করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের একটি উদ্যোগ নিয়ে সম্প্রতি জাতীয় সংসদ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির কয়েকজন সিনিয়র সংসদ সদস্য 'কঠোর সমালোচনা' করেছেন। 'কঠোর' কিংবা 'নরম' সমালোচনা যা-ই হোক না কেন, বিষয়টি যে জাতীয় সংসদে আলোচনায় এসেছে তা বিলম্বে হলেও ভালো। জাতীয় সংসদেই তো আলোচনা-সমালোচনা হবে, এটিই প্রত্যাশিত, যদিও এই প্রত্যাশা বহুবার হোঁচট খেয়েছে। এমনকি অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও আলোচনার বাইরেই থেকে গেছে। এমতাবস্থায় যা হয়ে গেল তাই-বা কম কিসের, যদি আমরা সহজসরল সমীকরণ করি। কিন্তু এখন কি হঠাৎ করে সিনিয়র ক'জন সংসদ সদস্য উচ্চকণ্ঠ হলেন তাদের স্বার্থে আঘাত লাগার কারণে- এমন প্রশ্ন উঠেছে।
মাঠ পর্যায়ে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি কার্যক্রমের সমন্বয়ের দায়িত্বে ৬৪ জেলায় সচিবদের নিয়ে আসায় আলোচনার সূত্রপাত। এই দাপ্তরিক আদেশটি জারি হয়েছিল এপ্রিলে, কিন্তু প্রতিক্রিয়ায় প্রতিবাদের ঢেউ উঠল জুনের অন্তিমে। রাষ্ট্র পরিচালনায় আমলাদের ভূমিকা নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন আরও আগে উঠলেও রাজনীতিক বা সংসদ সদস্যরা তেমন কিছু বলেননি। কিন্তু আমলাদের ভূমিকা রাষ্ট্র পরিচালনায় এতটাই এখন ক্রমবর্ধমান, যা শেষ পর্যন্ত সংসদ সদস্যদের সোচ্চার হতে বাধ্য করেছে। সরকারি দলের একজন জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য জাতীয় সংসদে আমলা প্রসঙ্গে বলেছেন, রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদার ক্রমানুসারে সংসদ সদস্যদের স্থান সচিবদের ওপরে। তিনি পাশাপাশি প্রশ্ন তুলেছেন, জেলায় জেলায় সংসদ সদস্যরা থাকা সত্ত্বেও সরকার করোনা মহামারি মোকাবিলায় সরকারি কার্যক্রমে সমন্বয়ের দায়িত্বভার সচিবদের ওপর ন্যস্ত করা কতটা সংগত হয়েছে। প্রশ্ন যৌক্তিক ও অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সমাধানটা এত সহজ কি? আমরা দেখে আসছি, সংসদ সদস্য ও স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের মধ্যেও একই দ্বন্দ্ব এবং তাও নতুন নয়।
রাজনীতিকদেরই ভালো জানার কথা রাষ্ট্রের ওপর আসল কর্তৃত্বটা কার। কর্তৃত্ব জনগণেরই হওয়ার কথা। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, তার মালিকানা জনসাধারণের হবে এটাই জনশ্রুতি। আমাদের সংবিধানে তা-ই যুক্ত করা হয়েছিল সূচনাতেই। কিন্তু তা হয়নি। বাস্তবে ক্ষমতা রয়ে গেছে অন্যের হাতে। মনে পড়ছে রবীন্দ্রনাথের খুব সুন্দর একটি উপমা। কেবল উপমা নয়, আকাঙ্ক্ষা। তিনি বলেছেন, খুব ভালো হতো রাষ্ট্র যদি হতো ডিমের খোসার মতো। ডিমের খোসা খুবই জরুরি, যাকে ছাড়া ডিমের চলে না। ভেতরে সারবস্তুকে ঘিরে রাখে এই খোসা, পাহারা দেয়। খোসা আছে বলেই ডিমের ভেতর প্রাণ লুকিয়ে থাকে। কিন্তু এমনিতে খোসার দাম কী? ডিমের থেকে আলাদা করে ফেললে খোসাকে কে দাম দেয়। তাই খুব ভালো হতো রাষ্ট্র যদি হতো খোসার মতো। জনগণের জন্য প্রয়োজনীয়, কিন্তু জনগণের সেবক মাত্র, তার বেশি কিছু নয়। কিন্তু সেটা হয় না। রাষ্ট্র হয়ে দাঁড়ায় অন্তর্গত জনসাধারণের শাসক- তা সে পিতার মতোই হোক, কিংবা দৈত্যের মতো। কিন্তু মালিক কে? এই যে পিতা কিংবা দৈত্য তার ওপর কর্তৃত্ব কার? দেখা যাচ্ছে এ বিষয়ে প্রশ্ন পুষ্ট হচ্ছে। আরও হোক। তাহলে হয়তো সমাধানের পথ বের হবে।
রাজনীতিকরা আগে যা-ই মনে করে থাকুক না কেন, যা-ই বলুন না কেন, এখন স্বীকার করেন যে, রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব জনগণের হাতে নেই। রয়েছে আমলাতন্ত্রের হাতে। একটু পেছনে ফিরে তাকাই। আমরা বলতাম স্বাধীনতা, ইংরেজরা বলত ট্রান্সফার অব পাওয়ার। তাই করেছিল তারা, ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিল। করেছিল বাধ্য হয়ে। জনসাধারণ ক্ষেপে উঠেছে, আমলাতান্ত্রিক মহলেও অস্থিরতা দেখা যাচ্ছিল। এমন অবস্থায় ক্ষমতা ছেড়ে চলে যেতে হলো। দিয়ে গেল কাকে? রাজনীতিকদেরই দিতে হলো, কেননা তারাই তখন এগিয়ে, সামনে। ইংরেজ, খুশি হতো আমলাতন্ত্রের হাতে ক্ষমতা তুলে দিতে পারলে। কেননা এর সদস্যদের সঙ্গে কিছুটা বিরোধ থাকলেও সংযোগে, অভ্যাসে, কৃতজ্ঞতায় আমলাতন্ত্র ছিল তুলনায় অনেক নির্ভরযোগ্য। আমলাতন্ত্রই ছিল ইংরেজ শাসকদের দৃষ্টিতে প্রিয়। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ঘটল কিছুটা ভিন্ন রকমের। ওখানেও রাজনীতিকরা সামনে ছিলেন বটে, কিন্তু তাদের চেয়ে আমলাতন্ত্রের সদস্যরা ছিলেন শক্তিশালী। তাছাড়া রাজনীতিকরা নিজেরাও ছিলেন আমলামনস্ক।

বাঙালি জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পেছনে অনেক স্বপ্ন ছিল, অঙ্গীকার ছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পরও কি আমরা পেয়েছি সেই স্বপ্ন-অঙ্গীকারের যথাযথ বাস্তবায়ন করতে? আধুনিক রাজনীতি অত্যন্ত জরুরি বিষয়। রাজনীতি করবেন রাজনীতিকরা, যাদের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক থাকবে নিবিড়। আমাদের এখানে এ পর্যন্ত রাজনীতি বহুবার রাজনীতিকদের হাতছাড়া হয়েছে। এর ফলটা ভালো হয়নি। নানাভাবে এর বিরূপ মূল্য দিতে হয়েছে। আবার রাজনীতি সঠিক পথে চলেওনি। হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহূত হয়েছে রাজনীতি। যে কোনো বিষয়েই আলোচনা হতে পারে তিনটি স্তরে। একেবারে নিচে ব্যক্তি, তার ওপরে ঘটনা, আরও ওপরে মতামত। কোনোমতেই ব্যক্তিগত আক্রমণের নিম্ন সাংস্কৃতিক স্তরে নামিয়ে আনা হবে না রুচিসম্মত। অতীতে বলা হয়েছে, আমলাতন্ত্র ছাড়া চলবে কী করে- এ প্রশ্ন যারা করেছেন তারা আমলা ও আমলাতন্ত্রকে এক করে ফেলেছেন। আমলা ও আমলাতন্ত্রের মধ্যেও পার্থক্য আছে। হ্যাঁ, আমলা ছাড়া চলবে না, কিন্তু আমলাতন্ত্র ছাড়া অবশ্যই চলবে। যেমন ধরা যাক যুক্তরাজ্যে চলছে।
যুক্তরাজ্যে অবশ্যই আমলারা রয়েছেন। কোনো দপ্তরে গেলে কিংবা যোগাযোগ করলে বা করার দরকার হলে তাদের উপস্থিতি অবশ্যই টের পাওয়া যায়। কিন্তু তারা দেশ শাসন করেন না। দেশ শাসন তারাই করেন, যাদের করার কথা। করেন জনপ্রতিনিধিরা, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়। বস্তুত গণতন্ত্র ও আমলাতন্ত্র পরস্পরবিরোধী। তাদের সহাবস্থান সম্ভব নয়। গণতন্ত্র ও আমলাতন্ত্র তো একসঙ্গে যায় না। যায়নি কখনও। বলা হয়েছে, সমাজতান্ত্রিক দেশেও আমলাতন্ত্র রয়েছে। হ্যাঁ, রয়েছে বৈকি এবং রয়েছে বলেই তো গোলযোগও দেখা গেছে। মাও সে তুং চীনে আমলাতন্ত্রের বিকাশ দেখেছিলেন। দেখতে পেয়ে বড় দুঃখে নিজের গড়া পার্টির হেডকোয়ার্টার্সে নিজেই তোপ দাগার ডাক দিয়েছিলেন। এ ইতিহাস কী প্রমাণ করে? প্রমাণ করে এই সত্য যে, আমলাতন্ত্র বড়ই কঠিন বস্তু। বিপ্লবেও নষ্ট হয় না। আবার ফিরে আসে। সমাজতান্ত্রিক বিশ্বই যদি না পারল আমলাতন্ত্রকে উচ্ছেদ করতে, তাহলে আমরা পারব কী করে? তবে আমাদের ইতিহাস আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়বার ইতিহাস। কিন্তু তার পরও আমরা পারিনি, আমলাতন্ত্র রয়ে গেছে।
আমরা যেমন স্বাধীন বাংলাদেশে শুদ্ধাচারী রাজনীতির ধারা সমৃদ্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছি, তেমনি ক্রমাগত হারিয়েছি দায়বদ্ধ-দক্ষ-স্বচ্ছতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ জনপ্রতিনিধিও। অতীতের কথা বাদই দিলাম, ৫০ বছরেও স্বাধীনতার প্রত্যয়টা আমরা পূরণ করতে পারলাম না। জনপ্রশাসনে যারা আছেন, তারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী, জনগণের সেবক। জনপ্রতিনিধিরাও জনগণেরই সেবক। সবার এখতিয়ার নিয়ে কথা বলে জনকল্যাণমূলক পথ সৃষ্টি করতে হবে যূথবদ্ধ প্রয়াসে। আমরা ভুল অনেক করেছি, ভুলের পরিধি আর বিস্তৃত না হলেই মঙ্গল। দেশটাকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে নিয়ে যেতে সবার প্রচেষ্টা খুব জরুরি। পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত সৃষ্টি হয় এমনটি পরিহার করাই বাঞ্ছনীয়। আমাদের মনে আছে, খুব দূরের ঘটনা নয়; অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে জনপ্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের মুখোমুখি অবস্থানের কথা। যার যার সীমানা, বলা ভালো এখতিয়ারের বাইরে যে তৎপরতা বন্ধ করা উচিত।
সাম্প্রদায়িকতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী কোনো কিছুই যেন মাথাচাড়া দিয়ে না উঠতে পারে এ জন্য অত্যন্ত জরুরি গণতান্ত্রিক রাজনীতির পথ মসৃণ করা। সরকারের মন্ত্রিপরিষদে দক্ষদের নিয়ে আসাও জরুরি। এ ছাড়া আমলানির্ভরতা ত্যাগ করা কঠিন। আবারও বলি, আমলা ও আমলাতন্ত্রকে এক করা মোটেও ঠিক হবে না। আমলা থাকুন, আমলাতন্ত্র নয়। গণতন্ত্রের পথ নিস্কণ্টক করা চাই। জনপ্রতিনিধিদের শাসন প্রতিষ্ঠার পথ মসৃণ হোক। রাজনীতি ফিরে পাক হারানো পথ। রাজনীতিকরা নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বলে অধিকতর প্রয়াসী হোন। কারও কারও কারণে ভাবমূর্তি খুব মলিন হয়ে গেছে। নেতৃত্বকে অবশ্যই আপসহীন হতে হবে। না, নির্বাচনে জেতার ব্যাপারে নয়, আরও বড় ব্যাপারে। আর তা হলো বৈষম্যমূলক ও আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে বদলানো। এ ব্যবস্থা সেকালে ছিল, একালেও রয়ে গেছে। কিন্তু একাল তো সেকাল নয়।
শিক্ষাবিদ ও সমাজ বিশ্নেষক