ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

মুক্তিযুদ্ধের দলিল থেকে

মুক্তিযুদ্ধ

মুক্তিযুদ্ধের দলিল থেকে

ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৩ | ১২:৫৩ | আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০২৩ | ১২:৫৩

ইতিমধ্যে আমরা অনেক ভেবেছি। পাক বাহিনীর নগ্ন হামলার জবাব দিতে হবে। বাংলার দামাল যুবকদের পুনর্গঠিত করতে হবে। ২৭ শে মার্চ রায়েরবাজারের কর্মীদের কাছ থেকে আমরা বিদায় নিলাম। এই বিদায় ছিল মর্মস্পর্শী। তাজউদ্দীন ভাইকে আমি বলি, এখন পথই আমাদের ঠিকানা, পথই আমাদের সঠিক পথে পৌঁছে দেবে।

বিদায়ের সময় রায়েরবাজারের একজন কর্মী জিজ্ঞাসা করেন, আমাদের পরিবারের জন্য কিছু বলার আছে কিনা। আমরা দু’জনে দু’টুকরো কাগজ নিয়ে কিছু লিখে তাদের হাতে দিলাম। কর্মীরা পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব নিলেন। তাজউদ্দীন ভাইয়েরটা পৌঁছল, আমারটা কর্মীরা পৌঁছাতে পারেনি। শুনেছি আমার বাড়ীওয়ালী কাউকে বাড়িতে ঢুকতে দেননি। আমার খোঁজে কেউ আসলে তাকে ভয় দেখাতেন।

পরবর্তীকালে দু’জনে আলাপ করে দেখেছি, স্ত্রীর কাছে আমাদের দু’জনার লেখার মধ্যে আশ্চর্য রকমের মিল ছিল। আমাদের বক্তব্যের সারমর্ম ছিল, আমরা এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়িয়েছি। কবে এর শেষ হবে জানি না। আট কোটি মানুষের সাথে মিশে যাও। যদি বেঁচে থাকি, তাহলে দেখা হবে।

আমরা আবার যাত্রা করি। তাজউদ্দীন আহমদের পায়ে কাপড়ের জুতা। হাঁটতে তার কষ্ট হচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতে তার পায়ে ফোসকা পড়ে যায়। জুতা খুলে তিনি হাঁটতে থাকেন।

আমরা রায়েরবাজার থেকে নদী পার হয়ে নবাবগঞ্জ থানায় যাব। অগণিত লোক পার হয়ে যাচ্ছে। পার হয়ে হেঁটে চলেছি। ঢাকা থেকে ভাগ্যাহত মানুষ যাচ্ছে। চারিদিকে শুধু মানুষ আর মানুষ। পাক বাহিনীর বর্বর অত্যাচারে লোকজন ঢাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছে। মানুষের মিছিলে সর্বশ্রেণীর মানুষ রয়েছে। এই মিছিলে আমরা মিশে গেছি। কেউ জানে না। আমরা কারা। শুধু জানি আমিও ওদের একজন। চলতে চলতে এক সময় হয়তো এক বৃদ্ধার মাথার পুঁটলিও নিজের হাতে নিয়েছি। কখনো বা কোনো ছোট শিশুকে কোলে করে পার করে দিয়েছি।

আমাদের গতি দ্রুত। ক্ষুধা তৃষ্ণায় কাতর হাজার হাজার মানুষ উত্তপ্ত বালির ওপর দিয়ে চলেছে। রাস্তার দু’পাশে গ্রামের মানুষ মিছিলের মানুষকে উদার হস্তে খাওয়াচ্ছে, আশ্রয় দিচ্ছে। ডেকে ডেকে মানুষকে খাওয়াচ্ছে। আতিথেয়তার প্রতিযোগিতা ছিল প্রতিটি গৃহে। সেদিন বাংগালীর জন্য বাংগালীদের দরদ দেখেছিলাম, এতে আমি নিশ্চিন্ত হই যে বাংলার স্বাধীনতা কেউ ঠেকাতে পারবে না।

চলার পথে একজন সিপাই যুবকের সাথে কথা হলো। তার পরনে লুঙ্গি। ২৫ শে মার্চ রাতে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে ছিল। সে রাতে কীভাবে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচলো, কীভাবে তার সঙ্গী-সাথীরা পাক বাহিনীর বর্বরতার শিকার হলো, এই ভয়াবহ কাহিনী তার মুখ থেকে শুনলাম। অন্য একজন সিপাই। সে মিটফোর্ড হাসপাতালে একজন রাজবন্দীর পাহারায় ছিল। অতি কষ্টে সে জীবন নিয়ে চলে এসেছে।

কাফেলাতে শুধু জীবন্ত মানুষ নয়, এখানে রয়েছে লাশ। কয়েক দিনের পুরোনো লাশও রয়েছে। প্রিয়জনের মৃতদেহ ওরা ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ীতে নিয়ে যাচ্ছে। পথে পথে অনেক জানাজা হতে দেখলাম। ঢাকাতে যারা শহীদ হয়েছে তাদের লাশ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে।...

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার তথ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষে হাক্কানী পাবলিশার্স বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র: পঞ্চদশ খণ্ড [সাক্ষাৎকার]

প্রথম প্রকাশ : ১৯৮৫


আরও পড়ুন

×