শিক্ষা একটি অধিকার। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭তম ধারার মাধ্যমে সব শিশুর জন্য শিক্ষাকে সম্পূর্ণ অবৈতনিক এবং বাধ্যতামূলক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আজকের বাংলাদেশে একদিকে যেমন দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন ঠিকই হচ্ছে কিংবা দেশে শিক্ষার হারও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে চলছে, কিন্তু অন্যদিকে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত সেই 'দেশের প্রয়োজন' মেটানোর জায়গাটিতে অনেকটাই ব্যর্থ বলে প্রমাণিত হচ্ছে। সম্প্রতি বাংলাদেশে যদিও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে, তথাপি আমাদের শিক্ষা জগতে অনুকরণীয় এবং পথিকৃৎ শিক্ষকের সংখ্যা একেবারেই নগণ্য। একজন আদর্শ শিক্ষকই পারেন কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মাঝে জ্ঞানপিপাসা এবং নৈতিকতার বীজ বপন করতে; আর ঠিক এই জায়গাটিতেই আমাদের দেশে ধীরে ধীরে একটা শূন্যতা তৈরি হচ্ছে। কারণ, আমাদের শিক্ষা জগতে সেই সব অনুকরণীয় শিক্ষকের অভাব বেড়েই চলেছে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে শিক্ষাকে কীভাবে একটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং নৈতিক আন্দোলনে পরিণত করা যায়, তার একটি অনন্য সাধারণ উদাহরণ তৈরি করে গেছেন সদ্য প্রয়াত বাংলাদেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব এবং সামাজিক আন্দোলনের পুরোধা অধ্যাপক আমীর আহাম্মদ চৌধুরী রতন, যিনি সবার কাছে 'রতন দা' নামেই পরিচিত ছিলেন।
'রতন দা' ২৮ নভেম্বর ১৯৪৩ সালে ময়মনসিংহে জন্মগ্রহণ করেন। তার আদি বাড়ি ফেনী জেলায় হলেও জন্ম ও বেড়ে ওঠা আর কর্মক্ষেত্র- সবই এই ময়মনসিংহকে ঘিরে। তার চিন্তা-চেতনা সবটাই যেন দখল করে ছিল এই ময়মনসিংহ- তার শিল্প, সংস্কৃতি, ক্রীড়া আর মানুষ। অধ্যাপক আমীর আহাম্মদ চৌধুরী ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতকোত্তর শেষ করে ১৯৬৪ থেকে ১৯৮৩ পর্যন্ত ময়মনসিংহের গৌরীপুর কলেজে অধ্যাপনা করেন। ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৬ পর্যন্ত উক্ত কলেজটিতে অস্থায়ী অধ্যক্ষের দায়িত্বও পালন করেছিলেন। ইতোমধ্যে ১৯৫৯ সালে তার বিশেষ উদ্যোগে গড়ে তোলেন 'ময়মনসিংহ মুকুল ফৌজ' ক্লাব। এই ক্লাবটি ময়মনসিংহ তথা তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তান এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের ক্রীড়া এবং সংস্কৃতি জগতে একটি বিরাট ভূমিকা পালন করে। 'সত্য-সুন্দর-সাম্য-শিক্ষা'- এই আদর্শকে সামনে রেখে ১৯৭০ সালে মুকুল ফৌজ থেকে অধ্যাপক আমীর আহাম্মদ চৌধুরী রতনের নিরলস প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে আজকের মুকুল নিকেতন বিদ্যালয়টি। অপরিসীম ধৈর্য, অনুকরণীয় শৃঙ্খলা আর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সেদিনের সেই পর্ণকুটিরে সজ্জিত মুকুল নিকেতন আজ সুবিশাল অট্টালিকার ওপরে দাঁড়িয়ে। ছাত্রছাত্রীদের শুধু শিক্ষাই নয়, পাশাপাশি তাদের যোগ্য, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, কর্তব্যপরায়ণ, চরিত্রবান, আত্মনির্ভরশীল, বিনয়ী ও সৎসাহসী করে গড়ে তুলতে বিদ্যালয়টি পুথিগত বিদ্যার পাশাপশি শৃঙ্খলা, নিয়মানুবর্তিতা, শরীরচর্চা, ক্রীড়া, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপরে বিশেষ গুরুত্বারোপ করে থাকে। আশির দশক থেকে মুকুল নিকেতন বিদ্যালয়টি অধ্যাপক আমীর আহাম্মদ চৌধুরী রতন স্যারের নেতৃত্বে একটি অত্যন্ত সুন্দর পরিবেশে শিক্ষা প্রদানের পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের মাঝে সংস্কৃতি চর্চা, ক্রীড়া এবং সমাজসেবায় উদ্বুদ্ধ করার মাধ্যমে একটি নৈতিক জাতি গঠনে বিশেষ অবদান রেখে আসছে। এই কৃতিত্বের স্বপ্নদ্রষ্টা অধ্যাপক আমীর আহাম্মদ চৌধুরী রতন।
সদা নির্লোভ, আদর্শিক এই মানুষটির জীবন মোটেও সহজ ছিল না। পথে পথে বাধা-বিপত্তি এসেছে বার বার; কিন্তু সৎ সাহস আর দৃঢ় সংকল্পের কাছে তা কখনোই তার পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। আইয়ুব খান-বিরোধী আন্দোলনে তার নেতৃত্বে ময়মনসিংহে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক আন্দোলন, মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ময়মনসিংহ এবং তার তৎকালীন কর্মস্থল গৌরীপুর অঞ্চলে বলিষ্ঠ সাংগঠনিক নেতৃত্ব এবং পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক গ্রেপ্তার হয়ে তার অমানুষিক নির্যাতন ভোগ, ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ময়মনসিংহের রাজপথে তার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব- এ সবই যেন রূপকথার গল্পের মতোই মনে হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধে তার পিতামহসহ মোট ছয়জন নিকটাত্মীয় শহীদ হন। অধ্যাপক আমীর আহাম্মদ চৌধুরী রতন গত ১৫ অক্টোবর রাতে শ্যামলীর বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। আজ তার ৭৮তম জন্মদিন। শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় স্মরণ করছি তাকে।

 শিক্ষক, ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিক্স

মন্তব্য করুন