চীনের জিনজিয়াং প্রদেশের উইঘুর মুসলিমদের সংকট বিশ্বে আজ আলোচিত ঘটনা। জিনজিয়াংয়ে প্রায় ১০ লাখ উইঘুর এবং অন্যান্য মুসলিম সম্প্রদায়ের বসবাস। ইতোমধ্যে সংখ্যালঘু উইঘুরদের গণহত্যার অভিযোগ উঠেছে চীনের বিরুদ্ধে। ২০০৯ সালে জিনজিয়াং প্রদেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পর থেকেই উইঘুর মুসলিমদের ওপর নিপীড়ন চালাচ্ছে চীন। উইঘুর মুসলিমদের প্রতি চীনের দমনপীড়ন আচরণকে 'গণহত্যা' বলে অভিহিত করেছে কানাডার হাউস অব কমন্স। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের এ আচরণকে গণহত্যা বলে অভিহিত করে। কানাডার আইনপ্রণেতারা একই সঙ্গে একটি সংশোধনীও পাস করেছেন, যেখানে চীন সরকার উইঘুর গণহত্যা অব্যাহত রাখলে ২০২২ সালের শীতকালীন অলিম্পিক গেম বেইজিং থেকে সরিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটিকে আহ্বান জানানোর জন্য কানাডা কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডসও উইঘুর মুসলিমদের ওপর নির্যাতনকে গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করেছে।
সম্প্রতি উইঘুরদের নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিবিসি নিউজকে চীনে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পৃথিবীর মানবাধিকার সংগঠনগুলো বহুদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, জিনজিয়াংয়ে প্রায় ১০ লাখ উইঘুর ও অন্যান্য মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজনকে ক্যাম্পে আটক রেখে নির্যাতন চালাচ্ছে চীন সরকার। 'শিক্ষা শিবির' নামক ক্যাম্পে উইঘুরদের আটকে রেখে তাদের চীনা ম্যান্ডারিন ভাষা শেখানো হচ্ছে জোর করে। কমিউনিস্ট পার্টির প্রশংসার কথা বলা ও তাদের সঠিক আচরণ পরিচালনার নিয়মগুলো কঠোরভাবে অনুসরণ করতে তাদের বাধ্য করা হচ্ছে। এ অভ্যাসগুলোর অংশ হিসেবে চীন সরকার সাংঘর্ষিকভাবে জিনজিয়াংয়ের উইঘুর সংস্কৃতি ও জাতিগত সত্তাকে মুছে ফেলার চেষ্টা করছে। তবে এসব প্রশ্নে চীন বলছে, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য সংখ্যালঘুদের ক্যাম্পে রেখে 'বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ' দেওয়া হচ্ছে। উইঘুরদের গণহত্যার অভিযোগ এভাবেই উড়িয়ে দিতে চায় চীন সরকার। তারা পাল্টা দাবি করছে, তাদের দেশে যথেষ্ট ধর্মীয় স্বাধীনতা ও শ্রম আইন বলবৎ রয়েছে।
বিবিসির রিপোর্টে এসেছে, বন্দিশিবিরে থাকা সংখ্যালঘু মুসলিম নারীদের ওপর পরিকল্পিত ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতন করা হচ্ছে। এর আগে অনেকবারই বিভিন্ন মাধ্যমে সংবাদ পরিবেশন করা হচ্ছিল, উইঘুর মুসলিম নারীদের জোর করে অপারেশন করে বন্ধ্যা করে দেওয়া হচ্ছে কিংবা গর্ভপাত করানো হচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল কিংবা ইসলামিক দেশগুলোর সংগঠন সবাই এ বিষয়ে বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে কথা বললেও লাভ হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক মঞ্চে সমালোচিত হলেও তা নিয়ে বিশেষ কোনো উদ্বেগ নেই চীনের। বরং যে কোনো মূল্যে উইঘুর সংস্কৃতি ধ্বংস করার জন্য সব রকম চেষ্টাই চালানো হচ্ছে চীনের জিনজিয়াং প্রদেশে। অ্যাড্রিয়ান জেনস নামে এক গবেষক জানান, অঞ্চলটিতে জন্মহার হ্রাসের জন্য চীনা প্রশাসন ৩৭ মিলিয়ন ডলারের প্রকল্প হাতে নিয়েছে। যার ফলে ২০১৯ সালে জিনজিয়াং প্রদেশে ২৪ শতাংশ জন্মহার হ্রাস পেয়েছে।
১৮ মার্চ ২০২১ যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কায় অনুষ্ঠিত হয়েছে চীন এবং আমেরিকার উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক। এ উপলক্ষে হোয়াইট হাউসের সামনে জড়ো হয় উইঘুর সম্প্রদায়ের বেশকিছু প্রবাসী প্রতিনিধি। তারা মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান, চীনে ধর্মীয় এবং অন্যান্য বাকস্বাধীনতা দমনের অপরাধে চীনা প্রতিনিধিদের ওপর যেন চাপ প্রয়োগ করা হয়। সেখানে তুরসোন জিয়াউদুন নামে এক নির্যাতিত উইঘুর নারী তার ভয়ংকর অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে বলেছেন, 'চীনা প্রশাসন প্রথমে আমার শরীরে থাকা কাপড় ছিনিয়ে নেয়। আমার কানের দুল ছিঁড়ে ফেলে। তারপর টানা ৯ মাস ধরে আমাকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয় এবং পশুর মতো নির্যাতন করা হয়। আমি সৌভাগ্যবতী, আমি সেখান থেকে পালিয়ে আসতে সমর্থ হয়েছি।' মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্রিঙ্কেনের কথায়, 'সারাবিশ্বের নিন্দা সত্ত্বেও চীন জিনজিয়াং প্রদেশে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী আচরণ করেই চলেছে।'
চীনের জিনজিয়াং প্রদেশের জনসংখ্যার ৪৫ ভাগই উইঘুর মুসলিম। এ অঞ্চলটি তিব্বতের মতো স্বশাসিত একটি অঞ্চল। বিদেশি মিডিয়ার সেখানে প্রবেশের ব্যাপারে কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। তারপরও সেখানে উইঘুর মুসলিমদের ওপর পরিচালিত অত্যাচারের বর্ণনা সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে নানা সূত্র ধরে। কিন্তু চীন তা বরাবরই অস্বীকার করে চলেছে। তারা দাবি করেছে, উইঘুর মুসলিমরা সমস্ত নাগরিক অধিকার নিয়ে ভালো রয়েছে। সংখ্যালঘুরা কতটা সুরক্ষিত, সে বিষয়ে বুঝতে তারা জাতিসংঘের প্রতিনিধিদের সরেজমিন পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার আমন্ত্রণ জানিয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াংই বলেন, 'উইঘুর মুসলিম অধ্যুষিত জিনজিয়াং প্রদেশে সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। গোটা প্রক্রিয়া যথাযথ আইন মেনেই চলছে। সেখানে গত চার বছর কোনো বড় ধরনের সন্ত্রাসবাদী হামলা হয়নি। জিনজিয়াংয়ে সামাজিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের সাক্ষী উইঘুর মুসলিমরা। এসব থেকে বোঝা যায়, সেখানে গণহত্যা, বন্দিশিবিরে জোর করে কাজে বাধ্য করা কিংবা ধর্মীয় নিপীড়নের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। এমন অভিযোগ চীনের ভাবমূর্তিকে কালিমালিপ্ত করতে আনা হয়েছে। জিনজিয়াংয়ের দরজা সব সময় খোলা রয়েছে। চাইলে সেখানে যেতে পারেন জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের কর্মকর্তারা।'
চীনের গলার জোর তাদের সামাজিক ব্যবস্থারই প্রতিফলন। কিন্তু তারপরও জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদে প্রদত্ত ভাষণে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কণ্ঠে কিন্তু সত্যতার বহিঃপ্রকাশই ঘটেছে। তিনি স্বীকার করেছেন, জিনজিয়াং প্রদেশে সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। সন্ত্রাসবাদী তারা কাকে বলছে, তা তো তাদের সংজ্ঞার ওপরই নির্ভর করবে। তাই সেখানে তারা যে ব্যাপক একটি ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, তা সন্দেহ করার অবকাশ নেই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, চীনের প্রতিবেশী এবং প্রভাবশালী দেশগুলো কি এ অত্যাচার নীরবে সহ্য করে নেবে? বিশ্ব মানবতা কি উইঘুর মুসলিমদের জন্য চিৎকার করে প্রতিবাদ করবে না?
কলাম লেখক
ceo@ilcb.net

বিষয় : চীন মেজর (অব.) সুধীর সাহা

মন্তব্য করুন