ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন লেখক ঝুম্পা লাহিড়ীর প্রথম উপন্যাস 'দ্য নেইমসেক' প্রকাশিত হয় ২০০৩ সালে। এর আগেই ২০০০ সালে তার প্রথম গল্পগ্রন্থ 'ইন্টারপ্রেটার অব ম্যালাডিস'-এর জন্য তিনি বিখ্যাত পুলিৎজার পুরস্কার লাভ করে আলোচনায় আসেন। স্বাভাবিকভাবেই তার প্রথম উপন্যাসও প্রকাশের সাথে সাথে তুমুলভাবে সমাদৃত হয়।

'দ্য নেইমসেক'-এর বাংলা হতে পারে 'সমনামী'। এই উপন্যাসে তিনি মূলত প্রথম ও দ্বিতীয় প্রজন্মের ভারতীয় অভিবাসীদের গল্প করতে বসে তার যাপিত জীবনের খুব ঘনিষ্ঠ অভিজ্ঞতাকেই আশ্রয় করেছেন। শ্রমজীবী অভিবাসীদের মুখে শোনা অযাপিত গল্পের ধারেপাশেও যাননি। তার গল্পের অভিবাসীরা সুবিধাপুষ্ট, কারণ তারা একাডেমিক অভিবাসী। উচ্চশিক্ষার্থে, গুরুভাগই বৃত্তি নিয়ে প্রবাসে যান এবং ডিগ্রির সুবাদে সেই দেশে ভালো চাকরি ও জীবন জুটিয়ে নিতে পারেন। জীবন কাটে অনেকটা এলিট পরিমণ্ডলে এবং অনেকটা সেই দেশীয়দের আবহে-প্রবাহে। 

'দ্য নেইমসেক'-এর গল্প গড়ে উঠেছে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি পরিবারের মার্কিন মুল্লুকে অভিবাসন দিয়ে। ম্যাসাচুসেটস ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী ইঞ্জিনিয়ার অশোক গাঙ্গুলী ভারতীয় মূল্যবোধকে ধারণ করেই পাশ্চাত্য জীবনে মানিয়ে নিতে পারেন। কিন্তু তার স্ত্রী অসীমা পরিবার থেকে দূরে থাকার নিরন্তর এক অভাববোধ নিয়ে তার বসনের শাড়ির মতোই বাঙালি সংস্কৃতিকে আঁকড়ে বেঁচে থাকেন। সন্তানদের বেড়ে ওঠাতেও একদিকে অসীমা-অশোক উভয়েরই যেমন চেষ্টা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি-মূল্যবোধের প্রতি সম্ভ্রম-ভালোবাসা গড়ে উঠুক, অন্যদিকে গোগল আর তার বোন সোনালী ওরফে সোনিয়ার প্রবণতা পাশ্চাত্য সংস্কৃতিকে আরও বেশি করে আঁকড়ে ধরা। 

গল্পের পুরোটা জুড়ে দেখা যায় গোগল কী করে তার পরিচয়-সংকট আর তার নামের প্রতি তীব্র বিতৃষ্ণা নিয়ে নিরন্তর পালিয়ে বেড়াচ্ছে, কী করে পলায়নপরের মতো অপরিকল্পিতভাবে সম্পর্কে জড়াচ্ছে এবং তা বিয়োগান্তক ইতিতে সমর্পিত হচ্ছে।

অসীমার সাংস্কৃতিক আঘাত আর ছেলে গোগলের দ্বন্দ্ব-সংকট এতটাই সরল বয়ানে চিত্রিত হয়েছে যে, যেকোনো অভিবাসী পরিবার সহজেই এর সাথে সাধারণ যোগসূত্র খুঁজে পাবেন। এই বাস্তব-আশ্রিত মানবিক বয়ানে তিনি পাঠককে এই বইয়ের সাথে এবং বইয়ের চরিত্রগুলোর ভেতরে বাস করার মতো এক দারুণ সংযোগ যেন স্থাপন করে দেন। আমরা তাদের সংকটে, আনন্দে ও দুঃখে সমভাবে স্পর্শিত হই। গোটা গল্পের অভিযাত্রাকেই তিনি যেন আমাদের স্পর্শের পরিধিতে এনে দেন। 

কিন্তু অভিবাসী বাঙালি দম্পতি, যারা ফেলে আসা স্বদেশের সংস্কৃতি ধরে রাখতে চান, তাদের ছেলের নাম গোগল হলো কেমন করে? ঘটনাটা এমন, গল্পের প্রথম প্রজন্ম অশোক গাঙ্গুলী কলকাতায় এক মারাত্মক ট্রেন দুর্ঘটনার শিকার হয়ে লাশ আর ধ্বংসস্তূপেযখন মৃতপ্রায়, সেই মুহূর্তে তাকে বাঁচিয়ে দেয় রুশ লেখক নিকোলাই গোগলের একটি গল্পগ্রন্থ। ট্রেনে বসে তিনি পড়ছিলেন গোগলের 'দ্য ওভারকোট'।

চলৎশক্তিহীন শরীরে কাউকে ডাকার ক্ষমতা যখন তার ছিল না, তখন হাতে ধরা সেই বইয়ের ছিন্নভিন্ন পাতা নাড়িয়েই তিনি উদ্ধারকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হন এবং বেঁচে যান। তার এই দ্বিতীয় জন্মের জন্য তিনি লেখক গোগলের সাথে বোধ করতেন অদ্ভুত এক নাড়ির টান। তাই প্রথম সন্তানের জন্মমুহূর্তে সনাতন পন্থায় দাদিশাশুড়ির এয়ার মেইলে পাঠানো নামের অপেক্ষা যখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ করতে অসম্মত, বার্থ সার্টিফিকেট ইস্যু করে নবজাতককে রিলিজ দিতে প্রস্তুত, সেই তাড়াহুড়োয় আপাতভাবে সন্তানকে দিলেন সেই সমনাম, গোগল গাঙ্গুলী।
কিন্তু দাদিমার সেই মেইল পথে কোথায় হারিয়ে যায়, সাথে কিছুকাল পরে দাদিমাও। অশোক ঠিক করলেন ভালো নাম দেয়া যাক লেখক গোগলের পুরো নাম নিকোলাই থেকেই নিখিল, নিখিল গাঙ্গুলী। কিন্তু স্কুলে ভর্তির সময় এই অজানা সংস্কৃতিতে গোলমাল লেগে যায়। বার্থ সার্টিফিকেট বলছে বাচ্চার নাম গোগল, বাচ্চাও সেই নামই কেবল জানে। ফলাফল, তার নাম হয়ে যায় গোগল গাঙ্গুলী।

একদিকে গোগল, আরেকদিকে গাঙ্গুলী। এমন এক নাম, যা স্বদেশিও নয়, বিদেশিও নয়। সে কেন 'গোগল'-এর ব্যাখ্যা তার নিজের কাছেই অনুপস্থিত। এই নামের প্রতি বিতৃষ্ণাই যেন হয়ে ওঠে গোগলের পশ্চিমা দেশে পশ্চিমা বন্ধুদের মাঝখানে নিজের সাংস্কৃতিক আবহের বিষম রূপের এক প্রকাশ।

গোগলের নামের এই দ্বন্দ্ব শেষ পর্যন্ত তাকে আইনানুগভাবে নাম পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যায়। এবং এখানেই সে থামে না। এই নামে তাকে চেনে-জানে এমন চিরপরিচিত শহর-বন্ধু, বাবা-মা সব ছেড়ে সে পালিয়ে বেড়ায় এবং এক পর্যায়ে ভাবে সে এ থেকে মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু আচমকাই একদিন সে বাবার কাছে তার নামকরণের কারণ জেনে ব্যথিত ও অনুতপ্ত হয়ে ওঠে। কেন সে আগে তা জানেনি? কেন বাবা-মায়েরা সন্তানের কাছ থেকে তাদের কী আকাঙ্ক্ষা, কী অপ্রাপ্তি আর তার কারণগুলো কী তা স্পষ্ট উচ্চারণ না করে দুই পক্ষে কেবল অভিমানের দেয়াল তুলে দেয়? এই প্রশ্নগুলো পাঠককে তাড়িত করে। পরবাসে গোগল নিজের সংস্কৃতির প্রতি সম্মানবোধ দেখাবে, না নিজের নৃতাত্ত্বিক পরিচয় ঢাকতে আরও বেশি করে তাকে অস্বীকার করবে? কেন যেই সংস্কৃতি প্রথম প্রজন্মের অনেকের কাছে ভালোবাসা, অনেকের কাছে স্রেফ দিনের শেষে নিজের আপন বলয়ে রাতপোশাক, আর পরের প্রজন্মের কাছে দুঃস্বপ্ন?

এই দুইয়ের টানাপোড়নে পর্যুদস্ত গোগলের স্ত্রী মৌসুমীও ভগ্নপ্রাণে যখন বাবা-মায়ের আগ্রহে ভারতীয় বন্ধু-পরিবারের ছেলে গোগলের সাথে সাতপাঁকের মাধ্যমে শান্তি খুঁজে নেয়, তখন কেন এত দ্রুত তাতে কী জানি কিসের লাগি তারও প্রাণ করে হায় হায়? সাজানো নীড় ছেড়ে ছোটে আরেক বোহেমিয়ান উদাসীন চরিত্র, তার কৈশোরকালীন ভালোলাগা জার্মান সাহ্যিতের মাঝবয়সী শিক্ষকের দিকে? ক্ষীণ কেশ ডিমিথ্রি কি তার কাছে এমন বন্ধনহীন, দায়হীন সম্পর্কের অব্যক্ত হাতছানি, নাকি অস্তিত্বের সংকটে ভোগার এক ধ্বংসাত্মক অস্থিরতার প্রকাশ?   

উপন্যাসে পশ্চিমা আবহে অসীমার সংগ্রামের সাতকাহন যেন এক চিরায়ত চরিত্রায়ণ। অতি বাঙালি মেয়েটা একসময় গাড়ি চালিয়ে চাকরি করে একা কী করে যে দিন চালিয়ে নিলেন! প্রবাসে কিংবা নিজের দেশেও অনেক নারীর এমন সংগ্রাম যেন বহুদেখা এক চিত্র, গরজ যেখানে সত্যিই বড় বালাই!

গল্প শেষে অসীমা তার সংসার-সন্তানের দায়িত্ব সম্পন্ন করে স্বামীর স্মৃতি আজন্মের বসন শাড়িতে মুড়ে ভালোলাগার শহর কলকাতায় তার প্যাশন রাগসঙ্গীতের কাছেই ফিরে যান। রয়ে যায় একা গোগল, যে তার সমনামী বিষণ্ণ লেখক নিকোলাই গোগলের মতোই যেন অজানা বিষন্নতায় পথ চলে।

উপন্যাসটি পড়তে পড়তে কারও মনে হতে পারে, গল্পটা আরও সংক্ষিপ্ত হতে পারত। গোগলের নামের প্রতি বিতৃষ্ণার প্রথম প্রকাশ নিয়েই লেখক ছয়-ছয়টি পাতা ব্যয় করেছেন। মনে হতে পারে গোগলের বা তার স্ত্রী মৌসুমীর নিজ নিজ উন্মাতাল জীবনের একের পর এক সম্পর্কের শারীরিক ডিটেইল এত না হলেও পারত। লেখিকার বয়ানে কাউকে দেখেই কেউ এমন কামুক লোলুপের মত চোখের ভ্রু, ঠোঁট, জামার কলার থেকে গোড়ালি অবধি স্ক্যান করতে পারে, এই জানাটা সনাতন বাঙালি মনোস্তত্ত্বে কারও জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে। মনে হতে পারে বরং অশোক-অসীমার সংসার আর ভালোবাসার গল্প, যা খুব সামান্যই এতে স্থান পেয়েছে, তা আরও বিস্তৃত হতে পারত।
তথাপি, বাঙালি পরিবারের যে কোনো অভিবাসী প্রজন্মে-প্রজন্মে টানাপোড়েন আর সাংস্কৃতিক সংকটকে নিপুণ মুন্সিয়ানায় আর গভীর বিশ্লেষণে জানার জন্য 'দ্য নেইমসেক' এক উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।
অভিবাসী-অনভিবাসী সবাইকেই ঝুম্পা লাহিড়ীর 'দ্য নেইমসেক' দিতে পারে এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা।


মন্তব্য করুন