কবি মোহন রায়হানের ৬৪তম জন্মদিন আজ

প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২০     আপডেট: ০১ আগস্ট ২০২০   

অনলাইন ডেস্ক

দ্রোহ, প্রেম, প্রতিবাদ এবং স্বাধীনতা, সাম্য ও বিপ্লবের কবি মোহন রায়হানের ৬৪তম জন্মদিন আজ। স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনের সংগ্রাম ও তৎপরবর্তী সামরিক শাসনবিরোধী লড়াইয়ের গর্ভ থেকে মোহন রায়হানের অভ্যুদয়। বস্তুত মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সাম্য, মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক ন্যায় বিচারের স্বদেশ গঠনের আকাঙ্ক্ষা ও বিক্ষোভ মোহন রায়হানের কবিতাকে ধারণ করে মূর্ত হয়ে উঠেছিল। 

১৯৭১ সাল ছিল হাজার বছরের বাঙালি জীবনের এক জাগরণ কাল। এ সময় ‘একাত্তরের হাতিয়ার গর্জে উঠুক আরেকবার’, ’অস্ত্র জমা দিয়েছি ট্রেনিং জমা দেইনি’ প্রভৃতি স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে দেশ। অর্জিত স্বদেশ পুনর্দখলের সেই লড়াইয়ের ভাষার উপর্যুপরি নির্মাণ ঘটেছে মোহন রায়হানের কবিতায়। ‘জ্বলে উঠি সাহসী মানুষ’, ‘ফিরে দাও সেই স্টেনগান’ 'আমাদের ঐক্য আমাদের জয়' একদা তার কণ্ঠে ভর করে গর্জে উঠেছিল বাঙালির আর্ত পুনর্যুদ্ধের ডাক। মোহন রায়হানের ‘ফিরে দাও সেই স্টেনগান’ বাঙালির রাজনৈতিক চেতনার ধারাবাহিক উচ্চারণ। 

তিনি যখন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র, মফস্বলে স্কুল পালিয়ে যোগ দেন ছয় দফা আন্দোলনের মিছিলে। ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে মোহন তখন তুখোড় কিশোর ছাত্রনেতা। পরিণাম হিসেবে ভোগ করতে হয় পাক-পুলিশের বেদম রক্তাক্ত প্রহার। মাত্র ১৫ বছর বয়সে যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে। স্বাধীনতার পর যুক্ত হন জাসদ রাজনীতির সঙ্গে। ১৯৭৩ সালে আইএ পরীক্ষা দিতে হয়েছে জেলখানা থেকে। গুম আর অসংখ্যবার শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন- পুলিশ, আর্মি আর দলবাজ সন্ত্রাসীদের হাতে। জেল খেটেছেন ১৩ বার। ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী লড়াইয়ে শামিল ছিলেন সামনের সারিতে। যুক্ত ছিলেন ২০১৩ সালের শাহবাগ আন্দোলনে। বাংলাদেশের রাষ্ট্র সংগ্রামের প্রতিটি লড়াই, সমস্ত চড়াই-উৎরাই, ক্ষোভ-বিক্ষোভ, লাঞ্ছনা ও নিস্পন্দিত দুষ্কালকে তিনি যোগ্য মূহূর্তে প্রতিনিয়ত ধারণ করেছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে মোহন রায়হানের ভূমিকার বিশেষ তাৎপর্য এখানেই। 

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ এরশাদ সামরিক শাসন জারি করা মাত্র মধুর ক্যান্টিন থেকে প্রথম প্রতিবাদী মিছিল বের হয় মোহন রায়হানের নেতৃত্বে। ১৯৮৩-এর ১১ জানুয়ারি সামরিক স্বৈরশাহীর বিরুদ্ধে প্রথম ছাত্রবিদ্রোহের নেতৃত্বও দেন তিনি। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, জাতীয় কবিতা পরিষদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তিনি। বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব, লেখক শিবির, অরণি সাংস্কৃতিক সংসদ, প্রাক্সিস অধ্যয়ন সমিতি, সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ কমিটি, একাত্তুরে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিসহ বহু সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠা, নেতৃত্বে ও আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিলেন তিনি। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল- জাসদের কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন। মানুষের স্বাস্থ্যসেবা অধিকারে গড়ে তুলেছেন বিনা অপারেশনে হৃদরোগ চিকিৎসা হাসপাতাল ও বিষমুক্ত নিরাপদ খাদ্যের আন্দোলন।

জ্বলে উঠি সাহসী মানুষ, আমাদের ঐক্য আমাদের জয়, সামরিক আদালতে অভিভাষণ, আর হল না বাড়ি ফেরা, ফিরে দাও সেই স্টেনগান, শকুন সময়, সবুজ চাদরে ঢাকা রক্তাক্ত ছুরি, নিরস্ত্রীকরণ কবিতা, কবি কাপুরুষ হলে পৃথিবীতে নামে অন্ধকার, রক্তসিক্ত অশ্রুজবা, মেঘের শরীরে যাব, শাহবাগ ডেকেছে আমায়, কালো আকাশে রক্তাক্ত মেঘ- প্রভৃতি তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। তিনি দীর্ঘদিন সম্পাদনা করেছেন সাপ্তাহিক দিকচিহ্ন ও কবিতাপত্র দিকচিহ্ন।