ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান

গণআন্দোলন

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৩ | ১৩:০১ | আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০২৩ | ১৩:০১

গণঅভ্যুত্থান দিবস হলো বাংলাদেশে ২৪ জানুয়ারি উদযাপিত একটি জাতীয় দিবস। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফা, পরবর্তী সময় ১১ দফা ও ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় রক্তাক্ত সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালি জাতি মহান স্বাধীনতা অর্জন করে। সেই থেকে ২৪ জানুয়ারি বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থান দিবস হিসেবে পালিত হয়। পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে স্বায়ত্তশাসনের লক্ষ্যে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণে এই দিবসটি পালন করা হয়। লেখক কাওসার রহমানের মতে, বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠন ও স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনকে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

২০ জানুয়ারি ছাত্রনেতা আসাদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে গণআন্দোলনের সূচনা হয়। তার তিন দিন পর ২৪ জানুয়ারি পুলিশ গুলি করে মতিউর, মকবুল, রুস্তম ও আলমগীরকে। এই চারজনকে হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ রাজপথে নেমে আসে। বিশেষ করে মৃত্যুর আগে মাকে লেখা নবম শ্রেণির ছাত্র কিশোর মতিউরের হৃদয়বিদারক চিঠি আন্দোলনমুখী মানুষকে আরও ক্রুদ্ধ করে তোলে। মতিউরদের মৃত্যুর পর গণআন্দোলন তখন রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এই গণআন্দোলন। ছাত্র-জনতার সঙ্গে যোগ দেন নানা পেশার মানুষ। মারমুখী ছাত্র-জনতাকে দমন করতে পুলিশ ও ইপিআর আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির মধ্যে ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহা নিহত হন। প্রগতিশীল শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহার মৃত্যুতে ২০ ফেব্রুয়ারি ক্রুদ্ধ ও ভাবাবেগে আপ্লুত হাজার হাজার ছাত্র-জনতা সান্ধ্য আইন উপেক্ষা করে ঢাকার রাজপথে নেমে আসে এবং মশাল মিছিল করে।

জনতার কঠিন রুদ্ররোষ এবং গণঅভ্যুত্থানের জোয়ারে স্বৈরাচার আইয়ুব সরকার তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান অভিযুক্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবসহ সবাইকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ফলে আইয়ুব খানের স্বৈরতন্ত্রের পতন হয়। ঊনসত্তরের একুশে ফেব্রুয়ারি স্বৈরাচারবিরোধিতায় নতুন মাত্রা যোগ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে অধ্যাপক আবদুল হাইয়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় ‘ভাষাভিত্তিক জাতীয়তার সংগ্রাম’ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে দৃঢ় অভিমত ব্যক্ত করা হয়। গণঅভ্যুত্থানের প্রবল চাপে আইয়ুব খান ঘোষণা করেন, পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না। একই দিন শেখ মুজিবসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অভিযুক্তরা এবং নিরাপত্তা আইনে আটক ৩৪ জন নেতা মুক্তি পান। গণতন্ত্রের দাবিতে স্বৈরশাসনবিরোধী এ সংগ্রামে গ্রামগঞ্জের খেটে খাওয়া মানুষ  তখন শুধু সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উচ্চারণ করেই থেমে থাকেনি, বরং স্ব স্ব ক্ষমতাবলয়ে অধিষ্ঠিত শোষক শ্রেণি বা তাদের প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধেও সোচ্চার হয়ে ওঠে। অবস্থা এমন দাঁড়ায়, বহু স্থানে কৃষকরা ছাত্রদের সহযোগিতায় বিভিন্ন ধরনের অপরাধীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

বহু স্থানে ছাত্ররা কৃষকদের সহযোগিতায় নায়েব, তহশিলদার, পুলিশ, দারোগা, সার্কেল অফিসারদের বিচার করে গলায় জুতার মালা পরিয়ে ঘুরিয়েছে।
শামসুর রাহমানের ‘আসাদের শার্ট’ লেখা হয়েছিল ঊনসত্তরের ওই ঐতিহাসিক মুহূর্তের ভেতর। তিনি লেখেন– ‘ডালিম গাছের মৃদু ছায়া আর রোদ্দুর-শোভিত/ মায়ের উঠোন ছেড়ে এখন সে-শার্ট/ শহরের প্রধান সড়কে/ কারখানার চিমনি-চূড়োয়/ গমগমে এভেন্যুর আনাচে-কানাচে/ উড়ছে, উড়ছে অবিরাম/ আমাদের হৃদয়ের রৌদ্র-ঝলসিত প্রতিধ্বনিময় মাঠে,/ চৈতন্যের প্রতিটি মোর্চায়। /আমাদের দুর্বলতা, ভীরুতা কলুষ আর লজ্জা/ সমস্ত দিয়েছে ঢেকে একখণ্ড বস্ত্র মানবিক;/ আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা। আল মাহমুদ লিখলেন ছড়া– ‘ট্রাক! ট্রাক! ট্রাক!/ ট্রাকের মুখে আগুন দিতে মতিয়ুরকে ডাক।’

আসাদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের যাত্রা শুরু হয়েছিল। মতিউরদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সেই গণঅভ্যুত্থান পূর্ণতা লাভ করে। আর সার্জেন্ট জহুরুল হক ও ড. শামসুজ্জোহার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সেই গণঅভ্যুত্থানের সমাপ্তি ঘটে। এই আন্দোলন শুধু ছাত্র বা রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, একপর্যায়ে কৃষকদের মধ্যে, শ্রমিকদের মধ্যে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল বলেই তা হয়ে উঠেছিল গণঅভ্যুত্থান। 

আরও পড়ুন

×