তুই বাপের ছাওয়াল, না মায়ের ছাওয়াল?
প্রশ্ন শুনে ছয় বছরের সুবল তো সুবল, তার মা শ্রীমতী পর্যন্ত ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়।
ছেলেকে মছিরুন্নেছা ফ্রি প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি করাতে এনেছে শ্রীমতী। সেখানে দরকার ছাত্রের নাম, বাপের নাম, জন্ম তারিখ, ঠিকানা এইসব। তাহলে এই প্রশ্ন কেন? প্রশ্নটা এসেছে ধর্মের কারণে। সুবলের ধর্ম কী- এই প্রশ্নের উত্তরে শ্রীমতী বলেছে যে তারা হিন্দু। কিন্তু কেরানি যে তাকে চেনে- এ কথা ভাবেনি শ্রীমতী। প্রশ্নটা এসেছে, কারণ সুবলের বাপ মদো ইউসুফ হচ্ছে মুসলমান ঘরের ছেলে। তাহলে সুবলের ধর্ম কী লিখা হবে? শ্রীমতী ধাঙড়ের মেয়ে। হিন্দুরা মানুক না মানুক, ওরা এই শহরে নিজেদের হিন্দু বলেই পরিচয় দেয়। তা ছাড়া মুসলমান সমাজ তাকে গ্রহণ করেনি। বরং তাকে বিয়ে করায় ইউসুফকেও পতিত করেছে। ইউসুফ, সার্বক্ষণিক মদ খেয়ে মাতাল বলে মদো ইউসুফ, গত আট বছর থেকে আছে সুইপার কলোনিতে শ্রীমতীর ঘরেই। এইসব ভেবেই শ্রীমতী তার ছেলের ধর্মের কথা বলেছিল হিন্দু। কিন্তু দেখা যাচ্ছে কেরানি তা মানতে রাজি নয়। সেখান থেকেই কথায় কথায় এই প্রশ্ন।
প্রথমটায় একটু টাল খেলেও শ্রীমতী দ্রুত সামলে নিল। একটু জেদি গলাতেই বলল- ল্যাখেন হিন্দু।
তার জেদ স্পর্শই করে না কেরানিকে। বলপেনের গোড়া দিয়ে কিছুক্ষণ কান চুলকে বলল- তোমার একলার কথাতে তো হয় না, ছাওয়ালের বাপের মতামতও লাগবি। কাল না হয় তাক নিয়া আস।
এসব অবশ্য এখনকার কথা। কিন্তু গল্পের শুরু কমপক্ষে আট-নয় বছর আগে। যখন সহদেব জমাদারের মেয়ে শ্রীমতী সবে ডাগর হয়ে উঠেছে। মেয়েকে নিয়ে কত যে ঝক্কি সামলাতে হয়েছে লোকটাকে তা আর কহতব্য নয়। কারণ শ্রীমতীর রূপ। ধাঙড় যুবতীর দেহের গড়নে, চলনে-বলনে যৌনতা পিছলানোর ব্যাপারটা এমনিতেই থাকে। এদের মধ্যে শ্রীমতী আক্ষরিক অর্থেই সুন্দরী। কলেজের ছাত্ররা নাম দিয়েছিল কালো গোলাপ। শ্রীমতী কোনোদিন কলেজে যায়নি। স্কুলেই যায়নি। তবু কলেজের ছাত্ররা তাকে চিনত। কারণ ছোট্ট আয়তনের মাত্র কয়েক হাজার স্থায়ী অধিবাসীর এই শহরে প্রায় সবাই সবাইকে চিনত। নামে না হলেও চেহারায় পরিচয় ছিলই। আসল নামের বদলে কালো গোলাপ নামেই জোয়ান ছেলেরা বেশি ডাকত শ্রীমতীকে। দেখা গেল ভদ্দরলোকের ছেলেরা মেথরপট্টির পাশের ছোট মাঠে শীতকালে ব্যাডমিন্টন আর গরমকালে ভলিবল খেলায় বেশ উৎসাহী হয়ে উঠেছে। মেথরপট্টিতে পচানির আসর এমনিতেই বসে। নিচুস্তরের মাতালদের কাছে দু-চার হাঁড়ি পচানি বেচে পট্টির মেয়েরা কিছু কাঁচা পয়সা কামায়। কিন্তু এখন মেথরপট্টির পচানির আসরের ভিড় বেড়েই চলে। সহদেব জমাদারের খাতির অন্যরকম। তাকে পচানি খাওয়াতে সবাই ব্যস্ত। তার নেশার খরচ প্রায় পুরোটাই বেঁচে যায়।
এ তো গেল মজার দিক। আপাত লাভের দিক। বিপদ শুরু হলো অল্পদিনেই। শ্রীমতীকে ডেকে ডেকে কথা বলতে চায় পাতি মাস্তানরা। ইঙ্গিতে প্রস্তাব দেয়। কখনো সরাসরি। অন্য সুইপার মেয়েদের মতো শ্রীমতীরও গলা খুব চড়া। মাস্তান-রংবাজ কেয়ার না করে বাপ-মা তুলে গালি দেয়। এর মধ্যেই একদিন হিরু গুণ্ডা তাকে জাপটে ধরেছিল হরেনের কানাগলির মধ্যে। ধস্তাধস্তি করে বেরিয়ে আসতে পেরেছে শ্রীমতী। কিন্তু ব্যাপারটা সহ্যের বাইরে চলে গেল যে রাতে বাবু-মানিকের দল তুলে নিতে এসেছিল শ্রীমতীকে। পট্টির সব লোকের চিৎকার, হইচই, সে যাত্রা বাঁচিয়েছে শ্রীমতীকে।
সহদেবের বউ থানার বড়বাবুর বাসায় ঝাড়ূ দেয়, মেঝে মোছে। সে কেঁদে পড়ল বড়বাবুর বউয়ের পায়ে। স্ত্রীর পীড়াপীড়িতে ওসি নিজে একদিন-একরাতে কয়েকবার অভিযান চালায়। দাবড়ানি দিল মাস্তান-পাতি মাস্তানদের। পরের কয়েকটা দিন বেশ শান্ত। তারপর আবার যে কে সেই। বরং বেড়েই চলে উপদ্রব। সহদেব তখন পায়ে পড়ে সনৎ চৌধুরীর। এলাকার এমপি। বাঘে-গোরুতে একঘাটে জল খায় সনৎ বাবুর দাপটে। হিন্দু হয়েও রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের দেশে তিনি বারবার ভোটে জেতেন। সংখ্যালঘুদের কাছে তিনি সাক্ষাৎ-দেবতা। তো সহদেব যখন তার দেখা পেল, তিনি এক পা তুলে দিয়েছেন নিজের গাড়ির মধ্যে। রাজপুরুষ রাজধানীতে যাচ্ছেন। তেড়ে-ফুড়ে তার দিকে এগোচ্ছে সহদেব। সঙ্গী-সাথিরা পথ আগলায়- এখন না বাপু, এখন নেতার টাইম নাই।
কিন্তু নিষেধ মানলে তো সহদেবের চলে না। তার অবস্থা যাকে বলে শিরে সংক্রান্তি। একবার ঢাকা চলে গেলে নেতা কবে ফিরবে ঠিক নেই। অতদিন অপেক্ষা করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। সে তাই রীতিমতো শোরগোল তুলে লোকজনকে বাধ্য করল তাকে নেতার কাছে যাওয়ার সুযোগ দিতে।
এক ঠ্যাং গাড়ির মধ্যে রেখেই নেতা শুনলেন তার বক্তব্য। তারপর বললেন- বাড়ি যা। আমি ব্যাপারটা দেখব।
এখুনি কিছু একটা করেন বাবু।
কী মুশকিল! নেতা ভুরু কোঁচকান।
চামচারা শোর তোলে- যা তো এখন। তোর ব্যবস্থা হবে।
না বাবু! আমাক বাঁচান! কিছু বেবস্তা করেন।
নেতা গাড়ি থেকে ঠ্যাং বের করে, সঙ্গীদের গাড়িতে উঠতে বলে বাড়ির মধ্যে ঢুকে যান। সহদেব এবার ভরসা পায়। নেতা নিশ্চয়ই ফোন করতে গেছেন! সে হালকা মনে বাড়ি ফেরে।
কিন্তু সে রাতেও কোনো ফলাফল আসে না। তার ঘরের চালায় বৃষ্টির মতো ঢিল পড়ে; শ্রীমতীকে নিয়ে বানানো সঙ্গমাত্মক ছড়া-পদ্য শোনা যায় সারারাত। হতাশায় আরও নুয়ে পড়ে সহদেব।
এদিকে নেতা যাকে ব্যাপারটি দেখতে বলে গেছেন, সেই অ্যাডিশনাল পুলিশ সুপার ইকবাল আহমেদ আদতে একজন পাস করা পশুডাক্তার। ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে ডিগ্রি অর্জন করার পরে তার বোধোদয় হয়েছিল যে- মাছের রাজা ইলিশ আর স্বামীর রাজা পুলিশ। সে তাই বিসিএস পরীক্ষায় ফার্স্ট চয়েস দিয়েছিল এএসপি। এবং দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় জুটেও গিয়েছিল চাকরিটা। তার অতীত শিক্ষাগত যোগ্যতা তার কর্মএলাকার শিক্ষিত লোকেরা জেনে যায়। জেলা শহরগুলোতে এক শ্রেণির প্রশাসন-ঘেঁষা নাচিয়ে-গাইয়ে এবং সংগঠক থাকে, যারা প্রশাসনের সহযোগিতায় অথবা প্রশাসনের সহযোগী হিসেবে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এসব অনুষ্ঠানে ডিসি প্রধান অতিথি হলে এসপি বিশেষ অতিথি হন। তো এসব অনুষ্ঠানের দাওয়াতপত্রে এই রকমও লেখা হয়- ডা. ইকবাল আহমেদ এএসপি।
নেতা রাজধানীর উদ্দেশে শহর ত্যাগ করার পরদিন স্বয়ং এএসপির পদার্পণ ঘটল মেথরপট্টিতে। সহদেব ঘরে নেই। পাশের ঘরের নরেশ এএসপিকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল তালপুকুরে। পশ্চিমঘাটে চিত হয়ে পড়ে আছে সহদেব। পচানি খেয়েছে গলা পর্যন্ত। দুঃখকষ্ট ভুলতে, রাত্রের নিদ্রাহীনতা ভুলতে, মেয়েকে নিয়ে দুশ্চিন্তার কথা ভুলতে...
নরেশ হাঁটু গেড়ে বসে ধাক্কায়- এই সহদেব! সহদেব, উঠ্‌!
সহদেব একবার শুধু করমচার মতো লাল চোখ মেলে তাকায়। তারপর কিছু না বলে চিত থেকে বাম কাত হয়।
নরেশ আরও জোরে ধাক্কায়। আরও জোরে চ্যাঁচায়- সহদেব! এই সহদেব!
উঁ।
উঠ। তোর কাছে মানুষ এসেছে।
সহদেব চোখ না খুলেই জিজ্ঞেস করে- কুন শালা রে?
ওই যে তুই এমপি সাহেবের কাছে গিয়েছিলি। সনৎ বাবুর কাছে। তাঁই পাঠিয়েছে। পুলিশের বড়া অফসার। এএসপি ছার।
এতগুলো কথাও সহদেবের মধ্যে কোনো উৎসাহ সঞ্চার করে না। সে চোখ বন্ধ করেই বাম থেকে ডান কাতে ফিরতে ফিরতে বলে- আর পুলিশ! দারোগাই কিছু করতে পারল না। এএছপি আর কী বাল ছিঁড়বে!
এসব কথা শোনার পরে যখন এএসপি ডা. ইকবাল আহমেদ উপলব্ধি করেছিল যে এএসপিকে নয়, সহদেবের মতো মানুষরা ওসিকেই অপেক্ষাকৃত বড় ও কার্যকর অফিসার মনে করে, তখন কি তার ওসি হতে ইচ্ছে করেছিল?
তবে পুলিশ সহদেব তথা শ্রীমতীর সমস্যা দূর করতে পারেনি। সনৎ চৌধুরীর দ্বারাও সমস্যার সমাধান হয়নি। সমস্যার সমাধান হয়েছিল ইউসুফের দ্বারা। মোদো ইউসুফ। পানির মতো মদ খায় বলে তার নামের আগে মোদো।
সুইপার কলোনির পেছনের হাঁটা রাস্তাটা সরু হলেও কিছু লোকের চলাচল আছে। বিশেষ করে যারা থানাপাড়া থেকে শর্টকাটে কাঁচাবাজারে যেতে চায়। দিনের যে কোনো সময় সে পথে গেলেই ইউসুফের দেখা পাওয়া যায়। এঁদো ডোবাটায় পানি থাকে শুধু আষাঢ়-শাওন দুই মাস। চোত মাসের খটখটে মাটির কথা বাদ দিলে বাকি সময়টা কিছু কিছু কাদা। সেই কাদায় গড়াগড়ি দিচ্ছে ছোট-বড় মিলিয়ে এক হালি শুয়োর। কাদার মতো কদাকার গায়ের রং। বিচ্ছিরি জীবগুলো দেখে পথচারীদের ঘেন্না স্বাভাবিক। কেউ কেউ আবার চমকেও ওঠে যখন হারাম মাংসের জীবগুলো পরস্পরের নাকে নাক ঠেকিয়ে চিঁচিঁচিঁহি করে ডেকে ওঠে। তার পরেই শব্দ ওঠে ঘোঁত, ঘোঁত। এঁদোর ধারে একটা নিম আর একটা লটকন গাছ। তাদের যৌথ ছায়ার মাঝখানে বাঁশের মাচা। সেই মাচায় ইউসুফ। কখনো বসা, কখনো আধশোয়া, কখনো শুয়ে থাকা ইউসুফ। কালো হারাম মাংসের জীব, পচা ডোবার কঙ্কাল আর সুইপার কলোনির আস্তর খসা ঘরগুলোর পটভূমিকায় প্রথম দর্শনে ইউসুফ নিদারুণ বেমানান। সাধারণ বাঙালির গায়ের রঙ মেটে। বড়জোর বাদামি। কিন্তু ইউসুফের গায়ের রঙ এক্কেবারে ধবধবে। লন্ডন-প্যারিস পাঠিয়ে দিলে সায়েবরাও তাকে নিজেদের লোক কিনা ভেবে ধন্দে পড়ে যাবে।
কালো শুয়োরগুলোর পাশে ফরসা ইউসুফকে সারাদিন বসে-শুয়ে থাকতে দেখা যায়। গ্রীষ্ফ্মে শীতে। বর্ষায় ইউসুফ কী করে তা অবশ্য জানা যায় না। কারণ বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ওই পথ দিয়ে কেউ যায় না। তা ছাড়া এঁটেল মাটির ভেজা কাদায় পা পিছলে পড়ার ভয় তো আছেই।
তো ইউসুফকে ওইখানে, ওই মাচাতেই বসে থাকতে হয়। কেননা, ইউসুফের আর কোথাও যাবার জায়গা নেই। তার সঙ্গে কেউ মেশে না। এমনকি ইউসুফের বাবা-মা, ভাই-বোন, চাচাতো-খালাতো আত্মীয়রাও তার সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করেছে। গত আট বছরে ইউসুফের যাতায়াতের চৌহদ্দি ওই শ্রীমতীর ঘর আর এই মেথরপট্টির পচানির ঠেক। আর ওই ডোবার ধারের মাচা। ইউসুফ সেখানে বসে পথচারী দেখে; শুয়োরদের গুঁতোগুঁতি দেখে। তবে বেশিরভাগ সময় সে শুধু তাকিয়েই থাকে, দেখে না কিছুই।
আট বছরেই ছোট শহরের মানুষের কাছে ইউসুফ-শ্রীমতীর প্রেমকাহিনী ফিকে হয়ে গেছে। অথচ এক সময় ধর্মপুরাণের ইউসুফ-জোলেখার প্রেমকাহিনীর সঙ্গে সমানতালে উচ্চারিত হতো মোদো ইউসুফের কথা। শ্রীমতীকে বিয়ে করার অপরাধে কী মারটাই না খেয়েছিল ইউসুফ! বাপ-ভাই-পাড়াতো ভাইরা মিলে এমন মার দিয়েছিল যে তিন মাস ধরে রক্ত বেরিয়েছে তার পায়খানার সাথে। তার দুর্দশা দেখে এমনকি শ্রীমতীও গলে গিয়ে বলেছিল- আর কত জুলুম সইবে! তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যাও! তোমার শরীর থেকে সব খুন যে বেরিয়ে যাচ্ছে।
ইউসুফ তখন শুধু মাছের চোখে তাকিয়েছে শ্রীমতীর সিঁদুরের দিকে।
'একদা চারি বন্ধু একসঙ্গে বিদেশে চাকরির খোঁজে বাহির হইল। যাইতে যাইতে পথে রাত্রি হইয়া গেল; তখন সকলে পরামর্শ করিয়া স্থির করিল প্রত্যেকে এক প্রহর রাত্রি জাগিয়া পাহারা দিবে, তিনজন ঘুমাইবে। প্রথম বন্ধু একাকী জাগিয়া জাগিয়া কী করে, ভাবিতে ভাবিতে একটি কাষ্ঠের নারীমূর্তি তৈয়ার করিল। যখন দ্বিতীয় বন্ধুর পালা আসিল, তখন সে ইহার গায়ে বসিয়া বসিয়া অলংকার পরাইল। তৃতীয় বন্ধু ছিল তাঁতি, সে একটি ছোট শাড়ি বুনিয়া মূর্তিটিকে পরাইল। চতুর্থ বন্ধু ছিল সিঁদুর বিক্রেতা। যখন তাহার জাগিবার পালা আসিল, তখন সে একমুঠি সিঁদুর লইয়া ইহার ললাটে ঘষিয়া দিল। অমনি মূর্তিটি জীবন্ত হইয়া উঠিল।'
যে সিঁদুর কাঠের মূর্তিকে জীবন্ত করে, সেই সিঁদুর কি ওদের দু'জনকে নতুন জীবন দিতে পারেনি? শ্রীমতী কাকভোরে ইউসুফের জন্যে রান্না করে দেয়, দাঁত মাজার নিমের ডাল কেটে দেয়, মুখ ধোয়ার পানি তুলে দেয়, ইউসুফের ভেজা মুখ আঁচলে মুছে দেয়, মুখে তুলে খাইয়ে দেয়, কাজে যাবার সময় ইউসুফের জন্য হাঁড়িভর্তি চা বানিয়ে বিস্কুট-মুড়ির সঙ্গে রেখে দেয়, সন্ধ্যায় নিজের হাতে ইউসুফের গ্লাসে পচানি ঢেলে দেয়, রাতে নিজের লীলায়িত যৌবন দেয়।
এতকিছুর পরেও ইউসুফ অল্পদিনেই হাঁপিয়ে ওঠে। তার মোহ দ্রুত ফিকে হতে থাকে। সে নিজের মধ্যে হাতড়ে-হাতড়ে প্রেম জিনিসটা তেমন খুঁজে পায় না। তবু ইউসুফ শ্রীমতীকে ছেড়ে যায় না। কারণ হয়তো তার যাবার কোনো জায়গা নেই।
রাস্তায় বেরুলে লোকে তার গায়ের ছোঁয়া এড়িয়ে চলে, দোকানে চা খেতে চাইলে তাকে কাপ-গেলাস দেওয়া হয় না, দোকানের চেয়ার-বেঞ্চিতে তার বসার অধিকার নেই। ব্রাত্য জীবনের যাতনা ইউসুফ মর্মে-মর্মে উপলব্ধি করতে থাকে। ফলে সে আরও বেশি করে নিজেকে ঘরবন্দি করতে থাকে, চায়ের বদলে পচানি খেতে থাকে। পানির বদলেও। এবং কারণে-অকারণে শ্রীমতীকে পেটানো শুরু করে।
পিটুনি খেতে শ্রীমতীর তেমন আপত্তি নেই। মেথরপট্টিতে সব মরদই পচানি খেয়ে বউ পেটায়, খিস্তি করে হিন্দি-বাংলা মিশিয়ে। কিন্তু শ্রীমতী অন্তত এটুকু বোঝে যে ইউসুফের পিটুনির পেছনে নেশা ছাড়াও আরও কিছু আছে। ইউসুফ হয়তো নিজের বর্তমান পরিণতির জন্যে দায়ী করছে তাকেই। এটাই কষ্ট দেয় শ্রীমতীকে। সমাধানের পথ জানা নেই। সে আরও পতিব্রতা হবার চেষ্টা করে। চেষ্টা করে ইউসুফের অন্তরের সব ফাঁকফোকর পূর্ণ করার। এতে কতটুকু কাজ হয় বোঝা যায় না। বরং মনে হয়, দিনে দিনে তার উদাসীনতা বেড়েই চলে।
হঠাৎ ইউসুফের বাড়ি থেকে তার ডাক পড়ে।
শ্রীমতী হতবাক। ইউসুফ সুখের আতিশয্যে পারে তো বার্তাবাহক ফুপাতো ভাইকে কোলে তুলে আদর করে। কিন্তু এইসব উচ্ছ্বাস ফুপাতো ভাইকে স্পর্শও করে না। সে ভাবলেশহীনভাবে বলে- দেরি করা যাবি না। শিগগির চলেন।
ইউসুফ তবু তড়িঘড়ি করে না। ঘরের মধ্যে এসে শ্রীমতীকে বলে- রক্তের টান বুঝিস, পানি হয় না কুনোদিন। আজ আমি যাচ্ছি, কয়দিন পরেই তোর ডাক পড়বি।

বাড়িতে পৌঁছে দেখে তার বাপের জবান বন্ধ। জ্ঞান নেই। যতক্ষণ জ্ঞান ছিল, বার বার নাকি ইউসুফকে দেখতে চেয়েছে। মৃত্যুপথযাত্রীর শেষ ইচ্ছে পূরণের জন্যেই সম্মতি দিয়েছিল ভাইয়েরা। কিন্তু ইউসুফ বাড়িতে ঢুকতেই তার দিকে সবাই এমন ঘৃণার চোখে তাকাল যেন সে এইমাত্র ভাগাড় থেকে উঠে এসেছে সারা গয়ে গু মেখে।
ইউসুফ বাড়িতে পা দেবে, শুধু এই জন্যেই বোধহয় বাপের রুহটা আটকে ছিল। তাকে কেউ বাড়িতে স্বাগত জানায়নি, সে-ও ঘরে ঢুকবে কিনা ভেবে ইতস্তত করছিল। তারপর সাহস করে দাওয়ায় পা রাখতেই ভেতর থেকে মা আর ভাইবোনদের কোরাস আর্তনাদ। ইউসুফ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে চৌকাঠেই দাঁড়িয়ে যায়। ঘরের স্যাঁতসেঁতে আলোহীনতার মধ্যেও দেখা যায় স্ত্রী-পুত্ররা আছড়ে পড়েছে এইমাত্র মরহুম হয়ে যাওয়া ইউনুস আলির মৃতদেহের ওপর।
একটা মানুষ মরে যাবার পর তার শেষ সময়ে অপ্রত্যক্ষ ক্ষমা ঘোষণা উত্তরাধিকারীরা মেনে নেবেই- এমন কোনো কথা নেই। ইউসুফের সঙ্গে কেউ কোনো কথা বলেনি, বাপের লাশ ছোঁবার অধিকার তাকে দেওয়া হয়নি। জানাজায় দাঁড়াতে দেবার তো প্রশ্নই ওঠে না।
আসর-বাদ জানাজা হয়েছিল পাড়ার মসজিদে। সন্ধের পর পরই দাফন-কাফন শেষ। প্রায় মাঝরাতে গোরস্তানের খাদেম দেখলেন, কেউ একজন আলো-আঁধারির মধ্যে গোরস্তানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দিশেহারার মতো কী যেন খুঁজছে।
খাট আর চৌকি পাশাপাশি জোড়া দিয়ে ঘরের অর্ধেক খেয়ে নেয়। ঢোকার দরজাটা ঘরের ঠিক মধ্যখানে হওয়ায় খাটচৌকির জোড়া একপাল্লা দরজা বন্ধ করে রাখে। অন্য অংশে কেরোসিনের চুলা, দেয়ালের তাকে কৌটার রাজ্য, কাঁসার খানকয় বাসন আর গেলাস আর চীনামাটির জোড়া মেলানো ছয় খানা কাপপিরিচ। সেই ঘরের জানালায় জাবরা আর আলতাবানু, ঘরের ভেতরে হারমোনিয়াম বাজছে। জাবরা আলতার পিঠে হাত দিয়ে জিজ্ঞেস করে,
'দেইখিছিস?'
আলতা ঘরের অন্য প্রান্তের আধখোলা দরজার দিকে তাকায়। ঘরের মধ্যে হারমোনিয়াম আর গজগজানি।
ভ্যানগাড়ি আর হারমোনিয়ামের দামের একটা তুলনামূলক আলোচনাতে জাবরা সুবিধা করতে পারে না। কারণ, এসব ব্যাপারে যে প্রশ্রয় দিতে নেই সেই নীতিবোধটা আমার খুব ভালোই আছে। ততক্ষণে জাবরার পুরোপুরি মন উচাটন হয়ে গেছে। জোড়া রড থেকে ডান পা নামিয়ে জাবরা প্লাস্টিকের স্যান্ডেল সমেত প্যাডেল ধরে। হাতল সোজা করতে করতে সামনে তাকায়। তারপর একটা পরিস্থিতি বলার মতো করে নিচু স্বরে বলে -
'আলতা তো ইশকুলে যেইতেই চায় না!'
ওর মনের ভাবটা বুঝতে পেরে আমার মোটেই খুশি লাগেনি কখনও। প্যাডেলে চাপ দেবার সময় 'এইসু' বলে যায় জাবরা। ওদের বাড়িতে যাবার দাওয়াত দিয়ে চলে যায় ও।
আলতাবানু
আলতাবানুকে আমি প্রথম প্রথম দেখি জাবরার সঙ্গে। জাবরার ঘাড়ে, মানে পিঠে সওয়ার হয়ে আমাদের তিরিশ টাকার বাসায় এসেছে। সত্যি করে বললে বাসার উঠানে। দুজনেই হাঁপিয়ে ধুপিয়ে একশা। জাবরা হাঁপাচ্ছে আলতাকে পিঠে করে নিয়ে এসে। অনেক তো আর বড় নয় ও আলতার থেকে। কত এই চার, পাঁচ কি বড়জোর ছয় বছরের। আর আলতা হাঁপাচ্ছে এক হাতে ভাইয়ের মাথা চেপে ধরে বসে থাকার অস্বস্তিতে। অন্য হাতে তখন তার লজেন্সের কাঠি। পাঁচ পয়সায় পাওয়া যেত তখন। মিষ্টি খানিক ছিল, কিন্তু লাল ছিল আরও বেশি। আলতার হাতের আঙুল, গাল, থুতনি, সম্ভবত জাবরার কিছু চুলও লালে আর লালায় মাখামাখি। আলতা বটে। এমনিতেই, কাঠি লজেন্স না খেলেও, আলতা লালচে। ওর মায়ের মতো। কাঠি লজেন্সের লালটা আবার অন্য রকম। লাল বললে চলে। কিন্তু গোলাপি বললে আরও ভালো। হাওয়াই মেঠাইয়ের মতো। নেশা ধরে যায় দেখতে থাকলে। উত্তেজনায় বার কয়েক আমি কিনেছি, খেয়েছি। এ নিয়ে খানিক অশান্তিও হয়েছে। এই দারুণ লাল রংটা বাবা কিংবা মা কাউকেই খুশি করেনি কখনও। বাবা কিছুতেই বুঝতেন না চার আনা করে টফি খাওয়ানোর পরও এটা কেন খাই। আমিও ভারি অবাক হতাম। টফি আর এইটার মধ্যে তুলনাটা কীভাবে করেন তিনি। যাকগে সে অন্য প্রসঙ্গ। উঠোনে এসেই ভাইয়ের পিঠ ছেঁচড়ে নেমে যেত আলতা। ফোলানো একটা ইজের ঘটি প্যান্ট। পরা থাকলে অ্যালুমিনিয়ামের ঘটির মতো গোল দেখায়। খালি গায়ে গলায় একটা লাল সাদা পুঁতির মালা। চোখে কাজল। কপালেও একটা কাজলের টিপ। পিঠ ছেঁচড়ে নেমেই কাঠি লজেন্সের মাথাটা জিহ্বায় ঠেসে ধরে, চোয়ালটা ঝুলিয়ে, ঘাড়টা যতখানি পারা যায় ত্যারছা আর গোঁজ করে, বড় বড় চোখ করে আমাদের দিকে তাকাবে আলতা। হতে পারে এইরকম দেখাগুলাই আলতাকে আমার প্রথম দেখা না। কিন্তু আলতা আর জাবরার কথা মনে করলে এটাই আসে আগে। সেসব অনেক দিন আগের কথা। এখানে এসে প্রাইমারি স্কুলে আমি থ্রিতে ভর্তি হয়েছি তখন।
আলতাবানুদের বাসা আর আমাদেরটা খুব কাছে। নতুন জায়গায় এসে সর্বনিম্ন তিরিশ টাকায় যে বাসাটা, পাকাও বটে, বাবা খুঁজে পেয়েছিলেন সেটা ঘটনাচক্রে জাবরাদের পাড়াতেই। তারপরই আমাদের নিয়ে আসেন বাবা। জাবরাদের বাসাটা আসলে বাড়ি। ওর আম্মা পৈতৃক সূত্রে একখ জমি পেয়েছিলেন ভিটাতে। সেখানেই মাটির দেয়াল তুলে জাবরাদের ঘর। জাবরা, বাবরা, আলতাবানু, ওদের আম্মা, আর আব্বা লালুমিয়া, গোলাপবানু তখন একেবারে মায়ের কোলে। বোঝাই যাচ্ছে গোলাপবানু হচ্ছে গে আলতাবানুর ছোট সবার ছোট বোন। লালুমিয়া কামলা খাটেন, ওখানে বলে মুনিষ খাটা। যখন যা পান তাই করেন, কিন্তু তার পাকা হাত বেড়া বোনায়। চিটার বেড়ায় সবচেয়ে পাকা, পুটুশও ভালো, বাঁশবাকালিরও করেন। অর্ধেক বছরই তার কাজ নাই। এসবই চলতে-ফিরতে জানা। মাঝেমধ্যে জাবরার আম্মা এসে বলেন। ধুলামাখা পায়ে আমাদের বাসার রকেই বসতেন তিনি। আমার মায়ের সঙ্গে এসব আলোচনা তার শেষে মোটামুটি সংসারের মাপে এসেই ঠেকে। ঠিক কতজনার সংসার থাকা ভালো সাধারণত সেটা নিয়েই মা বলেন। সে রকমই মনে পড়ে আমার। একেক দিন বাড়িওয়ালি আসতেন। আক্ষেপ করতেন, দোকানদার ভাইয়েরা কীভাবে মুনিষের সঙ্গে বোনের বিয়ে দেয়। জাবরার দুই মামা দোকানদার। চারপায়া দোকান তাদের।
সওয়ার
রাস্তায় চলতে ফিরতে জাবরার সঙ্গে দেখা হতো। আস্তে আস্তে সেটাও কমে গেছে। আমরা তখন অন্য পাড়ায় থাকি।
রাস্তায় ভ্যান চালাতে চালাতে জাবরার পা আরও লম্বা হয়েছে তখন। পুরোটাই নাগালে ওর। আমাদের বাসা বদলের সময়ে একবার জাবরাও ভ্যান নিয়ে এসেছিল। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাসায় গেছি। সেই গম্ভীর মুখ চিরে হঠাৎ হাসি। জবর আলী। নরম নরম নতুন দাড়িতে ওকে অদ্ভুত রকমের সুন্দর দেখায়। কখনও অবশ্য সেটা বলা হয়নি। দাড়িগুলো ও ঝুলিয়ে দিয়েছে। জামাটা তখন অন্য রকম। ঝোলানো জামা। পাঞ্জাবির মতো পাশে পকেট। কাঁধে একটা গামছা। আমি সেবারে অনেক চেষ্টা করেছি ও যাতে কিছুতেই একহাত এগিয়ে না থাকে। কিন্তু যেই না আমাকে জিজ্ঞেস করল 'ভালো আছো?' আমার ঝামেলাটা পাকাতেই থাকল। এরপর যথারীতি ও আগের জায়গাতেই যেতে থাকল, আর প্রশ্ন করতে থাকল। আর বাসা পর্যন্ত এসে যখন রিংকুকে দেখতে চাইল তখন ও পুরোপুরি মুরুব্বি। আমি যথারীতি ওর পোষা বেড়ালের মতো। আমি লক্ষ করলাম, আগের মতো একটা গোছানো রাগও তখন দাঁড়াচ্ছে না। বেশ কঠিন পরিস্থিতি।
রিংকুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে জাবরা এবারে খবর জানতে চায়। বিশ্ববিদ্যালয় ওর কাছে কলেজ।
'তোমাদের কলেজটা সুন্দোর?'
আমি টেনে বলি, 'হ্যাঁ!'
জাবরা হাসিমুখে জিজ্ঞেস করে, 'রিংকু ওই কলেজে পইড়বে?'
আমি বলি, 'হ্যাঁ, পড়বে তো!'
আলতাবানুর কথা জিজ্ঞেস করা আমার আর হয়ে ওঠে না। জাবরার কথা এরপর ভুলতেই বসেছি।
ছুটির মধ্যে ঢাকা থেকে বাসায় গেছি। দুপুরে আলসেমি। আর সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া ক্যাসেটের গান শুনছি। আমাদের তখন আড়াই ঘরের বাসা। রিংকু এসে ক্যাসেট থামিয়ে বসে। হারমোনিয়াম বাজিয়ে একটা-দুইটা গান গায়। এক কথা দুই কথা, কখন যেন জাবরা এসে পড়ে। মাকে জিজ্ঞেস করি-
'মা, জাবরার খবর জানো কিছু? কী করে?'
'কী আর করবে? তিন দিনে এক দিন ভ্যান চালায়।'
'তিন দিনে এক দিন ভ্যান চালায় মানে কী?'
'তোর বাবা তো বলল জাবরা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। রিংকুও তো বলল। অসুখ হয়েছিল তো খুব।'
'কী অসুখ?'
'কে জানে! হাসপাতালেও তো ছিল। এক মাসের মতো। রাখে নাকি অতদিন?'
'হাসপাতালে বলেনি কী হয়েছে?'
'জানি না তো বাবা! আর জানলেই বা কী?'
খানিকক্ষণের জন্য চুপচাপ কাটে আমার। আবার গুছিয়ে জিজ্ঞেস করি-
'আলতাবানুর খবর জানো?'
'আলতাবানুর মেয়ে হয়েছে।'
'কে বলল?'
'রিংকুই তো বলল।'
'জানলি কী করে রে?' রিংকুকে আমি জিজ্ঞেস করি।
'জাবরার সঙ্গে দেখা হলো রাস্তায়। ওর শরীরের কথা জিজ্ঞেস করলাম। তখন নিজের কথা না বলে আলতার কথা বলল।'
'কী অসুখ হয়েছে রে?'
'কার?' রিংকু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
'জাবরার।'
'আহা। ও তো বললই না কিছু। হাসল। হাসতেও পারে না ঠিকমতো।'
আবারও খানিক চুপচাপ কাটে আমার।
'আলতার শ্বশুরবাড়ি কই রে?'
'ঝাউবাড়ি।' রিংকু জানায়।
'কী করে ওর বর?'
'মুনিষ খাটে, আর কী করবে?' মা বলেন এবারে।
'আলতার মেয়ে হলো কি জাবরাদের বাড়িতে?'
'না হাসপাতালে। বলল আলতাকে আনতে পারেনি। পয়সাপাতি নেই। কাজবাজ প্রায় বন্ধ।'
'তো?'
'শ্বশুরবাড়িতেই ছিল। পানি নেমে গেছিল বলল। ওর ভ্যানে করে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে।'
'ওর ভ্যানে মানে?' আমার প্রশ্নে রিংকু অবাক হয়ে যায়।
'জাবরার ভ্যানে!'
ভুলু চেয়ারম্যানের তামাকের গুদামে জাবরা ভ্যান নিয়ে এসেছে যখন ওর আর নামানোর উপায় নেই। সামনে পড়ে থাকা তামাকের গাঁটের ওপর বসে গামছা দিয়ে মুখ ঢাকে ও। মুখ মোছে, দাড়ি মোছে। অর্ধেক শরীরে মুখের থেকে দাড়ি তখন বড় দেখায়। হাসপাতালের ডাক্তার বলেছে বিশ্রাম নিতে। আটমণী ভ্যান থামিয়ে তামাকের গাঁটের ওপর বসে বিশ্রাম নেয় জাবরা। গোলাপবানু তখন দৌড়ে আসে। বাবরাও তখন রিকশা চালায়। সেও রিকশা নিয়ে খুঁজতে বেরিয়েছে জাবরাকে। গোলাপবানু এসে জাবরাকে জানায়।
ধুমধাম করে ভ্যান খালি করে জাবরা ঝাউবাড়িয়া ছোটে। চার মাইল রাস্তা। জাবরার মনে হতে থাকে চৌদ্দ মাইল। আলতার কথা নাকি ডাক্তারের কথা ভাবতে ভাবতে ও ঝাউবাড়িয়া ছোটে। আলতার বাড়ির উঠানে যখন ভ্যান থামিয়ে দাঁড়ায় জাবরা, তখন ওকে ভালো দেখায়, নাকি আলতাকে ভালো দেখায়, সেটা বলতে পারবে কদম, আলতার বর। দুপুর থেকেই আলতা ছটফট করছে। আগের বার যখন হাসপাতালে গেছে, ডাক্তার বলেছে অ্যানিমিয়া। জাবরা আসার এক-দেড় ঘণ্টা আগে আলতার পানি নেমে গিয়েছে। কদম এদিক-সেদিক ভ্যানের জন্য দৌড়াদৌড়ি করে। নগদ একশ টাকার চিন্তায় পরিচিত লোক খুঁজতে থাকে। হয়রান কদম দেখেছে জাবরার ভ্যান আসছে। কদম দৌড়ে এসে পোঁটলা-পুঁটলি তৈরি করে। কদমের মা গোছাতে থাকেন কী লাগবে।
ভ্যানের ওপর পোঁটলা দু'তিনেকের মধ্যে শুয়ে আলতা। মাথার পাশে তার শাশুড়ি। উরুর কাছ ঘেঁষে কদমের ছোট বোন। কদম পাশে পাশে দৌড়াচ্ছে। গরুর গাড়ির রাস্তায় বর্ষাকালের কাদার চাঁই। বর্ষার পর ভীষণ শক্ত, ভীষণ এবড়োখেবড়ো। জাবরার শুকনো মুখ বেয়ে বড় বড় চোখে সেই রাস্তার মসৃণ খাদগুলোতে তাকিয়ে থাকে। ভ্যানের চাকা রাখতে চায় সেখানে। ভ্যানের ওপর বসে দোয়া পড়তে থাকেন কদমের মা। নিঃশব্দে পড়তে থাকে জাবরাও। আর আলতা সশব্দে। জাবরা এসে পৌঁছানোর পর থেকেই যন্ত্রণার চিৎকার থামিয়ে দিয়েছে। ভ্যানে শুয়ে বড় বড় ঘন ঘন শ্বাস নিতে নিতে ভাইজানের সঙ্গে কথা বলে আলতা-
'ভাইজান। চিন্তা নাই। ঠিইক হইয়ে যাবে।'
জাবরার বুকে দুশ্চিন্তার ধুকপুকানি, নাকি এক মাস হাসপাতালে কাটানো হূৎপিে র ধুকপুকানি ডাক্তারই ভালো জানেন।
এবারে চল্লিশ মাইলের চ্যালেঞ্জ লাগে জাবরার। ও আরও সাবধানে মসৃণ খাদ খোঁজে, আরও জোরে চালাতে চায়। হাসপাতালে এসে যখন পৌঁছায়, রাত তখন আটটা। ছোট শহরের হাসপাতাল প্রায় ডাক্তারশূন্যই থাকে। আটটায় তো বটেই। তার মধ্যে বিছানা পর্যন্ত কখন আলতাকে নিয়ে যেতে পেরেছে, সেটা সঠিকভাবে জানা যায় না। তারপরই কেবল, কেবল তারপরই জাবরা এক গ্লাস পানি চেয়েছে কারও কাছে। পুরো গ্লাস খেতে পারেনি। তার আগেই হাসপাতালের বারান্দায়, মেঝেতে শুয়ে পড়েছে।
রিংকু যখন জাবরাকে ওর শরীর নিয়ে জিজ্ঞেস করে, জাবরা সে কথা না বলে আলতার গল্প করেছে। আলতার মেয়ের গল্প করেছে। এক মাস হাসপাতালে থাকার কথা মুখেও আনেনি। জিজ্ঞেস করাতে নাকি খালি হেসেছে। ডাক্তাররা ওকে বিশ্রাম নিতে বলেছিলেন। দ্বিতীয়বার যখন হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়, তখন চিনতে পারা নার্স-কম্পাউন্ডাররা কী বলে গালমন্দ করেছে জাবরা বলতেই পারবে না। কারণ ওই পানির গ্লাস না খেতেই মেঝেতে শুয়ে পড়েছে জাবরা। গালমন্দগুলো শুনতে পায়নি বলে ও দ্বিতীয় বার অসুস্থ হবার কথা ঘুণাক্ষরেও টের পেতে দেয়নি রিংকুকে। আলতার কথা বলেই পার পেতে চেয়েছে।
লেখক, কথাসাহিত্যিক

মন্তব্য করুন