'যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে,/ আমি বাইব না মোর খেয়াতরী এই ঘাটে,/ চুকিয়ে দেব বেচা কেনা,/ মিটিয়ে দেব গো, মিটিয়ে দেব লেনা দেনা,/ বন্ধ হবে আনাগোনা এই হাটে-/ তখন আমায় নাইবা মনে রাখলে...'। ১৯১৬ সালের ৭ এপ্রিল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনে বসে 'বাউল' রাগে 'দাদরা' তালে লিখেছিলেন তার অনুপস্থিতিময় ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনুভূতিতে ভরা এ সংগীত। কেউ তাকে মনে রাখুক বা না রাখুক, তাতে কিছু আসে যায় না বলে তিনি জানিয়ে গেলেও ৮০ বছর পরও তার প্রয়াণ দিবসে শোকাচ্ছন্ন হয় সারা বাংলা!
আজ সেই ২২ শ্রাবণ- যে বর্ষণমুখর দিনে কবিগুরু ছেড়ে গিয়েছিলেন এই পৃথিবী। ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের এই দিনে কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে তার প্রিয় ঋতু বর্ষাতেই নিভে যায় কবির জীবনপ্রদীপ। বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদান রাখা এ কবির মৃত্যুতে শ্রদ্ধা জানিয়ে সেদিন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম শোকাহত হৃদয়ে লিখেছিলেন- 'দুপুরের রবি পড়িয়াছে ঢলে অস্তপারের কোলে/ বাংলার কবি শ্যাম বাংলার হৃদয়ের ছবি তুমি চলে যাবে বলে/ শ্রাবণের মেঘ ছুটে এলো দলে দলে।'
বাংলার প্রকৃতি ও গ্রামীণ সৌন্দর্য, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক সার্থকভাবে কাব্য, গান, গল্প, উপন্যাসের পরতে পরতে তুলে ধরেছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাঙালির জনজীবন ও সংস্কৃতিতে তার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। বাংলা সাহিত্যের প্রায় সব শাখা রবীন্দ্রনাথের ছোঁয়ায় পেয়েছে নতুন চলার পথ। প্রাত্যহিক সব অনুভূতিকে বৈচিত্র্যময় ভাষা ও বর্ণনায় প্রতিষ্ঠা করেছেন। প্রেম, রোমাঞ্চ, ভালোবাসা বা বিরহ- মনজ যে কোনো অবস্থার প্রকাশেই বাঙালির অপরিহার্য অবলম্বন তিনি। মহিরুহ বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির। অসামান্য সৃষ্টিকর্মের মধ্য দিয়ে তিনি অর্জন করে নিয়েছেন বিশ্বকবির খেতাব। তার কারণেই বিশ্বের মানচিত্রে বাঙালি এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অনন্য মর্যাদায়।
বাংলা সাহিত্য নতুন দিক ও মাত্রা পেয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে। অর্জন করেছে বিশ্বের স্বীকৃতি। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ, নতুন সুর ও বিচিত্র গানের কথা, অসাধারণ সব দার্শনিক চিন্তাসমৃদ্ধ প্রবন্ধ, সমাজ ও রাষ্ট্রনীতি-সংলগ্ন গভীর জীবনবাদী চিন্তা-জাগানিয়া অজস্র বাণী, এমনকি চিত্রকলায়ও রবীন্দ্রনাথ চিরনবীন। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, নাট্যকার, কথাশিল্পী, চিত্রশিল্পী, গীতিকার, সুরকার, সংগীত পরিচালক, ছোটগল্পকার ও ভাষাবিদ। জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি চিত্রকর হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেন। বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত 'আমার সোনার বাংলা' তারই লেখা, যা সর্বকালের সেরা সংগীত হিসেবে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত। তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি একই সঙ্গে বিশ্বের দুটি রাষ্ট্রের (বাংলাদেশ ও ভারত) জাতীয় সংগীতের রচয়িতা। শ্রীলঙ্কার জাতীয় সঙ্গীতও রচিত হয়েছে তার প্রেরণায়।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ও বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে রবীন্দ্রনাথ এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করেন। রবীন্দ্রনাথ শুধু বাংলাদেশ ও ভারত উপমহাদেশেই নন; সারাবিশ্বে সবার কাছেই মানবমুক্তির বার্তা নিয়ে উদ্ভাসিত। 'গীতাঞ্জলি' কাব্যগ্রন্থের জন্য প্রথম এশীয় হিসেবে ১৯১৩ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন। নোবেল ফাউন্ডেশন তার এই কাব্যগ্রন্থকে বর্ণনা করেছিল একটি 'গভীরভাবে সংবেদনশীল, উজ্জ্বল ও সুন্দর কাব্যগ্রন্থ'রূপে।
শুধু সৃজনশীল সাহিত্য রচনাই নয়; অর্থনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়েও কবিগুরুর ভাবনা বাঙালি জাতিকে পথ দেখিয়েছে। তিনি এই বাংলার পল্লি উন্নয়ন নিয়ে ভেবেছেন; সমবায়ী কাজের পথ বাতলে দিয়েছেন। বাংলায় আলু, ভুট্টা ইত্যাদি চাষের সূচনা ঘটে তারই উদ্যোগে। দরিদ্র কৃষককে ঋণ দেওয়ার লক্ষ্যে নোবেল পুরস্কারের টাকায় কৃষি ব্যাংকের কাজ শুরু করেন তিনি। কেবল সমাজ সচেতন নন; রাজনীতি সচেতনও ছিলেন তিনি। তাই বঙ্গভঙ্গ রদ করার দাবিতে হিন্দু-মুসলমানদের নিয়ে রাজপথে নেমে এসেছিলেন রাখিবন্ধন কর্মসূচিতে। ১৯১৫ সালে তিনি ব্রিটিশ সরকারের 'নাইট' উপাধি পান। ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ওই উপাধি প্রত্যাখ্যানও করেন তিনি।
আজকের কর্মসূচি :বাংলা ১২৬৮ সনের ২৫ বৈশাখ, ইংরেজি ১৮৬১ সালের ৮ মে কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে জন্ম নেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আলোচনা, কবিতা পাঠ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ বর্ণাঢ্য আয়োজনে কবির ৮০তম প্রয়াণবার্ষিকী পালন করবে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। এ উপলক্ষে বাংলা একাডেমি অনলাইন মাধ্যমে আলাচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেবেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ। 'পূর্ববঙ্গ থেকে বাংলাদেশ :রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শেখ মুজিবুর রহমান' শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন। আলোচনায় অংশ নেবেন অধ্যাপক বেগম আকতার কামাল এবং অধ্যাপক অনীক মাহমুদ। এ ছাড়াও রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করবেন শিল্পী অদিতি মহসিন; কবিতা আবৃত্তি করবেন বাচিকশিল্পী রুবীনা আজাদ। বাংলা একাডেমির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেবেন একাডেমির মহাপরিচালক কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা। বিটিভিসহ বিভিন্ন স্যাটেলাইট চ্যানেল এবং বেতারেও সম্প্রচার করা হবে বিশ্বকবির প্রয়াণ দিবসের নানা অনুষ্ঠান।