মমিনুল হক। একজন নিভৃতচারী মানুষ। দীর্ঘদিন ধরে যারা তাকে চেনেন, জানেন, যার স্পর্শ, অবয়ব সবকিছুই সজীব, যার নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে যাদের অনন্ত সহবাস, তারাও হঠাৎ মমিনুল হককে তার এই কেতাবি নামে তাৎক্ষণিকভাবে স্মৃতির আয়নায় দাঁড় করাতে পারবেন না। তবে মমিনুল হকের সঙ্গে একটিমাত্র শব্দ যোগ করা গেলে অর্থাৎ মমিনুল হক খোকা বললে তাৎক্ষণিকভাবেই সবার স্মৃতিপটে জীবন্ত হয়ে উঠবে খোকাভাই। বঙ্গবন্ধু-বাংলাদেশ এই অত্যুজ্জ্বল ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য সংযোজন।

পঞ্চাশ বছর ধরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক ও পারিবারিক জীবনে ঘটে যাওয়া সব ইতিহাসের এক জীবন্ত ও নীরব সাক্ষী খোকাভাই। পারিবারিক সূত্রে খোকাভাই বঙ্গবন্ধুর মেজো ফুফুর কনিষ্ঠ পুত্র হলেও জাতির পিতার রাজনীতির সূচনালগ্ন থেকে তিনি ছিলেন একজন নীরব সহচর, বিশ্বস্ত আত্মজন ও সংকট সন্ধিক্ষণের নির্ভরযোগ্য তূর্য সেনানী। খোকাভাই বঙ্গবন্ধুকে ডাকতেন মিয়াভাই বলে। মিয়াভাই-খোকাভাইয়ের মেলবন্ধন ছিল পারস্পরিক বিশ্বাস, ভালোবাসা ও অহংকারের। ১৯৫৩ সালের ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ দিনগুলো থেকে শুরু করে সেই সর্বনাশা ১৯৭৫ সালর ১৫ আগস্ট পর্যন্ত এই বন্ধন ছিল অটুট। সেদিন ইতিহাসের কাঁটা থমকে দাঁড়িয়েছিল ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে, ঘাতকের কালো মেশিনগানের নিচে মুখ থুবড়ে পড়েছিল মানবতা, মানবসভ্যতা। ইতিহাসের এসব ঘটনা-দুর্ঘটনা, উত্থান-পতনে খোকাভাইয়ের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছিল।

কোনো ইতিহাস লেখার লোভে নয়, ইতিহাসের কাছে নিজের দায়বদ্ধতা কিছুটা হলেও লাঘব করার তাগিদ অনুভব করেছিলেন খোকাভাই। তাই বঙ্গবন্ধুর সব স্মৃতি গ্রন্থিত করার নিরলস প্রয়াস চালান তিনি। যাতে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে জীবন্ত হয়ে বিরাজ করে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকে জাতির পিতা হয়ে ওঠা, স্বাধীন সার্বভৌম দেশের রূপকার ও মানব ইতিহাসে সফল সার্থক জাতির স্রষ্টা হিসেবে আত্মপ্রকাশের ধারাবাহিক ইতিহাস। 

এ লক্ষ্যে খোকাভাই সিন্ধান্ত নিয়েছিলেন একটি বই রচনা করার। সেই চিন্তা-চেতনারই সোনালি ফসল- ‘অস্তরাগে স্মতি সমুজ্জ্বল বঙ্গবন্ধু, তার পরিবার ও আমি’। বইটির প্রথম প্রকাশ ফেব্রুয়ারি ২০০০, দ্বিতীয় সংস্করণ আগস্ট ২০০০, তৃতীয় মুদ্রণ নভেম্বর ২০০৯ এবং চতুর্থ মুদ্রণ জানুয়ারি ২০১৬।

ইতোমধ্যে বীর মুক্তিযোদ্ধা জাতির পিতার নির্ভরযোগ্য সহচর, সুখ-দুঃখের বিশ্বস্ত সুহৃদ, মমিনুল হক খোকা মৃত্যুবরণ করেছেন। এদিকে তার বইটির কোনো সংখ্যাও আর নেই। তাই মুজিব বর্ষের এই সময়ে ‘অস্তরাগে স্মতি সমুজ্জ্বল বঙ্গবন্ধু, তাঁর পরিবার ও আমি’ বইটির পুনর্মুদ্রণের উদ্যোগ নিয়েছেন তারই ছেলে এহসান হক।

বইটি নিয়ে এহসান হক জানান, দেশ-জাতি ও সমাজ সচেতনতার পাশাপাশি পিতার লালিত্য ইতিহাস ঐতিহ্য সংরক্ষণেও উদ্যোগ নেয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। তার এই সোনালি ফসল ঘরে তোলার একটি সুবর্ণ সুযোগ আসে বর্তমান মুহূর্তে, যখন বাংলাদেশ সুবর্ণ রেখায়। মহাসমারোহে জাতি পালন করছে মুজিববর্ষ। জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী পালনের সাথে সাথে আরেকটি মাহেন্দ্রক্ষণ চলছে জাতীয় জীবনে। আমরা আমাদের মহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছি। জাতীয় জীবনের এমন একটি হিরণ্ময় মুহূর্তে উদ্যোগ নিয়েছি শ্রদ্ধেয় পিতার গ্রন্থিত বইটির পুনর্মুদ্রণের।