কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ফুলে ফুলে ভরে ওঠে তার কফিন। এ সময় অনেকেই বলছিলেন, রাবেয়া খাতুন তার লেখার মধ্য দিয়ে মানুষের মাঝে বেঁচে থাকবেন। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধাজ্ঞাপন, চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে জানাজা শেষে রাজধানীর বনানী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

সোমবার বিকেলে তার দাফন সম্পন্ন হয়। এ সময় তার জামাতা প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুকিত মজুমদার বাবুসহ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

বার্ধক্যজনিত কারণে রোববার মারা যান রাবেয়া খাতুন। সকাল সাড়ে ১১টা থেকে বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চে অস্থায়ী বেদিতে তার শ্রদ্ধানুষ্ঠান শুরু হয়। শুরুতেই আওয়ামী লীগের পক্ষে দলটির সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন শ্রদ্ধা জানান। 

এ ছাড়া শ্রদ্ধা জানান তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, বাংলা একাডেমির সভাপতি শামসুজ্জামান খান ও মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, নাট্যজন মামুনুর রশীদ, নাসির উদ্দীন ইউসুফ প্রমুখ।

প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শ্রদ্ধা জানায় তথ্য মন্ত্রণালয়, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, বাংলা একাডেমি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, গণসঙ্গীতশিল্পী সমন্বয় পরিষদ, ঢাকা পদাতিক, জাতীয় কবিতা পরিষদ, চন্দ্রাবতী একাডেমি, পঞ্চভাস্বর, টইটুম্বর, জাসদ, বাংলাদেশ টেলিভিশন নাট্যশিল্পী সংসদ, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও পরিবেশক সমিতি, বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি। পৃথক বিবৃতিতে শোক জানিয়েছে সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ, মহিলা পরিষদ, যুব মৈত্রী, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও টিম অ্যাসোসিয়েট।

রাবেয়া খাতুনের চলে যাওয়া সাহিত্য অঙ্গনের অপূরণীয় ক্ষতি উল্লেখ করে তথ্যমন্ত্রী বলেন, 'বাংলা সাহিত্যে রাবেয়া খাতুনের মতো নারী লেখিকা খুব বেশি নেই। তিনি দেশের এমন একজন লেখিকা, যিনি বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। ৫০টির বেশি উপন্যাস, চারশ ছোটগল্প তিনি রচনা করেছেন। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, তিনি যে সময় সাহিত্যচর্চা শুরু করেছিলেন, তখন একজন নারীর পক্ষে সাহিত্যচর্চা এত সহজ কাজ ছিল না। সেই সময় সাহিত্যচর্চা শুরু করে তিনি বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে গেছেন।' 

তিনি আরও বলেন, 'রাবেয়া খাতুন শুধু নিজে লেখিকা হিসেবে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন তা নয়, তিনি তার পুরো পরিবারকে একটি সংস্কৃতিমনা পরিবার হিসেবে গড়ে তুলেছেন। ফরিদুর রেজা সাগর তারই সন্তান, যিনি শুধু টেলিভিশন পরিচালনা নয়, চ্যানেল আইর মাধ্যমে সংস্কৃতি অঙ্গনে দেশের কৃষ্টি-সংস্কৃতিকে ধারণ ও লালন করছেন। রাবেয়া খাতুনের অন্য সন্তান ও পরিবারের সবাই দেশের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন।'

রামেন্দু মজুমদার বলেন, 'আমাদের যারা পথ দেখিয়েছেন জাগতিক নিয়মে তারা চলে যাচ্ছেন। মহামারি করোনার কারণে এই চলে যাওয়া ত্বরান্বিত হচ্ছে। রাবেয়া খাতুন বর্ণাঢ্য ও দীর্ঘজীবন পালন করেছেন। তিনি সব ক্ষেত্রে সফল হয়েছেন। তিনি যে কাজ করেছেন, সে কাজ থেকে যদি তরুণরা উজ্জীবিত ও উৎসাহিত হয় তাহলেই তার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো সম্ভব হবে।'

ছবি: সমকাল

নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেন, 'পঞ্চাশের দশকে তিনি কলম ধরেছিলেন। সেই সময়টি ছিল পশ্চাৎপদ সময়। বাংলাদেশের অগ্রসরতার পেছনে তার অবদান রয়েছে। একজন নারী লেখক হিসেবে তার অনমনীয় মনোভাব উদাহরণস্বরূপ। তিনি শুধু নিজেই সফল হননি, নিজের সন্তানদেরও প্রতিষ্ঠিত করেছেন।'

হাবীবুল্লাহ সিরাজী বলেন, 'রাবেয়া খাতুন একজন সচেতন লেখক ছিলেন। তিনি সব সময় সমাজের নিপীড়িত মানুষের জন্য কলম ধরেছেন।'

অন্যপ্রকাশের প্রধান নির্বাহী মাজহারুল ইসলাম বলেন, 'সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই, যেখানে তিনি কাজ করেননি। শিশুসাহিত্য থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্য- সব ধরনের রচনা তিনি করেছেন। তিনি ছিলেন বহুমাত্রিক লেখিকা। মুক্তিযুদ্ধের ওপর তার লেখা অমর হয়ে থাকবে।'

পরিবারের পক্ষে মুকিত মজুমদার বাবু বলেন, 'আজ আপনারা যারা এখানে এসেছেন সবাই রাবেয়া খাতুনকে ভালোবেসে এসেছেন। লেখার মাধ্যমে তিনি আপনাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন। আপনাদের ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা তাকে আজীবন স্মরণীয় করে রাখবে।'

বাংলা একাডেমি থেকে রাবেয়া খাতুনের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় তেঁজগাওয়ের চ্যানেল আই কার্যালয়ে। চ্যানেল আইয়ে অনুষ্ঠিত জানাজায় অংশ নিয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে কথা বলেন মুকিত মজুমদার বাবু। তিনি রাবেয়া খাতুনের আত্মার শান্তি কামনায় দোয়া চান। দোয়া চান চ্যানেল আইর পরিচালক ও বার্তা প্রধান শাইখ সিরাজ। জানাজায় অংশ নেন চ্যানেল আই ও ইমপ্রেস গ্রুপের আরেক পরিচালক রিয়াজ আহমেদ খানসহ চ্যানেল আই পরিবারের সদস্যরা। এ ছাড়াও দেশের নানা অঙ্গনের বিশিষ্টজন অংশ নেন।

এ সময় পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ৮ জানুয়ারি বাদ জুমা চ্যানেল আই মসজিদে রাবেয়া খাতুনের আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া অনুষ্ঠিত হবে।

মন্তব্য করুন