নগরের প্রান্তিকে বিস্তীর্ণ প্রান্তর জুড়ে ফুটেছে সফেদ কাশফুল; সাদা মেঘেরা দখলে নিয়েছে গোটা আকাশ। শিশিরভেঁজা ঘাসের বুকে থোকায় থোকায় জমেছে শিউলিগুচ্ছ, আর তা থেকে আসছে মৌমাত সৌরভ।
ষড়ঋতুর তৃতীয় ঋতু শরৎ এই বঙ্গে এসেছে বহুদিন। আশ্বিনের আর দিনকয়েক বাকি। তারপর বিদায় নেবে শরৎ, আসবে হেমন্ত।
শরতের এই বিদায়বেলাতেই রাজধানীতে শরৎ বন্দনার আয়োজন করেছিল সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠী।
করোনাভাইরাস মহামারীতে নগরজুড়ে আনন্দ আয়োজনে আরোপিত হয় কঠোর বিধিনিষেধ। মহামারির প্রকোপ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলে উৎসব আয়োজনের অনুমতি পেল আয়োজকরা।
বেশ অনেক বছর ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় ঋতু উৎসব আয়োজন করা হলেও মহামারী শুরু হওয়ার পর অনুমতি মেলেনি। তাই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মুক্তমঞ্চ, শিল্পকলা একাডেমির কফি হাউজ প্রাঙ্গনকেই বেছে নিচ্ছেন আয়োজকরা।

এবার সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠীর শরৎ উৎসব- এর পর্বটি হচ্ছে শিল্পকলা একাডেমির কফি হাউজ প্রাঙ্গনে। শুক্রবার সকাল ঠিক সাড়ে সাতটায় স্বপন সরকারের ঢোলবাদন পর্বের মধ্যে দিয়ে শুরু হয় শরৎ উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। 

উৎসবে যোগ দিতে আসা কজনের সঙ্গে কথা হয় তখন।
তিনি সমকালকে বলেন, ‘মেট্রোরেলের ঝক্কিঝামেলা পোহায়ে ওই চারুকলায় যাওয়া বেশ ঝামেলার। তার চেয়ে এখানে বেশ খোলামেলা। সবুজ ঘাসের ওপর কেমন শিশির পড়েছে!! সকালের রোদটা একটু একটু করে তেতে উঠছে। গান হচ্ছে, নাচ হচ্ছে। চারুকলা ছিল এতদিনের ঐতিহ্য। ওখানে বকুলতলা, কাঠালচাঁপার ঘ্রাণ বড় মিস করছি। কিন্তু এবার এখানেই বেশ ভালো লাগছে। এখানেই নগরবাসীর সুবিধে।’


উত্তরা থেকে আসা মুক্তা মনোয়ার বলেন, ‘এবার শরৎ উৎসব শুক্রবার হওয়াতে কী যে ভালো হয়েছে! যানজটের ঝামেলা নাই। উত্তরা থেকে কত দ্রুত এসেছি। খুব ভালো লাগছে। কতগুলো দিন আমরা ঘরবন্দি হয়ে ছিলাম। ঋতু উৎসবে এসে আমরা নিজেরাও নিজেদের রাঙিয়ে নিলাম।’


উৎসব প্রাঙ্গন তখন নানা বয়সী মানুষের আনাগোণায় মুখর হয়ে উঠেছে, তাদের পরনে বাহারি পোশাক। জামদানি, কাতানের সঙ্গে নারীরা পরেছেন পুঁতির মালা, কারও কানে ঝুমকো দুল। কেউবা কাজলটানা চোখের ঠিক ওপরে পরেছেন ছোট্ট টিপ। তাদের সঙ্গে আসা পুরুষ সঙ্গীটিও বাদ যাবেন কেন? তারা অনেকেই পরেছেন টাইডাই, অলওভার প্রিন্টের পাঞ্জাবি। ছোট্টরা ঘুরে বেড়াচ্ছে উৎসবের প্রাঙ্গনের এদিক, সেদিক।
তাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই মঞ্চের মাইক থেকে সঞ্চালক নিরা ও রুম্পা জানালেন, এবার ‘শরৎ কথন পর্ব’। এ পর্বে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ, সঙ্গে ছিলেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ ও বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আহকাম উল্লাহ।এ পর্বে স্বাগত বক্তব্য দেন সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক মানজার চৌধুরী সুইট, সভাপতিত্ব করেন লেখক- গবেষক অধ্যাপক ড. নিগার চৌধুরী।


সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ বলেন, ‘ময়মনসিংহে ব্রহ্মপুত্রের কোল ঘেষে আমাদের বাড়ি। বাড়ির আশপাশে কাঁশগুচ্ছ ফুটে থাকত। আমি ফিরে যাই সেই ছোটবেলায়। এখন সুযোগ পেলে চলে যাই উত্তরা বা দিয়াবাড়ীতে, কাঁশের সমারোহে।’
আহকাম উল্লাহ বলেন, ‘আজ আমরা এ শরৎ উৎসবে চাইবো, অতি দ্রুত এ মহামারী চলে যাক।  আমাদের সেই অদ্ভূত গন্ধের, অতি সবুজ পৃথিবীটা আমরা আবার ফিরে পাব,যেখানে নিরাপদ থাকবে সব প্রাণী।’
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ বলেন, ‘বিদেশি সংস্কৃতির আগ্রাসনের কথা যতই বলি না কেন,বাঙালিত্বকে তা কখনও কেড়ে নিতে পারবে না। এই আলো ঝলমল শহরে শরৎ উৎসব আয়োজনের জন্য সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠী বড় একটা ধন্যবাদ পাবে। নিজস্ব সংস্কৃতিকে লালন ও বিকাশের মধ্য দিয়ে আমরা বাঙালির শেকড়কে বিস্তৃত করতে চাই।’
‘শরৎ কথন’ পর্ব শেষে আয়োজকরা ফিরে গেলেন সাংস্কৃতিক পর্বে।
এ পর্বে সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠী পরিবেশন করে নজরুলসঙ্গীত ‘এসো শারদ প্রাতের পথিক’, রবীন্দ্রসঙ্গীত ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে।’
সম্মেলক কণ্ঠে শরৎ আগমনী সঙ্গীত ‘শিশিরে শিশিরে শারদ আকাশে’ পরিবেশন করে বহ্নিশিখা। প্রয়াত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী মিতা হকের সংগঠন সুরতীর্থ পরিবেশন  করে ‘আমার নয়ন ভোলানো এলে’।
এরপর সম্মেলক নৃত্যপর্বে ‘ওগো আমার আগমনী আলো’ গানের সঙ্গে পারফর্ম করে অনিক বসুর দল স্পন্দন। ‘শরৎ আমার স্নিগ্ধ অপরূপ তুমি অনন্যা’ গানের সঙ্গে সম্মেলক নৃত্য পরিবেশন করে তামান্না রহমানের দল নৃত্যম।


নাঈম হাসান সুজার দল নৃত্যজন নৃত্য পরিবেশন করে ‘অমল ধবল পালে লেগেছে মন্দ মধুর হাওয়া’ গানের সঙ্গে। এছাড়াও কত্থক ‍নৃত্য পরিবেশন করে কত্থক নৃত্য সম্প্রদায়। বাফার নাচের দলটি ‘খর বায়ু বয় বেগে চারিদিক’ রবীন্দ্রসঙ্গীতটির সঙ্গে সম্মেলক নৃত্য পরিবেশন করেন।


একক সঙ্গীত পর্বে লালনসঙ্গীত পরিবেশন করেন বিমান চন্দ্র বিশ্বাস, অনিমা রায়, মামুন জাইদ খান, সজীব, প্রিয়াঙ্কা গোপ।
আবৃত্তি পর্বে অমর রায়ের ‘শরতের গন্ধ পাওয়া যায়’ পরিবেশন করেন আহকাম উল্লাহ। তানভীর মোকাম্মেলের ‘নয়ন তারা’ কবিতাটি আবৃত্তি করেন নায়লা তারাননুম চৌধুরী কাকলী।


এদিন ‘শরৎ উৎসব’-এর দ্বিতীয় পর্বটি শুরু হবে শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৪টায় । দ্বিতীয় পর্বের শুরুতে পারফর্ম করবে মৈত্রী শিশুদল, গেন্ডারিয়া কিশলয় কচিকাঁচার মেলা, শিল্পবৃত্ত।
দলীয় সঙ্গীত পরিবেশন করবেন ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী, পঞ্চভাস্কর, সমস্বর, সুর সাগর ললিতকলা একাডেমি, বুলবুল ললিতকলা একাডেমি অব ফাইন আর্টস-বাফার শিল্পীরা।
দলীয় আবৃত্তি পরিবেশনা করবে ঢাকা স্বরকল্পন, মুক্তধারা সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র।
দলীয় নৃত্য পরিবেশনা থাকবে ধৃতি নর্তানালয়, নৃত্যালোক, স্বপ্ন বিকাশ কলা কেন্দ্র, দিব্য, নৃত্যাক্ষ।
 একক আবৃত্তি পরিবেশন করবেন রফিকুল ইসলাম, মাসকুর-এ-সাত্তার কল্লোল, মা.সুদুজ্জামান, ফয়জুল আলম পাপ্পু, সুপ্রভা সেবতি
একক সঙ্গীত পরিবেশন করবেন মহাদেব ঘোষ, সরদার রহমতউল্লাহ, বিশ্বজিৎ রায়,ফেরদৌসী কাকলি, সঞ্জয় কবিরাজ, রত্না সরকার, মহুয়া মঞ্জুরী সুনন্দা,শ্রাবণী গুহ রায়, সমর বড়ুয়া,পল্লব গোমেজ, নবনীতা জাইদ চৌধুরী, রোমানা আক্তার, শান্তা সরকার, অমিত হিমেল, শিমুল সাহা, মারুফ হোসেন, তাহমিনা আক্তার মুক্তি।
দুই পর্বে যন্ত্রশিল্পী হিসেবে থাকছেন মন্দিরায় বিশ্বজিৎ সেন বিষ্ণু, কি-বোর্ডে ডালিম বড়ুয়া, তবলায় স্যামসন সরকার, বাঁশিতে হাসান, একুইস্টিক গিটারে দীপন।