করোনায় এলোমেলো পরিপার্শ্ব ও বাস্তবতা। জীবন ও স্বপ্নের অনবরত ধ্বংসের মুখেও অমিত সাহসী কিছু মানুষ প্রবল বিক্রমে দুঃসময়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। জীবন ঘুরে দাঁড়ানো সাহসী মানুষ ও তাদের উদ্যোগের বিবরণ জানিয়েছেন সমকালের সারাদেশের তৃণমূল প্রতিনিধিরা...
রাইসুল উদ্দিন সৈকত। এলবিয়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান। চট্টগ্রামের জুনিয়র চেম্বারে সাবেক সভাপতিও ছিলেন তিনি। বিদেশ থেকে উচ্চশিক্ষা শেষে দেশে ফিরে হাল ধরেন বাবার ব্যবসার। চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে ছোট্ট প্রতিষ্ঠানটিকে গ্রুপে রূপান্তর করেছেন তিনি। ব্যবসা ক্রমেই সম্প্রসারণ করে গ্রুপকে পরিণত করছেন তিনি মহিরুহে। এখন তার প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে হাজার হাজার মানুষ। ১২০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১২ একর জায়গায় বাড়বকুণ্ডে গড়ে তুলেছেন তিনি রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান 'এলবিয়ন স্পেশালাইজড ফার্মা'।
বাবার স্বপ্ন যেভাবে সত্য করলেন সন্তান
১৯৯১ সালে মাত্র ১০০ জন কর্মী এবং ওষুধের ৩০টি আইটেম নিয়ে চট্টগ্রামের চান্দগাঁও আবাসিক এলাকায় ভাড়া করা ভবনে ছোট পরিসরে যাত্রা শুরু হয়েছিল এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ লিমিটেডের। কিন্তু এখন এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ, এলবিয়ন অ্যানিমেল হেলথ, এলবিয়ন কনজুমার প্রডাক্টস, এলবিয়ন হেলথকেয়ার, মার্লিন ফার্মা, এলবিয়ন ট্রেডিং করপোরেশন ও ফেভারিটা লিমিটেডের কার্যক্রম চালাচ্ছেন তিনি। বাবা আলহাজ নিজাম উদ্দিনের এই প্রতিষ্ঠানকে আমূল বদলে দিয়েছেন তার সুযোগ্য তিন সন্তান।
বাবার দেখা স্বপ্নটাকেই সত্য করেছেন তার সন্তানরা। তাই দেশ ছাড়িয়ে এলবিয়ন ফার্মার লক্ষ্য এখন বিদেশের রপ্তানি বাজার। সেই লক্ষ্যে সীতাকুণ্ড উপজেলার বাড়বকুণ্ডে ১২০ কোটি টাকা নতুন বিনিয়োগে স্থাপন করা হয়েছে এলবিয়ন গ্রুপের অত্যাধুনিক এক ওষুধ কারখানা। এখানকার উৎপাদিত ওষুধ চলতি বছরই বিদেশে রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে এলবিয়ন কর্তৃপক্ষ।
শতকোটি টাকার নতুন স্বপ্ন বাস্তবে
১২০ কোটি টাকা ব্যয়ে গড়া 'এলবিয়ন স্পেশালাইজড ফার্মা' নামের নতুন কারখানায় প্রথম পর্যায়ে উৎপাদন হবে স্টেরয়েড ও ইনজেকশন আইটেম। আফ্রিকা, ঘানা, সুদান, শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমারে রপ্তানির লক্ষ্যে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে এ কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। অ্যান্টিবায়োটিক, হৃদরোগ, নিউরোলজির পাশাপাশি জেনারেল মেডিসিন উৎপাদন করা হবে শতভাগ রপ্তানিমুখী এ প্রতিষ্ঠানে। নতুন এ প্রতিষ্ঠানেই কর্মসংস্থান হবে এখন অন্তত তিন হাজার মানুষের। নতুন এ কারখানায় বর্তমানে মানব স্বাস্থ্য সংশ্নিষ্ট তিনশর অধিক আইটেম এবং পশু স্বাস্থ্য সংশ্নিষ্ট আরও ২০০ আইটেম ওষুধ ও অন্যান্য পণ্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে এরই মধ্যে এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজের ৩২৫টি আইটেম তালিকাভুক্ত রয়েছে। গুণগত মানের জন্য ইতোমধ্যে আইএসও ৯০০১ :২০০৮ সনদও অর্জন করেছে এলবিয়ন গ্রুপ। গত কয়েক বছর ধরেই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি ১৫ থেকে ২০ শতাংশ করে অর্জন করেছে কোম্পানিটি।
কেন ওষুধ শিল্পে এলবিয়ন
ওষুধ শিল্পের বর্তমান অবস্থা ও রপ্তানির সম্ভাবনা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে রাইসুল উদ্দিন সৈকত জানান, দেশে ওষুধের অভ্যন্তরীণ বাজার প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার। ওষুধের আমদানিকারক থেকে রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। শতাধিক দেশে যাচ্ছে এ দেশের ওষুধ। বর্তমান উৎপাদন ক্ষমতা ও বিশ্ববাজারের সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে রপ্তানিতে এশিয়ার শীর্ষে উঠে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এ জন্য দরকার কম সুদে ব্যাংক ঋণ। একই সঙ্গে দরকার বাংলাদেশি দূতাবাসগুলোর সক্রিয়তা।
ওষুধের কাঁচামাল সংগ্রহে বিদেশনির্ভরতা কীভাবে কমানো যায়- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'এখন প্রয়োজনের মাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কাঁচামাল দেশে তৈরি হচ্ছে। বাকিটা বিদেশ থেকে আনতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। তবে আশার কথা, এ সমস্যা নিরসনে একটি ওষুধ শিল্প পার্ক গড়ে তোলার প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন আছে।' মেধাস্বত্বে ছাড় পাওয়ার সুবিধা কাজে লাগানোর কিছু কৌশলের কথা জানালেন এই তরুণ উদ্যোক্তা। তিনি বলেন, 'মেধাস্বত্ব আইনের সময়সীমা ১৭ বছর বাড়ানোর সুযোগ কাজে লাগিয়ে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এ শিল্পে নিজস্ব শক্ত অবস্থান তৈরি করতে হবে। আমাদের নতুন বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি ২০২৪ সালের পরের প্রাক-প্রস্তুতি এখনই নিতে হবে।'
তরুণদের এ খাতে ভালো করার সুযোগ কতটা- এমন প্রশ্নের জবাবে রাইসুল উদ্দিন সৈকত বলেন, 'নতুনদের যথাযথ পরিচর্যা ও তাদের উদ্ভাবনী জ্ঞান-মেধা কাজে লাগাতে সরকারের সহযোগিতা দরকার। এ জন্য সরকারের প্রণোদনামূলক নীতি থাকা জরুরি। বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের সম্ভাবনার হাতছানি দিচ্ছে ওষুধ শিল্প। গুণগত মান নিশ্চিত করে উৎপাদন ক্ষমতা বাড়তে থাকায় প্রতি বছর রপ্তানি বাড়ছে। সব ঠিক থাকলে আগামী ১০ বছরের মধ্যে ওষুধ রপ্তানি বেড়ে ১০ গুণ হবে।'
সরকারি এক নোটিশই বদলে দিল সব
এলবিয়ন গ্রুপের এই উত্থানের পেছনে একটি সরকারি নোটিশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান রাইসুল উদ্দিন সৈকত। তিনি বলেন, 'আমরা প্রতিদিনই ম্যাজিস্ট্রেট মুনীর চৌধুরীকে দোয়া করি। কারণ তিনি প্রশাসনের পক্ষ থেকে তখন জোর তাগিদ না দিলে আজকের এই এলবিয়ন গ্রুপ আর হয়ে উঠত না। তার কারণেই আমরা বড় কিছু করার সাহস করেছি। না হলে এলবিয়ন এখনও হয়তো চান্দগাঁওয়ের সেই ছোট্ট পরিসরে আটকে থাকত। মাত্র তিন দিনের নোটিশে চান্দগাঁও আবাসিক এলাকা থেকে দ্রুত জায়গা খুঁজে সীতাকুে নিজেদের পৈতৃক জমিতে কারখানা স্থানান্তর করে এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ। ১০০ জনের সেই কারখানায় এখন কয়েক হাজার লোকের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান হয়েছে। নতুন কারখানায় হবে আরও অন্তত তিন হাজার জনের সরাসরি কর্মসংস্থান।'
উৎপাদন দেশে, নজর বিদেশে
বাংলাদেশে ওষুধের অভ্যন্তরীণ বাজার প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার। বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই ওষুধ শিল্পে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ। স্কয়ার, এসিআই, রেনাটা, ইনসেপ্টা, এসকেএফসহ অনেক দেশি কোম্পানিই এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা মহাদেশে ওষুধ রপ্তানি করছে। সম্প্রতি বেক্সিমকো ফার্মা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ওষুধ রপ্তানির অনুমতি পেয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, প্রতি বছর হাজার কোটি টাকার ওষুধ বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। এই চিত্রে গতি আনা গেলে ভবিষ্যতে গার্মেন্টের পরেই ওষুধ হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি পণ্য। বিদেশের এ বাজারকেই এখন নতুন লক্ষ্য হিসেবে ঠিক করেছে এলবিয়ন গ্রুপ। আর সে কারণেই ১২ একর জায়গাজুড়ে সম্পূর্ণ কমপ্লায়েন্স কারখানা স্থাপন করছে গ্রুপটি। ১২০ কোটি টাকা বাজেটের মধ্যে শুধু জমি কিনতেই খরচ হয়েছে প্রায় ৩০ কোটি টাকা। প্রয়োজনীয় পুরো জমিটি পেতে সময় লেগেছে তাদের প্রায় আট বছর। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি বছরই 'এলবিয়ন স্পেশালাইজড ফার্মা লিমিটেড' নামের কারখানা উৎপাদনে যাবে।
ব্যস্ততা আছে সামাজিক কাজেও
ব্যবসার পাশাপাশি সামাজিক কাজেও ব্যস্ততা আছে রাইসুল উদ্দিন সৈকতের। সম্প্রতি দ্য চিটাগং কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য হিসেবে মনোনীত হয়েছেন তিনি। এ বিষয়ে জানতে তিনি বলেন, 'আমাদের দেশে সমবায় আন্দোলনের মাধ্যমে অনেক প্রতিষ্ঠান সফলতার মুখ দেখেছে। অনেক সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী উপকৃত হয়েছে। দ্য চিটাগং কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি লিমিটেডের বর্তমান ব্যবস্থাপনা কমিটি সোসাইটির সদস্যদের জন্য নতুন নতুন সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধাগুলোকে আরও আধুনিকায়ন করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। মূলত সমাজের জন্য কিছু করার তাড়া থেকেই এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছি।'
রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ও এলবিয়ন
চট্টগ্রামের জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি রেস্টুরেন্ট সেগাফ্রেডো জেনেতি এসপ্রেসো নামের কফিশপের উদ্যোক্তা রাইসুল উদ্দিন সৈকত। ভোক্তাদের খাবারের সেবা হাতের মুঠোয় আনতে সম্প্রতি নতুন অ্যাপ চালু করেছে এ প্রতিষ্ঠানটি। গত ৮ অক্টোবর রেস্টুরেন্টটির ফুড ডেলিভারির অ্যাপ ও ওয়েববসাইট কেক কেটে উদ্বোধন করেন দৈনিক আজাদীর পরিচালনা সম্পাদক ওয়াহিদ মালেক। ইতালির বিশ্বখ্যাত কফি ব্র্যান্ড সেগাফ্রেডো জেনেতি এসপ্রেসোর দেশের একমাত্র শাখাটি নগরীর নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটিতে। ব্র্যান্ডটির একমাত্র আমদানিকারক এলবিয়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান রাইসুল উদ্দিন সৈকত বলেন, 'আমরা সবসময় খাবারের গুণগত মান সুরক্ষায় সচেষ্ট রয়েছি। এ জন্য ইতালির বিখ্যাত কফিশফের সেবা নিয়ে এসেছি বন্দর নগরীতে। যে কেউ আমাদের অ্যাপ থেকে অর্ডার করে হোম ডেলিভারি নিতে পারেন এই কফিশফের খাবারের।'

লেখক: চট্টগ্রাম ব্যুরোপ্রধান

বিষয় : সৈকতের ওষুধ রপ্তানির স্বপ্ন

মন্তব্য করুন