সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের ৮৮তম জন্মদিন আজ সোমবার। ১৯৩৪ সালের এই দিনে সিলেট শহরের এক সল্ফ্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। শিক্ষা, সরকারি চাকরি, রাজনীতি, অর্থনীতি, সাহিত্য মিলিয়ে বর্ণাঢ্য জীবন তার। বীর মুক্তিযোদ্ধা মুহিত ভাষাসংগ্রামেও অংশ নিয়েছেন।

জন্মদিনকে সামনে রেখে গতকাল কথা হয় আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে। প্রায় ৪৫ মিনিটের ফোনালাপের অধিকাংশ সময়ই তিনি সাবলীলভাবে কথা বলেন। তিনি জানালেন, অবসরে বেশ আনন্দেই সময় কাটাচ্ছেন। বই পড়ছেন। লেখালেখি করছেন। পড়াশোনা আর লেখার পাশাপাশি নাতি-নাতনিদের সঙ্গে খুনসুটি করে দিন কাটাচ্ছেন তিনি। তার বড় ছেলের দুই সন্তান। একজন পাঁচ বছরের, অন্যজন তিন বছরের। তাদের সঙ্গে অনেক সময় কাটে। তবে করোনাকালে কাছের অনেক মানুষের চলে যাওয়ায় তিনি মর্মাহত। করোনার সময়ে বাল্যবন্ধু নূরুল হোসেন খান মারা গেছেন। তার সঙ্গে ক্লাস থ্রি থেকে বন্ধুত্ব। কিন্তু বিদায় বেলায় যেতে পারেননি। এজন্য মন খারাপ। করোনা শেষ হলে অবশ্যই তার বাড়িতে যাবেন।

মুহিত বলেন, ২০১৮ সালে অবসর নেওয়ার পর নিজের লেখালেখি, মুজিববর্ষ উদযাপন কমিটির বৈঠকে অংশ নেওয়া ছাড়া বিশেষ কোনো কিছুতে সম্পৃক্ত নন। থাকছেন বনানীতে নিজের বাড়িতে। যেখানে মন্ত্রী হওয়ার আগে ২৪ বছর ছিলেন। মন্ত্রী থাকাকালীন ১০ বছর ছিলেন সরকারের দেওয়া হেয়ার রোডের বাড়িতে। নিজের বাড়িতে ফিরে তার ভালো লাগছে। কারণ বাড়িটি তার স্ত্রী সৈয়দা সাবিয়া মুহিত অনেক যত্ন করে গড়ে তুলেছিলেন। বাড়িটিকে আবার নতুন করে সাজাচ্ছেন তিনি। বর্তমানে তিনি থাকছেন নিচতলায়। চারতলার কাজ শেষ হলেই দ্বিতীয় তলায় চলে যাবেন। এ বাড়িতেই তার ছেলে, পুত্রবধূ, মেয়ে ও তাদের সন্তানরা থাকেন।

সাবেক অর্থমন্ত্রী বলেন, 'আমার খুবই ভালো সময় কাটছে। ১৯৮০ সাল থেকে মানব জাতির ইতিহাস নিয়ে বই লিখছি। বইটি তিন খণ্ডে প্রকাশিত হবে। আশা করছি দু-এক মাসের মধ্যে প্রথম খণ্ডের কাজ শেষ হবে। বাকি দুই খণ্ডের কাজও অনেক এগিয়েছে। দুই বছর ধরে অনেক কাজ করতে পেরেছি। কারণ উইকিপিডিয়াতে এখন অনেক তথ্য পাওয়া যায়। এছাড়া তথ্য সংগ্রহ করতে আমেরিকা, ইংল্যান্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লাইব্রেরিতে গেছি।'

করোনাকালে সময় কীভাবে কাটছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'করোনার আগেও বাড়িতে দিন কাটাতাম। এখন সেরকমই কাটছে। অনেক আনন্দ পাচ্ছি। মাঝে মাঝে মন চায় মুক্তিযুদ্ধ লাইব্রেরি এবং জাতীয় গণগ্রন্থাগারে যেতে। কিন্তু করোনার কারণে সম্ভব হচ্ছে না। যখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে আমি যাবো।'

জন্মদিনে পারিবারিক অনুষ্ঠান থাকবে জানিয়ে তিনি বলেন, 'আমার জন্মদিনে সবসময়ই পারিবারিক আয়োজন থাকে। তাতে বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়রা স্বেচ্ছায় অংশ নেন। এবারও থাকবে। তবে করোনার কারণে হয়তো অনেকে আসবেন না। আমরা ১১ ভাইবোন জীবিত আছি। আমাদের সবার বড় বোন আছেন। বড় ভাই মারা গেছেন। সবাই থাকবেন। আমার জন্মদিনে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানাই।'

করোনার কারণে সামগ্রিক অর্থনীতিতে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা থেকে উত্তরণে তার পরামর্শ জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখন বড় ধরনের সম্প্রসারণমূলক উদ্যোগ দরকার। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশ না হলে কিছু হবে না। প্রবৃদ্ধির উচ্চাশা থাকবে, তবে হিসাব থাকবে রক্ষণশীল। সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ একটি মোমেন্টামে ছিল, যা এখনও রয়েছে। এটিকে ধরে রাখতে হবে। সেজন্য অবশ্যই সম্প্রসারণমূলক উদ্যোগ জরুরি। ব্যাংক খাতের সংস্কার বিষয়ে তিনি বলেন, 'একটা ব্যাংক কমিশন গঠনের ইচ্ছা ছিল। কিন্তু করতে পারিনি। ভেবেছিলাম পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কেউ কাজটি করবে। ব্যাংক খাতের উন্নয়নে একেকটা সমস্যা ধরে কাজ করতে হবে। সবচেয়ে বড় সমস্যা খেলাপি ঋণ, যা কমানোর জন্য ব্যাংকগুলোকে একটি নির্দিষ্ট হারে নামিয়ে আনার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া যেতে পারে।'

আবুল মাল আবদুল মুহিত দেশের অগ্রগতি নিয়ে সন্তুষ্ট। তবে শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকার আক্ষেপ জানালেন তিনি। মুহিত বলেন, দেশকে আরও এগিয়ে নেওয়ার জন্য শক্তিশালী বিরোধী দল প্রয়োজন। বিএনপি সেই ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ। যতদিন বিএনপির নেতৃত্বে খালেদা জিয়া থাকবেন, ততদিন তা সম্ভবও নয়। কারণ তিনি (খালেদা জিয়া) দেশের স্বার্থ নিয়ে ভাবেন না।

মুহিত বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। অবহেলিত মানুষের আবাসিক সমস্যা সমাধানে কাজ করছেন। এটি বিশাল কাজ। ঝুপড়ি থেকে তুলে নিয়ে কাউকে নিজের বাড়ি দেওয়া, হাতে স্থায়ী বন্দোবস্তের কাগজ দেওয়া, একটা স্বপ্ন দেওয়া শুধু কল্যাণ রাষ্ট্রের পক্ষেই সম্ভব। অন্য সরকার হলে ক্যাপিটাল প্রাসাদ বা সিটি হতো। সেখানে কল্যাণের কিছু থাকত না।

আবুল মাল আবদুল মুহিত ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। পরের বছর একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তার আগে অংশ নেন ভাষা আন্দোলনে। ছাত্রজীবনে সলিমুল্লাহ হল ছাত্র সংসদের ভিপিও নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। ১৯৫৬ সালে তিনি যোগ দেন পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে (সিএসপি)। সিএসপিতে যোগ দিয়ে তিনি ওয়াশিংটন দূতাবাসে পাকিস্তানের কূটনীতিকের দায়িত্ব নেন এবং মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের জুনে পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করেন। ওই সময় তিনি বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। প্রশাসন, মুক্তিযুদ্ধ, আত্মজীবনীসহ এ যাবত তিনি ২৯টি বই লিখেছেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে সিলেট-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। এরপর টানা দশ বছর অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে এরশাদ সরকারের সময়ে ১৯৮২ থেকে ৮৩ সাল পর্যন্ত অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। মোট ১২টি জাতীয় বাজেট পেশ করেছেন তিনি।

মুহিতের বাবা আবু আহমদ আবদুল হাফিজ ছিলেন সিলেট জেলা মুসলিম লীগ ও পাকিস্তান আন্দোলনের অন্যতম নেতা। মা সৈয়দা শাহার বানু চৌধুরীও সক্রিয় ছিলেন রাজনীতিতে। ১৪ ভাইবোনের মধ্যে মুহিতের অবস্থান তৃতীয়। দুই ছেলে ও এক মেয়ে তার। ছোট ছেলে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক প্রবাসী।

মন্তব্য করুন