ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের প্রধান পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরব, ঐতিহ্য এবং ইতিহাসে এর স্থান নতুন করে ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণের দাবি রাখে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস নিঃসন্দেহে সংগ্রামেরই ইতিহাস। কারণ সময়ের বাঁকে বাঁকে তাকে লড়তে হয়েছে এবং তার এই লড়াইটা অনিবার্য হয়েই উঠেছিল। বিশ্বব্যাপী করোনা দুর্যোগের ভয়াবহতা বর্তমান বাস্তবতায় দেশে দেশে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে, আমরাও এর বাইরে নই। এ কারণেই আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ উদযাপন আয়োজন একেবারেই সীমিত। গৌরবান্বিত-ঐতিহ্যবাহী দেশের শীর্ষ এ বিদ্যাপীঠকে একদিকে লড়তে হয়েছে জ্ঞানের জন্য, অন্যদিকে সামাজিকতার জন্য। দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ও এ কাতার ভিন্ন নয়, কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো অন্য বিশ্ববিদ্যালয়কে এমন দ্বৈত কর্তব্য এই মাত্রায় পালন করতে হয়নি- এও সত্য।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ জ্ঞান-বুদ্ধিচর্চার উর্বর ক্ষেত্র। এখান থেকে অর্জিত জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে পড়ে সমাজে এবং এই আলোয় আলোকিত হয় মানুষ। পাশাপাশি এও সত্য, সমাজই বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় এবং এর অনেক দৃষ্টান্ত আমাদের সামনেই রয়েছে। এ সত্যও অস্বীকার করা যাবে না, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে অন্যতম কারণ ছিল রাজনৈতিক। বঙ্গভঙ্গ পূর্ববঙ্গের মানুষের মনে যে আশা জাগিয়েছিল, তা-ই আবার হতাশায় পরিণত হতে খুব বেশি সময় লাগেনি। তা ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত। এ বঙ্গে মানুষের মনে জেঁকে বসা হতাশা দূর করতেই ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। একই সঙ্গে এও তর্কাতীতভাবেই সত্য, এর প্রতিষ্ঠার পেছনে রাজনৈতিক কারণ থাকলেও সামাজিক তাৎপর্যের ব্যাপকতাও অনেক বিস্তৃত এবং এও ইতিহাসেরই অংশ। রাজনৈতিক ও সামাজিক এ দুই প্রেক্ষাপট বিশ্নেষণ করলে আমরা দেখব, পাকিস্তানের প্রথম নির্বাচনে বাঙালি নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টের ঐতিহাসিক বিজয় ও মুসলিম লীগের ভূমিধস পরাজয়ের পেছনে আজকের শতবর্ষী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা ইতিহাসে অন্যভাবে লেখা রয়েছে। আইয়ুব খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন তার প্রধান প্রতিপক্ষ চিহ্নিত করেছিলেন- এ প্রশ্নের উত্তর মেলে উল্লিখিত ও এর পরবর্তী অধ্যায়গুলো পর্যালোচনায়।
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ পর্বের সূচনাতেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর প্রধান লক্ষ্য ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। কারণ, একাত্তর-পূর্ব গণতান্ত্রিক-সাংস্কৃতিক সব আন্দোলনেই ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনন্য ভূমিকা। পাকিস্তানি শাসকরা বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য করার জঘন্য পরিকল্পনা করেছিল। তাই তাদের আক্রমণের প্রথম লক্ষ্যবস্তু ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ভূমিকা ছিল একাত্তর-পূর্ব রাজনৈতিক অধ্যায়গুলোতে; এরই ধারাবাহিকতায় এ বিশ্ববিদ্যালয় যুক্ত হয় মুক্তিযুদ্ধে। জাতির মেধাবী সন্তানদের বেছে বেছে পাকিস্তানি সেনারা হত্যা করতে থাকে আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের একেবারে আগমুহূর্ত পর্যন্ত। একাত্তরের ২৫ মার্চ যে বর্বর আক্রমণ ওরা শুরু করে, তাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষার্থী প্রাণ হারান। এ বিষয়গুলো যেমন ইতিহাসে লেখা আছে, তেমনি এখনও অনেকের লেখা ওগবেষণায় তা উঠে আসছে। আসবেই। আসতেই থাকবে। ১০০ বছরের বাঙালি জাতির ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য সময়জুড়ে আছে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা। স্বাধীনতার পর আমরা অনেক স্বপ্ন নিয়ে নতুনভাবে, নতুন প্রত্যয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে যাত্রা শুরু করেছিলাম। স্বপ্ন ছিল খুব পুষ্ট। এই স্বপ্নের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তখন অন্যরকমভাবে প্রোথিত ছিল।
কিন্তু আমাদের স্বপ্ন হোঁচট খেল স্বাধীন দেশে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, স্বাধীন দেশে ইতিহাসের স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়ে গৌরবময় অংশীদার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্বাধীনভাবে চলতে পারেনি। জ্ঞানের চর্চা নানাভাবে ব্যাহত হয়েছে। খর্বিত হয়েছে অপরিহার্য স্বায়ত্তশাসন। সময় যত গড়াতে থাকে ততই হস্তক্ষেপ বাড়তে থাকে রাজনৈতিক দলগুলোর; বিশেষ করে অগণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক সরকারগুলোর নিজেদের স্বার্থে। শুরু হলো গৌরবের গায়ে কালো দাগ লাগা। হীন রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে চর দখলের মতো দখল করতে চাইলেন স্বার্থবাদীরা। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়েও যে তাদের শ্যেনদৃষ্টি পড়েনি তা নয়। কিন্তু মূল লক্ষ্যবস্তু ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। কত রক্তাক্ত অধ্যায়ের সৃষ্টি হলো। কত প্রাণ ঝরে গেল। জীবনের ওপর, শিক্ষার পরিবেশের ওপর বৈরী ছোবল থেকেই সৃষ্টি হলো আরও নানারকম কদর্যতার। এত বৈরী পরিবেশের ভেতরেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান যে কাজ- জ্ঞান আহরণ, জ্ঞান সৃষ্টি, জ্ঞান বিতরণ সে কাজগুলো এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়েছে। শিক্ষাদান, গবেষণা, প্রকাশনা ইত্যাদিও থেমে থাকেনি। কিন্তু কোনো কিছুই হয়নি কাঙ্ক্ষিত কিংবা সন্তোষজনক মাত্রায়। শুধু ছাত্র রাজনীতিকেন্দ্রিক কোন্দলই নয়; অনাকাঙ্ক্ষিত আরও অনেক চিত্রই দেখা গেল। শিক্ষকদের দলাদলির কদর্যতা ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণের কারণ হয়ে দাঁড়াল।
শিক্ষার মান কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ধরে রাখা যায়নি। আগের তুলনায় শিক্ষকদের আর্থিক সুযোগ-সুবিধাসহ আনুষঙ্গিক অনেক কিছুই বেড়েছে। এই যে নানা মাত্রিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, তা অনেককেই পূর্ণমাত্রায় অধিকতর দায়িত্বশীল করতে পারল না। এখন যে রকম দলাদলি দৃশ্যমান, আগে তেমন ছিল না। এ পরিস্থিতির সৃষ্টি এক দিনে হয়নি। বারবার বিশ্ববিদ্যালয়ের কপাট বন্ধ হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের যে মূল কাজ পঠন-পাঠন, গবেষণা; এদিকে যদি অগ্রসর হওয়া না যায় তাহলে সার্বিক ক্ষতি বাড়তেই থাকবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বর্ণযুগ ফিরিয়ে আনতে হবে দেশ-জাতির স্বার্থ ও প্রয়োজনেই।

রাজনৈতিক সহাবস্থান ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম গৌরব-ঐতিহ্য। কিন্তু আজ তা ম্লান। ২৮ বছর পর ডাকসু নির্বাচন হলো ২০১৯ সালে। নব্বই-পরবর্তী গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে ডাকসু নির্বাচন না হওয়ার বিষয়টি প্রশ্নবোধক তো বটেই। সমস্যা আরও আছে। সব অনিশ্চয়তা, জটিলতা, কদর্যতা দূর করার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনেরই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বর্ণযুগ ফিরিয়ে আনার দায় সরকারেরও অনেক। বিশ্ববিদ্যালয়কে জ্ঞানচর্চা, জ্ঞান সৃষ্টি, জ্ঞান বিতরণের মূল ক্ষেত্র হিসেবে পরিচ্ছন্ন রাখতেই হবে। নিয়োগ প্রক্রিয়া, গবেষণা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করাও সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এ ব্যাপারে দরকার রাজনৈতিক অঙ্গীকার। ষাটের দশক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শুধু রাজনৈতিক সোনালি যুগই ছিল না; শিক্ষা ও গবেষণার জন্যও ছিল সোনালি যুগ। সেই যুগ ফিরিয়ে আনা দুরূহ নয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও সংশ্নিষ্ট সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়ই তা সম্ভব। সৃজনশীল-সৃষ্টিশীল সব কাজে দিতে হবে যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা। একাডেমিকভাবে ষাটের দশকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফেরত পাওয়ার দাবি সর্বাগ্রে। এ লক্ষ্যেই কাজ করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রমের অন্যতম কাজ হলো গবেষণা। তবে ফরমায়েশি কিংবা চৌর্যবৃত্তির গবেষণায় বিপুল জনগোষ্ঠীর কোনো কল্যাণ হবে না। দলবাজি, লেজুড়বৃত্তি বন্ধ করতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ভূমিকা ও গৌরব তা সামাজিক ও রাজনৈতিক; যা কোনো অঙ্কের মানদণ্ডে হিসাব করা যাবে না। রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তির বিরূপ প্রভাব নানা ক্ষেত্রে বারবার প্রকটভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। যেমন হলে সিট বরাদ্দের ক্ষেত্রেও যেন তা-ই নিয়ামক শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। করোনা দুর্যোগ ফের সেশনজটের আলামত স্পষ্ট করে তুলেছে। এর নিরসনে পরিকল্পিত পরিকল্পনা দরকার। সবক্ষেত্রেই সত্য হলো- ব্যক্তি বদলে সুফল মিলবে না যদি ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো না যায়। নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচনও জরুরি। আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করলাম গত মার্চে। ৫০ বছরে আমাদের অর্জন কম নয়, কিন্তু বিসর্জনও আছে অনেক। সবকিছু মিলিয়েই গৌরব ফিরিয়ে আনার ছক কষে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের বিঘ্নিত চরিত্রই শুধু নয়, সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের ব্যাপারেই সমভাবে মনোযোগ বাড়াতে হবে। পরমতসহিষ্ণুতা বোধের ব্যাপারে উদার হওয়া চাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সমাজের অনেক বড় আশার জায়গা। সেখানে ক্ষত থাকুক, তা কাম্য নয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখলে চলবে না। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এমন কোনো কিছুই কাম্য নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের অদম্য যাত্রা নিয়ে সংহতি ও ক্ষোভ আছে অনেকের মনে। আমরা চাই সংহতি। আদর্শই সবক্ষেত্রে হোক নিয়ামক শক্তি।
বিশ্ববিদ্যালয়কে মনুষ্যত্ব বিকাশের অনুশীলনস্থল হিসেবে দেখতে চাই আমাদের এগোনোর স্বার্থ ও প্রয়োজনেই। যারা প্রকৃত দেশপ্রেমিক তাদের এসব ব্যাপারে গভীরভাবে ভাবতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর দেশপ্রেমের বিচার হবে শিক্ষা সম্পর্কে তারা কী ভাবছে, সেই নিরিখেই।
ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়