ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

ভাষা আন্দোলন

গণআন্দোলন

ভাষা আন্দোলন

অধ্যাপক রাজীব নন্দী

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৩ | ১৩:০৫ | আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০২৩ | ১৩:০৬

সমকালের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বিশেষ আয়োজন ‘সম্ভাবনা’য় দুই পর্বে গণআন্দোলন নিয়ে লিখেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রাজীব নন্দী ও তাঁর গবেষণা সহকারী, একই বিভাগের শিক্ষার্থী মো. মাসুদ ও এমাদুল হাসান

পাঁচ বছর আগে যে অঞ্চলে স্লোগান উঠেছিল ধর্মের ভিত্তিতে দেশ চাই, সেই অঞ্চলে ফের স্লোগান উঠল– ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। ১৯৪৭ থেকে ৫২; ইতিহাসের এক ঘূর্ণিবার্তা যেন। সাতচল্লিশে দেশভাগের পরেই যখন বাঙালির ভাষার ওপর আঘাত এলো, তখন বুকের রক্ত ঢেলে লেখা হলো এক নতুন ইতিহাস। ভাষা আন্দোলনের সেই লড়াই থেকে সঞ্চিত শক্তিই পরবর্তীকালে জুগিয়েছে গণঅভ্যুত্থানের প্রেরণা।

‘ভাষা আন্দোলন নিছক সাংস্কৃতিক আন্দোলন নয়’ শিরোনামে এক নিবন্ধে সাংবাদিক জয়ন্ত ঘোষাল লিখেছেন– ১৯৫১-তে পাকিস্তানে প্রথম যে আদমশুমারি হয় তাতে দেখা যায়, মোট জনসংখ্যার ৫৪.৬ শতাংশ মানুষ বাংলায় কথা বলেন। উর্দুতে কথা বলেন ৭.১ শতাংশ। পাঞ্জাবি ভাষাভাষীর সংখ্যা ২৮.০৪ শতাংশ। ৫.৮ শতাংশ হিন্দি। পশতু ৭.১ শতাংশ। আর বাকি ১.৮ শতাংশ ইংরেজি ও অন্য ভাষাভাষীর নাগরিক ছিলেন। সবার মিলিত হিসাব ১০৪.৫৪ শতাংশ। অনেকে নিজেদের দ্বিভাষী হিসেবে পরিচয় দেওয়ায় পরিসংখ্যান একশ ছাড়িয়ে যায়। এর মধ্যে পাকিস্তানের রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, আমলা তথা প্রভাবশালীদের বড় অংশ ছিল উত্তর ভারত থেকে আসা উর্দুভাষী নাগরিক। ভাষাসংক্রান্ত এই দাবিকে সামনে রেখে সর্বপ্রথম আন্দোলন সংগঠিত করে তমদ্দুন মজলিস। এর নেতৃত্বে ছিলেন অধ্যাপক আবুল কাসেম। ক্রমান্বয়ে অনেক অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল সংগঠন এই আন্দোলনে যোগ দেয় এবং একসময় তা গণআন্দোলনে রূপ নেয়। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ একটি স্মরণীয় দিন।

গণপরিষদের ভাষাতালিকা থেকে বাংলাকে বাদ দেওয়া ছাড়াও পাকিস্তানের মুদ্রা ও ডাকটিকিটে বাংলা ব্যবহার না করা এবং নৌবাহিনীতে নিয়োগের পরীক্ষা থেকে বাংলাকে বাদ দিয়ে উর্দুকে রাখার প্রতিবাদস্বরূপ ওইদিন ঢাকা শহরে সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। ধর্মঘটীদের দাবি ছিল বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা এবং পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা করা। ধর্মঘটের পক্ষে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ এই স্লোগানসহ মিছিল করার সময় শওকত আলী, কাজী গোলাম মাহবুব, শামসুল হক, অলি আহাদ, শেখ মুজিবুর রহমান, আবদুল ওয়াহেদ প্রমুখ গ্রেপ্তার হন। আব্দুল মতিন, আবদুল মালেক উকিল প্রমুখ ছাত্রনেতাও ওই মিছিলে অংশ নেন; বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বিরাট সভা হয়। একজন পুলিশের কাছ থেকে রাইফেল ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের আঘাতে মোহাম্মদ তোয়াহা গুরুতর আহত হন এবং তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে ১২-১৫ মার্চ ধর্মঘট পালিত হয়।

১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পূর্ব পাকিস্তান সফরে আসেন। তিনি ঢাকার দুটি সভায় বক্তৃতা দেন এবং দুই জায়গাতেই তিনি বাংলা ভাষার দাবিকে উপেক্ষা করে একমাত্র উর্দুকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা দেন। এ সময় সারা পূর্ব পাকিস্তানে ভাষা আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল। জিন্নাহর বক্তব্য তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়ে। ১৯৫০ সালের ১১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। এর আহ্বায়ক ছিলেন আবদুল মতিন। ১৯৫২ সালের শুরু থেকে ভাষা আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ মোড় নিতে থাকে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন দেখলেন– রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হওয়ার সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থারও অবনতি ঘটে। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ মুসলিম লীগের প্রতি আস্থা হারাতে থাকে। ১৯৪৯ সালে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত হয় নতুন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ। পূর্ব পাকিস্তানে বঞ্চনা ও শোষণের অনুভূতি ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে এবং এখানকার জনগণ ক্রমেই এই মতে বিশ্বাসী হতে শুরু করে যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের জায়গায় তাদের ওপরে আরোপিত হয়েছে নতুন ধরনের আরেক উপনিবেশবাদ। এ পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন একটি নতুন মাত্রা পায়। 

আরও পড়ুন

×