বৈশ্বিক মহামারি করোনা সংক্রমণের শুরু থেকে ক্ষুদ্র ও অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ব্যবসা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে পারেননি। এ সময়ের মধ্যে তিনটি ঈদ, দুটি পহেলা বৈশাখ ও একটি দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২০২০ সালের ঈদুল ফিতরের আগে ব্যবসায়ীরা মাত্র ১০ দিন দোকান খোলা রাখতে পেরেছিলেন। ২০২১ সালে ঈদুল ফিতরের আগে প্রধানমন্ত্রীর সহানুভূতিতে ১৭ দিন দোকান খোলা রেখে ব্যবসা পরিচালনা করার সুযোগ পেয়েছেন। এ জন্য বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি প্রধানমন্ত্রীকে কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানায়। তার হস্তক্ষেপ ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের কারণে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে ক্ষুদ্র ও অতি ক্ষুদ্র শ্রেণির ব্যবসায়ীরা পরিবার-পরিজন নিয়ে কোনোভাবে টিকে আছেন। কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্যে এই দীর্ঘ মন্দার কারণে ব্যবসায়ীরা প্রায় ৬০ শতাংশ পুঁজি হারিয়ে ফেলেছেন।
করোনাকালে মানুষের আয়-রোজগার কমেছে। কেউবা চাকরি হারিয়েছেন, কেউ হারিয়েছেন ব্যবসা। এমন একটি অবস্থায় মানুষ যখন জোড়াতালি দিয়ে দিন কাটাচ্ছে, তখন নতুন করে মানুষের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে খুচরা পর্যায়ে ৫ শতাংশ ভ্যাট।
ভ্যাট আরোপিত পণ্য ক্রেতা যখনই কিনছেন, তখন তিনি ভ্যাটসহই কিনছেন। এখন প্রশ্ন, এনবিআর কীভাবে ভ্যাট সংগ্রহ করে। প্রথমেই উৎসে আমদানি বা উৎপাদন পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট + ৫ শতাংশ এটি পাইকারি বিক্রয়ের সময় ৩৫ শতাংশ লভ্যাংশ ধরে আবার উৎসে ৫ শতাংশ ভ্যাট নেওয়া হয়। পাইকারি ব্যবসায়ী যখন খুচরা ব্যবাসায়ীর কাছে বিক্রি করেন, তখন আবার ৫ শতাংশ ভ্যাট যুক্ত করেন। এবার আসি একজন খুচরা ব্যবসায়ীর কাছে পণ্যটি পৌঁছার আগেই চার স্তরে ভ্যাট আদায় হয়ে যায়। এর সবই ব্যবসায়ীরা দিচ্ছেন, যা পরে ক্রেতার কাছ থেকে তুলে নেওয়া হয়। যদিও বিভিন্ন পর্যায়ে ভ্যাট সমন্বয়ের সুযোগ আছে। ধরে নিই, আমদানি ও উৎপাদন পর্যায়ে পণ্যটির দাম ছিল ১০০ টাকা। শুল্ক্ক, আয়কর ও ভ্যাট পরিশোধের পর পণ্যটির দাম ১৭০ টাকায় ক্রেতা কিনে নিয়েছেন। ক্রেতা কিন্তু জানেন না পণ্যটি কেনা কত, শুল্ক্ক কত, আয়কর কত ও ভ্যাট কত?
খুচরা পর্যায়ে ক্রেতা যখন পণ্যটি ক্রয় করবেন, তখন যদি ১৭০ টাকার ওপর ৫ শতাংশ অথবা ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অথবা ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রদান করেন ক্রেতা, কিন্তু এবার বুঝবেন যে তিনি ভ্যাট দিয়েছেন। বর্তমান ২০১২ সালের নতুন ভ্যাট আইনটি প্রযুক্তিনির্ভর। সেই কারণে বলা হয়েছে, খুচরা পর্যায়ে দোকান ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন করে বাধ্যতামূলক রেজিস্ট্রেশন নিতে হবে এবং মাস শেষে রিটার্ন সাবমিট করতে হবে। রিটার্ন সাবমিট না করলে ১০ হাজার টাকা জরিমানা। রেজিস্ট্রেশনের পর খুচরা পর্যায়ে ইএফডি মেশিনের মাধ্যমে ক্রেতার কাছ থেকে খুচরা পর্যায়ে ভ্যাট আদায় করতে হবে। এই ইএফডি মেশিন সরবরাহ করবে এনবিআর। দুঃখজনক হলেও সত্য, এনবিআর না জানিয়ে অথবা জোরজবর দস্তি করে রেজিস্ট্রেশন করিয়ে নিচ্ছে। যার বিপরীতে গত দুই বছরে ১ শতাংশ ইএফডি মেশিনও বসাতে পারেনি। এনবিআর যদি ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ দোকানে এই মেশিন বসাতে পারত তাহলে ক্রেতাসাধারণের কাছ থেকে ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আদায় করা সহজ হতো।
নতুন ভ্যাট আইন ২০১২ কার্যকর হয়েছে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে অনুমোদনের মাধ্যমে। এর আগে এ আইনটি কার্যকর করার অনেকবার চেষ্ট করা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে আইনটি বাস্তবায়ন করা হয়নি। তিনি বলেছিলেন, এ আইনটি বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ব্যবসাবান্ধব এবং সহজীকরণ করে যেন বাস্তবায়ন করা হয়। সে অনুযায়ী ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে আইনটি কার্যকর করার সময় অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, আইনটি কার্যকর করার পর কোনো অসংগতি ধরা পড়লে সেটি চিহ্নিত করে আমরা ব্যবসাবান্ধব করে দেব। বলা হয়েছিল, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে ভ্যাট সংগ্রহে প্রতিষ্ঠান ও দোকানগুলোয় ইএফডি মেশিন স্থাপন করা হবে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কোনো সক্ষমতার স্বাক্ষর রাখতে পারেনি। একটি মার্কেটে ৫০০ দোকান থাকলে সেখানে ২০-২৫টি দোকানে ইএফডি মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। এতে পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে দোকানদারদের মধ্যে এক ধরনের মূল্য ব্যবধান ও অসমতা সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে ইএফডি মেশিনবিহীন দোকান থেকে ভ্যাট সংগ্রহে রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তা ও দোকানিদের মধ্যে এক ধরনের বোঝাপড়ার মাধ্যমে ভ্যাট সংগ্রহ করা হচ্ছে। সেখানে অনেক অর্থনৈতিক অনিয়ম সংঘটিত হচ্ছে, যা সরকার ও ব্যবসায়ী কারও জন্যই কল্যাণকর নয়।
পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে ৬০ থেকে ৭৫ কোটি টাকার ওপরে কখনোই ভ্যাট আদায় হয়নি। তাই খুচরা পর্যায়ে ৫ শতাংশ আদায় করলেই যে অনেক ভ্যাট আসবে, তা বলা যাবে না। অতীতের তথ্যপ্রমাণ তা-ই বলে। বরং এতে সরকারের জনপ্রিয়তায় ঘটতি দেখা দেবে। পাশাপাশি এনবিআর বছরে ৭৫ থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকা ভ্যাট আদায় করে, যা সমুদ্রের মাঝে এক ফোঁটা পানির সমান। আমরা মনে করি, ক্ষুদ্র ও অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও ক্রেতাসাধারণকে খুচরা পর্যায়ে ৫ শতাংশ ভ্যাটমুক্ত রাখার জন্য এই মহামারিকালে ২০২১-২২ অর্থবছর সময়ে খুচরা পর্যায়ে ৫ শতাংশ আরোপিত ভ্যাট উৎসে আদায় করলে সরকার বর্তমানের চেয়ে তিন-চার গুণ ভ্যাট আদায় করতে পারবে। এতে ক্রেতাও বুঝবেন না, তিনি ভ্যাট দিয়েছেন। বরং এই করোনাকালে সবাই ভালো থাকবেন। এতে এনবিআরের কোনো প্রকার অতিরিক্ত জনবলের প্রয়োজন হবে না। পাশাপাশি সরকার, ক্রেতা-বিক্রেতা সবাই স্বস্তির মধ্যে থাকবেন। বিষয়টি ভেবে দেখার অনুরোধ করছি।
সভাপতি, বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি ও সাবেক সহসভাপতি, এফবিসিসিআই