শিশু পোশাক ও পাঞ্জাবি তৈরি করেন। পাশাপাশি নকশিকাঁথাও তৈরি শুরু হয়।
বাজারে চাহিদা অনুযায়ী নিজেরা কাপড় কিনে যেমন পোশাক তৈরি করেন, তেমনি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কাপড় ও সুতাসহ অন্যান্য সামগ্রী কিনে দিলে তাদের দেখিয়ে দেওয়া ডিজাইন অনুযায়ী নির্ধারিত মজুরির বিনিময়েও তৈরি করেন। উৎপাদিত পণ্যগুলো বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও ঢাকায় সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়। সব মিলিয়ে বছরে প্রায় অর্ধকোটি টাকার পণ্য বিক্রি হয়।
সংস্থার কারখানায় ধীরে ধীরে কর্মিসংখ্যা বাড়তে থাকে এবং একসময় ৪০ জন নারী-পুরুষ সরাসরি বেতনভুক্ত হিসেবে যোগদান করেন। আশপাশের কয়েক গ্রামের আরও ২৫০ জন নারী চুক্তিভিত্তিতে কাজ করেন। কাজের ধরন অনুযায়ী কর্মচারীরা প্রতি মাসে চার হাজার থেকে ১৭ হাজার টাকা বেতন পান। আর চুক্তি ভিত্তিতে যারা নিজ নিজ বাড়িতে বসে কাজ করেন, তাদের মাসিক আয় দুই হাজার থেকে আট হাজার টাকা। গ্রামে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় শশীবদনীসহ আশপাশের কয়েক গ্রামের ২০৯টি পরিবারে সচ্ছলতা ফিরে আসে।
চলতি বছরের মার্চে করোনার সংক্রমণ শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত শশীবদনী যুব আত্মকর্মসংস্থান সংস্থার উৎপাদন স্বাভাবিকই ছিল। সরকারিভাবে নির্দেশনা দেওয়া হলে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। তবে বেতনভুক্ত এবং চুক্তিভিত্তিতে নিয়োজিত কর্মীদের বেতন-ভাতা যাতে বন্ধ না হয়ে যায় সেজন্য বিকল্প হিসেবে সংস্থাটি করোনার সংক্রমণ রোধক পোশাক পিপিই (পার্সোনাল প্রটেকশন ইক্যুইপমেন্ট) তৈরি শুরু করে। পাশাপাশি নানা প্রতিষ্ঠান থেকে কর্মহীন হয়ে পড়া শশীবদনী গ্রামের লোকজনকে দুই বেলা খাবার দেওয়ার জন্য গ্রামের সচ্ছল ব্যক্তিদের সহায়তায় 'ফুড ফর অল' নামে একটি কর্মসূচিও হাতে নেওয়া হয়। এর মাধ্যমে প্রতিদিন গড়ে ৪০টি পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়। রাসেলসহ তার বন্ধুদের গড়া সংস্থার কারণে শশীবদনীসহ আশপাশের গ্রামের অভাবী মানুষ বিশেষ করে নারীরা স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি এই অঞ্চলে মাদক কারবারিদের তৎপরতা অনেকাংশে কমেছে। সংস্থার কর্মীদের সার্বক্ষণিক নজরদারির কারণে শশীবদনী গ্রামে এখন আর কোনো মাদকসেবীই খুঁজে পাওয়া যায় না। একইভাবে আশপাশের গ্রামগুলো থেকেও মাদকসেবীর সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। এটি এই সংস্থার আরেকটি বড় অর্জন। করোনাকালের মাঝেই পোশাক রপ্তানির প্রস্তাব এসেছে মালয়েশিয়া থেকে। কর্মকর্তারা জানান, মালয়েশিয়ায় বসবাসরত এক বাংলাদেশি নারী ব্যবসায়ী প্যান্ট-শার্ট ও শিশু পোশাক নেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছেন। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে এ বছরের শেষ দিকে অথবা আগামী বছরের শুরুতে রপ্তানি শুরু হতে পারে। গ্রামের মানুষের সচ্ছলতা ফেরানোর পর শশীবদনী যুব আত্মকর্মসংস্থান সংস্থা এবার কোয়ালিটি এডুকেশন নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা করেছে। এ লক্ষ্যে তারা করোনা সংক্রমণের আগে প্রাথমিক কাজও শুরু করেছিল। কিন্তু ১৭ মার্চ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তা স্থগিত হয়ে যায়। ওই সংস্থার পরিচালনা পর্ষদের সদস্য লিটন চন্দ্র জানান, তারা শহরে এবং শহরের বাইরের ৪৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের পোশাক তৈরির কাজের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। তিনি বলেন, ওই কাজ থেকে লভ্যাংশের যে অর্থ পাওয়া যাবে তার একটি অংশ শিশুদের মেধা বিকাশ যেমন সাধারণ জ্ঞান ও বিতর্ক প্রতিযোগিতাসহ সৃজনশীল নানা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে।

লেখক: বগুড়া ব্যুরোপ্রধান

বিষয় : বদলে যাওয়া পাঁচ গ্রাম

মন্তব্য করুন