আমার একজন বন্ধু
এখনও বিশ্বাস করে স্বর্গ
বলে কিছু আছে। সে কোনো বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী নয়, তবু সে ভাবে
ঈশ্বরের সাথে কথা বলে। সে ভাবে তার কথা শোনার জন্যে
স্বর্গে একজন বসে আছে। -লুইস গ্লিক
২০২০ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন মার্কিন কবি লুইস গ্লিক। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টায় সুইডিশ নোবেল কমিটির মহাসচিব অধ্যাপক ম্যাটস মাম এক সংবাদ সম্মেলনে পুরস্কার প্রদানের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। ভোর সাড়ে ৬টায় ঘুম ভাঙিয়ে পুরস্কার প্রদানের কথা বলা হলে গ্লিক বলেন, এ পুরস্কার তার কাছে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত; তবে তিনি এতে আনন্দিত।
আগামী ১০ ডিসেম্বর তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হবে। এ বছর পুরস্কারের অর্থমূল্য বাড়িয়ে আট কোটি ৫০ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। করোনা অতিমারির কারণে চিরাচরিত নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে স্টকহোমের পরিবর্তে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাকে পুরস্কার প্রদান করা হবে। বর্তমানে তিনি এ বিশ্ববিদ্যালয়েই সংযুক্ত অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।
বলা অন্যায় হবে না যে, লুইস গ্লিক বাংলাভাষী পাঠকের কাছে অপরিচিত নাম। বাংলা ভাষার কোনো মুদ্রিত পত্রপত্রিকায় তার কবিতা ছাপা হয়নি। আজ পর্যন্ত তার ছয়টি কবিতা বাংলায় অনূদিত হয়ে ইন্টারনেটে প্রকাশিত হয়েছে। এ বছর শুরুর দিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক খোরশেদ আলম দুটি কবিতা অনুবাদ করেছেন যার একটি এ রকম:
আমার প্রতি তোমার এতটুকু করুণার জন্য
মনে করো না যে আমি কৃতজ্ঞ নই।
আমি খর্বাকৃতির করুণা পছন্দই করি,
বরং বৃহৎ আকারের চেয়েও
এইসব করুণা আমার বেশিই প্রিয়,
যা তোমাকে চোখে চোখে রাখে,
নেকড়ের জ্বলজ্বলে দৃষ্টির মতো,
অপেক্ষায় জাগিয়ে রাখে
দিনের পর দিন
নিঃশেষ হবার আগ পর্যন্ত।
['কৃতজ্ঞতা']

জীবনানন্দ দাশ বলেছেন, 'কবিতা নানা রকম'। স্বীকার করে নিতে হবে যে লুইস গ্লিকের কবিতা অনুসরণ করে সম্পূর্ণ ভিন এক শিল্পশৈলী, যা আমাদের কমবেশি অপরিচিত। তার গদ্য কবিতা নিছকই গদ্য- আমাদের বহু পরিচিত রূপবন্ধ থেকে পৃথক। ছন্দ, অন্ত্যমিল, উপমা ও চিত্ররূপময়তার সঙ্গে ধ্বনি মাধুর্যের সম্মিলনে যে কবিতা পড়তে আমরা অভ্যস্ত, লুইস গ্লিকের কবিতার শৈলী তার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার রচনা নিড়াম্বর; এমনকি শব্দ নির্বাচনেও এমন কোনো বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয় না যা আমাদের চমৎকৃত করতে পারে।
তার রচনার বহুলাংশে আধিপত্য করে আত্মজৈবনিকতা। সেখানে পাঠক প্রত্যক্ষ করবেন একধরণের মৃত্যুচেতনা, মানব অস্তিত্বের অসহায়ত্ব আর একটি আত্মগত কণ্ঠস্বরের ঘনিষ্ঠ প্রক্ষেপণ। যা তার চোখ দেখে, তা-ই তিনি তুলে ধরেন গদ্যের বুননে- কখনো হয়তো কোনো মন্তব্য জুড়ে দেন। কবিতায় তার কণ্ঠস্বর মৃদু, কখনো ভয়ার্ত, অনিশ্চিত, দ্বিধাভারাক্রান্ত। শৈশবে গ্লিক দুরারোগ্য ব্যাধি অন্রানারেক্সিয়া নারভোসা বা স্নায়বিক ক্ষুধা রোগে আক্রান্ত হন। এই রোগ কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। মৃত্যুকে কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা তাই পরিণত জীবনে তার কবিতায় ফিরে ফিরে আসে। জীবনমৃত্যুর মাঝখানে দ্বিধান্বিত স্বর- তার কবিতায় ভাষা পেয়ে মূর্ত হয়। সূর্যাস্ত কবিতাটির শুরু এই ভাবে :

সূর্যাস্তের সাথে সাথেই একজন
খামার-শ্রমিক পুড়িয়ে ফেলছে মৃত পাতা
কোনো বড়ো ঘটনা আদৌ নয়,
কিছু আগুন মাত্র
জাঁদরেল মহাজনের হস্তকবলিত
একটি পরিবারের মতো নিয়ন্ত্রিত
ক্ষুদ্র একটি ঘটনা।
['সূর্যাস্ত']
অঙ্কুর সাহা অনুবাদের জন্যে যে কবিতাটি পছন্দ করেছেন, সেটি 'বাধাবিপত্তির গান'। অনুবাদটি ভালো:

যখন প্রেমিককে বাহুবন্ধনে জড়াই, বুকের ভেতর মনে হয়
নড়তে শুরু করলো ধরিত্রীর আদিম হিমবাহ,
বিরাট, বিশাল পাথর উলটে সরতে লাগলো বরফ, তারপর
গম্ভীর, কঠিন মুখের পাথর সব; আর জঙ্গল উপড়ানো
বৃক্ষেরা মিলে তৈরি হল ছেঁড়াখোঁড়া ডালপালার সমুদ্র-
আর যেখানে দাঁড়িয়ে শহর, তারাও শুরু করলো গলতে,
দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলা বাগান, উঠোনে বসে চকলেট খাচ্ছিলো
যেসব খুকিরা, আর আনমনে ছড়িয়ে দিচ্ছিলো
তাদের রঙিন খোশা: আর যেখানে শহর ছিলো,
তার আকর, তার উন্মোচিত রহস্য: আর আমি দেখি
পাথরের চেয়ে বরফ শক্তিশালী, আত্মরক্ষার চেয়েও-
তারপর আমরা যাই যে যার যার পথে, সময় কাটতেই চায় না,
এক ঘণ্টাও না।
লুইস গ্লিকের বসবাস স্বপ্ন আর বাস্তবতার মধ্যে। কবিতার পটভূমি তিনি তৈরি করেন নির্জলা মুখের ভাষায়। বাক্যে শব্দ স্থাপনার ক্রম কখনও বুদ্ধির অতীত হয়ে যায়। কখনো সম্পূর্ণ কবিতা পাঠের আগে উদ্দিষ্ট অর্থ আদৌ স্পষ্ট হয় না। বলতেই হয়, নোবেল পুরস্কারের জন্য লুইস গ্লিককে মনোনয়ন একটি দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত, যা সম্ভবত বিতর্ক সৃষ্টি করবে। আপাতত বিতর্কের সম্ভাবনা একপাশে সরিয়ে আমরা কবিতার বিশ্বজয়কে উদযাপন করি। অভিনন্দন, কবি লুইস গ্লিক।

মন্তব্য করুন