ঘুরে আসুন মুক্তাগাছা জমিদারবাড়ি

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০১৯     আপডেট: ২৮ আগস্ট ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম

আজকাল নগরজীবনের অনেকেই আছেন ছুটির দিনে, দলবেঁধে বা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘুরতে পছন্দ করেন। তাদের জন্যই একদিনে ঘুরে বেড়ানোর মতো জেলা ময়মনসিংহ থেকে ঘুরে এসে লেখা এই প্রতিবেদন 

ছুটছি ময়মনসিংহ জেলার ফুলবাড়িয়া, রাতটা কাটিয়ে পরদিন যাব মুক্তাগাছা। ব্যক্তিগত বাহনে রাত ৯টায় রওনা দিয়ে ঢাকার যানজট ঠেলেঠুলে পৌঁছাই রাত প্রায় ২টায়। কিছুটা দেরি হওয়ার কারণও রয়েছে। চলতি পথে বিভিন্ন জায়গায় গাড়ি থামিয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে খানিকটা সময় দোকানিদের সঙ্গে আড্ডায় মেতেছি। ভ্রমণকালীন নানা জায়গার বিভিন্ন মানুষের জীবনমান সম্পর্কে ধারণা নেওয়াটাও বেশ ভালো লাগে। ভোরের আলো ফুটতেই চলে যাই সৌন্দর্যের চাদরে ঘেরা গ্রামগুলো ঘুরতে। এই গ্রাম থেকে ওই গ্রাম। নাশতা সেরে চলে যাই মুক্তাগাছার পথে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই পৌঁছে যাই মুক্তাগাছা রাজবাড়ী।

এটি একটি প্রাচীনতম ঐতিহাসিক জমিদারবাড়ি। এর বয়স প্রায় তিনশ' বছর। নিরাপত্তারক্ষীদের অনুমতি নিয়ে ঢুকে যাই ভেতরে। একদা মহারাজা আচার্য চৌধুরীর বাড়ির এমন ভগ্নদশা কেন? দে-ছুটের বন্ধুরা ইতিহাস-ঐতিহ্যের টানে পুরো বাড়িটি চষে বেড়ানোর চেষ্টা করি। প্রতিটি স্থাপনা বেশ ভালো করে পরখ করি। প্রায় ১০০ একর জায়গার ওপর নির্মিত মুক্তাগাছা জমিদারবাড়ি। বাড়ির ভেতর আস্তাবল, মন্দির, রঙমহল, সিন্দুক ঘর, নাট্যমঞ্চ, বসতঘরসহ আরও অনেক কিছুই রয়েছে। নেই শুধু রাজা থেকে মহারাজা উপাধিপ্রাপ্ত জমিদার আচার্য চৌধুরী। শৌখিন জমিদার শশীকান্ত চৌধুরীর পদচারণা কিংবা ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়ানো অবাধ্য প্রজার গগনবিদারী চিৎকার। তবে যতটুকু অক্ষত রয়েছে, তার নির্মাণশৈলী দেখেই বোঝা যায় যে, বাড়ির ভেতরের বিভিন্ন স্থাপনা ছিল বেশ দৃষ্টিনন্দন।

এই বাড়িতে ১৯৪৫ সালে উপমহাদেশের প্রথম ঘূর্ণায়মান নাট্যমঞ্চ স্থাপন করেছিলেন নাট্যপ্রেমী জমিদার জীবন্দ্র কিশোর আচার্য চৌধুরী, যা তাদের আভিজাত্যের পরিচয় বহন করে। ভগ্ন অবস্থায় দোতলা একটি ঘর দেখা গেল। জানা যায়, গরমের দিনে প্রাকৃতিকভাবেই বাইরে দিয়ে ঘামিয়ে ভেতরে ঘরকে রাখত ঠাণ্ডা। জমিদার আচার্য চৌধুরীর পূর্বপুরুষ থাকতেন বগুড়াতে। ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর নানা কারণে শ্রীকৃষ্ণ আচার্য চৌধুরীর চার ছেলে হররাম, শিবরাম, বিষুষ্ণরাম ও রামরাম তৎকালীন আলাপসিং পরগনা আসেন। এখানে বসবাসের জন্য মনস্থির করেন। আলাপসিং পরগনার বিভিন্ন জায়গা ঘুরে দেখেন। পরে মুক্তাগাছার জায়গাটা পছন্দ করেন। আজকের মুক্তাগাছা তৎকালীন সময়ে আলাপসিং পরগনার অধীনে ছিল। জমিদার আচার্য চৌধুরীর বংশের প্রথম পুরুষ শ্রীকৃষ্ণ আচার্য চৌধুরী মুর্শিদাবাদ নবাবের খুব আস্থাভাজন ছিলেন।

সেই প্রতিদানস্বরূপ তিনি ১১৩২ খ্রিষ্টাব্দে নবাবের কাছ থেকে আলাপসিং পরগনার বন্দোবস্ত পেয়েছিলেন। সে সময় মুক্তাগাছা শহরসহ আশপাশে জলাভূমি ও অরণ্যঘেরা ছিল। মূলত জমিদার আচার্য চৌধুরীর বংশের পূর্বপুরুষদের মাধ্যমেই মুক্তাগাছা শহরের গোড়াপত্তন। তৎকালীন ময়মনসিংহ অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী জমিদার ছিলেন এই বাড়ির জমিদার বাবুরা। তারাই ১৬ হিস্যার জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই বাড়ির জমিদার বাবুরা জ্ঞান চর্চায়ও ছিলেন বেশ আগ্রহী। ময়মনসিংহের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই তাদের বেশ অনুদান রয়েছে। মুক্তাগাছা জমিদারবাড়ির লাইব্রেরির অনেক দুর্লভ বই বর্তমানে বাংলা একাডেমিতে সংরক্ষিত আছে।

রাজবাড়ীর মূল ফটকের সামনেই রয়েছে সাতঘাটের বিশাল পুকুর। প্রতিটি ঘাটই বাঁধানো। পুকুরের পাশেই দুর্লভ প্রজাতির নাগলিঙ্গম বৃক্ষ রয়েছে। সেই গাছে এখনও ফুল ফুটে আগন্তুকদের দৃষ্টি কেড়ে নেয়। ঘাটে বসে বিমুগ্ধ নয়নে পুকুরের সৌন্দর্য দেখি আর কল্পনাতে ফিরে যাই সেই জমিদারির আমলে, যখন তাদের সম্মানে বাড়ির সামনে দিয়ে জুতা পায়ে আর ছাতা টানিয়ে কোনো প্রজা হেঁটে যেত না। সময়ের আবর্তনে আজ সবকিছুরই বিবর্তন। হারিয়ে যায় সব, থেকে যায় ইতিহাস। মুক্তাগাছার শেষ জমিদার ছিলেন রাজা জীবেন্দ্র কিশোর আচার্য চৌধুরী। জমিদারিপ্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর তিনি ভারতে চলে যান। ঘোরাঘুরি শেষে আমরাও মুক্তাগাছার মণ্ডা খেয়ে ফিরতি পথ ধরি। তাহলে বন্ধুরা আর দেরি কেন? ছুটিতে ছুটে যান, ধান-নদী-মহিষের সিং- এই তিন মিলে গড়া ময়মনসিংহ।

যেভাবে যাবেন :ঢাকার মহাখালী বাসস্ট্যান্ডে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিভিন্ন পরিবহনের বাস ময়মনসিংহে চলাচল করে। এ ছাড়া সরাসরি মুক্তাগাছা পর্যন্তও চলাচল করে। ময়মনসিংহ শহরে গিয়ে সেখান থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় গেলে পর্যটকদের জন্য সুবিধা বেশি হবে। গেটলক বাস ভাড়া ঢাকা-ময়মনসিংহ ২২০-২৫০ টাকা। সরাসরি মুক্তাগাছা ভাড়া নেবে লোকাল পরিবহনে ১৬০ টাকা। নিজস্ব/ভাড়া গাড়িতে দিনে দিনেই ঘুরে আসা যাবে। সব শ্রেণির সাধ্যের মধ্যেই ময়মনসিংহ শহরে মানভেদে অনেক আবাসিক ও খাবার হোটেল রয়েছে।