যতীন সরকার রচিত 'পাকিস্তানের জন্মমৃত্যু-দর্শন' বাঙালির অসাম্প্রদায়িক ইতিহাসের অনন্য দলিল। 'আত্মসূত্র' অংশে ওই গ্রন্থ থেকে নির্বাচিত অংশ পত্রস্থ হলো...
উনিশশো সাতান্ন-আটান্নর দিকে হেকিম ভাইয়ের সঙ্গে আলোচনায় আমার ধারণা জন্মেছিল যে, চল্লিশের দশকের একেবারে গোড়া থেকেই এ দেশের গ্রাম এলাকার মুসলমানের মধ্যে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভাবনা আস্তে আস্তে ছড়াতে থাকে। এরপর ছেচল্লিশ সালের সাধারণ নির্বাচনে মুসলমানদের জন্য নির্ধারিত আসনে মুসলিম লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়, সে বছরেই আগস্ট মাসে মুসলিম লীগের 'প্রত্যক্ষ সংগ্রাম'-এর ঘোষণা এবং তারই অনিবার্য পরিণতিতে কলকাতা-বিহার-নোয়াখালীর হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা- এই কয়েকটি ঘটনার প্রভাব এমন সর্বব্যাপী হয়ে পড়ে যে, তখন আর হিন্দু-মুসলমানকে এক ভাবার কোনো সুযোগই যেন অবশিষ্ট থাকে না।
তখন আরবি নামধারী মানুষরা একদিকে, অন্যদিকে সংস্কৃতি নামধারীরা। অর্থাৎ মুসলমান আর হিন্দু যেন দুটি সমান্তরাল রেললাইন। পাশাপাশি আছে কিন্তু মেশামেশি হওয়ার কোনোই সম্ভাবনা নেই। আবার সমান্তরাল রেললাইনের উপমাকেও বেশিদূর পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়া চলে না। কারণ রেলের দুটি লাইন তো পরস্পরের পরিপূরক, দুটোতে না মিললেও রেলগাড়িটিকে তারাই মেলায়। হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে কিন্তু এমনটি হওয়ারও কোনো উপায় নেই। তারা মিলবেও না, মেলাবেও না। সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে তাদের থাকতে হবে। ধুতি-লুঙ্গি দ্বন্দ্বের কোনো মীমাংসা নেই। জল আর পানি দুটো আলাদা জিনিস, স্নান আর গোসল সম্পূর্ণ পৃথক দুটো কর্ম! মাংস আর গোশত, ডিম আর আন্ডা কখনো এক হতে পারে না।
দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রবক্তা অনেক লেখকই সমান্তরাল রেললাইনের উপমা দিয়ে এদেশের হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ককে বোঝাতে চেয়েছেন। কলকাতায় 'পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি'র প্রধান সংগঠকরূপে আবুল মনসুর আহমদই বোধহয় সর্বপ্রথম এই উপমাটি ব্যবহার করেছিলেন। এরপর থেকেই এটি বহুদিন ধরে ক্রমাগত ব্যবহূত হয়ে এসেছে।
উনিশশো ছেচল্লিশের অনেক কথাই তো আমার বেশ স্পষ্ট মনে আছে। সে সময়ে ধুতি-লুঙ্গি দ্বন্দ্ব সমাস এমন স্পষ্ট রূপ ধরেছে যে, 'মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান'- জাতীয় কথাগুলো নিছক পরিহারের মতো শোনায়। অথচ সে সময়েই নজরুলের এ গানটি গাঁয়ে-গঞ্জে প্রচুর প্রচার পেয়েছে। সে-সময়েই আমাদের গ্রাম এলাকার অনেক সচ্ছল মানুষের বাড়িতে কলেরগানের প্রবেশ ঘটে গেছে। গ্রামোফোনকেই গাঁয়ের মানুষ বলতো কলের গান। কলের গানই আব্বাসউদ্দীন আর শচীনদেব বর্মনকে সকল গাঁয়ের মানুষের আপনজন করে তুলেছে। কলেরগান গুনেই গায়ের যুবক-কিশোররা নিজেদের কণ্ঠে তুলে নিয়েছে 'ওই মালতীলতা দোলে...'। এ গানটিকে সবাই বলতো আধুনিক গান। এটি যে রবীন্দ্রসংগীত, সে-কথা আমি জেনেছি অনেক বছর পরে। কলেরগানই গাঁয়ের মানুষকে রবীন্দ্রনাথের গান, নজরুল ইসলামের গান আর আধুনিক গানের সঙ্গে পরিচয়ের নিবিড়তা এনে দিয়েছে। পল্লীর বাউল-মারফতি-ভাটিয়ালি-ভাওয়াইয়ার মতো এসব গানও তত দ্বিজাতিতত্ত্বের কথা বলে না। পরীর গানের মতো এসব গানও বাঙালির সেক্যুলার ঐতিহ্যেরই ধারক। তবু কী আশ্চর্য, চল্লিশের দশকে কলেরগানের মারফত গাঁয়ের ঘরে ঘরে সেক্যুলার বাঙালি সংস্কৃতির বাণী ও সুরের ব্যাপক প্রচার ঘটলেও এ-সময়েই কিনা গেঁয়ো আর শহুরে নির্বিশেষে প্রায় সকল বাঙালিই হয়ে গেল কমবেশি কম্যুনাল। কম্যুনিটিই তার কাছে হয়ে গেল নেশন, কম্যুনালিজমকেই সে গ্রহণ করল ন্যাশনালিজমের বেনামিতে।
কলেরগানেই আমরা প্রথম শুনি শচীন সেনগুপ্তের 'সিরাজউদ্দৌলা' নাটকের রেকর্ড। সেই নাটক শুনে আমাদের সে কী উত্তেজনা! পথে ঘাটে মাঠে আমরা সিরাজউদ্দোলা, মোহনলাল, গোলাম হোসেন, লুৎফা আর আলেয়ার সংলাপ আওড়াই। এ সময়ে সিরাজউদ্দৌলা নাটকের বইটিও গাঁয়ের মানুষের হাতে এসে যায়। এ-পাড়া ও-পাড়ায় স্টেজ বেঁধে শুরু হয়ে যায় সিরাজউদ্দৌলার অভিনয়। কিন্তু 'বাংলা শুধু হিন্দুর নয়, বাংলা শুধু মুসলমানের নয়, বাংলা হিন্দু-মুসলমানের মিলিত গুলবাগ'- সিরাজের এই সংলাপ শুনে যতই হাততালি দিই, বাস্তবে কি এ-কথা আমরা বিশ্বাস করেছি? করিনি যে, তার প্রমাণ তো আমরা আমাদের সব কাজেকর্মেই রেখেছি। হেকিম ভাইয়ের পরিচালনাতেও তার বাড়ির গোলঘরে বেশ কয়েকবার 'সিরাজউদ্দৌলা' মঞ্চায়ন হয়েছে, তিনি নিজেই সিরাজের ভূমিকায় মঞ্চাবতরণ করেছেন। অথচ, অন্তত চল্লিশের দশকে বাংলাকে তিনি হিন্দু-মুসলমান মিলিত গুলবাগ বলে মনে করতেন না। কিন্তু তার রক্তে ছিল হিন্দু-মুসলমানের মিলিত সংস্কৃতিরই ঐতিহ্য। যে বাউল পিতার সৃষ্টিসম্ভারের প্রতি ছিল তার অসীম শ্রদ্ধা, সেই জালাল উদ্দিন খাঁর 'জাতে জাতে যার তার মতে, গেছে ধর্ম বিভাগ করে' কিংবা 'বিচার করলে নাইরে বিভেদ কে হিন্দু কে মুসলমান'- এসব বাণীতেও তো পুত্র খান মোহাম্মদ আবদুল হাকিম আস্থা হারাতে পারেন না। তাবে আস্থা না হারালেও সে আস্থার সূর্যকে যে সে-সময়ে দ্বিজাতিতত্ত্বের রাহু এসে গ্রাস করেছিলো, সে-কথাও একান্ত সত্য। অবস্থাটা এমন দাঁড়িয়েছিল যে, সাম্প্রদায়িক সমস্যার চরম অবনতি দেখে, অনেক উদার অসাম্প্রদায়িক মানুষও সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে দেশবিভাগকেই শেষ সমাধান বলে ধরে নিয়েছিলেন। গরু কোরবানি আর মসজিদের সামনে বাজনা বাজানো নিয়ে হিন্দু-মুসলমানী কাণ্ড-কারখানা অনেক দিন ধরে চলতে থাকায় এমনিতেই শান্তিপ্রিয় মানুষরা ত্যক্তবিরক্ত হয়ে গিয়েছিল। এরপর ছেচল্লিশের দাঙ্গায় তাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে বিশ্বাস একেবারে ধসে পড়ল। এভাবে একত্রে থেকে খেয়োখেয়ি করার চেয়ে হিন্দু-মুসলমান পৃথক হয়ে যাওয়াই যে ভালো সে-কথাই বলেছিলেন সুফী জুলফিকার হায়দার নামক এক কবি-

'বহুদিন ধরে হিন্দু ও মুসলমান এ দুই মহাজাতে
একে অন্যের প্রতি দিনের পর দিন, বহু নির্মম
আঘাতে আঘাতে
ভেঙেই গেছে যখন হৃদয়ে হৃদ্যতার মন্দির মসজিদ
তবে কেন আর মিথ্যা ছলনা অথবা কাস্তেয় শান
দেয়া।
এভাবেই, চল্লিশের দশকেই, দ্বিজাতিতত্ত্ব পৌছে গেলো চূড়ান্ত পরিণতিতে।
তাই বলে এমন মনে করারও কোনো কারণ নেই যে, দ্বিজাতিতত্ত্বের ধারণাটি চল্লিশের দশকে জন্ম নিয়ে সে দশকেই গায়ে-গতরে বেড়ে ওঠে এবং হঠাৎ করে প্রলয়কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলে। হ্যাঁ, দ্বিজাতিতত্ত্বের চূড়ান্ত পরিণতি চল্লিশের দশকেই ঘটেছিল বটে, কিন্তু ধারণা রূপে এর বয়স নিতান্ত কম নয়। উনিশ শতকেই এর জন্ম হয়েছে, আর এর জন্মদাতা স্যার সৈয়দ আহমদ- দলিল দস্তাবেজ ঘেঁটে এমন কথাও তো বলেছেন অনেকে।
তবে যে যাই বলুন, দ্বিজাতিতত্ত্বই হোক আর একজাতিতত্ত্বই হোক, 'জাতি' বস্তুটার জন্ম এদেশে হয়ইনি। 'জাতি' বলতে আমি ইংরেজি 'নেশন'-এর কথা বলছি। 'নেশন'-এর তর্জমা আমরা জাতি শব্দটি দিয়ে করেছি বটে, কিন্তু এ-কথাও না মেনে উপায় নেই যে, জাতি আর নেশন মোটেই এক নয়। আমাদের কাছে জাতি মানে ছিল জাত। আর এই 'জাত' হতে পারে 'কাস্ট'-এর প্রতিশব্দ। যখন 'নেশন'-এর তর্জমা 'জাতি' দিয়ে করলাম, তখনো আমাদের মগজের কোষে কোষে কাজ করেছে 'কাস্ট'-এরই ধারণা। কারণ 'নেশন' তো আমাদের দেশে কোনোদিনই ছিল না। এর জন্ম ষোড়শ শতকের ইউরোপে। আমাদের দেশে নেশন কিংবা নেশনের ধারণা গড়ে ওঠার মতো কোনো পরিবেশ ষোড়শ শতকে তো ছিলই না, এমনকি উনিশ শতকেও তেমন পরিবেশ পুরোপুরি সৃষ্টি হতে পারেনি। রোমান চার্চ-বিরোধী ধর্মসংস্কার আন্দোলন আর ধনতন্ত্রের উদ্ভবের সঙ্গে নেশনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। ঘোড়শ শতক থেকে শুরু করে উনিশ শতক পর্যন্ত বিস্তৃত সময়ের ভেতর ইউরোপে নেশন ও নেশন স্টেটগুলো গড়ে ওঠে।