বাংলা ভাষার অন্যতম কথাশিল্পী রাবেয়া খাতুন ৩ জানুয়ারি প্রয়াত হয়েছেন। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়ে দুটি রচনা পত্রস্থ হলো...
কুয়াশাচ্ছন্ন বিকেল। গাঢ়ভাবে শীত নামছে। উড়ো উড়ো খবর পাচ্ছি, খালাম্মা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাকে হাসপাতালে নিতে হবে। অ্যাম্বুলেন্স বাসার দিকে রওনা দিয়েছে। হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন রাবেয়া খাতুন। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক। তার সুযোগ্য সন্তান ফরিদুর রেজা সাগর দেশে নেই। তিনি চিকিৎসার জন্য সুদূর আমেরিকা গিয়েছেন। ফরহাদুর রেজা প্রবাল পুরো করোনাকালে আছেন তার স্থায়ী নিবাস অস্ট্রেলিয়ায়। কনিষ্ঠ কন্যা কাকলী আপা বস্টনে। জামাতা জহিরউদ্দিন মাহমুদও বস্টনে।
শুধু পাশে আছেন মুকিত মজুমদার বাবু এবং কেকা ফেরদৌসী। বাবু ভাই দ্রুত সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। শাইখ সিরাজ উৎকণ্ঠা নিয়ে যোগাযোগ রক্ষা করছেন। আমেরিকায় তখন মধ্যরাত। সাগর ভাই তখন কী করছেন আমরা উদ্বাস্তুর মতো এলোমেলো ছোটাছুটি করছি। কী করব বুঝে উঠতে পারছি না। সব এলোমেলো। দুঃসংবাদের মাত্রা বাড়তে লাগল। খালাম্মার শরীরের প্রেশার ও অক্সিজেনের প্রবাহ কমে যাচ্ছে। আমরা ক্রমেই অসহায় হয়ে পড়লাম। টেলিফোনে যোগাযোগ চলতে লাগল। মঈন, ইজাজ খান স্বপন, নান্টু, মোসাদ্দেক হাসান, হেলাল, জিয়া, ইমরান পরশ, দুশ্চিন্তায় অস্থির হয়ে উঠল।
আমার ভেতরেও ভয়াবহ অস্থিরতা কাজ করছে। কবি আসলাম সানীর সঙ্গে একটু শেয়ার করলাম। অস্থিরতা কমছে না। ঝড়ের পূর্বাভাসে যেমন পাখিরা অস্থির হয়ে ওঠে, আমিও তেমনই জলে ভাসা খড়কুটোর মতো চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে ভাসতে লাগলাম।
বিকেল ৫টার দিকে সেই অমোঘ সত্যের মুখোমুখি হতে হলো। রাবেয়া খাতুন আর নেই। রাবেয়া খাতুন বনানীতে নিজের বাসভবনে চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে পড়েছেন।
আকাশ তখন গভীর কুয়াশায় ঢাকা।
কী করব আমি? বনানীর দিকে ছুটে গেলাম। খালাম্মার কাছে যাব। তার পাশে বসব। আর কি খালাম্মা কথা বলবেন?
আমীরুল বসো।
স্মিত হাসি দেবেন। তারপর শুরু হবে আমাদের আড্ডা। বিভিন্ন বিষয়ে। সাহিত্য থেকে রাজনীতি, টিভি সিরিয়াল থেকে নূরজাহান বেগম, হুমায়ূন আহমেদ থেকে সৈয়দ হক, ইমদাদুল হক মিলন, আফজাল হোসেন, কক্সবাজার থেকে দুবাই, বালিদ্বীপ থেকে লন্ডন, বন্যাদি, সাগর মিয়া ( ফরিদুর রেজা সাগরকে আদর করে ডাকতেন), নিজের জীবনের গল্প, ভবিষ্যতে লেখার পরিকল্পনা। কত বিষয় নিয়েই আমাদের বিস্তারিত আড্ডা শুরু হতো। উত্তম, সুচিত্রা, অমিতাভ-শাহরুখ, হেমন্তের গান- আড্ডা ডালপালা মেলে দিত।
আড্ডা তো আর হবে না। বনানীর রাস্তায় হঠাৎ আমি স্থবির হয়ে গেলাম। শতবার আমি খালাম্মার সঙ্গে ভ্রমণসঙ্গী হয়েছি। একসাথে ঘোরাঘুরি। সব স্মৃতি আমাকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দিলো।
একসময় বনানীর বাসার প্রশস্ত করিডোরে পৌঁছলাম। যেন শূন্য প্রাসাদ। খালাম্মার ঘরে কি আর যাব? খাটের পাশে চেয়ার নিয়ে বসব? খালাম্মার লেখার টেবিল। সরু কলম। খালাম্মার প্রকাশিত কিছু বই। পুবদিকে খোলা জানালা। গাছের পাতার সবুজ উঁকিঝুঁকি। সামনে টেলিভিশন। এক পাশে বড় বড় ছবির অ্যালবাম। দেয়ালজুড়ে পারিবারিক ছবি। তিনি তার চার সন্তানকে জীবনের অধিক ভালোবাসতেন। সন্তানরা তার পাশে থাকলেই তিনি তৃপ্ত থাকতেন। অর্থবিত্ত কোনো মোহ ছিল না। কেবল সন্তানরা তার সর্বস্ব। সাগর ভাই ছিল খালাম্মার একমাত্র ভালোবাসা। অপরিসীম স্নেহ। খালাম্মার কাছে সাগর ভাই ছিলেন চিরশিশু। মাতা-পুত্রের এই গভীর সম্পর্ক নিয়ে উপাখ্যান রচিত হতে পারে। মাকে ভালোবাসার এক উদাহরণ সাগর ভাই। অনেক কিছু মনে পড়তে লাগল। রোম প্যারিস ভেনিস লন্ডন বার্লিন ভিয়েনা ইস্তাম্বুল বালিদ্বীপ ভিয়েতনাম- কত কত শহর। আর কতবার যে কলকাতা গিয়েছি! বইমেলায় হেঁটেছি একসাথে।
স্মৃতি আমাকে আচ্ছন্ন করে তুলল। এর মধ্যে সাগর ভাই ও প্রবাল ভাইয়ের সঙ্গে টেলিফোনে কথা হলো।
বিষাদের মধ্যে তলিয়ে যেতে লাগলাম। বন্যাদি, ফেরদৌস আরা এলেন। বাবু ভাই সবকিছু ধীরস্থিরভাবে সামলাচ্ছেন। আমি কি তিনতলায় যাব?
খালাম্মার বিছানার পাশে দাঁড়াব? তার নিথর নিস্পন্দ দেহ। তিনি না ফেরার দেশে চলে গেছেন। অতি সত্য কথা। কিন্তু আমি তো বিশ্বাস করি- খালাম্মা ঘুম ভেঙে জেগে উঠবেন। আমার যুগল সংবাদ নেবেন। খালাম্মা, আপনার ঘুম কি ভাঙবে না? খালাম্মা কি কথা বলবেন না? আমি স্থবির হয়ে গেলাম। আমার শরীর কাঁপতে লাগল।
সেদিন ছিল ৩ জানুয়ারি। রবিবার। বিকেল ৫টা। বয়স হয়েছিল পঁচাশি বছর।

রাবেয়া খাতুন ছিলেন লেখকদের লেখক। তিনি আন্তর্জাতিক মানের কথাসাহিত্যিক। এক হাজারের বেশি ছোটগল্প, শতাধিক উপন্যাস, শতাধিক ভ্রমণ কাহিনি, শিশুসাহিত্য, স্মৃতিকথা, আত্মকথা, প্রায় সত্তর বছর ধরে একটানা লিখেছেন। সেসব নিয়ে আগামীতে গবেষণা হবে। তার লেখায় নারীসুলভ উদাসীনতা নেই। তিনি গভীর জীবন ছবি নিয়ে গদ্য রচনা করেছেন। অতি সংবেদনশীল লেখক তিনি। সূক্ষ্ণ অনুভবের রূপকার। এই তো সেদিন- তার ৮৬তম জন্মদিন। ২৭ ডিসেম্বর ২০২০। রবিবার। তার শুভ জন্মদিন। আমরা সাড়ম্বরে সবসময় জন্মদিন উদযাপন করতে চাই। কিন্তু রাবেয়া খাতুন এসব বাড়াবাড়ি একদম পছন্দ করতেন না। কত কষ্টে যে তাকে রাজি করাতাম। সাগর ভাইকে তিনি সরাসরি 'না' করে দিতেন- দামি হোটেলে টাকাপয়সা নষ্ট করার মানে হয় না। সাগর ভাই মায়ের কথা মেনে নিতেন।
মা বলতেন, আমি তোমাদের সাথে নিয়ে বাসায় জন্মদিন উদযাপন করব? সাগর ভাই বলতেন, কী বলেন আম্মা? আপনার সঙ্গে তো অনেকে দেখা করতে আসবে। তখন কী হবে? খালাম্মা নিরুত্তর থাকতেন। জন্মদিন উদযাপন করার জন্য সেতুবন্ধ হিসেবে আমাকে কাজ করতে হতো। কত ছলনা করে খালাম্মাকে রাজি করাতাম। কখনও বলতাম, আপনার বইয়ের প্রকাশনা উৎসব করব। আপনার জন্মদিনের কেক কাটা হবে না। বেশি লোকের ভিড় হবে না।
কখনও বলতাম, খালাম্মা আপনাকে ঘিরে একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করছে অন্য প্রকাশ। মাজহারুল ইসলামরা এর আয়োজক। আপনাকে যেতেই হবে। আমাদের পীড়াপীড়ি ও চাপে একসময় খালাম্মা রাজি হতেন। দামি হোটেল, বাসার বারান্দায়, কোনো রিসোর্টের খোলা প্রাঙ্গণে- কতভাবেই না খালাম্মার জন্মদিন উদযাপন করেছি। একটা ব্যাপার ছিল নির্ধারিত। ২৭ ডিসেম্বর ছিল সৈয়দ শামসুল হকের জন্মদিন। আমরা দুজনের জন্য দুটো কেক এক সাথে কাটতাম। আর থাকত রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার গান। খালাম্মাকে নিবেদন করে গান।
খালাম্মা বন্যাদির গান খুব পছন্দ করতেন। তিনি ছিলেন গানের পাগল। একসময় গান গাইতেন। কোনো এক জন্মদিনে বন্যাদির সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে খালাম্মা গান গেয়েছিলেন। প্রতি জন্মদিনে খালাম্মাকে এক সেট গয়না কিনে দিতেন সাগর ভাই। খালাম্মা সেই গয়না পরে শিশুর মতো আনন্দিত হয়ে উঠতেন সন্ধ্যাবেলা। জন্মদিনের আসরে তিনি আসতেন প্রিয় পুত্রবধূ কনা রেজার সাথে। খালাম্মার পাশে সারাক্ষণ কনা রেজা থাকতেন। কেকা আপা আর কাকলী আপার কথা নাই-বা বললাম। পারিবারিক জীবনে খালাম্মা ছিলেন অসম্ভব এক সুখী মানুষ। প্রবাল রেজা ষাটোর্ধ এক শিশু হয়ে যেতেন মায়ের সামনে। যদিও তারও বিত্ত-বৈভবের অভাব নেই। এই ছিল খালাম্মার আনন্দময় জীবন। সোনালী, মেঘনা, মোহনা, ফাইয়াজ, আকাশ- নাতি-নাতনিদের সাথেও গভীর আন্তরিকতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। মামুন ভাই, বাবু ভাই তার জামাতা নয়, তার সন্তানই ছিলেন।
তবে এবারের জন্মদিন কি হবে? সাগর ভাই গৃহবন্দি। করোনা সব এলোমেলো করে দিয়েছে। খালাম্মার জন্মদিন উদযাপন করব কেমনভাবে? সাগর ভাইয়ের সঙ্গে ফোনে কথা বললাম। সাগর ভাই স্বভাবসুলভভাবে বললেন, দ্যাখো- কী করা যায়? আর করোনার মধ্যে কিই-বা করবে?
তবে আমরা প্রায় ৬০ জন সেলিব্রেটির জন্মদিনের শুভেচ্ছা রেকর্ড করলাম। বন্যাদি বললেন, হ্যাঁ। ভালো উদ্যোগ। আগামীবার খালাম্মার জন্মদিন উদযাপন করতে পারব কিনা কে জানে!
২৬ ডিসেম্বর ২০২০ রাতে সাগর ভাই পরিবারের সদস্যদের খালাম্মাকে সেই শুভেচ্ছা বাণী দেখালেন। এ যেন খালাম্মার প্রতি সাগর ভাইয়ের জন্মদিনের উপহার।
জন্মদিনে ২৭ ডিসেম্বর আমরা ছোটকাকু ক্লাবের পক্ষ থেকে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শীতবস্ত্র ও খাদ্য বিতরণ করি। এ বিষয়টা খালাম্মা জানতে পেরে খুব খুশি হন।
দুপুরের পরপর ফোন করলাম খালাম্মাকে। তিনি নিজেই ফোন ধরলেন। বয়সের ভারে শরীর ভেঙে পড়েছে।
কণ্ঠে জড়তা।
আমাকে বললেন,
হ্যাঁ আমীরুল।
খালাম্মা জন্মদিনের শুভেচ্ছা।
তোমাকে ধন্যবাদ।
করোনা শেষ হলে খালাম্মা আপনার কাছে আসব। আড্ডা হবে। গল্প করব খালাম্মা।
খালাম্মা যেন গভীর ঘুমের ভেতর থেকে জেগে উঠলেন,
হ্যাঁ- অনেকদিন তোমাকে দেখি না। এসো।
খালাম্মা খুব পরিমিত কথা বলতেন।
'এসো' মানে হচ্ছে তার সঙ্গে গল্প-কথন, আড্ডা, খাবার সবকিছু।
আমিও খুব আনন্দিত। খালাম্মার সঙ্গে কথা হয়েছে। জন্মদিনের শুভেচ্ছা দিয়েছি। ছোটকাকু ক্লাবের পক্ষ থেকে উদযাপন করেছি। তার সঙ্গে খুব শীঘ্রই দেখা হবে। মন আনন্দের জলতরঙ্গে নেচে উঠল। কিন্তু হায়! কে জানত তার জন্মদিনের সাত দিন পরেই তার মহাপ্রয়াণ হবে!
চিরঘুমের দেশে তিনি চলে যাবেন।
কে জানত! আমরা এখনও দুঃস্বপ্নের মধ্যে আছি। অস্থির এক ঘোরের মধ্যে আছি। খালাম্মা, আপনি তো আমাদের বটবৃক্ষ। এখন কে আমাদের ছায়া দেবেন?

মন্তব্য করুন