সংবিধানের চার মূলনীতি- জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র। একাত্তরে এই মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে দখলদার পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও সামরিক বাহিনীকে পরাজিত করে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং বীর মুক্তিযোদ্ধারা ছিলেন এই মূলনীতির স্বপ্নদ্রষ্টা। তাদের উদ্দেশ্য ছিল অসাম্প্রদায়িক, সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।
অথচ স্বাধীন বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তীর প্রাক্কালেও সেই মূলনীতির প্রতিফলন ঘটেনি রাষ্ট্র ও সমাজে। বরং সংবিধান ও রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামোতে দেখা দিয়েছে নানা বৈপরীত্য। দেশ স্বাধীন হওয়ার সাড়ে তিন বছরের মাথায় পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী জাতীয় চার নেতাকে হত্যার মধ্য দিয়ে শুরু হয় এই সাংবিধানিক বৈপরীত্য।
এমনকি এক যুগ ধরে বঙ্গবন্ধুর গড়ে তোলা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকলেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আদর্শ বিকাশের পথপরিক্রমা মসৃণ হয়নি। বরং এই সময়ে উন্নয়ন ও অগ্রগতির পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং ধর্মভিত্তিক দল ও সংগঠনগুলোর রাষ্ট্র ও সংবিধানবিরোধী অপতৎপরতা নিয়ন্ত্রণেই ব্যস্ত থাকতে হয়েছে ক্ষমতাসীন দলটিকে।
মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বিস্তারে সরকারিভাবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ তিনটি প্রতিষ্ঠান থাকলেও মূলত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের গেজেটভুক্তি ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে ভাতা প্রদান ও আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে নানা কার্যক্রম চালাতেই সক্রিয় এগুলো। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্বকণ্ঠে মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথা ও মুক্তিযুদ্ধের দালিলিক তথ্য সংরক্ষণ এবং মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণা ও জাদুঘর নির্মাণের কাজ শুরু করতে পারেনি এসব প্রতিষ্ঠান। প্রণীত হয়নি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ চর্চার পাঠ্যসূচিও। এসব নিয়ে যে ধরনের গবেষণা করা প্রয়োজন তাও যথাযথভাবে হচ্ছে না। ফলে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আদর্শের বিষয়টি এখনও তৃণমূলে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ছড়িয়ে পড়েনি।
মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কোনো দল বা গোষ্ঠীর বিষয় নয়; এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধারণ করার বিষয়। দলমত নির্বিশেষে চিন্তাভাবনা ও কর্মে জাতির পিতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যাতে সর্বজনীনতা পায়- এমন একটি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
জাতীয় চার মূলনীতি প্রসঙ্গে ১৯৭২ সালের ২২ নভেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, 'জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা- এই চারটি মূলনীতি দিয়েই বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। এই চারটি মৌলিক নীতির ধারায় বাংলাদেশ পরিচালিত হবে। এটিকে মুজিববাদ বা অন্য যে কোনো নামে অভিহিত করা হোক না কেন, আমার কিছু বলার নেই। আমি এই চার নীতিতে বিশ্বাসী।' দেশ স্বাধীন হওয়ার আগেও বঙ্গবন্ধু এসব মূলনীতি ব্যাখ্যা করেছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ওই মূলনীতিকেই ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছে।
একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সংবিধান সংশোধন করে জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রীয় মূলনীতি থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ বাতিল করেছেন, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল গঠনের ওপর নিষেধাজ্ঞাও প্রত্যাহার করেছেন। একইভাবে আরেক উর্দিধারী জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদও সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে ইসলামকে 'রাষ্ট্রধর্ম' ঘোষণা করেছেন। এসবের সঙ্গে প্রকৃত ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। এসব কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে সংবিধানটি এখন জগাখিচুড়িতে পরিণত হয়েছে। এই আদর্শ বিচ্যুতি দেশ ও জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক।
বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, "অনেক অর্জন থাকলেও আদর্শিক সংকট প্রকট। এই আদর্শিক বিচ্যুতি আমাদের পীড়া দেয়। কারণ বঙ্গবন্ধু বাহাত্তরের ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে বলেছিলেন, 'বাংলাদেশ আদর্শিক রাষ্ট্র হবে।' তিনি সংবিধানের চারটি মূলনীতিও দিয়েছিলেন। একইভাবে একাত্তরের ১০ এপ্রিল স্বাধীন বাংলাদেশের ঘোষণাপত্রে তিনটি লক্ষ্য- সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা বলা হয়েছিল। স্বাধীনতার ৫০ বছরের প্রাক্কালে প্রশ্ন আসছে- সেগুলোর কতটা সমাজ ও রাজনীতিতে বিস্তৃত হয়েছে। যদি বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ প্রতিষ্ঠিত করতেই হয়, তাহলে অবশ্যই বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যেতে হবে।" তার মতে, এখনকার উন্নয়ন ও অগ্রগতির রাজনীতি হয়তো রাজনীতির জন্য ভালো; কিন্তু দেশের জন্য নয়। বঙ্গবন্ধুর দৃষ্টিতে রাজনীতি ছিল মানুষের কল্যাণে। রাজনীতি যদি 'ক্ষমতার কল্যাণ' করে তাহলে সমস্যা প্রকট হবে।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ডা. সারওয়ার আলী বলেন, বাংলাদেশ একটা সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে উন্নীত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বিস্ময়কর সাফল্য এসেছে। কিন্তু যে মৌলিক লক্ষ্য নিয়ে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বীর মুক্তিযোদ্ধারা দেশ স্বাধীন করেছেন, সেখান থেকে রাষ্ট্র এবং সমাজ উভয়ই পশ্চাৎপসরণ করছে। কারণ রাজনীতিবিদ ও সামাজিক নেতাদের কৌশলের কাছে নীতি পরাস্ত হয়েছে।
শ্রেণি-বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন ছিল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়েলথ-এক্সের গত বছরের তথ্যমতে, অতি ধনীর বৃদ্ধির হারের দিক থেকে বাংলাদেশ আরও আগে থেকেই বিশ্বে প্রথম স্থানে রয়েছে। পাশাপাশি ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ধনী মানুষের সংখ্যা ১১ দশমিক ৪ শতাংশ হারে বাড়বে- যে হার সারাবিশ্বে তৃতীয়। এসবের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, বঙ্গবন্ধুর কাছে দরিদ্র ও সাধারণ মানুষ ছিল মুখ্য। তিনি চেয়েছিলেন তারা যাতে সচ্ছল জীবনযাপন করে। কিন্তু এখনকার রাজনীতি বিত্তশালীদের দখলে। মন্ত্রী-এমপিদের অধিকাংশই ব্যবসায়ী। তাদের কেউ আগে রাজনীতি করেনি। যার প্রভাব রয়েছে রাষ্ট্রের প্রশাসন কাঠামোতে। তাই এখনও শ্রেণি-বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়া সম্ভব হয়নি।
আদর্শ চর্চায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের সংকট রয়েছে- এমন মন্তব্য করে বিশিষ্ট গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, বঙ্গবন্ধুকে জাতির স্থপতি হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়াটা গর্হিত 'রাজনৈতিক অপরাধ'। যেটি কোনো কোনো দল অবিরাম করে চলেছে। সব দেশেই রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতাকে দলমতের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া হয়। তার মতে, বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোনো বিভাজন থাকা উচিত নয়। বিরোধী দলগুলো একই আদর্শের মত-পথ অনুসরণ করলে দেশের রাজনৈতিক চর্চা সমৃদ্ধ হতো। তখন একমুখী দলের ওপর রাজনৈতিক নির্ভরশীলতা কমে গঠনমূলক রাজনীতির বিকাশ ঘটত।
সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের মহাসচিব হারুন হাবীব বলেন, আজও বাংলাদেশ দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও বৈষম্যে জর্জরিত। প্রধান কারণ, আমরা মুক্তিযুদ্ধ এবং জাতির পিতার মৌলিক আদর্শ চর্চায় সফলতা দেখাইনি। বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ মুখের স্লোগান হয়েছে, কিন্তু অন্তরের স্লোগান হয়ে ওঠেনি।
বাহাত্তরের সংবিধান এখনও পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। শুধু আইন বিভাগ এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক পর্যায়ে সংবিধান পড়ানো হয়। একইভাবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়টি সম্প্রতি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকসহ সব পর্যায়ের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হলেও তা যথেষ্ট নয়। এ প্রসঙ্গে শিক্ষাবিদ শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী বলেন, গত কয়েক বছরে পাঠ্যসূচিতে খণ্ডিত আকারে হলেও কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। তবে এটি যথেষ্ট নয়। শিক্ষার প্রতিটি স্তরে 'বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ' নামে অন্তত ১০০ নম্বরের পাঠ্যসূচি করা প্রয়োজন। তাই সরকারকে বলব, এখনও সময় আছে। আদর্শিক পাঠ্যসূচির দিকে নজর দিন।
এ প্রসঙ্গে সম্প্রীতি বাংলাদেশের আহ্বায়ক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম মূলনীতি ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের সাংস্কৃতিক মুক্তি। জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সভ্যতার মুক্তি। সেখানে মূল দর্শন ছিল অসাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতা। বঙ্গবন্ধু স্পষ্ট করেই বলেছিলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। এটি পৃথিবীর ইতিহাসে 'ইউনিক'। বিভিন্ন সময়ে এই দর্শন নিয়ে ষড়যন্ত্র হয়েছে, এখনও হচ্ছে। অনেক আঘাত এসেছে। কিন্তু সম্মিলিতভাবে এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। তাহলেই বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হবে।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আ. ক. ম. মোজাম্মেল হক বলেন, স্বাধীনতাবিরোধী চক্র ক্ষমতায় থেকে নানাভাবে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির মাধ্যমে জাতিকে বিভ্রান্ত করেছে। তবে বর্তমান সরকার বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ ও আদর্শ চর্চায় সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে। এটি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় বা সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে জনগণকে সম্পৃক্ত করে আদর্শ চর্চায় নানা কর্মসূচি গ্রহণের প্রস্তুতি চলছে বলেও জানান তিনি।

মন্তব্য করুন