ঢাকা বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

শীতের সঙ্গী শাল

প্রচ্ছদ

শীতের সঙ্গী শাল

.

তাসলিমা তামান্না

প্রকাশ: ২৮ নভেম্বর ২০২৩ | ২২:৫৭ | আপডেট: ২৮ নভেম্বর ২০২৩ | ২২:৫৮

সকাল বেলায় শিশির ভেজা/ ঘাসের ওপর চলতে গিয়ে/ হালকা মধুর শীতের ছোঁয়ায়/ শরীর ওঠে শিরশিরিয়ে–সুফিয়া কামাল
ঋতু বদলের পালায় প্রকৃতিতে এখনও চলছে হেমন্তকাল। তবে ভোরের কুয়াশায় ঘেরা প্রকৃতি, দূর্বাঘাসে জমে থাকা শিশিরকণা, ঝরাপাতা আর মিষ্টি রোদ জানান দিচ্ছে প্রকৃতিতে শীতের আগমনী বার্তা। অনেকেই এরই মধ্যে গায়ে জড়াতে শুরু করেছেন শীতের কাপড়। 
বছরের অন্য সময়ের তুলনায় শীতকালের ফ্যাশন হয় একদম অন্যরকম। এ সময়ে নিজের মনের মতো নানা রঙিন পোশাকে সাজাতে পারেন নিজেকে। কারণ, শীতকালজুড়েই থাকে নানা উৎসবের সমারোহ। পৌষ পার্বণ, বড়দিন, নতুন বছর। সর্বোপরি এটি বিয়ের মৌসুম। ঋতুবৈচিত্র্যের পালায় শীত ঠিক যতটা রুক্ষ হয়, আপনার সাজগোজ ঠিক ততটাই অন্যরকম হয়ে উঠতে পারে। সাজগোজে থাকতে পারে নম্রতা এবং রঙের ছোঁয়া। শীতে অনেকেই নানা ধরনের সোয়েটার ও জ্যাকেট পরেন। তার পরও শালের একটা আলাদা আবেদন যেন থেকেই যায়। 
যুগ যুগ ধরে শাল শীতের সঙ্গী হয়ে আছে এ দেশের মানুষের সঙ্গে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে শীত নিবারণে যে যতই গরম কাপড় পরুক না কেন, এখনও গায়ে একটা ভারী চাদর না জড়ালে ঠিক স্বস্তি পান না। শহরে তুলনামূলকভাবে শীত কম অনুভূত হলেও শালের কদর কিন্তু কম নয়। প্রায় প্রতিটি বাড়ির আলমারিতে তোলা থাকে এক বা একাধিক শাল। শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, কুর্তি, টপস, ফতুয়া-জিন্স, টি-শার্ট ও শার্ট সবকিছুর সঙ্গেই সহজে মানিয়ে যায় শাল। 
একটা সময় বাড়িতে বাড়িতে হাতে বোনা উলের শালের কদর ছিল। এখন এ ধরনের শাল তেমন একটা দেখা যায় না। ফ্যাশন যেহেতু প্রতিনিয়তই পরিবর্তনশীল, এ কারণে দেশের ফ্যাশন ডিজাইনাররাও সে বিষয়টি মাথায় রেখে প্রতিবছর নিত্যনতুন শাল আনছেন। নারী-পুরুষ উভয়ের ব্যবহারের উপযোগী করে তৈরি করা হচ্ছে এসব শাল। বিদেশি শালও বাজারে রয়েছে প্রচুর। তবে ঢাকা শহরের শীতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গত দু-তিন বছর ধরে হালকা বা পাতলা শাল ফ্যাশনে বেশ ভালোভাবেই জায়গা করে নিয়েছে। হালকা শীতে এ শালগুলো যেমন আরাম দেয়, তেমনি বহন করতেও সহজ। শালে রয়েছে নানা রকম বিকল্প। প্রতিটির উষ্ণতার আঁচও ভিন্ন ভিন্ন। শীতের ফ্যাশনে সেগুলো হতে পারে আপনার সঙ্গী।
ঘরে কিংবা দাওয়াতে সব পোশাকের সঙ্গেই মানিয়ে যায় শাল। খাদি, ভেলভেট কিংবা সুতির শালে আরামের সঙ্গে মিলবে ফ্যাশনও। খাদি, তসর, সিল্ক, এন্ডি, ধুপিয়ান ছাড়াও বিভিন্ন উপকরণের চাদর পাওয়া যায় ফ্যাশন হাউসগুলোতে।
এবারের শীতে শালের নানা বৈচিত্র্য নিয়ে এসেছে ফ্যাশন হাউস ‘লা রিভ’। এ ব্যাপারে লা রিভের ফ্যাশন ডিজাইনার মারুফা শিল্পী জানান, শালের ক্ষেত্রে তারা কটন কাপড়কেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। কিছু শাল তৈরি করা হয়েছে ভিসকস কাপড় দিয়ে। তিনি আরও জানান, এবারের শালের ডিজাইনের ক্ষেত্রে ট্র্যাডিশনাল লুকটাই বেশি রাখা হয়েছে। এ শালগুলোতে পাড় ও আঁচলে খুব সুন্দর স্ক্রিন প্রিন্ট করা হয়েছে। ডিজাইনার মারুফা বলেন, যেহেতু আমাদের সংগ্রহে বিভিন্ন রেঞ্জের শাল রয়েছে, এ কারণে কাজ ও মেটেরিয়ালসেও কিছু পার্থক্য আছে। তিনি জানান, স্ক্রিন প্রিন্টের পাশাপাশি শালে এমব্রয়ডারি, কারচুপির কাজ করা হয়েছে। আবার পার্টি-অনুষ্ঠানকে মাথায় রেখে অলওভার কাজের শালও আছে। তিনি বলেন, যেহেতু আমাদের দেশে  বেশি শীত পড়ে না, এ কারণে খুব ভারী শাল আমরা করি না। বরং আরামদায়ক শীত উপযোগী শালই করা হয়।
‘লা রিভে’র এবারের শীতে সংগ্রহে হালকা রং থেকে শুরু করে সবুজ, লাল, নীল, নেভি ব্লু, হালকা গোলাপিসহ অনেক রঙের শাল রাখা হয়েছে। টিএনজারদের জন্য আছে কেপ, শাল পঞ্চের মতো ডিজাইন। এ ব্যাপারে মারুফা জানান, টিউনিক ও কামিজের সঙ্গে পরার মতো মানানসই অনেক ধরনের প্রিন্টের শাল পাওয়া যাচ্ছে তাদের শোরুমগুলোতে। এগুলো দেখতেও বেশ ফ্যাশনেবল। 
শাল তৈরির ক্ষেত্রে কটন কাপড়ে প্রাধান্য দিয়েছে ফ্যাশন হাউস ‘রঙ বাংলাদেশ’ও। এ ব্যাপারে ফ্যাশন হাউসটির কর্ণধার সৌমিক দাস বলেন, যেহেতু আমাদের এখানে খুব ভারী শীতে পড়ে না, এ কারণে শীতটা উপভোগ করার জন্য শাল তৈরিতে কটন কাপড় ব্যবহার করা হয়েছে। কিছু আছে ভিসকস কটন, যা পরলে আরাম লাগে। তিনি জানান, এবারের শালের ক্ষেত্রে পাতলা ধরনের আরামদায়ক সুতি কাপড়ে ব্লক, স্ক্রিন প্রিন্ট, কারুচুপি, এমব্রয়ডারি কাজ করা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, শালগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে মেয়েরা একই সঙ্গে শাল-ওড়না দু’ভাবেই ব্যবহার করতে পারেন। ছেলেদের ব্যবহার উপযোগী শালও পাওয়া যাচ্ছে তাদের শোরুমগুলোতে। 
দেশীয় ফ্যাশনে শালের গুরুত্ব প্রসঙ্গে সৌমিক দাস জানান, বাইরের অনেক দেশে শীতের তীব্রতা বেশি থাকে। এ কারণে শরীর পুরোপুরি ঢেকে রাখার জন্য ভারী গরম পোশাক ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে। আমাদের দেশের আবহাওয়া তেমন নয়। ঠান্ডা-গরমের একটা ব্যাপার আছে। গ্রামাঞ্চলে ঠান্ডা পড়লেও নগরে সেরকম শীত পড়ে না। সে ক্ষেত্রে শাল হতে পারে দারুণ বিকল্প। চাইলে খুলে রাখা যায়, আবার ঠান্ডা লাগলে গায়ে জড়িয়েও নেওয়া যায়। 
শীতের শালে স্টাইলিশ লুক আনতে দেশীয় ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো করছে নানা রকম নিরীক্ষা, যা তরুণদের বেশ আকৃষ্ট করেছে। 
ব্লক প্রিন্ট বা ভেলভেটের চাদরে ভারী চুমকি, পুঁতি বা এমব্রয়ডারি কাজের পাশাপাশি ব্যতিক্রমী ডিজাইনের দিকেও লক্ষ্য রাখছেন কেউ কেউ। স্ক্রিন প্রিন্ট, ডিজিটাল প্রিন্টে নকশিকাঁথা ও বিখ্যাত চিত্রকর্মের আদলে ভিন্নধর্মী ডিজাইনের শাল তৈরি করছে কোনো কোনো হাউস। কেউ আবার নানা ধরনের শিল্পকর্ম ফুটিয়ে তুলছে চাদরে। কেউবা চাদরে তুলে ধরছে শীতের গদ্য, কবিতার পঙক্তিমালা। 
শালে স্টাইল
মেয়েরা শাড়ি পরলে শাল এমনভাবে জড়াবেন, যাতে সুন্দর শাড়িটিও দেখা যায়। এজন্য প্রথমে শালটিকে ত্রিভুজের মতো করে ভাঁজ করে নিন। এবার কাঁধের ওপর থেকে ঘুরিয়ে নিন। দুই কাঁধের দু’পাশে যেন শালের দুই প্রান্ত এসে পড়ে। এবার ডান দিকের একপ্রান্ত ভাঁজ করে ঘুরিয়ে বাঁ দিকের কাঁধে রাখুন। বা উল্টোটাও করতে পারেন। শাড়ির বাহারও দেখানো হবে, আর আপনাকেও সুন্দর দেখাবে।
টপস বা পশ্চিমা কোনো পোশাকের সঙ্গে শাল ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রথমে শাল ভাঁজ করে দুই কাঁধ থেকে ঝুলিয়ে নিন। দুই প্রান্ত সমান রেখে কোমরের বেল্টের সঙ্গে আটকে দিতে পারেন।
সালোয়ার-কামিজের সঙ্গে ব্যবহার করলে ওড়নার বদলে এক কাঁধে ফেলে রাখুন শাল। এতে ঠান্ডাও কাটবে, আবার দেখতেও ফ্যাশনেবল লাগবে। 
ছেলেরা পাঞ্জাবি পরলে কাঁধে রাখতে পারেন একটা শাল। আজকাল জিনস-শার্ট বা টি-শার্টের সঙ্গেও অনেকেই শাল ব্যবহার করেন।
কোথায় পাবেন : শীতের এ সময়টায় দেশীয় ফ্যাশন হাউসগুলোতে নানা ধরনের শালের সমারোহ থাকে। আড়ং, লা রিভ, রঙ বাংলাদেশ, অঞ্জন’স, কে ক্র্যাফট, বাংলার মেলাসহ বিভিন্ন ফ্যাশন হাউস থেকে কিনতে পারবেন পছন্দের শাল। হরীতকী, দেশাল, নিত্য উপহারসহ ভিন্ন ধারার ফ্যাশন হাউসে পাবেন নানা নকশা আঁকা নানা ডিজাইনের শাল। এর পাশাপাশি বাজারে রয়েছে মণিপুরি, রাখাইন, চাকমাসহ বিভিন্ন আদিবাসীর তাঁতের শাল। রঙে ও নকশায় এসব শালেও রয়েছে ভিন্নধর্মী লোকজ আমেজ। এ ছাড়া নিউমার্কেটসহ বিভিন্ন শপিং মল থেকে কিনতে পারবেন দেশি-বিদেশি শাল।
দরদাম: বাজারে এখন নানা ধরনের শালের ছড়াছড়ি। মার্কেট ও ডিজাইনভেদে দামেও রয়েছে ভিন্নতা। অভিজাত শপিং মলগুলোতে দেশি-বিদেশি শাল কিনতে পারেন ৫০০ থেকে ৫০০০ টাকার মধ্যে। ফ্যাশন হাউসগুলোতে শালের দাম পড়বে ১ হাজার থেকে ২৬০০ টাকার মধ্যে। 

শীতে অনেকেই নানা ধরনের সোয়েটার ও জ্যাকেট পরেন। তার পরও শালের একটা আলাদা আবেদন যেন থেকেই যায়।  যুগ যুগ ধরে শাল শীতের সঙ্গী হয়ে আছে এ দেশের মানুষের সঙ্গে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে শীত নিবারণে যে যতই গরম কাপড় পরুক না কেন, এখনও গায়ে একটা ভারী চাদর না জড়ালে ঠিক স্বস্তি পান না। শহরে তুলনামূলকভাবে শীত কম অনুভূত হলেও শালের কদর কিন্তু কম নয়। প্রায় প্রতিটি বাড়ির আলমারিতে তোলা থাকে এক বা একাধিক শাল। শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, কুর্তি, টপস, ফতুয়া-জিন্স, টি-শার্ট ও শার্ট সবকিছুর সঙ্গেই সহজে মানিয়ে যায় শাল। 

মডেল: সায়মা স্মৃতি
মেকওভার: জারা’স বিউটি লাউঞ্জ
শাল: লা রিভ; ছবি: ফয়সাল সিদ্দিক কাব্য

আরও পড়ুন

×