ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। ভারতে কেন্দ্রে পরবর্তী সময়ে কারা ক্ষমতায় আসছে, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ফল তার একটা আভাস হতে পারে। ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসবেন কিনা, সে সমীকরণ ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। বিশেষ করে ২০১৯ সালের পশ্চিমবঙ্গের হিসাব আমরা দেখেছি। তখন লোকসভার নির্বাচনে এই রাজ্যের ৪২টি আসনের মধ্যে তৃণমূল পায় ২২টি, বিজেপি পায় ১৮টি, কংগ্রেস পায় দুটি। অথচ ২০১৪ সালে বিজেপি আসন পেয়েছিল মাত্র দুটি। সে সূত্র ধরেই বিধানসভার নির্বাচনে বিজেপি ঘুরে দাঁড়াতে চায়।
যদিও অনেকে বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার নির্বাচনে তৃণমূল, বিজেপি ও বাম দলের মধ্যে একটা ত্রিমুখী লড়াই হবে। আসলে মূল লড়াইটা আমরা বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যেই দেখব। ভারতের অন্যান্য নির্বাচনের চেয়ে কিংবা পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভার আগের নির্বাচনগুলোর তুলনায় এবারের নির্বাচনে আমরা অধিক সহিংসতা এবং পরস্পরবিরোধী লড়াই দেখছি, যা ভারতের অন্যান্য নির্বাচনে সচরাচর দেখা যায় না। তার চেয়ে বড় বিষয়, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে ঘুরেফিরেই আসছে করোনা প্রসঙ্গ। দেশজুড়ে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে তোপ দেগেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রচার-প্রচারণা কমিয়ে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের শেষ দুই ধাপের ভোট এক দিনে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে তৃণমূল নির্বাচন কমিশনে আবেদনও জানিয়েছে। বস্তুত চতুর্থ ধাপের ভোটের পরই করোনা পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে তখন বাকি থাকা চার ধাপের ভোট একসঙ্গে করার আবেদন করেছিল মমতার দল। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন, একসঙ্গে ভোট হলে প্রচারে ভিড় হওয়ার সুযোগ থাকবে না। ফলে ভোটের কারণে করোনার সংক্রমণ হবে না। তবে কমিশন তখন বলেছিল, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে এক দিনে চার ধাপের ভোট নেওয়া সম্ভব নয়। বলা বাহুল্য, এবার পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন হচ্ছে আট ধাপে। ষষ্ঠ ধাপের ভোট সম্পন্ন হয়েছে। ভোটের ফলাফল পেতে আমাদের ২ মে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
আগেই বলেছি, এবারের পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে অন্য ধরনের পরিবেশ বিরাজ করছে। ওখানে লড়াই, মারামারি ছাপিয়ে ঘৃণা-বিদ্বেষে রূপ নিয়েছে। এমনকি চলমান নির্বাচন ঘিরেই বাংলাদেশ প্রসঙ্গ সামনে এসেছে। দুঃখজনকভাবে আমরা দেখেছি, পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশ সম্পর্কে ভারতের স্বরাষ্ট্র্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন, 'যে কোনো পিছিয়ে পড়া দেশে উন্নয়ন হতে শুরু করলে সেটা প্রথমে কেন্দ্রে হয়। তার সুফল প্রথমে বড়লোকদের কাছে পৌঁছায়, গরিবদের কাছে নয়। এখন বাংলাদেশে সেই অবস্থা চলছে। ফলে বাংলাদেশের গরিব মানুষ এখন খেতে পাচ্ছে না। সে কারণেই বাংলাদেশ থেকে ভারতে অনুপ্রবেশ চলছে' (সমকাল ১৬ এপ্রিল ২০২১)। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দৃঢ়ভাবে তার এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। যেখানে বাংলাদেশ ও ভারতের তুলনামূলক বিচারে সামাজিক-অর্থনৈতিক সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ এগিয়ে, সেখানে এখানকার মানুষের অর্থনৈতিক কারণে ভারত যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। আসলে তারা নির্বাচনে সুবিধা পাওয়ার জন্যই এ ধরনের কথা বলে থাকে। সেখানে ভোটারদের মধ্যে হিন্দু জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগিয়ে তোলার জন্যই এ ধরনের বিতর্কিত মন্তব্য করা হয়। এর আগেও বাংলাদেশকে কটাক্ষ করে আমরা এমন মন্তব্য শুনেছি।
তবে আমি মনে করি, এ ধরনের মন্তব্যে দুই দেশের কূটনীতিতে কিংবা দুই দেশের সম্পর্কে তেমন প্রভাব ফেলবে না। আমরা জানি, বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক বিস্তৃতি অনেক বেশি প্রসারিত। দুই দেশের সম্পর্ক যে উচ্চতায় পৌঁছেছে, সেই বিবেচনায় অযাচিত মন্তব্য জাতীয় স্বার্থে প্রভাব না ফেললেও মানুষের আবেগের জায়গা থেকে এটি অগ্রহণযোগ্য এবং অবশ্যই পরিত্যাজ্য। এমন মন্তব্য মানুষের মনে বিরূপ প্রভাব ফেলে, যা শেষ পর্যন্ত সম্পর্কেও তিক্ততা তৈরি করতে পারে। দুই দেশের সম্পর্ক তো কেবল জাতীয় সম্পর্ক কিংবা সরকারের সম্পর্কের বিষয় নয়। সেখানে মানুষে মানুষে, নাগরিকে নাগরিকে এক ধরনের হৃদ্যতা থাকবে। বোঝাপড়া থাকবে। এমন মন্তব্যের ফলে কাঙ্ক্ষিত এমনটি গড়ে ওঠে না।

অনুপ্রবেশের বিষয়টির সঙ্গে সঙ্গে এনআরসি তথা জাতীয় নাগরিক নিবন্ধনের বিষয়টিও চলে আসে। পশ্চিমবঙ্গে যদিও এনআরসি হয়নি। তার পরও সেখানে অনুপ্রবেশ নিয়ে বারবার কথা উঠছে। আসামে এনআরসি হয়েছে। এর বিরূপ প্রভাব পশ্চিমবঙ্গেও পড়ছে। কিন্তু মমতা ব্যানার্জি বা তার দল বিষয়টি বরাবরই নাকচ করে আসছে। এনআরসি-অনুপ্রবেশ ইত্যাদি প্রসঙ্গ নাগরিকের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি করে। এসব বিষয় জনগণের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে।
পশ্চিমবঙ্গে কারা নির্বাচিত হবে এবং বাংলাদেশে তার প্রভাব কী হবে- প্রশ্ন উঠেছে নানা মহলে। আমি মনে করি, ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের যে মাত্রা রয়েছে, তাতে বিজেপি কিংবা তৃণমূল যে-ই আসুক, তাতে নীতিগত অবস্থানে নড়বড় হবে না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। মমতা ২০১১ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তবে কোনো কারণে যদি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় বিজেপি আসে; বিশেষ করে শুরুতে যে পরিসংখ্যান দিয়েছি, ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের ১৮টি আসন পাওয়া এবং এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যেভাবে ব্যাপক প্রচারে নেমেছেন, তাতে বিজেপি জিতলে বাস্তবতা ভিন্ন হতে পারে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ক্ষমতা থেকে সরাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহসহ দিল্লি থেকে শুরু করে বিজেপির শীর্ষ নেতারা পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপক প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি জিতলে বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তার চুক্তির সম্ভাবনা কতটা রয়েছে, তা এখনই বলা কঠিন। যদিও আমরা জানি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় 'ভেটো' দেওয়ার কারণেই এ চুক্তিটি আপাতদৃষ্টিতে আটকে আছে। সেদিক থেকে বিজেপি জিতলে কেন্দ্রের সঙ্গে রাজ্যের সায় থাকলে তিস্তার ভাগ্যবদল ঘটতেও পারে। অবশ্য সময়ই তা বলে দেবে। তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় থাকলে সেখানকার মানুষের জন্য একটা স্বস্তির কারণ হবে, কারণ বিজেপি যেভাবে অনুপ্রবেশ কিংবা এনআরসির কথা বলে, তৃণমূল কিংবা কংগ্রেস বিষয়টিকে সেভাবে প্রশ্রয় দেয় না। তাতে পরোক্ষভাবে বাংলাদেশেরও উপকার। তবে এটাও সত্য, বিজেপি ভোটের মাঠ গরম করার জন্য হিন্দুত্ব জাতীয়তাবাদকে জাগিয়ে তুললেও বাস্তবে অন্য দেশের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে অনেকাংশেই পেশাদারিত্ব বজায় রেখে চলেছে।
মোটের ওপর এ নির্বাচনটি আমার দৃষ্টিতে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে জেতার জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করছে। যে করেই হোক তারা সেখানে জিতে তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূলের জনপ্রিয়তা পশ্চিমবঙ্গে আগে থেকেই স্পষ্ট। তারাও প্রচারণায় কম যায়নি। শেষ পর্যন্ত কী হয় সেটাই দেখার বিষয়।

অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়