ঘোষণাটি যে আসবে, অনুমিতই ছিল। করোনা মহামারি মোকাবিলায় সর্বাত্মক লকডাউন সামনে রেখে আগামীকাল সোমবার, অর্থাৎ দু'দিন আগেই পর্দা নামছে বইমেলার। গতকাল শনিবার সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ মেলার দিন কমে যাওয়ার এ ঘোষণা দেন। এ ছাড়া অবশ্য করারও কিছু ছিল না। কারণ, সোমবার মেলা শেষ না হলে প্রকাশনীগুলো স্টল-প্যাভিলিয়ন সরানোর সুযোগ পেত না। লকডাউনের আগে তাদের এক দিন সময় দিতেই এ সিদ্ধান্ত।

কে এম খালিদ সমকালকে বলেন, সবার সঙ্গে কথা বলেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আশা করছি, সিদ্ধান্তটি সবার জন্যই ভালো হবে। প্রকাশকদের দ্বিমত করারও খুব একটা সুযোগ ছিল না, নেইও। তাম্রলিপির কর্ণধার এ কে এম তারিকুল ইসলাম জানান, মেলায় যার যত বেশি বিনিয়োগ ছিল, তার তত বেশি ক্ষতি হয়েছে। তবে লকডাউনের মধ্যেও বইমেলা চালানোর সুযোগ দেওয়ায় সরকারকে ধন্যবাদ জানান তিনি। বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি ও সময় প্রকাশনের কর্ণধার ফরিদ আহমেদ বলেন, অন্য বছরের মেলায় যেমন বিক্রি হয়, এবার তার ২০ শতাংশও হয়নি। আমাদের অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। তবে সময় কমানো নিয়ে আমাদের কোনো দ্বিমত নেই।

গতকাল মেলায় ঘুরে সময় কমে যাওয়ার প্রভাব-প্রতিক্রিয়া খুব একটা টের পাওয়া যায়নি। পাঠকেরা যে যার মতো ঘুরে ঘুরে বই কিনেছেন, তবে সমাগম হয়েছে শুক্রবারের তুলনায় কম। ভিড় কমার সঙ্গে কমেছে বিক্রিও। তবে যারাই মেলায় এসেছেন, অধিকাংশই কোনো না কোনো বই সংগ্রহ করে বের হয়েছেন। আবার ঘুরতেও এসেছিলেন অনেকে। তারা মেলার নান্দনিক ডিজাইনের বাঁশের তৈরি কাঠামোকে 'ব্যাকগ্রাউন্ডে' রেখে সেলফি তোলায় ব্যস্ত ছিলেন। চানখাঁরপুল থেকে আসা নন্দিনী রায়হান কয়েকটি বই সংগ্রহ করেছেন। আসার সময় সঙ্গে নিয়ে এসেছেন দ্বিতীয় শ্রেণিপড়ুয়া সন্তান নাহিলকে। আসার মূল উদ্দেশ্য ছিল ঘোরাঘুরি। তিনি বলেন, আসলে এখন ছুটির দিনে ঘুরতে যাওয়ার মতো তেমন কোনো জায়গা নেই। আর লকডাউন শুরু হলে তো বাসা থেকে বের হওয়াই হবে না। তাই মেলায় ঘুরতে এসেছিলাম। কয়েকটি বই পছন্দ হওয়ায় সংগ্রহ করেছি। সন্তানের জন্যও কয়েকটি কমিক বই কিনেছি। তবে মেলায় সিরিয়াস পাঠকও ছিলেন। তারা এসেছিলেন বইয়ের তালিকা নিয়ে। সব মিলিয়ে মেলার শেষ ছুটির দিনটি খুব একটা ভালো যায়নি। অনেক প্রকাশকই জানিয়েছেন, শুক্রবার মোটামুটি বিক্রি হলেও শনিবার তাদের হতাশ করেছে। তবে আশা করছেন, শেষ দুটি দিন মেলা চাঙ্গা হয়ে উঠবে। বাড়বে বিক্রি, কমে আসবে ক্ষতির পরিমাণ।

লেখকের কলমে করোনাকাল: করোনা মহামারি আমাদের জীবনকে ঠিক কতটুকু বদলে দিয়েছে, ভাবলে চমকে যেতে হয়। কেউ কি ভেবেছিলেন, একটা 'মাস্ক' আমাদের সারাদিনের সঙ্গী হতে যাচ্ছে! এই মহামারি আমাদের চিন্তা, অর্থনীতি তথা পুরো সমাজ ব্যবস্থায় ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। এবারের বইমেলায়ও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। সাহিত্যে সমকালীন অবস্থা উঠে আসবে, এটাই স্বাভাবিক। হয়েছেও তাই। এবারের মেলায় করোনা নিয়ে বের হয়েছে বেশ কয়েকটি বই। করোনা বিষয়বস্তু থাকা বইগুলোর মধ্যে বাতিঘর থেকে আসা মঈনুস সুলতানের 'যুক্তরাষ্ট্রের মফস্বলে করোনা সংকট ও বর্ণবিভেদের বৃত্তান্ত', রিজওয়ানুল ইসলামের 'করোনাঘাতে অর্থনীতি ও শ্রমবাজার', সময় থেকে ওবায়দুল কাদেরের 'করোনাকালে', বিভাস থেকে ধ্রুব এষের 'করোনাধারা', কথাপ্রকাশ থেকে মাহবুব আজীজের উপন্যাস 'অপ্রকাশ্য', ছায়াবীথি থেকে মাহবুব আলমের 'করোনাকালে সাম্প্রদায়িকতা ও রাজনৈতিক বিদ্বেষ', প্রথমা থেকে আবুল বাসারের অনুবাদে ড. মাইকেল মোসলির 'কোভিড ১৯ :করোনাভাইরাস যা জানা দরকার', রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের 'যুদ্ধোত্তর থেকে করোনাকাল', অন্যপ্রকাশ থেকে ওয়ামেক আজফার রাজার 'করোনা উপাখ্যান' ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

নতুন বই: বাংলা একাডেমির জনসংযোগ উপবিভাগের তথ্যমতে, গতকাল মেলার ২৪তম দিনে নতুন বই এসেছে ১০৮টি। এদিনের বিষয়ভিত্তিক বইয়ের মধ্যে গল্পের বই রয়েছে ২০টি, উপন্যাস ৯টি, প্রবন্ধ একটি, কবিতা ৩৫টি, গবেষণা দুটি, ছড়া ছয়টি, শিশুসাহিত্য সাতটি, জীবনী চারটি, রচনাবলি একটি, বিজ্ঞান একটি, ইতিহাসের তিনটি, ধর্মীয় সাতটি, অনুবাদ তিনটি, সায়েন্স ফিকশন একটি এবং অন্যান্য আটটি। এদিনের উল্লেখযোগ্য বইগুলো হলো- সেলিনা হোসেনের 'আকাশপরী', রামেন্দু মজুমদারের 'শতবর্ষে বঙ্গবন্ধু ও বিবিধ ভাবনা', বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের 'বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ :একজন যুদ্ধ শিশুর গল্প ও অন্যান্য', কাবেদুল ইসলামের 'পূর্ব পাকিস্তান অ্যাসেম্বলিতে শেখ মুজিব (১৯৫৫-৫৮)', সাহাদাত পারভেজের 'ড্যাডি সমগ্র', মোস্তফা কামালের '১৯৭৫', সুমনকুমার দাশের 'ধীর পায়ে ধূলি পথে', ফেরদৌসী রহমানের 'কথা ও স্মৃতি', আলী ইমামের 'গল্পগুলো পশুপাখির', প্রিয় বাংলা থেকে হানিফ সংকেতের 'সংগত প্রসঙ্গত অসংগত', পাঞ্জেরী থেকে কিশোর ক্ল্যাসিক অনুবাদ 'দি মিল অন দি ফ্লস জর্জ ইলিয়ট' ইত্যাদি। গত ২৪ দিনে মোট বই প্রকাশ হয়েছে দুই হাজার ৫২৯টি।