ঢাকা শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

পেছনে কারা, এখনও অন্ধকারে পুলিশ

পেছনে কারা, এখনও অন্ধকারে পুলিশ

.

সাহাদাত হোসেন পরশ ও ইন্দ্রজিৎ সরকার

প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২০২৪ | ০০:৪২ | আপডেট: ১৪ জানুয়ারি ২০২৪ | ১৬:০৫

জাতীয় নির্বাচন ঘিরে রেলে যে নাশকতা হয়েছে– এর পেছনে কারা কলকাঠি নেড়েছে, সে বিষয়ে স্বচ্ছ তথ্য নেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে। মূল পরিকল্পনাকারী ও অর্থের জোগান কারা দিয়েছে, সে ব্যাপারেও অন্ধকারে পুলিশ।

গেল দেড় মাসে শুধু ঢাকা জেলার আওতাধীন এলাকায় ১৪ মামলা করেছে রেলওয়ে পুলিশ। সব মিলিয়ে ছোট-বড় ৪০টির বেশি নাশকতায় ৯ জনের প্রাণক্ষয় হয়েছে। দগ্ধ ও আহত হয়েছেন আরও অনেকে। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে গোপীবাগ ও তেজগাঁওয়ের ঘটনায়। নাশকতার আগুনের দুই ঘটনায় দগ্ধ হয়ে মারা গেছেন আটজন।

 বড় ঘটনা আর বেশি মৃত্যু হলেও গোপীবাগ ও তেজগাঁও নাশকতার তদন্ত খুব বেশি এগোয়নি। দুটি মামলার তদন্ত করছে রেলওয়ে পুলিশ। এদিকে গাজীপুরের শ্রীপুরের ভাওয়ালগড়ের বনখরিয়া রেললাইন কেটে বগি লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা গেছে। তবে ওই নাশকতায় জড়িত কয়েকজন এখনও অধরা। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচনকেন্দ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ায় পুলিশের ব্যস্ততার কারণে নাশকতার মামলার নিরবচ্ছিন্ন তদন্ত করা যায়নি। এসব ঘটনায় কয়েকজনকে ‘শনাক্ত’ করা গেছে– গোয়েন্দাদের তরফ থেকে এমন দাবি করা হলেও তাদের এখনও আইনের আওতায় আনা যায়নি।

রেলে নাশকতার ঘটনায় বিএনপিকে দায়ী করে আসছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। তবে বিএনপির দাবি, সরকারই এসব ঘটনা ঘটিয়ে বিএনপির ওপর দায় চাপাচ্ছে।

নাশকতার ঘটনায় পুড়ে ছাই হয়েছে রেলের সাতটি বগি; ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৯টি বগি ও একটি ইঞ্জিন। এ ছাড়া রেলপথ কেটে ফেলা, আগুন দেওয়া, ফিশপ্লেট তুলে নেওয়া, ককটেল বিস্ফোরণের মতো বেশ কিছু ঘটনাও ঘটেছে।

রেল পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৬ নভেম্বর রাতে টাঙ্গাইল স্টেশনে টাঙ্গাইল কমিউটার ট্রেনের বগিতে আগুন দেওয়া হয়। সেটি সকালে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল। ওই ঘটনায় ট্রেনের দুটি বগি পুড়ে যায়। দু’দিন পর ১৯ নভেম্বর রাতে জামালপুরের সরিষাবাড়ী স্টেশনে থেমে থাকা যমুনা এক্সপ্রেস ট্রেনে আগুন দেওয়া হয়। এ সময় পুড়ে যায় দুটি বগি এবং একটি বগি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২২ নভেম্বর রাতে সিলেট রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা ঢাকাগামী উপবন এক্সপ্রেস ট্রেনের একটি কোচে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এর পর ভয়াবহ নাশকতার ঘটনা ঘটে ১৩ ডিসেম্বর। ওই দিন শ্রীপুরের ভাওয়ালগড়ের বনখরিয়া রেলপথের ২০ ফুট কেটে ফেলা হয়। ভোরে ঢাকাগামী মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস ট্রেন সেখানে দুর্ঘটনায় পড়ে। রেলের ইঞ্জিন ও ছয়টি বগি লাইন থেকে ছিটকে পড়লে একজন নিহত হন। আহত হন অনেকে। ১৯ ডিসেম্বর ঢাকার তেজগাঁওয়ে মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেসে আগুনের ঘটনায় পুড়ে যায় তিনটি বগি। যাত্রীভর্তি আগুনে পুড়ে মারা যান চারজন। সর্বশেষ ৫ জানুয়ারি রাতে রাজধানীর গোপীবাগে বেনাপোল এক্সপ্রেসে আগুন দেওয়া হয়। সেখানেও পুড়ে মারা যান চার যাত্রী। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে দু’জনকে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে রেল পুলিশ। তারা হলেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক নবীউল্লাহ নবী ও মহানগর দক্ষিণ যুবদলের নেতা কাজী মনসুর আলম। তদন্ত-সংশ্লিষ্টদের দাবি, ট্রেনে আগুন দেওয়ার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন ওই দুই নেতা। তারা জানিয়েছেন, ৪ জানুয়ারি নাশকতার পরিকল্পনার বিষয়ে হোয়াটসঅ্যাপে ভার্চুয়াল কনফারেন্স হয়। মহানগর দক্ষিণ যুবদলের আহ্বায়ক খন্দকার এনামুল হক এনাম ওই কনফারেন্সে সভাপতিত্ব করেন। তিনি এবং যুবদল দক্ষিণের সদস্য সচিব রবিউল ইসলাম নয়ন ট্রেনে আগুন দেওয়ার বিষয়ে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন। তাদের পরিকল্পনা ও নির্দেশনা অনুযায়ী নাশকতা ঘটানো হয়।

রেলওয়ে পুলিশের ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার আনোয়ার হোসেন সমকালকে বলেন, রিমান্ড শেষে শনিবার দু’জনকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তারা আদালতে কোনো জবানবন্দি দেননি। তবে রিমান্ডে জানিয়েছেন, ভার্চুয়াল কনফারেন্সে যুবদলের এক নেতা ট্রেনে আগুন দেওয়ার দায়িত্ব নেন। তাদের দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে। সত্যতা পেলে যুবদলের ওই নেতাকে গ্রেপ্তার করবে পুলিশ। পলাতক ওই নেতাকে পেলে ঘটনার ব্যাপারে অনেকটা স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।

গোপীবাগে ট্রেনে আগুনের ঘটনায় জড়িত অভিযোগে নবীউল্লাহ নবী, মনসুর আলমসহ মোট আটজনকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পরে ৬ জানুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি জানানো হয়। ডিবি লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার (অতিরিক্ত ডিআইজি হিসেবে পদোন্নতিপ্রাপ্ত) মশিউর রহমান সমকালকে বলেন, আগুন দেওয়ায় সরাসরি জড়িত চারজনের ব্যাপারে তথ্য পাওয়া গেছে। গ্রেপ্তার মনসুর আলম পুলিশকে জানিয়েছেন, নাশকতার জন্য তিনি কয়েকজন নেতাকর্মী নির্ধারণ করে দেন। ওই চারজনকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। তাদের পাওয়া গেলে এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানা যাবে।

ডিবি ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার আবদুল আহাদ জানান, নতুন কোনো তথ্য এখন পর্যন্ত তারা পাননি। মূলত লালবাগ বিভাগই বিষয়টি দেখছে।

তেজগাঁওয়ে ট্রেনে আগুন দেওয়ার ঘটনায় জড়িত কাউকে এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা যায়নি। ঘটনার দু’দিন পর চারজনকে শনাক্ত করার কথা জানিয়েছিল র‍্যাব-৩। সেদিন ডিবির তরফ থেকেও জড়িতদের নাম-পরিচয় পাওয়ার দাবি করা হয়েছিল। তবে প্রায় এক মাসেও শনাক্ত হওয়া আসামিদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

২১ ডিসেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে এবং পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথোপকথনে র‍্যাব-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফ মহিউদ্দিন আহমেদ জানান, জড়িত চারজনের নাম পেয়েছেন তারা। তিনি বলেন, জড়িতদের দু’জন ভাড়াটে অপরাধী। তারা টাকার বিনিময়ে নানা অপরাধ করে থাকে। অপর দু’জন রাজনৈতিক দলের কর্মী। দ্রুতই তাদের আইনের আওতায় আনার আশাও প্রকাশ করেন তিনি। তবে এখন পর্যন্ত তাদের গ্রেপ্তার করা যায়নি। র‍্যাব জানায়, সিসিটিভি ফুটেজে পাওয়া ছবির সঙ্গে সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত চারজনের চেহারা মেলেনি। তবে তারা প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

এদিকে ডিবিও ‘শনাক্ত’ অপরাধীদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি। সংস্থাটির শীর্ষ এক কর্মকর্তা পরে সাংবাদিকদের জানান, এর আগে গ্রেপ্তার যুবদল নেতা মুকিত হোসাইনের কাছে ট্রেনে আগুন দেওয়ায় জড়িতদের বিষয়ে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। সেগুলো যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রেলওয়ে পুলিশের তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা জানান, তেজগাঁওয়ে ট্রেনে আগুন দেওয়ার মামলার তদন্তে এখনও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। তবে গোপীবাগে ট্রেনে আগুনের ঘটনায় যারা গ্রেপ্তার হয়েছেন, তারা এ নাশকতায় জড়িত থাকতে পারেন। এ কারণে তাদের এ মামলায়ও গ্রেপ্তার (শ্যোন অ্যারেস্ট) দেখানো হবে। এর পর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন জানানো হবে।

গাজীপুরের নাশকতার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের পরিদর্শক মো. সালাউদ্দিন বলেন, গাজীপুরের ঘটনায় জড়িত কয়েকজনকে ধরার চেষ্টা চলছে। এ ঘটনায় একজন আসামি ও আরেক সাক্ষী আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।

আরও পড়ুন

×