কবিতা

ঋষিতুল্য এক পিতার উপাখ্যান

প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২০   

মানিক চন্দ্র দে

মানিক চন্দ্র দে

মানিক চন্দ্র দে

ছত্রিশ বছরের দূরের এক আকাশ থেকে

তোমার নিত্য আসা যাওয়া আমার ধূসর স্মৃতিতে। 

তুমিতো আছ ছত্রিশ বছরের দূরে, কোনখানে। 

তোমার রক্ত করে নিত্ত উপহাস

আমার ব্যস্ততার আকাশে এসে। 

তুমি আস বাল্যশিক্ষা  হাতে

আস উপদেশের নক্সিকাঁথা নিয়ে

ভোরের প্রার্থনার মত

ছন্দে ছন্দে 

আমার প্রার্থনার প্রথম ধ্বনিত মন্ত্রে। 


এইতো সেদিনের এক অবুঝ কিশোর

তোমার ছিল যে ন্যওটা, ছিল  দূরন্ত

পিছু নিত তোমার প্রবাসযাত্রায়।

থামাতে হতো, মিথ্যা আশ্বাসে

যেতে হতো তোমার  প্রবাসে চাকরিতে। 


বেশিদিনের কথা নয় যেন

লাঠি লজেন্সের ভোলানো দিনে

তোমার সাথে একদিন ঢাকা আসা 

হায়রে ঢাকা! 

সদরঘাটের বিজলী আলোর টারমিনাল

লাল নীল সবুজ আলোরা জ্বলে

স্বপ্নের মতো। 

উঁচু দালানের পিছে

জির্ণ কুঁড়ে ঘর। 

হাসি আর কলের গানের

সাথে, কান্নারা মিশে 

ঢাকার আকাশে। 


বুড়িগঙ্গার পাড়ের ফলের দোকান থেকে

আসা আাঙুর বেদানার ঘ্রাণ 

মো মো করা গন্ধে আকুল বিকুলি প্রাণ! 

মালাই আইসক্রিমের কাঠি ধরে রিক্সায় উঠা। 


চার আনা প্রতিদিন পেতাম তোমার কাছ থেকে

এই চার আনা দিয়েই ঢাকা কে দেখি-

ঢাকা মানে বেকারীর বিস্কুটের ঘ্রাণ,

বুড়িগঙ্গার হাওয়া। 

ঢাকা মানে মচমচে পরোটা, গরম ধোঁয়া ওঠা,

ঢাকা মানে বুরিন্দা, হালুয়া আর আলু ডাল পুরি,

বাখরখনি ভিজিয়ে চুমুকে চুমুকে

চায়ের আড্ডা,বন্ধুদের সাথে। 

ঢাকা মানে ক্যাফে কর্ণারের ক্রাম্বচপ

ঢাকা মানে আর্য বোর্ডিং এর পাবদার ঝোল

কালোজিরা আর কাঁচামরিচের ফালি। 

ঢাকা মানে বিউটি বোর্ডিং এ

সরষে ইলিশের  এপিঠ, ওপিঠ

বাবার সাথে। 


জীবনের প্রথম সিনেমা, রূপমহলে

তোমার সাথে গিয়ে। 

রূপবান আর রহিম বাদশা। 

ছবি কথা কয়, 

নাচে গায়

ভাবা যায়? 

মায়ের শাসন, ভাইয়ের চোখের ভয় 

থোড়াই কেয়ার আমার

তুমি ধরেছিলে হাত যে আমার! 

আরো মনে পড়ে, তুমি কখনো 

গায়ে হাত তোলনি। 


একদিন তুমি দূরে কোন জেলায়

চলে গেলে চাকরির নিয়মে

আমি আবার একা, 

হৃদয় আমার বড্ড  ফাঁকা 

তোমা বিহনে। 

কখন আসবে খাকি পোষাকের লোকটি

প্রাগৈতিহাসিকের মত! 

আমার হাতে পৌছে দিতে তোমার চিঠি

গুটি গুটি অক্ষরে অক্ষরে 

তোমার ঝর্ণা কলম থেকে নেমে আসতো

নীল নীল সব আশির্বাদের বৃষ্টিধারা। 

চিঠি লিখতে বসলে কি তুমি

হয়ে যেতে পুশকিন বা সক্রেটিস? 

তখনো বুঝিনি, এখন বুঝলাম বাবা কি জিনিস! 

একদিন আসতে  হাতে স্যুটকেস 

আচ্ছা, বাবারা কি সান্তাক্লস? 


জোয়ারের পর ভাটা, আর ভাটার পর জোয়ার

জানে তো সবাই! 

কিন্তু জানেকি, অসময়ে  আসে কালবৈশাখী ঝর? 

কেউতো জানেনি কখনো।  

পাখির মত মানুষ মারে পাক হানাদারের দল

নিরীহ বাঙালির রক্তে রাঙা রাজপথ হল লাল

প্রাণভয়ে ছোটে মানুষ একি দিকবেদিক! 

তুমি কোথায় আর আমরা কোথায় পাইনা যে কোন হদিস। 

একদিন দেখি আমরা আগরতলা, 

শরণার্থী ক্যাম্পে।  আশ্রয় ছেড়ে আমরা তখন আশ্রয়হীন। 

শরণার্থী ক্যাম্পের ছাউনিতে কাঁদি,

বাবা কই, বাবা কই? 

মায়ের ভায়ের হাহাকারে বাতাস যে

ভারী,  চলাচল যেন নেই। 

ক্যাম্পের ভেতর আমাশা আর ডায়রিয়া দেয় হানা 

জীবন বাঁচাতে রেশনে লাইন কী যে বিরম্বনা! 

অবশেষে এল সোনালি সকাল 

আমরা আবার মুক্ত

চারদিকে কত আত্মীয় স্বজন আমরা আবার যুক্ত। 

লাল সবুজের পতাকা পেলাম 

কিন্ত বাবাতো পাইনা! 

একদিন বাবাকে পেলাম, 

ভোরের বসন্ত বাতাসে

গোটা পরিবার খুশি, সবচেয়ে বেশি আমি! 


সুখের সময়  কেন যে  দ্রুত কাটে-

রকেটের চেয়ে ও দ্রুত, 

দুঃসময়গুলো পড়ে থাকে যেন 

স্টিমরোলার এর মত। 


বুড়িগঙ্গার জল বয়ে চলে অবিরত। 


একদিন -

মেঝোভাইয়ের বৌভাতের দিন

কত মানুষের কত মিলন

কত  কলরব, কত গুঞ্জন। 

বিজলীবাতিরা জ্বলে টিপ টিপ

আমার স্বপ্নের মত। 

বাদ্য বাজনার মুখরিত দিনে

ব্যস্ততায় কাটে দিনটি। 

আসে রাত, কাল রাত, গভীর! 

নীরব হয়ে গেল সব লেনদেন

কিছু আত্মীয়েরা যে এলোনা! 

ব্যস্ততা কি আজীবন? 

হিসাব নিতে চায় যে 'বাবার কলম'! 

যাবার বেলায় তুমি কি চেয়েছিলে

সকল রক্তের, আত্মীয়ের হোক, মেলা  ? 

তুমি কি জেনে গিয়েছিলে,  আজই শেষ তোমার সকল খেলা? 

মরণের দিনে

মানুষেরা কি জানে

শেষ হবে তার জীবনের ঋণ! 

চিঠিলেখা শেষে

সবাইকে কাছে

বললে তুমি, ' মিলেমিশে থেকো '।

ফেললে শেষ নিঃশ্বাস, 

বড়ই শান্ত

নীরবে।

পাঁচ মিনিটে। 

মিশে গেলে পঞ্চভূতে

ফেলে জীবনের সকল ভার 

এমন শান্ত, শীতল মৃত্যু দেখেছো কি

তোমরা 

কখনো আর? 


তারপর থেকে বাবাকে খুঁজি

আকাশে আকাশে তারায় তারায়। 

অনন্তের পাড়ে চলে গেছ তুমি

করে  গেছ একেলা আমায়! 

বিষয় : কবিতা