ঢাকা বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

রহস্যে ঘেরা কামরূপ কামাখ্যা

ভ্রমণ

রহস্যে ঘেরা কামরূপ কামাখ্যা

কামরূপ কামাখ্যা মন্দির

তানিয়া এ্যানি

প্রকাশ: ২৮ নভেম্বর ২০২৩ | ২২:৫৫

বাংলাদেশের কোলঘেঁষে থাকা নর্থ ইস্ট ইন্ডিয়ার গেট বলা হয় আসামকে। এই আসামের রাজধানী গৌহাটি। ব্রহ্মপুত্রের তীরঘেঁষে বয়ে চলা চায়ের শহর গৌহাটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে বেশ পরিচিত নীলাচল পাহাড়ের চূড়ায় গড়ে ওঠা কামরূপ কামাখ্যা মন্দিরের জন্য। শিব-পার্বতীর ভালোবাসার কল্পকথা, সেই সঙ্গে তান্ত্রিক জাদুমন্ত্রের গল্প-কাহিনি ঘোরে এই মন্দিরের আশপাশজুড়ে। কথিত আছে, সেই জাদুর নগরীতে কেউ গেলে আর ফিরে আসেনি। সেখানকার জাদুকররা তাদের বন্দি করে রেখে নানা কাজে লাগিয়েছে, নয়তো গরু-ছাগল বানিয়ে রেখেছে। কারও কারও মতে, কামরূপে নাকি কোনো পুরুষ নেই, সবই নারী! দুনিয়ার সব জাদুকর এখান থেকেই জাদুবিদ্যা অর্জন করেছেন। এমনটা আদি গল্পে প্রচলিত থাকলেও, বাস্তবে এমন কিছুর দেখা পায়নি। তবে জানা যায়, উৎসবের সময় দেখা মেলে তান্ত্রিকদের। নিজেদের শক্তি ক্ষমতা বাড়াতে তারা জড়ো হন মন্দির প্রাঙ্গণে। 
হিন্দু পুরাণ অনুসারে, পিতা দক্ষ রাজার অমতে সতী দেবী বিয়ে করেছিলেন মহাদেবকে। প্রতিশোধ নিতে দক্ষ রাজা এক যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন, সবাইকে সে যজ্ঞে নিমন্ত্রণ জানালেও, আমন্ত্রণ পাননি সতী দেবী এবং তাঁর পতি শিব। মহাদেবের অনিচ্ছা সত্ত্বেও সতী দেবী যান পিতার যজ্ঞের আয়োজনে। সেখানে মহাদেবকে অপমান করেন দক্ষরাজা। স্বামীর অপমান সহ্য করতে না পেরে সতী দেবী যজ্ঞের আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়েই নিজের দেহত্যাগ করেন। 
খবর পেয়ে ছুটে আসেন মহাদেব শিব। শোকে ক্ষুব্ধ মহাদেব যজ্ঞ ভণ্ডুল করে সতী দেবীকে তুলে নিয়ে প্রলয় শুরু করেন। মহাদেবের তাণ্ডব বন্ধ করতে অন্য দেবতাদের অনুরোধে বিষ্ণুদেব তাঁর সুদর্শন চক্র দিয়ে সতী দেবীর মৃতদেহ ছেদন করেন।
সতী দেবীর দেহখণ্ড ভার‍তীয় উপমহাদেশের ৫১টি জায়গায় পতিত হয়েছিল, যা পরবর্তী সময়ে হিন্দু পবিত্র পীঠস্থান (শক্তিপীঠ) হিসেবে পরিচিতি পায় ও পূজিত হয়। দেবী সতীর গর্ভ এবং যোনি পতিত হয়েছিল এ পাহাড়েই। সেখানেই গড়ে উঠে শক্তিপীঠ, যা সতীপীঠ নামে পরিচিত। কামাখ্যা মন্দির সেই শক্তিপীঠের অন্যতম। শিবের তরুণী স্ত্রী ও মোক্ষদাত্রী শক্তিই কামাখ্যা নামে পরিচিত।
কামাখ্যা মন্দিরের মূল অংশটি মন্দিরের ভেতরের পাহাড়ের গুহার ভেতর। ভেতরে পূজা করার জন্য একদম ভোর থেকেই শুরু হয় লম্বা লাইন। ৫০০ রুপিতে টিকিট করলে বিশেষ লাইনে কম সময়ে পৌঁছানো যায় একদম মূল গুহায়। 
মন্দিরে চারটি কক্ষ রয়েছে। গর্ভগৃহ, চলন্ত, পঞ্চরত্ন, নাট্যমন্দির নামে রয়েছে মণ্ডপ। মণ্ডপগুলোর স্থাপত্য তেজপুরের সূর্যমন্দিরের সমতুল্য। মন্দিরের চূড়াগুলো মৌচাকের মতো দেখতে।
ভেতরের সরু ছোট গুহায় কোনো প্রতিমা নেই। যোনি আকৃতির ঢালু পাথরের একটি খণ্ডবিশেষ রয়েছে। খানিকটা গর্তের ভেতরে থাকা এই যোনিপাথর সব সময় জল আবৃত থাকে।
কামাখ্যা মন্দিরকে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বেশ জাগ্রত মন্দির হিসেবেই মানেন; তাই সব পূজাসহ নানা আয়োজনে এখানে হাজির হন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। পূজার সামগ্রী কিনতে পাওয়া যায় মন্দির প্রাঙ্গণেই। কেউ কেউ মনোবাসনা কামনায় বলিও দিয়ে থাকেন মন্দির প্রাঙ্গণে।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১২ খ্রিষ্ট পূর্বাব্দে মঙ্গলদের আক্রমণে প্রথম কামাখ্যা মন্দির ধ্বংস হয়েছিল। এর পরও কয়েকবার আক্রমণ হয়েছিল এবং আবার নির্মাণ করা হয়। বর্তমান কামরূপ কামাখ্যা মন্দিরটি অহম রাজাদের রাজত্বকালে নির্মিত।
মন্দিরে দুপুরে ভোজের আয়োজন থাকে সব দর্শনার্থীর জন্য। বিনামূল্যে টোকেন নিয়ে লাইনে দাঁড়ালেই মিলবে ভোগের খিচুড়ি, পায়েস ও সবজির থালি।
মন্দির ঘিরে অম্বুবাচি মেলা
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মতে, আষাঢ় মাসে মৃগ শিরা নক্ষত্রের তিনটি পদ শেষ হলে সতী দেবী ঋতুব্রতী হন। এ সময়টাতে অম্বুবাচি পালন করা হয়। অম্বুবাচির দিন থেকে তিন দিন দেবী কামাখ্যা মন্দির বন্ধ থাকে। কোনো মাঙ্গলিক কাজ করা হয় না, চতুর্থ দিন দেবীর স্নান এবং পূজা শেষে দেবীর দর্শনের অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু অম্বুবাচির এই তিন দিন মন্দির প্রাঙ্গণজুড়ে চলে অম্বুবাচি মেলা। যে মেলায় দেবীর আশীর্বাদের আশায় ভিড় জমান দেশ-বিদেশের হাজারো দর্শনার্থী-পুণ্যার্থী। শুধু তাই নয়, প্রচুর তান্ত্রিক সাধুর দেখা মেলে এই অম্বুবাচি মেলায়। তান্ত্রিক সাধুদের কথা এ উৎসবের বেলাতেই দেখা মেলে তাদের। দূরদূরান্ত থেকে হাজির হন তারা নিজেদের শক্তি বাড়াতে, প্রাচীনকাল থেকেই সাধু-সন্ন্যাসীদের এমন উপস্থিতির জন্যই হয়তো কামাখ্যা ঘিরে ছড়িয়ে আছে এত গল্প কথা! 
পুরোটা পাহাড়ি পথ চাইলে হেঁটেও উঠতে পারবেন অথবা মূল গেট থেকে পেয়ে যাবেন মিনিবাস, ক্যাব। ফিরতি পথে ঢালু পাহাড়ের ভিউ পয়েন্টে দাঁড়ালে দেখা মিলবে পাহাড়ি শহর গৌহাটির পুরো রূপ। পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া হাইওয়ে আর ওপারেই পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে জ্বলে ওঠা আলো জানান দেয় গৌহাটি শহরের ভৌগোলিক অবস্থান। রাতের শহর দেখতেও অনেকে গাড়ি নিয়ে চলে আসেন এ পথে। প্রকৃতি আর দেবীর আরাধনার এ পথ মুগ্ধতা ছড়ায় ভক্ত-অনুরাগী এবং পর্যটকের মনে। 

 

কীভাবে যাবেন
বাংলাদেশ থেকে গৌহাটির সরাসরি কোনো ফ্লাইট নেই। ঢাকা থেকে কলকাতা, তার পর কলকাতা থেকে গৌহাটি যেতে হবে।  কলকাতা থেকে গৌহাটি বিমানে খরচ পড়ে প্রায় ৬-৭ হাজার রুপি আর ট্রেনে পড়বে ১২০০-১৫০০ রুপি, সময় লাগবে ১৮-২০ ঘণ্টা। সবচেয়ে ভালো হয় তামাবিল বা আগরতলা বর্ডার দিয়ে যেতে পারলে। আগরতলা থেকে সরাসরি ট্রেন এবং বিমান দুটিই আছে এবং সময়ও লাগবে কম। গৌহাটি শহর থেকে কামাখ্যা মন্দির পর্যন্ত যাওয়ার জন্য শহরেই পাওয়া যাবে পাবলিক বাস ও উবার। আপনার সঙ্গে ভারী ব্যাগ থাকলে সে সবও মন্দির প্রাঙ্গণের কোনো দোকানে ১০ রুপির বিনিময়ে জমা রেখে ঘুরে আসতে পারবেন পুরো মন্দির নিশ্চিন্তে। 

আরও পড়ুন

×