একাত্তরের প্রস্তুতিবিহীন যুদ্ধে পূর্ববঙ্গে অবস্থানকারী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বাঙালি সদস্যরা বিদ্রোহ করে হানাদার পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে সর্বস্ব পণ করে যুদ্ধ করেছেন, প্রাণ দিয়েছেন। পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে কেউ কেউ যোগ দিয়েছেন যুদ্ধে; কিন্তু যুদ্ধের পরে দেখা গেল যুদ্ধক্ষেত্রের প্রথম সারির সেই সহযোদ্ধারা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। শত্রুতাও দেখা দিয়েছে পারস্পরিক। যুদ্ধক্ষেত্রে খালেদ মোশাররফ ও জিয়াউর রহমান কেবল সহযোদ্ধা নন, বন্ধুও ছিলেন একে অপরের। পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে খালেদের ছিল অতুলনীয় সাহসী এক বিদ্রোহ। আর দেশবাসীর একটি অত্যন্ত সংকটময় ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় মুহূর্তে জিয়াউর রহমান বেতারে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর যে ঘোষণাটি দিয়েছিলেন, ইতিহাসে তাও লেখা রয়েছে। যুদ্ধের কিছুদিন পরেই কিন্তু দেখা গেল খালেদ মোশাররফ শিকার হয়েছেন অবিশ্বাস্য রকমের নির্মম এক হত্যকাণ্ডের এবং সেটা ঘটছে বন্ধু জিয়াউর রহমানের অনুরাগী সৈন্যদের হাত দিয়ে। এর পরে জিয়া নিজেই নিহত হলেন আরেক ষড়যন্ত্রে, যার ভেতর জড়িয়ে পড়েন আবুল মঞ্জুর, পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে যিনি যুদ্ধ করেছেন এবং জিয়ার সঙ্গে যার অত্যন্ত গভীর নৈকট্য ছিল। মঞ্জুর নিজেও নিহত হলেন তারই অধীনস্থ সৈনিকদের হাতে।

মঞ্জুর হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত হয়েছিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, যুদ্ধের যিনি ধারেকাছেও ছিলেন না, যার বিরুদ্ধে উল্টো গুঞ্জন ছিল পাকিস্তানিদের সহযোগিতার। মঞ্জুর হত্যা নিয়ে মামলা একটা হয়েছিল, কিন্তু বিচার হয়নি। যুদ্ধ করবেন বলে পাকিস্তান থেকে ছুটে এলেন আবু তাহের; যুদ্ধ করলেনও, যুদ্ধে একটি পা হারালেন। যুদ্ধ শেষে তিনি তৎপর হয়েছিলেন সেনাবাহিনীর ভেতর বিপ্লবী কর্মে। পরিণামে তাকে অভিযুক্ত হতে হলো সেনাবাহিনীর অফিসার ও তাদের পরিজনদের হত্যার প্ররোচনাদানকারী হিসেবে। তাহেরের আশা ছিল জিয়ার সাহায্যে একটি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা গঠনের কাজকে এগিয়ে নেবেন। পরিণতি দাঁড়াল তিনি ফাঁসিকাষ্ঠে প্রাণ দিলেন এবং প্রাণদণ্ডাদেশটি দিল যে আদালত, সেটি বসালেন জিয়াউর রহমান নিজে। এম এ জলিল যুদ্ধ করেছেন দেশের ভেতরে থেকেই। যুদ্ধের পরে তিনি গ্রেপ্তার হলেন ভারতীয় বাহিনীর কিছু সদস্যের লুণ্ঠন তৎপরতার প্রতিবাদ করতে গিয়ে। জিয়াউদ্দিন আহমদ একজন দক্ষ সামরিক অফিসার ছিলেন, পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে যুদ্ধে নেমেছিলেন। যুদ্ধ শেষে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশকে নতুন সরকারের নীতি সঠিক নয় বলে প্রবন্ধ প্রকাশ করে এবং চাকরি ছেড়ে যোগ দিলেন সর্বহারা পার্টিতে।

সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে এসব ঘটনায় বোঝাই যাচ্ছিল যে, রাষ্ট্র স্থিতিশীলতা পায়নি। যুদ্ধের সময়ে কেউ দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি যে, স্বাধীন বাংলাদেশে আবার সামরিক শাসন আসবে। কিন্তু সেই অপ্রত্যাশিত ও অবাঞ্ছিত ঘটনা ঘটেছে। একবার নয়, কয়েকবার। তার অর্থ দাঁড়াচ্ছে এই- দেশ স্বাধীন হলেও রাষ্ট্রের চরিত্র বদলায়নি। কথা উঠেছিল বাংলাদেশের জন্য কোনো সামরিক বাহিনী থাকার আদৌ দরকার আছে কিনা তা নিয়েই। থাকলেও সেটা কেমন ধরনের ও কোন মাত্রার হবে সেটা নিয়েও। কিন্তু সে বিষয়ে ভাববার সময় পাওয়া যায়নি। নতুন শাসকদের উদ্বেগ ছিল পুরাতন ব্যবস্থাটাকে আপৎকালীন বন্দোবস্ত হিসেবে হলেও চালু রাখা যায় কিনা তা নিয়ে। সেটা সম্ভব হয়েছিল এবং সেটা করতে গিয়ে পুরাতন আইনকানুন, আদালত, আমলাতন্ত্র সবই চালু থাকল। সামরিক বাহিনীও আগের ধরনেই পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলো।

পাকিস্তান প্রত্যাগত সেনাবাহিনীর সদস্যদের বাংলাদেশ বাহিনীর ভেতর নিয়ে নেওয়া হলো। ফলে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া এবং না নেওয়া- এই দুই ভাগের ভেতর নীরব ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হলো। সদ্যগঠিত রক্ষীবাহিনীর সঙ্গে নিয়মিত সামরিক বাহিনীর একটি দ্বন্দ্বও দেখা দিল। সংবিধান প্রণীত হলো, কিন্তু দেখা গেল তাতে ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর অস্তিত্বের স্বীকৃতি নেই। বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্বের কথা ভুলে তাকে জাতি-রাষ্ট্র হিসেবেই বিবেচনা করা হলো, অনেকটা পাকিস্তানি কায়দাতেই। যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মুজিববাহিনীর দ্বন্দ্ব ছিল, যুদ্ধের পরে সেটা প্রকট হলো এবং তাজউদ্দীন আহমদ প্রথমে প্রধানমন্ত্রিত্ব পরে মন্ত্রিত্ব থেকেই অপসারিত হলেন। অব্যবস্থাপনার দরুন দেশে দুর্ভিক্ষের মতো একটা মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে গেল। তাতে দু'লাখের মতো মানুষের প্রাণহানি ঘটল। চোরাচালান, হত্যাকাণ্ড, পরীক্ষায় নকল, সম্পদ লুণ্ঠন, এসব নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে থাকল। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হবে- এমন আশা ছিল সর্বজনীন। সে আশা পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা ক্রমাগত দূরে সরে যেতে থাকল। যাদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ নেই এমন যুদ্ধাপরাধীদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হলো। অবস্থা সামাল দেওয়ার জন্য ১৯৭৪ সালের শেষ দিকে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছিল। অল্প পরে ১৯৭৫ সালের শুরুতে এলো একদলীয় শাসন। কিন্তু তাতে অবস্থার কোনো উন্নতি ঘটল না। শুরুতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জনপ্রিয়তা ছিল আকাশচুম্বী। নিঃসন্দেহে সেটা ছিল সরকারের জন্য বিরাট এক মূলধন। কিন্তু ওই সরকার মূলধনটা কাজে লাগাতে পারেনি। সময় যতই এগোতে থাকল, সরকারের জনবচ্ছিন্নতা ততই বৃদ্ধি পেতে থাকল।

সবচেয়ে মর্মান্তিক এবং একেবারেই অবিশ্বাস্য যে ঘটনা ঘটল, সেটি হলো ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর প্রাণ হারানো। সেনাবাহিনীর কয়েকজন অফিসারের নেতৃত্বে এই নির্মম ঘটনাটি ঘটল। এই অফিসাররা সুযোগ নিয়েছে সরকারের জনবিচ্ছিন্নতা বৃদ্ধির। ঘটনার পেছনে যে আমেরিকার সমর্থন ছিল, এই ধারণা অন্যায্য নয়। ক্ষমতায় এলেন আওয়ামী লীগেরই মন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমদ। তিনি যে মার্কিনপন্থি ছিলেন সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আমেরিকা বাংলাদেশের অভ্যুদয় সমর্থন করেনি, তবে মেনে নিয়েছিল এবং চেষ্টা করেছিল নিজের প্রভাববলয়ের ভেতরে তাকে নিয়ে আসতে। বঙ্গবন্ধুর জায়গায় মোশতাকের ক্ষমতাপ্রাপ্তিতে আমেরিকার জন্য সন্তুষ্ট হওয়ার কারণ ছিল। মোশতাক সরকারের চারিত্রিক ঝোঁকটা কোনদিকে সেটা বোঝা গিয়েছিল ক্ষমতা দখলের সঙ্গে সঙ্গেই। তারা যখন 'জয় বাংলা'র জায়গাতে 'বাংলাদেশ জিন্দাবাদ' নিয়ে এলো, বাংলাদেশ বেতারের নাম দিল রেডিও বাংলাদেশ, রেডিও পাকিস্তানের আদলে, তখনই।

মোশতাকের সেই 'বিপ্লব' অবশ্য টেকসই প্রমাণিত হয়নি, তিন মাস হতে না হতেই তিনি এবং তার 'সূর্যসন্তান'রা উৎখাত হয়েছেন। তবে ব্যাপার সুবিধার নয় দেখে জেলখানায় লোক পাঠিয়ে তিনি আওয়ামী লীগের বন্দি চার শীর্ষ নেতাকে হত্যা করিয়েছেন। তারপরে ক্যু পাল্টা ক্যু ঘটেছে। জিয়াউর রহমান এলেন, সংবিধান থেকে তিনি ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের অপসারণ ঘটালেন। তারপরে এরশাদ এসে রাষ্ট্রধর্ম প্রবর্তন করলেন। মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকারের সম্পূর্ণ বিপরীত। এরশাদ ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হলেন গণআন্দোলনে। তারপর 'গণতন্ত্রে'র প্রত্যাবর্তন। মাঝখানে ছদ্মবেশী সেনাশাসন। এরপর ভোটারবিহীন নির্বাচন। সবকিছুই হলো, কিন্তু রাষ্ট্রের মালিকানা এলো না জনগণের হাতে। জনগণ প্রকৃতার্থেই কবে রাষ্ট্রের মালিক হবে- এ যেন এখনও এক অন্তহীন প্রশ্ন।

শিক্ষাবিদ ও সমাজ বিশ্নেষক