ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

পথ আগের মতোই আছে, বর্ণিল আমরাই পাল্টে গেছি

পথ আগের মতোই আছে, বর্ণিল আমরাই পাল্টে গেছি

আলফ্রেড খোকন

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৩ | ১২:৫৬ | আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০২৩ | ১২:৫৬

একজনের টাকাভর্তি ব্রিফকেস হারিয়েছে। আরেকজনে তা পেয়ে ফেরত দিয়ে হিরো বনে গেল! গণমাধ্যম তার সততার গল্প রচনা করে টক অব দ্য টাউন অথবা টক অব দ্য মফস্বলে হিরো হয়ে গেল। কিন্তু কেন? একজনের হারানো জিনিস আরেকজন পাবে, পেয়ে ফেরত দেবে– এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের সমাজে এটা অস্বাভাবিক। আর এ কারণেই তাকে হিরো বানাতে যাই। এটা সুস্থ চর্চা নয়।

প্রকাশ্যে একজন খুন হলো। কিংবা কর্তৃপক্ষের অবহেলা বা অসচেতনতার কারণে কমলাপুরে ফ্লাইওভার থেকে রড পড়ে এক কিশোরের মৃত্যু হলো নির্মমভাবে। এরকম অসংখ্য ঘটনা আমাদের সমাজে ঘটছে। সামান্য একটি ভ্যানগাড়ি (তথাকথিত) চুরির অপরাধে এক কিশোরকে গাছে ঝুলিয়ে নির্মমভাবে পেটানো হলো, তার ভিডিও প্রকাশ করল ফেসবুকে অথচ সে প্রতিবাদ করল না। সে ভাবলই না যে ছবি তোলার চেয়ে এই কিশোরকে বেদনার মারপিট বন্ধ করা দরকার আগে। এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হলো না, আবার সঠিক বিচারও হলো না। এই বিচার না হওয়া সমাজে যারা অপরাধ করবে, তারা জেনে গেল অপরাধ করে পার পাওয়া যায়। বিচারের বাণী নিভৃতে কেঁদে ফিরে!

এই আমরাই যখন ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ভিতর দিয়ে কোনো এক বন্ধু অথবা স্বজনের বাসায় যাই– তখন কী করি, ক্যান্টনমেন্টের ভিতরে প্রবেশের সমস্ত আইনকানুন মেনেই আমরা যাই। কারণ ক্যান্টনমেন্টের ভিতরে প্রচলিত আইন অমান্য করলে শাস্তি পেতে হবে– এই ভয়ে। তার মানে এখানে আইন আছে, আইনের শাসন আছে, রয়েছে প্রয়োগও। আবার এই আমরাই ক্যান্টনমেন্টের বাইরে এসে কোনো নিয়ম মানতে চাই না। এর প্রধানতম কারণ, আইন ভঙ্গের শাসন এখানে নেই। আবার যারা আইন প্রয়োগ করবে, তাদেরও রয়েছে গাফলতি, কেউ কেউ দুর্নীতিপরায়ণ। 

এই আমরাই যখন বিদেশে যাই– ধরা যাক সিঙ্গাপুরের রাস্তায় কোনো সিগারেটের সুগার কিংবা চিপসের প্যাকেট যত্রতত্র ফেলা যায় না। ফেললেই তা অপরাধ এবং ত্বরিত শাস্তি। ফলে আমরা ওই দেশে যেয়ে আইন মেনে চলি। অথচ সিঙ্গাপুর থেকে ফিরে স্বদেশে এসেই তার উল্টোটাই করি। এর কারণ হচ্ছে, এখানে আইনের যথাযথ প্রয়োগে রয়েছে অনিয়ম। 

আমার খুব অসহায় লাগে, যখন দেখি একজন কেউ অন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ায়। আমি যুক্তিবিদ্যার ভালো ছাত্র ছিলাম। যুক্তির কাছে ন্যায়কে পরাজিত হতে দেখেছি। অন্যায়কে জিতে যেতে দেখেছি। সংস্কৃতিহীন যুক্তিবিদ্যার একটি যুক্তি এমন– মানুষ একটি প্রাণী। রবীন্দ্রনাথ একজন মানুষ, তাই সে একটি প্রাণী। রবীন্দ্রনাথের দাড়ি আছে। ছাগল একটি প্রাণী, ছাগলেরও দাড়ি আছে। অতএব রবীন্দ্রনাথ একটি ছাগল! যুক্তিবিদ্যার এই কুযুক্তিবিদ্যা যখন সমাজে উঁচু হয়ে ওঠে, তখন সে সমাজ আর এগোয় না। সে সমাজের যতই কাঠামো আর অবকাঠামো উন্নত হয়, সমাজটি আর এগোয় না। অন্ধকারে হাঁটে– কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদের ভাষায় বলি– ‘অন্ধকারে হেঁটে হেঁটে আমরা এখন কার কাছে যাব।’

অন্যায় যখন মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়, তখন ন্যায়ের কোনো পথ থাকে না। পৃথিবীটা এখন খুব সহজ– গোপন ক্যামেরা তা আরও সহজতর করেছে। কে খুন করল, কে খুনের সহযোগিতা দিল– সব জানা যায়। কিন্তু আইনের কাঠগড়ায় এখনও যুক্তি ও কুযুক্তির বিচার। 

যে আইনের ফাঁক দিয়ে একজন খুনি মাফ পায়, যে বিচারে একজন বিচারক বিচলিত হয়– যুক্তির কাছে, সেটা তো কোনো পথ হতে পারে না। অপরাধী শাস্তি পাবে। পুবে, পশ্চিমে, উত্তরে, দক্ষিণে কিংবা নৈর্ঋতে। কিন্তু যখন পায় না, সে রাষ্ট্রে মানুষ আস্থা হারায়। মৌসুমী ভৌমিকের গানের কথার মতো– “আস্থা হারানো এই মন নিয়ে আমি আজ তোমাদের কাছে এসে দু’হাত পেতেছি।” প্রকাশ্য দিবালোকে যে একটি প্রাণ সংহার করল, তার জন্য কেন এত জেরা! কেন এত ওকালতি! কেন এত কাঠগড়া! কেন এত যুক্তি-তর্ক-গল্প!


অপরাধ সমাজে থাকবে। অপরাধ কোনো দিনই সম্পূর্ণ নির্মূল হবে না। অপরাধের যথাযথ শাস্তি যদি অপরাধী পায়, এরকম দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করা যায়, তবে অপরাধ কমবে। দশটি অপরাধের দুটির বিচার হলো, আটটি চাপা পড়ে রইল– এমন হলে তো একটা সমাজে সব রকমের অপরাধ বেড়েই যাবে। সেখানে যতই অবকাঠামোগত কিংবা যোগাযোগের নতুন নতুন সম্ভাবনার উদ্বোধন হোক না কেন– সে উন্নয়ন ঢাকা পড়ে যাবে। 

যখন কোনো সমাজে ক্রমশ নিচু জীবন চর্চা, স্থূল যাপন চর্চা, বিকারগ্রস্ত জীবন চর্চা, বেঁটে মন চর্চার দাপট বাড়তে থাকে, তখন সে সমাজে উন্নত জীবনবোধ, উঁচু জীবনের গান, সুস্থ মনন চর্চার সংস্কৃতির সব দরজা-জানালা বন্ধ হয়ে যায়। নব্বই দশকের পর থেকে আমাদের সমাজে নিচু জীবনবোধের চর্চা এতটাই বেড়েছে যে আমরা এখন নিচুকে উঁচু বলতে শিখেছি। মিথ্যেকে সত্য বলে জানতে শুরু করেছি। আমরা এখন অপরাধীকে ভয় করতে শিখে গেছি। কপট, লোভীকে দাওয়াত করছি। সৎ ও নির্লোভীকে অপাঙ্‌ক্তেয় ঘোষণা করছি! এখন একটা কথা বেশ চলছে– যে নিজে খেতে পারে, সে অন্যকেও খাওয়াতে পারে। এ কথার মানে হচ্ছে, যে নিজে ঘুষ খায়, সে অন্যকেও ঘুষ দেয়! আর যে নিজে খেতে পারে না (মানে ঘুষ) সে অন্যকে কীভাবে খাওয়াবে! সংস্কৃতিটা পুরোই উল্টোভাবে পাল্টে গেছে! অগ্রজ কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামানের সংস্কৃতির ভাঙা সেতুটি এখন শুধু ভেঙেই যাই যায়নি, বিলীন হয়েছে।

একটা সময়ে আমরা আমাদের বিবাহের সংস্কৃতিতে বিসমিল্লাহ খানের সানাই বাজাতাম। একটা মেয়ে নিজের ঘর ছেড়ে অন্যের অচেনা ঘরে যাচ্ছে– এই বিরহের সুর বিসমিল্লাহ খানের চেয়ে আর কেউ নিরঙ্কুশভাবে ধরতে পারেনি বলেই আমরা তাঁর সানাই পরিবেশন করতাম। আজ এই বিবাহে আমরা ডিজে নৃত্য আর উদ্ভট চিৎকার সংযোজন করেছি। পাশের বাড়িতে অসুস্থ বাবা অথবা মায়ের কথা মনে রাখছি না! এই শব্দসন্ত্রাসের কারণে অন্যের যে অসুবিধে হচ্ছে, তার কোনো গুরুত্বই আমাদের কাছে থাকছে না। 

সংস্কৃতি যখন ভেঙে পড়ে, তখন একটা সমাজও ভেঙে পড়তে থাকে। প্রথমে তা বোঝা যায় না। যখন বোঝা যায় তখন আর উদ্ধারের পথ থাকে না। আমি যখন কোনো বিবাহ উৎসবে যাই, এখনও হয় জীবনানন্দ দাশ অথবা রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি কিংবা তপন রায় চৌধুরীর রোমন্থন অথবা ভীমরতিপ্রাপ্তর পরচরিতচর্চা, কখনও সৈয়দ মুজতবা আলীর দেশে বিদেশে উপহার নিয়ে যাই। কিন্তু আমার উপহার দেখে যারা অভ্যর্থনা টেবিলে বসে উপহারকারীদের তালিকা নিরূপণ করেন, তারা আমাকে দাঁড় করিয়ে রাখেন, একটি সোনার আংটি অথবা কয়েক হাজার টাকার খাম যখন এগিয়ে আসে! ওদের কাছে একটি বইয়ের চেয়ে একটি খাদভর্তি সোনার আংটি অথবা কিছু নগদ অর্থ এতই মূল্যবান যে পৃথিবীর যে কোনো গ্রন্থ সেখানে পরাজিত হয়। এমনকি কোরান-গীতা-বাইবেল-ত্রিপিটকও!   

একসময় ছিল কোনো আমন্ত্রণে যেয়ে আমন্ত্রিত ব্যক্তি পেছনের সারিতে বসত। কারণ সে জানত, যদি সে সামনের সারিতে বসার লোকটি হয়, তবে আমন্ত্রণকারী তাকে সামনে নিয়ে আসবে। আর এখন হচ্ছে, অনামন্ত্রিতরাই সামনে যেয়ে বসে থাকবে, আমন্ত্রিতর কোনো গল্প নেই। 

সংস্কৃতি ভেঙে পড়লে, আইনের সংস্কৃতিও ভেঙে যায়। তবুও বলি, আইন আছে। আইনের পথ আছে, পথের বাঁক আছে। বাঁকের মধ্যে মোড় আছে, কারচুপি আছে। যুক্তি আছে, কুযুক্তি আছে। নেই তার নিজস্ব আবেগ, আবেগটাই সংস্কৃতি। আবেগের লাগবে প্রয়োগ। তাহলে বহু পথ, বর্ণিলভাবে মিলবে, মেলাবে মানবযাত্রার মনোরথ। এটাই আমার এই লেখার আসল কসরত। এরপর যত কথাই বলব, কথা আসলে একটাই– সংস্কৃতির লালন আর আইনের শাসনের যথাযথ প্রয়োগ: যেটা আমাদের এখানে ক্রমশ লুপ্তপ্রায়। 

মৌসুমী ভৌমিকের গানের কথায় আবারও ফিরে যাই, ওই যে আস্থা হারানো মন। আস্থা তখনই হারায় মানুষ, যখন দেখে তোমরা ডিজে পার্টি করছো, ওই দিকে শব্দসন্ত্রাসের কারণে একজন মুমূর্ষু মা আরও আক্রান্ত হচ্ছে। তোমরা আইন বানাচ্ছো, কিন্তু নেই তার প্রয়োগ। আস্থা হারিয়ে গেলে সবকিছু সস্তা হয়ে যায়। সস্তা বিকোয়, দুর্মূল্য বিকোয় না। 

আমরা আবার ফিরব। ফিরতেই হবে। 

লেখক: কবি

আরও পড়ুন

×