আজ ২ ফেব্রুয়ারি, বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান লেখক হাসান আজিজুল হকের ৮৩তম জন্মদিন। ১৯৩৯ সালের আজকের দিনে পশ্চিমবাংলার বর্ধমান জেলার যবগ্রামে তার জন্ম। দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে লিখে চলেছেন উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক এবং নানা বিষয়ে বিশ্নেষণধর্মী রচনা। তার সাহিত্যে ফুটে ওঠে সমাজ বাস্তবতার অপরূপ চিত্র। যার মূল লক্ষ্য মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি।

৮৩তম জন্মদিনের প্রাক্কালে সমকালের সঙ্গে আলাপকালে বর্তমান সময় নিয়ে জানতে চাইলে হাসান আজিজুল হক জানালেন, 'করোনার কারণে একেবারে গৃহবন্দি সময় কাটাচ্ছি। রাজশাহীতে এর প্রকোপ কিছুটা কম থাকলেও ঘর থেকে বের হচ্ছি না। গত দেড় মাসে বের হয়েছি বলে মনে পড়ছে না। সময় কাটছে বই পড়ে, গান শুনে আর টেলিফোনে কথা বলে। আর একটা বড় উপন্যাসের পরিকল্পনা করছি। লেখায়ও হাত দিয়েছি। যদি সুস্থ থাকি, বেঁচে থাকি তবে আগামী বছরের একুশে গ্রন্থমেলায় উপন্যাসটি প্রকাশিত হতে পারে।'

হাসান আজিজুল হককে তার জন্মদিন এবং ৮৩ বছরে পা দেওয়ার কথা মনে করিয়ে দিয়ে তার জীবনানুভূতি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সহাস্যে জবাব দেন, ''জীবন নিয়ে সব সময় তো আর এক ধরনের অনুভূতি হয় না। মানুষ একটা পর্যায়ে পৌঁছে গিয়ে ফুল স্টপ দিয়ে একবাক্যে কি বলতে পারে- 'জীবন সম্পর্কে আমার অনুভূতি হচ্ছে এই!' কখনও কখনও তা এক ধরনের, কখনও আবার আরেক ধরনের। তারাশঙ্করের 'কবি' উপন্যাসের নায়ক বলেছে, 'জীবন এতো ছোটো ক্যানে।' এটা একটা মৌলিক কথা। আবার অনেক সময় মনে হয়, কেটেই তো গেল। যা হবার তা-ই তো হয়ে গেল।"

হাসান আজিজুল হকের বাবার নাম মোহাম্মদ দোয়া বখশ ও মায়ের নাম জোহরা খাতুন। যবগ্রাম মহারানী কাশিশ্বরী বিদ্যালয় থেকে ১৯৫৪ সালে মাধ্যমিক শেষ করেন। এর পর বাংলাদেশে এসে ১৯৫৬ সালে খুলনার দৌলতপুরে ব্রজলাল কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ১৯৫৮ সালে রাজশাহী সরকারি কলেজ থেকে দর্শন শাস্ত্রে স্নাতক এবং ১৯৬০ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

কর্মজীবনে হাসান আজিজুল হক ১৯৬০ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত রাজশাহী সিটি কলেজ, সিরাজগঞ্জ কলেজ, খুলনা গার্লস কলেজ এবং দৌলতপুরে ব্রজলাল কলেজে অধ্যাপনা করেন। ১৯৭৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন এবং ২০০৪ সাল পর্যন্ত টানা ৩১ বছর অধ্যাপনা শেষে তিনি অবসরে যান।

হাসান আজিজুল হকের সাহিত্যে হাতেখড়ি কবিতা দিয়ে হলেও পরে গদ্যতেই মনোনিবেশ করেন। তার ভাষায়- "প্রায় সব বাঙালিই প্রথম জীবনে কবিতা লেখে। যে কবি, সে-তো লেখেই। যে কবি নয় সেও লেখে। আমিও তেমনি লিখেছি। তবে সিরিয়াসলি সাহিত্য করার চিন্তা যখন এলো তখন গদ্যেই বেশি মন দিই। আমি প্রথম উপন্যাস লেখার চেষ্টা করেছি ১৯৫৪ সালে; স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা দেওয়ার পরপরই। সেই অসমাপ্ত উপন্যাস এখনও খুঁজলে হয়তো পাওয়া যাবে। তারপর লেখার চেষ্টা করেছি ১৯৫৭ সালে। তখন আমার ১৮ বছর বয়স। 'শামুক' নামে একটা উপন্যাস লিখি তখন।"

এবারের জন্মদিনের আয়োজন সম্পর্কে প্রশ্ন করলে হাসান আজিজুল হক বলেন, এবার জন্মদিন পালনে আগ্রহীদের বারণ করেছি। কোনো অনুষ্ঠান হতেই হবে, এমন কথাও নেই। পারিবারিকভাবে উদযাপনেরও চিন্তা নেই। কারণ আমার জন্মদিন ফেব্রুয়ারির ২ তারিখ, আর ২০১৩ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি আমার স্ত্রী প্রয়াত হয়েছেন। তার পর থেকেই জন্মদিন পালনে উৎসাহ পাই না। তিনি বেঁচে থাকলে হয়তো জন্মদিন পালনে তৎপর হতেন।

হাসান আজিজুল হক তার সাহিত্যে জীবনাভিজ্ঞতা ও মননের অতলে পৌঁছে তুলে আনেন অরচিত নানা রত্ন-মানিক। চিন্তার গভীরে যে আরেক চিন্তার জগৎ আছে, তারই দেখা মেলে তার লেখায়। তার উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে উপন্যাস- 'আগুনপাখি' ও 'সাবিত্রী উপাখ্যান'। গল্পগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- 'সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্য', 'আত্মজা ও একটি করবী গাছ', 'জীবন ঘষে আগুন', 'নামহীন গোত্রহীন', 'পাতালে হাসপাতালে', 'বিধবাদের কথা ও অন্যান্য গল্প' ইত্যাদি। প্রবন্ধ সাহিত্যের মধ্যে রয়েছে- 'কথাসাহিত্যের কথকতা', 'চালচিত্রের খুঁটিনাটি', 'অপ্রকাশের ভার', 'অতলের আধি', 'লোকযাত্রা আধুনিক সাহিত্য', 'একাত্তর :করতলে ছিন্নমাথা' ইত্যাদি। আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- 'ফিরে যাই, ফিরে আসি', 'উঁকি দিয়ে দিগন্ত', 'এই পুরাতন আখরগুলি', 'টান', 'লন্ডনের ডায়েরি'।

কর্মমুখর সাহিত্য জীবনে হাসান আজিজুল হক লাভ করেছেন অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা। এর মধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য- আদমজী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৭), বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৭০), লেখক শিবির পুরস্কার (১৯৭৩), অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮১), আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৩), অগ্রণী ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৪), ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৮)। এ ছাড়া তিনি ১৯৯৯ সালে দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা 'একুশে পদক' এবং ২০১৯ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন।

মন্তব্য করুন