- শিল্পমঞ্চ
- প্রতিবাদের শুরুটা হোক পরিবার থেকেই
প্রতিবাদের শুরুটা হোক পরিবার থেকেই

#
ভোর ছয়টার অ্যালার্মে ঘুম ভাঙে আদিবের। ভোরের আকাশ আর বাতাসের গন্ধ গায়ে না মাখলে তার সকালটাই নাকি পানসে হয়ে যায়। তাই তো নামাজ সেরেই ছাদে যাওয়া তার রোজকার অভ্যাস। এই লকডাউন পরিস্থিতিতেও তার অভ্যাসটা পাল্টায়নি।
তাছাড়া আজকের দিনটা আদিবের কাছে বিশেষ একটি দিন। সে আজ ষোলোতে পা রাখল। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান সে। বাবা উপজেলা চেয়ারম্যান হওয়ায় এলাকায় তাদের বেশ প্রতিপত্তি। যদিও এসব বিষয়ে বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই আদিবের। সে পেয়েছে মায়ের স্বভাব। সাদামাটা এবং সরল।
আদিব ছাদের রেলিং ধরে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। হঠাৎ গাড়ির হর্নে চমকে উঠলো সে। খেয়াল করল বাড়ির সামনে একটা ছোট্ট ট্রলি থেমেছে। আর গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে তাদের ম্যানেজার কাজের লোকটিকে উচ্চস্বরে হুকুম দিচ্ছে, 'গাড়ি ভর্তি চালের বস্তা আর তেলের প্যাকেট। সাবধানে স্টোররুমে নিয়ে যাবি।'
আদিব বুঝতে পারল করোনার জন্য অনুদান এসেছে। কিন্তু অনুদানের সামগ্রী তাদের স্টোররুমে কেন থাকবে!
প্রশ্নটা মনে হতেই আদিবের মনখারাপ হয়ে গেল। সে মনে হয় কেন-এর উত্তরটা খুঁজে পেয়েছে। আদিব আর ছোট্টটি নেই। সে অনেক কিছুই বুঝতে শিখেছে। আর বুঝতে শিখেছে বলেই হয়তো তার চোখে দৃশ্যমান বাবার দুর্নীতিগুলো তার হৃদপিণ্ডে তীরের মতো বেঁধে।
আদিব মুহূর্তেই বুঝতে পারল তার এই জন্মদিনটা হবে মনখারাপের জন্মদিন। সে ধীর পায়ে রুমে ফিরে দরজা আটকে দিল।
-কিরে আদিব! নাস্তা করবি না? তোর জন্য পায়েস করেছি যে..!
দরজার ওপাশে মায়ের গলা
-পেটটা যেন কেমন করছে মা... খাব না।
-কিরে, শরীর খারাপ?
-উহু... কিছু হয়নি। তুমি যাও তো!
দুপুরেও আদিব কিছু খেলো না। মা অনেক করে বলার পরেও না। তার মনে যে উত্তাল ঝড় বইছে আদিব জানে, এই ঝড় শান্ত হতে সময় লাগবে।
#
রফিক সাহেব সাধারণত রাত ১২টার আগে বাড়ি ফেরেন না। কিন্তু আজ ফিরলেন ৯টায়। ছেলের জন্মদিন বলে কথা! রাতে একসাথে খাবেন।
-আদিব, বাবা খেতে আয়।
বাবার আদুরে গলা আদিবের কানে আসলো।
আদিব কোনো উত্তর না দিয়েই চুপচাপ খাবার টেবিলে বসে পড়ল। কিন্তু যে বিমর্ষতা তার চোখে-মুখে লেগে আছে তা আড়াল করা সত্যিই কষ্টকর।
-কী হয়েছে, খোকা? শুনলাম, সকাল থেকে কিছুই খাসনি! গিফট পাসনি দেখে মনখারাপ? হা হা হা! খেয়ে নে... তোর জন্য সারপ্রাইজ গিফট আছে!
আদিব এখনো চুপ। মা প্লেটে খাবার সাজিয়ে দিল...
-নে বাবা... খেয়ে নে তো!
আদিব মাথা নিচু করেই প্লেটটা হাত দিয়ে সরিয়ে রেখে বলল-
- অন্যের খাবার আমার গলা দিয়ে নামবে না, মা।
আদিব বুঝতে পারল দু'জোড়া চোখ তার দিকে অপলক তাকিয়ে আছে অবিশ্বাসের অনুভূতি নিয়ে।
-আমার সারপ্রাইজ গিফট লাগবে না বাবা। গরিবের অধিকার কেড়ে নিয়ে যে দামি গিফট আর খাবার আমাদের বাসায় আসে সেসব আমি ছুঁয়েও দেখতে চাই না।
কথা শেষ করেই আদিব ধীর পায়ে তার রুমে ফিরে এলো।
রফিক সাহেব বাকরুদ্ধ হয়ে টেবিলেই বসে রইলেন কিছুক্ষণ। কী করবেন তিনি? ছেলেকে বকবেন? শাসন করবেন? না-কি সেই অধিকার তিনি হারিয়ে ফেলেছেন? বিবেকের কাঠগড়ায় তিনিই যে আজ বন্দি। একমাত্র ছেলের কয়েকটি কথাই যেন তার বুকটাকে ঝাঁঝরা করে দিয়েছে।
#
পরদিন সকালবেলা। আদিব যথারীতি ছাদে গেল কিন্তু রেলিংয়ের পাশে দাঁড়াতেই সে যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। তাদের বাড়ির সামনে ত্রাণের সামগ্রী বিতরনের আয়োজন চলছে!
আদিব একছুটে বাবার রুমে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরল। বাবা তার ছেলের মাথায় হাত রাখলেন।মনের অজান্তেই তার চোখ সিক্ত হয়ে উঠলো।
আদিব আনন্দে চিৎকার করে উঠল
-আমি আমার সারপ্রাইজ গিফট পেয়ে গেছি বাবা। আর কিছুই চাই না... কিচ্ছুটি না...
লেখাটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ ইয়েস গ্রুপ আয়োজিত করোনাকালে দুর্নীতি ও প্রতিরোধের গল্প শিরোনামে 'দুর্নীতিবিরোধী গল্প লেখা' প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করেছে।
লেখক: শিক্ষার্থী, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
বিষয় : গল্প দুর্নীতি বিরোধী গল্প
মন্তব্য করুন