আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর দ্বারপ্রান্তে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত রক্তস্নাত এই বাংলাদেশের আজকের বাস্তবতায় প্রশ্ন দাঁড়ায়- এই কি একাত্তরে রক্তমূল্যে অর্জিত আমাদের স্বদেশ?

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সুনির্দিষ্ট কিছু অঙ্গীকার ছিল। স্বাধীনতা অর্জনের পর আরও কিছু নতুন প্রত্যয়ও যুক্ত হয়। স্বাধীনতা অর্জনের আজ প্রায় পাঁচ দশক পর প্রিয় স্বদেশে দাঁড়িয়ে মনে হয়, আমাদের রাজনীতিক ও রাষ্ট্র পরিচালকদের কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যর্থতা, ভুল কিংবা হীনস্বার্থের কারণে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি, ধর্মান্ধগোষ্ঠী, মৌলবাদীরা নানা ক্ষেত্রে সুযোগ নেয়। পঁচাত্তরের মর্মান্তিক অধ্যায়ের পর দীর্ঘদিন যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন, তারা নিজেদের দিকটাই বড় করে দেখেছেন দেশ-জাতির স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে। স্বাধীন দেশে এই উল্টো যাত্রায় অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষত সৃষ্টি হয়। তবে সবচেয়ে বড় ক্ষত সৃষ্টি হয় রাজনীতির ক্ষেত্রে এবং এর বিরূপ মূল্য এখনও দিতে হচ্ছে। এক পর্যায়ে ক্ষমতার পালাবদল ঘটল, মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দলের হাতে দেশের শাসনভার অর্পিত হলো।

বিগত এক যুগেরও বেশি সময়ে দেশের উন্নয়নের চিত্রও আশাজাগানিয়া এবং নানা ক্ষেত্রে অগ্রগতির ধারা এই করোনা দুর্যোগকালেও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তাতেও সম্ভাবনার বাংলাদেশকেই দেখি। তবে এর পাশাপাশি এই সত্যও অস্বীকার করা যাবে না- এতসব ইতিবাচকতার মধ্যেও কিছু নেতিবাচকতার কারণে আমাদের জন্য বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আজ ধর্মান্ধ, মৌলবাদী গোষ্ঠীর যে আস্ম্ফালন লক্ষ্য করা যাচ্ছে, এর পশ্চাৎকারণ অনেক বিস্তৃত। পঁচাত্তরের পর ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য খুলে গেল রাজনীতির বদ্ধ কপাট। তারপর পালাক্রমে দেশের শাসনভার যাদের ওপর অর্পিত হলো, তারা নিজেদের হীন স্বার্থে তাদের নানাভাবে প্রশ্রয় দিতে থাকলেন; কেউ কেউ ব্যবহারও করলেন। ধর্মান্ধ-মৌলবাদীদের অন্যায়-অযৌক্তিক দাবির কাছে তারা আত্মসমর্পণ করে যতটা ক্ষতি করলেন তাদের ভাবাদর্শের রাজনীতির, এর চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি করলেন দেশ-জাতির। প্রগতিশীল ও মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ-চেতনাও এ কারণে আঘাতপ্রাপ্ত হলো। হেফাজতের দাবিতে পাঠ্যপুস্তকে পাঠ্যসূচি পরিবর্তন, সুপ্রিম কোর্ট থেকে ভাস্কর্য অপসারণের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত কাজগুলো একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক সরকারের যে মারাত্মক ভুল ছিল, তা নতুন করে বলার কিছু নেই।

দেশে এখন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির করোনার কারণে। প্রায় গোটা বিশ্ব আজ এক বৈরী পরিস্থিতির শিকার। কিন্তু ধর্মান্ধ মৌলবাদীরা তো বসে নেই; তারা বিভিন্ন নামে-বেনামে গোপনে গোপনে যূথবদ্ধ! অনেকে প্রকাশ্যে হুঙ্কারও ছুড়ছে। সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য স্থাপন নিয়ে তাদের কেউ কেউ প্রকাশ্যে যে উগ্রবাদী মন্তব্য করেছেন, তা যুগপৎ বিস্ময়কর ও প্রশ্নবোধক।

ধর্মের ঝান্ডাধারী দল হেফাজতে ইসলামের সম্প্রতি বাঁক পরিবর্তন ঘটেছে। একটি সাধারণ ধর্মীয় দল থেকে দলটি এখন পরিণত হয়েছে ধর্মীয় রাজনৈতিক দলে। তাদের মধ্যে আবার বিএনপি-জামায়াতের মতাদর্শধারী কারো কারোর প্রবেশের পাশাপাশি তারা নিজেরাও বিভক্তির গণ্ডিবদ্ধ। আমাদের দুর্ভাগ্য, বাংলাদেশের জন্মসৃষ্টির ইতিহাস ও তৎপরবর্তী অঙ্গীকারের বাংলাদেশে অশুভ মেরুকরণের ভয়াবহ বিপদচিহ্ন ক্রমে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। হেফাজতের এক নেতা সম্প্রতি হুঙ্কার ছুড়েছেন, তার বাবার ভাস্কর্য স্থাপিত হলেও টেনে-হিঁচড়ে ফেলে দেবেন।

রাজনীতিতে ধর্মীয় ভাবাবেগের ব্যবহার যে কী বিপজ্জনক ও মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে, তার মূল্য ইতোমধ্যে পাকিস্তান, সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তানসহ আরও কয়েকটি দেশ দিয়েছে। যে বা যারা ভাস্কর্য নিয়ে এখন নতুন নতুন 'ফতোয়া' দিচ্ছেন, গলাফাটা বক্তব্য রাখছেন, তাদের নিশ্চয়ই অজানা নয়, বিশ্বের অনেক মুসলিম দেশেই দৃষ্টিনন্দন ভাস্কর্য রয়েছে। তুরস্কজুড়ে কামাল আতাতুর্কের ভাস্কর্য ছাড়াও রয়েছে আরও অনেক ভাস্কর্য। মালয়েশিয়া, কাতার, ইরান, ইরাক (ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের পর যদিও অনেক কিছু ভেঙে ফেলা হয়েছে), মিসর এমনকি সৌদি আরবেও অনেক দৃষ্টিনন্দন ভাস্কর্য রয়েছে। আমাদের দেশের ধর্মান্ধ-মৌলবাদীরা তো এ ব্যাপারে টুঁ শব্দটি করেন না।

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে উগ্রবাদীরা পরিস্থিতি যেদিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, এর পেছনে 'রাজনৈতিক' খেলা রয়েছে বলে মনে হয়। উগ্রবাদীদের আস্ম্ফালন রুখে দিতে ব্যর্থ হলে শুধু সুস্থ রাজনৈতিক চর্চাই নয়, আরও অনেক কিছুই হুমকির মুখে পড়তে পারে। এসব ব্যাপারে আর ছাড় দেওয়া সমীচীন হবে না। এর পেছনে কলকাঠি নাড়া হোতাদের চিহ্নিত করুন।

আরও বিস্ময়কর হলো, ধর্মান্ধ-মৌলবাদীদের এই আস্ম্ফালনের পরও আমাদের প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল ও সরকারের জোরালো তেমন কোনো কিছুই দৃষ্টিগ্রাহ্য হচ্ছে না? কেন তাদের এই নমনীয়তা? তারা কি এর ভবিষ্যৎ ভয়াবহতা সম্পর্কে এখনও সজাগ, সতর্ক নন? ধর্মান্ধ-মৌলবাদীদের কত তাণ্ডব আমরা স্বাধীন বাংলাদেশে এ পর্যন্ত দেখলাম। এর মূল কারণ আমাদের প্রগতিশীল রাজনীতি চর্চার ক্ষেত্রে অসংগতি-ব্যর্থতা। যারা নতুন করে ভাস্কর্যকে ইস্যু করে সমাজে অসহিষ্ণুতা সৃষ্টির চেষ্টায় লিপ্ত, তারা তো চিহ্নিত। লক্ষ্য করলে দেখা যায়, অন্ধত্ব আর ধর্মান্ধতা এমন এক জায়গায় পৌঁছে গেছে, নাটক-চলচ্চিত্রে কী সংলাপ বলা হবে, সেখানেও ধর্মকে টেনে আনছে মহল বা গোষ্ঠী বিশেষ। উদারতা আর প্রগতির পথ মসৃণ করতে চাই প্রগতিশীল সবার উদ্যোগে নবজাগরণ সৃষ্টির জোরদার প্রয়াস চালানো।

আমরা যেন ভুলে না যাই, অধর্ম আর অন্যায়ের বিরুদ্ধেই ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। ২৪ বছর পাকিস্তানিরা ধর্মের নামে বাঙালির ওপর শোষণ-নিপীড়ন চালিয়েছে। ধর্মান্ধদের আস্ম্ফালনে আমাদের বসে থাকার কোনো অবকাশ নেই। রাজনীতির নানা সমীকরণ এবং ধর্মান্ধ-মৌলবাদীদের সঙ্গে আপসের বিষয়গুলো সচেতন মানুষ মাত্রেরই জানা।

আমরা তো এমন বাংলাদেশ চাইনি। ধর্মান্ধতা মনুষ্যত্ব আর মানবতাকে ধ্বংস করে দেয়। ধর্মান্ধতা কত ভয়ংকর হতে পারে এর বহু নজির আমাদের সামনে আছে। ধর্মান্ধতা কোনো পবিত্র ধর্মের জন্যই মঙ্গলজনক নয়। ধর্মের নাম ভাঙিয়ে সব রকম ধ্বংসাত্মক ও নেতিবাচকতার পথ রুদ্ধ করতেই হবে। এই দায় যেন প্রগতিশীল রাজনীতিকরা ভুলে না যান।

এখন আত্মোপলব্ধি খুব জরুরি। আমরা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত সেই বাংলাদেশে ফিরে যেতে চাই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ-জাতির অনেক উন্নয়ন-অগ্রগতির অন্যতম মূল কারিগর। অন্ধত্ব, ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে তার কঠোর অবস্থান ভিন্ন গত্যন্তর নেই। ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এগোতে হবে। সরকারের মনে রাখা উচিত, ধর্মান্ধ-উগ্রবাদীরা কখনোই তাদের রাজনীতির সহায়ক শক্তি হবে না। রাজনীতির ভুল-ত্রুটির সংশোধন করতে হবে রাজনীতির মধ্য দিয়েই। তাই সর্বাগ্রে চাই রাজনীতিকদের স্বচ্ছতা-দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা। 'এখনও গেল না আঁধার'- বিজয়ের মাসে এমন উচ্চারণ করতে চাই না। আলো চাই, আলো। চারদিক আলোকিত হোক। দূর হোক অন্ধকার।

শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক

মন্তব্য করুন