সেটা ছিল রোদে প্যাঁচানো উত্তপ্ত এক গ্রীষ্ফ্মদিন। গ্রীষ্ফ্মকালের জ্বলন্ত রাস্তায় একটা হাড় জিরজিরে বুড়ো বাস চলছিলো ধুঁকে ধুঁকে। বাস যাত্রীরা ঠাসাঠাসি করে একে অন্যের সাথে প্রায় গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়েছিলো। তাদের সবার গায়ে গরম জলের মতো জবজবে ঘাম, সে ঘামের স্বাদ নোনতা, গন্ধ নোনতা। বাসের লেডিস সিটে বসে ছিলো কয়েকজন শাড়ি পরা এবং কয়েকজন সালোয়ার-কামিজ পরা লেডিস। তারা কথা বলছিলো না, কেবল শ্যাওলা পড়া পাথরের ম্লান স্থাপত্যের মতো সামনে তাকিয়ে ছিলো চুপচাপ। বাসের উইন্ডস্ট্ক্রিন দিয়ে হয়তো তারা কালো রাস্তার গা চিরে বয়ে যাওয়া হলুদ, সাদা দাগগুলো দেখছিলো অথবা দেখছিলো না কিছুই, কেবল অলস চোখের পাতা খুলে কিছু একটা দেখার ভান করছিলো।
বাসটির মতো বাসের ড্রাইভারও ছিলো বৃদ্ধ। তার তোবড়ানো গাল জুড়ে চিত্রলতার মতো লতিয়ে ছিলো নিষ্প্রভ সাদা দাড়ি, ঝানু গোয়েন্দার মতো তীক্ষষ্ট দৃষ্টি নিয়ে চারপাশ দেখে অ্যাকসিডেন্ট এড়িয়ে ধীরে-সুস্থে সীমিত গতিতে গাড়ি চালাচ্ছিল সে। বাসের যুবক যাত্রীরা সে কারণে ঈষৎ বিরক্ত, তারা চায় রোমাঞ্চপূর্ণ গতি এবং বয়স্করা নিশ্চিন্ত কারণ তারা চায় স্বস্তিকর নিরাপত্তা। মধ্যবয়সীদের অবশ্য এই সংক্রান্ত কোনো অনুভব ছিলো না, তারা কেউ পরিবার, কেউ ভবিষ্যৎ, কেউ গন্তব্য, কেউবা বস, গ্যাস, পানির বিল, চাকরি, প্রমোশন ইত্যাকার বিবিধ বিষয় নিয়ে ভাবছিলো। এতগুলো লোক একসাথে অথচ কোনো কোলাহল নেই, সবার মুখ বিকৃত হয়ে ছিলো অবসাদ আর ক্লান্তিতে।
হঠাৎ করেই গুমোট স্তব্ধতা ভেঙে খান খান। বাসের পেছন দিক থেকে তুমুল হৈচৈয়ের আওয়াজ ভেসে এলো। শক্ত সিটে বসে যারা এতক্ষণ ঝিমুচ্ছিলো তারা এবার সোজা হয়ে বসলো, মহিলারা উৎসুক হলো ঘটনা জানার জন্য, তারা সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটির কাছে জানতে চাইলো ব্যাপারটা, লোকটি তার পেছনের যাত্রীকে জিজ্ঞেস করলো, সে শুধালো পরবর্তী যাত্রীর কাছে, এভাবে জানা গেল, এক যুবক ছাত্র পরিচয় দিয়ে কন্ডাক্টরকে হাফ ভাড়া দিতে চেয়েছিলো, যদিও যুবকের কাছে কোনো পরিচয়পত্র ছিলো না। কন্ডাক্টর হাফ ভাড়া নিতে অস্বীকার করায় এসব তর্কাতর্কি। ওহ্‌! এ আর এমন কী? চলন্ত বাসে এসব তো মামুলি ব্যাপার! ফলে ঘটনা জানাজানি হবার পর আবার আগের মতো নেতিয়ে পড়ে কথাস্রোত।
অল্পকিছু পরেই বাসের মাঝামাঝি থেকে ভেসে আসে কান্না ও চিৎকার ধ্বনি। এক ভদ্রলোকের পকেট কাটা গেছে। তিনি হাত-পা আছড়ে স্বজন হারানো মানুষের মতো বিলাপ শুরু করেছেন। পকেটমার নাকি তার এক মাসের পুরো বেতনটাই নিয়ে গেছে মানিব্যাগসুদ্ধ। বাসের কেউ পকেটমারের শাস্তি দাবি করলো না, সহানুভূতি জানালো না কেউ। যেন চলন্ত বাসে এসব ঘটেই থাকে। কয়েকজন ফিসফিস করে সহযাত্রীদের জানায়, কবে কখন কীভাবে তাদের পিক পকেট হয়েছিল। ভদ্রলোকের অসহায় কান্না ধীরে ধীরে ফোঁপানিতে নেমে আসে। দু'হাতে মাথা চেপে তিনি নীরবে চোখের জল ফেলে চলেন- যে জলের স্বাদ নোনা।
বাসের সামনের অংশ এতক্ষণ নীরব ছিলো, নীরবতা ভাঙলো নারীকণ্ঠের ক্রুদ্ধ গর্জনে। মহিলা তার সামনে রড ধরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন বাসযাত্রীকে সজোরে ধমকাচ্ছেন,

-এই যে, আপনি সরে দাঁড়ান তো, এভাবে গায়ের উপর পড়ছেন কেন?
যাকে উদ্দেশ করে মহিলার এই রক্তচক্ষু, সে কোনো কথা না বলে একটু সরে দাঁড়ালো মাত্র। মহিলা এতে সন্তুষ্ট নন, তিনি এবার লোকটির চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুললেন। কটাক্ষে বললেন, নারীকে প্রত্যেক পুরুষই মনে করে লোভনীয় কেক অথবা পায়ের জুতো।
লোকটি এবার কেশে গলা পরিস্কার করে নেয়, তারপর স্পষ্ট উচ্চারণে বলে, 'দেখুন ম্যাডাম, আমার মাথার সবগুলো চুল কালো, আর আপনার অর্ধেক চুল সাদা; শোনেন, বাসি কেক ছোঁয়ার ইচ্ছে আমার নেই, ব্যবহূত জুতোও আমি পরি না।'
হেসে ফেললো অনেকেই, কেউ খুব রাগ করলো। এই জাতীয় অশোভন কথা বলার মানে কী? মহিলাদের প্রতি নূ্যনতম সম্মান নাই? ভদ্রতা নাই? সৌজন্যজ্ঞান নাই? দেশ থেকে কি আদব-কায়দা উঠে গেল? 'এক্ষুনি মাফ চা, ব্যাটা'- দুর্বিনীত লোকটির ঘেটি ধরে তার মাথা নত করতে বাধ্য করে কয়েকজন তাগড়াই প্যাসেঞ্জার।
'সরি ম্যাডাম, ভুল হয়ে গেছে'- অস্টম্ফুট কণ্ঠে দোষ স্বীকার করে লোকটা।
তার পরও মহিলা হয়তো রেগে গিয়ে আরো কিছু বলার জন্য মুখ খুলেছিল, মাঝখান থেকে বাদ সাধলো ড্রাইভার সাহেব। তার শরীর ক্ষীণকায় হলেও কণ্ঠ সবল। দৃষ্টি সামনে রেখেই বাজখাঁই কণ্ঠে হাঁক দিল সে,
'চিল্লাচিল্লি বন্ধ করেন, কোনখানে যামু খেয়াল নাই?'
যাত্রীরা এবার মিয়ানো মুড়ির মতো নিস্তেজ হয়ে যায়। আবার দীর্ঘক্ষণ একটানা অজানা পথ চলা। পথের শেষ রেখায় সম্ভবত নিশ্চিত গন্তব্য, গন্তব্যে অসম্ভব সুগন্ধী শান্তি, প্রিয়তোষ জীবন, অলীক সুখের কোমল হাওয়ায় প্রলম্বিত বিশ্রাম।
চলতে চলতে বেতো রোগীর মতো খক্‌ খক্‌ করে কেশে উঠে হঠাৎ থেমে পড়ে বাসটা। জায়গাটা পূর্ণিমায় ভেসে থাকা একটা অলস বিষণ্ণ বাজার। 'বাসের হূৎপিণ্ডে পানি চাই, তাই এই হঠাৎ ব্রেক'- কৈফিয়ত দেয় ড্রাইভার। কন্ডাক্টর ছোটে পানি সংগ্রহে।
'এই বাস কই যাইবো গো? বিরামপুরের দিকে যাইবোনি?'
বাজারের কয়েকজন কৌতূহলী লোক গলা বাড়িয়ে যাত্রীদের জিজ্ঞেস করে।
' না ভাই। এই গাড়ি যাইব স্বর্গ-ছেঁড়া'।
বাজারের লোকজন বিভ্রান্তিতে চোখ নাচায়, কয়েকবার অনিশ্চিত দৃষ্টি ছুড়ে দেয় দিগন্তে, তাদের কণ্ঠে বিস্ময়-
'স্বর্গ-ছেঁড়া? নামটা তো আগে কখনো শুনি নাই, জায়গাটা কোনখানে? দয়া করে যদি বৃত্তান্ত বলেন, যদি বিবরণ শোনান ...'
এইবার একজন মহিলা যাত্রী কথা বলে, তার চশমার অস্পষ্ট কাচে খেলা করে রামধনু রঙের অজস্র বিচিত্র বেলুন, মোহনীয় সুরে সে যেন পাখির মতো শিষ দেয়-
'স্বর্গ চেনো না মিয়ারা, বেহেশত চেনো না, জান্নাতের কথা শুনো নাই কোনো দিন?'
'শুনছি, শুনছি।'
লোকেরা এবার বলাবলি করে, 'স্বর্গ তো নন্দনকানন। এতে ঢুকতে হলে পেরোতে হয় মণিমাণিক্য, স্টম্ফটিক ও বৈদূর্যখচিত সোনার তৈরি দরজা, সেইখানে সকল দালানের ইট সোনা-রুপায় তৈরি, মাটি খাঁটি জাফরানের, কাঁকর হইলো মণিমুক্তা আর ইয়াকুত পাথর। আবে রহমতের শুভ্র নদী সুরম্য স্পন্দনে সারক্ষণ বয়ে চলে সেখানে, যার পানি দুধের চেয়ে সাদা, বরফের চেয়ে ঠান্ডা, মধুর চেয়ে মিষ্টি। স্বর্গের বাগানে গাছগুলো সোনা ও রুপার, ফলগুলো হাতের নিকটবর্তী, ফুলগুলো সুগন্ধ-সৌন্দর্যময়, বাতাস সেখানে মৃদু মেঘদলের মতো মোলায়েম আর মনোরম। জান্নাতে ইচ্ছাপ্রকাশ করলেই সোনা-রুপার পাত্রে তোমার সামনে চলে আসে সুস্বাদু বেহেশতি খানা, আসে মাছের কলিজার কাবাব, আসে সুমিষ্ট ফল- ফলাদি, আসে শীতল পানীয় ভর্তি পানপাত্র। আরো নাকি সেইখানে আছে নুর দিয়ে তৈরি অলৌকিক হুর। তারা নব্য কুমারী, অতিশয় সুন্দরী, নম্র ও নরম। তারা পরিচ্ছন্ন, স্বপ্নমানসী। হুর বালিকার মৃদু হাসিতে চারদিক আলোকিত হয়, একবিন্দু থুতুতে মিঠা হয়ে যায় দরিয়ার সমস্ত পানি ...'
'আহ্‌ স্বর্গ, শুনেছি বটে, সেখানে আছে আমাদের ক্লান্ত ও ভারতপ্ত হৃদয়ের প্রশান্তির পরম আশ্বাস, আছে অনিন্দ্য সুখ-সৌরভ, আছে জীবনের নব রূপায়ণ, মিলন মধুর অমল নিদ্রার রাত শেষে সুখ স্বচ্ছ অমলিন ভোর ... আহ্‌ স্বর্গের অনুপম আনন্দময় জীবন... ভয়হীন, ক্লান্তিহীন, আকাঙ্ক্ষাহীন, দুঃখতাপহীন, শুচিস্নিগ্ধ সেই স্থান। সেখানে ঈর্ষা নাই, শোক নাই, অজ্ঞতা নাই ..'
'হ্যাঁগো মিয়ারা, সেই স্বর্গেরই একখানা টুকরা ভাগ্যক্রমে ছিঁড়া পড়ছে ওই পূর্ব-দক্ষিণে, মহা দক্ষিণে, সেই স্থানের নামই স্বর্গছেঁড়া, আমরা সেইখানে যাবো, সেই মহাশান্তির দেশে।'
বাজারের লোকেরা কেমন অভূতপূর্ব শিহরণে স্বয়ংক্রিয় গুঞ্জন তোলে-


'আমরাও সেইখানে যেতে চাই, আমাদের নিয়া যান।'
'না, না, বাসে আর কোনো সিট নাই, এমনকি রড ধরে দাঁড়ানোরও জায়গা নাই, এমনকি পায়ের পাতা ফেলবারও উপায় নাই। নাই, নাই, নাই।'
'তবে আমাদের সেই পবিত্র পথের ঠিকানা বলেন, মানচিত্র এঁকে দেন, আমরা নিজেরাই স্বর্গছেঁড়া খুঁজে নিবো।'
যাত্রীদের এইবার মনে পড়ে তারা রয়েছে নিতান্তই অন্ধকারে, তারা বেকুবের মতো বলে-
'আমরা তো সেই পথ চিনি না, সেই পথ চেনে শুধু আমাদের বৃদ্ধ ড্রাইভার-'
একটা কোলাহলময় ভিড় এবার জড়িয়ে ধরে ড্রাইভারের চারপাশ-
'পথের ঠিকানা দ্যান জনাব, একবার সেই সুন্দর স্বপ্নের দেশে, প্রশান্তির দেশে নিয়া চলেন।'
'সে পথ বড় দূরের, বড় কষ্টের, বড় ভঙ্গুর সেই পথ।'
'আমরা যাবো, তবুও যাবো।'
'তবে ভাইসব, সবুর করেন, খোদ রাজধানী থেকে উনসত্তরজন লোকে ভরেছে এই দুর্বল যান, এক ট্রিপ দিয়া আসি, পরবর্তী ট্রিপে যাবেন আপনেরা, কেউ দরজায় ঝুলবেন না, বাম্পারে উঠবেন না, উঠলে বাস চলবে না, ভাইসব সবুর করেন। পরের পালায় আপনেরা যাবেন।'
জনগণ গলাকাটা মাছের মতো একটা ঝাঁকুনি দিয়ে স্থির হয়ে যায়, তাদের চোখ মৃত মাছের মতো ঠান্ডা ও ঘোলাটে রূপ ধারণ করে, বাজারের প্রাণ যেন ভেসে যায় অমাবস্যায়। বাস আবার চলতে শুরু করে সেই অনন্ত সুখের রাজ্যের দিকে। পথের কৌণিক দূরত্ব হিসাব করে ধীরে-সুস্থে ড্রাইভার এক্সিলেটরে চাপ দেয়, স্টিয়ারিং ঘুরায়।
যেন অনন্ত অপেক্ষার সড়কে গড়িয়ে যায় দীর্ঘ দীর্ঘ সময়ের স্বেচ্ছাচার, বাসযাত্রীরা, যারা নতমুখী অস্থির ও উদ্বেগপরায়ণ তারা ক্রমশ আক্রান্ত হয় দুরারোগ্য একঘেয়েমিতে। সেই বিরক্তি অচেনা ভাইরাসের মতো একটু একটু করে তাদের সবার মধ্যে সংক্রমিত হয়। জন্ম নেয় জাঁদরেল অসন্তোষ।
যার শুরুটা হয় বক্রতায়, একজন যাত্রী চেহারায় যার দারিদ্র্য, অশিক্ষা ও গোঁয়ার্তুমির নিপুণ জ্যামিতি; সে, তার ছেঁড়া ময়লা লুঙ্গি প্রায় ঊরু পর্যন্ত তুলে পরিবেশ পরিস্থিতির তোয়াক্কা না করে ঘ্যাশ ঘ্যাশ শব্দে হাঁটু চুলকাচ্ছিল, যেন সে একই সঙ্গে তার চুলকানি আক্রান্ত ত্বক ও গুমোট স্তব্ধতার ওপর মনের সমস্ত ঝাল মিটিয়ে প্রতিশোধ নিচ্ছিলো। ভুলে গিয়েছিল তার চারপাশ, যেন এভাবেই ত্বকের ওপর আঁচড়ে, খামচে, চুলকে সে ভেঙে দেবে তার সময়ের এই নিঃশব্দ স্থবিরতা।
তখন হঠাৎ তার অদূরে বসা কে একজন সুবেশী ভদ্রলোক নাক-টাক কুঁচকে হুঙ্কার দিয়ে উঠলো-
'এই ব্যাটা, লুঙ্গি নামা, আদব-কায়দা, শরম-লেহাজ কিছুই নাই? অসভ্য, বদমাইশ কোথাকার ..'
অকস্মাৎ ধমকে থতমত খেয়ে লোকটি তাৎক্ষণিক লুঙ্গি নামালো ঠিকই কিন্তু সেই সাথে উদ্ধত ঘাড় বেঁকিয়ে জানতে চাইলো, 'কোন সাহসে তাকে অসভ্য, বদমাশ বলা হয়েছে? গরিব বলে এই অপমান? তার কি কোনো মানসম্মান থাকতে নেই? এই কথাটা কি ভদ্রভাবে বলা যেত না?'
এক কথা, দু-কথা থেকে এসব কথা কাটাকাটি ফুটবলের মতো গড়াতে গড়াতে গিয়ে থামলো গোল পোস্টে, বৃদ্ধ ড্রাইভারের ওপর-
'ওই ড্রাইভার ব্যাটা গাড়ি টানতাছে তো টানতাছেই, পথ আর ফুরায় না কেন? আমাদের আর কত দূরে নিয়ে যাবে? কোথায় সেই স্বর্গ-ছেঁড়া? আর কতক্ষণই বা লাগবে ওখানে পৌঁছুতে?'
বৃদ্ধের মুখে শিশিরের মতো বিন্দু বিন্দু ঘাম, চেহারা মরা ঘাসের মতো ফ্যাকাসে, সে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে মাথার ওপরে দুই হাত তুলে বলে,
'শান্ত হোন, ভাইসবেরা, শুনেন শান্ত হয়ে, সম্ভবত আমরা পথ হারাইছি।'
মুহূর্তে বাসজুড়ে নামে বনভূমির নিস্তব্ধতা, একটি ভয়ার্ত কণ্ঠ যেন গহিন পাতাল থেকে আর্তনাদ করে ওঠে,
'কি? কি বল্‌লা?'
'কথা বোঝেন নাই? আমরা পথ হারাইছি' বৃদ্ধ পুনরায় স্পষ্ট কণ্ঠে বলে।
একটা সবুজ বৃক্ষ যেন চোখের নিমেষে শুকিয়ে যায়, বার বার সে গাছের মলিন পাতা ঝরে। চূড়ান্ত এক অসহায়ত্ব মুহূর্তে সকলকে গ্রাস করে নেয়। দ্রুত ধ্বংস হয় সমস্ত প্রত্যাশা-আনন্দ-স্বপ্ন এবং কিছূক্ষণের মধ্যেই একদল হতাশ মানুষ ফুঁসে ওঠে হিংস্রতায়, তাদের সমস্ত আশা-ভরসা যেন এক লহমায় ভেঙেচুরে চুরমার হয়ে গেছে। সবাই প্রতারিত হওয়ার নিস্করুণ অনুভব নিয়ে নির্মম আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়ে বৃদ্ধ ড্রাইভারের উপর। মুহূর্তে কী যেন ঘটে যায়। ড্রাইভারের কপাল ফেটে র্দ‌র্দ‌ করে রক্ত পড়ে, তার দুর্বল হাত-পা ভারসাম্য হারায়।
'প্রতারক, বাটপার, ঠগ, জোচ্চোর'- এমন গণ-চিৎকারের মধ্যে বৃদ্ধ ড্রাইভারের দুর্বল গোঙানি চাপা পড়ে যায়। হঠাৎ একজন বয়স্ক মহিলা যাত্রী তীক্ষষ্ট কণ্ঠে চেঁচিয়ে ওঠেন-
'ওরে মারামারি করিস না, থাম্‌, বুড়াকে মারলে এইখান থেকে ফিরবি কেমনে? এইখানে, এই অকূল পাথারে যে আটকা পড়বি সবাই, ওরে ছাড়, ছাড়রে বাপধনেরা, রক্তারক্তির ফল ভালো না, তোরা থাম, থাম তোরা।'
ধীরে ধীরে উন্মত্ত মানুষগুলো যেন সন্বিত ফিরে পায়। কোমলমতি মহিলারা এগিয়ে আসে বৃদ্ধ ড্রাইভারকে শুশ্রূষা করতে, কিন্তু তারা অচিরেই টের পায় বৃদ্ধ ড্রাইভার সবার দৃষ্টি এড়িয়ে চলে গেছে নাগালহীন ঊর্ধ্বলোকে, নিঃশব্দে। চারপাশে তখন নোনা বাতাসের বিবর্ণ দাপাদাপি, নারীরা সুর করে বিলাপ করে, পুরুষেরা বুক চাপড়ায়।
'এই দেশ তো চির সন্ধ্যার দেশ, এখানে রাত-ও নামে না, সকালও হয় না, শুধু সন্ধ্যা ঝুলে থাকে তার ধূসর নৈরাশ্য নিয়ে ..'
কন্ডাক্টরদের একজন চারিদিক জরিপ করে ঘোষণা দেয়। যাত্রীরা হাহাকার করে ওঠে।
যুবক বয়সী বাসযাত্রীরা সকলের উদ্দেশ্যে ইতস্তত রংচটা সান্ত্বনার কথা বলে। এইভাবে সেই অচেনা ধু ধু উপত্যকায় কাটে অনেকটা সময়, যদিও কতটা সময় তা ঠিক বোঝা যায় না। নোনা ঘাম, নোনা চোখের পানি ক্রমেই বাতাসকে করে তোলে আরো ভারী, আরো লবণাক্ত, আরো আর্দ্র। ঝড়-বৃষ্টিকে সঙ্গী করে নোনা বাতাস রাক্ষসের মতো দাঁত খিঁচিয়ে প্রবল দাপটে ডানা ঝাপটায়। ঘন, বিষণ্ণ হয়ে নামে অন্ধকার, কিয়ৎক্ষণ পর শূন্য জীর্ণ বাসটি পড়ে থাকে একেলা। সব মানুষ কিংবা বলা চলে স্বর্গলোভী বাসযাত্রীরা, দ্বিজ্ঞ্বিদিক ছোটে আশ্রয়ের খোঁজে, কেউ হয়তো ফিরে যায় নিজস্ব নির্ধারিত সীমানায়, কেউ হয়তো পথ হারায়, আর প্রাচীন বিধ্বস্ত বাসটি চুপচাপ নিশ্চল ভিজতে থাকে।
তারপর অবিরত অক্ষম দিন যায়। পথের ধারে সেই বাজারের লোকেরা অপেক্ষায় থেকে থেকে হয়ে যায় কঠিন শুস্ক সারি সারি পাথর এবং একদা আগুনবরণ ফাগুন মাসের শেষ তারিখে ভোর সকালে রাজধানী শহরের প্রান্তে আবারো এসে দাঁড়ায় একটা জরাজীর্ণ বৃদ্ধ বাস। দু'জন তরুণ কন্ডাক্টর লোকজনের কানে কানে শোনায় 'স্বর্গ-ছেঁড়া'র বৈভবপূর্ণ মধুময় কাহিনি। কিছুক্ষণের মধ্যেই লোকজন জড়ো হবে, বাসটার পেট ভরে উঠবে স্বপ্নবাজ স্বর্গপ্রত্যাশী মানুষে। যাত্রীরা দাঁড়াবে ঠাসাঠাসি করে। বেলা দ্বিপ্রহরে একজন সফেদ সাদা বৃদ্ধ ড্রাইভার নির্বিকার সন্না্যসীর মতো চাবি ঘুরিয়ে ধীরে ধীরে বাস ছাড়বে 'স্বর্গ-ছেঁড়া'র উদ্দেশে।
লেখক, কথাসাহিত্যিক

মন্তব্য করুন