১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর অবাঙালিদের কারখানায় আমরা যাঁরা কর্মরত ছিলাম, সেসব কারখানার বাঙালি টেকনিশিয়ান ও মেশিন অপারেটররা মাত্র গুটিকয়েক কারখানা চালুর মাধ্যমে আমাদের দেশে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং সেক্টরের যাত্রা শুরু হয়। প্রথম দিকে এই সেক্টরের কর্মতৎপরতা বিভিন্ন শিল্প কলকারখানা ও যানবাহনের কিছু কিছু যন্ত্রাংশ তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের মধ্যেই সীমিত ছিল। ধোলাইখাল এলাকার টিপু সুলতান রোডের ভেতরেই এসব কারখানা গড়ে ওঠে। এগুলো প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে এতই দুর্বল ছিল, যা আজ অনেকের কাছেই বিশ্বাসযোগ্য নাও হতে পারে। যেমন, ঢাকা শহরে বুয়েট ও বিটাককে বাদ দিলে যা দাঁড়ায় তা হলো- সব কারখানা মিলে গোটা দু'য়েক মিলিং মেশিন, তিন থেকে চারটি শেপিং মেশিন, পঁচিশ-ত্রিশটি ছোট-বড় লেদ মেশিন আর প্রত্যেকের কারখানায় অন্তত একটি করে ড্রিল, ওয়েল্ডিং ও টুলস গ্রাইন্ডিং মেশিন ছিল। পরবর্তী সময়ে সদ্য স্বাধীন দেশের উন্নয়ন ও বিভিন্ন পর্যায়ে প্রসারতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানার সংখ্যা বাড়তে থাকে।
১৯৮৬ সালে যখন ধোলাইখাল জিঞ্জিরা প্রকল্প নামে তৎকালীন সরকার ৫ কোটি টাকা ঋণ প্রদানের জন্য বরাদ্দ দেয়, তারপর থেকেই এ সেক্টরের বিকাশ ও বিস্তৃতি লাভ করে। এই প্রকল্পের অধীনে ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে একটি ব্যতিক্রমধর্মী বিশেষত্ব ছিল, যা আগে ও পরে আর কখনও দেখা যায়নি। একজন ঋণগ্রহীতা কোনোরকম বন্ধক না রেখে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ গ্রহণ করতে পারতেন, যার মধ্যে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত মেশিনারি ও ৩ লাখ টাকা ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের আওতায় ছিল।
দুই যুগ পর সেই ১০ লাখ টাকা আজ কোটি টাকারও বেশি। এ ছাড়া একদিকে যেমন অর্থায়নের মাধ্যমে প্রযুক্তি উন্নয়নের পথ করে দেওয়া হয়েছিল, অন্যদিকে গেজেট বিজ্ঞপ্তি জারির মাধ্যমে সাব-কন্ট্রাকটিং ব্যবস্থা প্রবর্তন করে দেশীয় কলকারখানাগুলোকে আমাদের চাহিদার অন্তত ২৫ শতাংশ যন্ত্রাংশ স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ বাধ্যবাধকতার বিধান করা হয়েছিল। এর ফলে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং সেক্টরের শিল্প উদ্যোক্তারা ব্যাপকভাবে উৎসাহিত ও উদ্বুদ্ধ হয়ে নতুন নতুন যন্ত্রাংশ এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের মেশিনারি তৈরিতে অবতীর্ণ হন। পরে সেই সময়ের সরকার ধোলাইখাল জিঞ্জিরা মডেল প্রকল্পে আরও ১৫ কোটি টাকা সারাদেশের জন্য বরাদ্দ দেয়। এভাবে গুটিকয়েক কারখানা থেকে আজ সারাদেশে ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প কারখানার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজারের বেশি।
এ খাতে বিভিন্ন ধরনের কারখানায় উল্লেখযোগ্য পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে- বিভিন্ন কলকারখানার মূলধনি যন্ত্র, সেচ পাম্প ও কৃষি যন্ত্রপাতি, মোল্ড অ্যান্ড ডাইস, ফাউন্ড্রি, নির্মাণ ও বৈদ্যুতিক সামগ্রী ইত্যাদি নানা ধরনের যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ এবং মেরামত সেবা। বর্তমানে এই শিল্পে প্রায় ৬ লাখ মানুষ কর্মরত। প্রতিবছর এ খাতে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার আমদানি বিকল্প যন্ত্র-যন্ত্রাংশ উৎপাদন করে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে।
বিগত বছরগুলোতে রপ্তানির পরিমাণ ওঠানামার মধ্যদিয়ে চলে আসছে। তবে গত অর্থবছরে রপ্তানির পরিমাণ লক্ষণীয় মাত্রায় বেড়েছে। গত দুই অর্থবছরে বিভিন্ন পণ্য রপ্তানিতে প্রণোদনা ও কর সুবিধা পাওয়ার ফলে রপ্তানি বেড়েছে বলে আমরা মনে করি। তবে এ খাতে বিশ্ববাজারের আকার ৭ ট্রিলিয়ন ইউএস ডলারের বিপরীতে রপ্তানির পরিমাণ এখনও উল্লেখ করার মতো নয়। অন্ততপক্ষে বিশ্ববাজারের ১ শতাংশও যদি হয়, তাহলে ৭০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি হওয়া উচিত ছিল। চলতি বছরে রপ্তানির পরিমাণ ১ বিলিয়ন কেন, এর অনেক গুণ বেশি হওয়াটাই সমীচীন ছিল। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদাও এ খাতে বেড়েছে। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী একদিকে যেমন বিনিয়োগ নেই, অন্যদিকে উৎপাদনও কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ছে না।
কিছু পদক্ষেপ যদি জরুরিভাবে নেওয়া হয়, তাহলে এই সেক্টরের পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি বহুগুণে বাড়বে। যেমন- সুলভমূল্যে দীর্ঘমেয়াদে শুধু লাইট ইঞ্জিনিয়ার শিল্পের জন্য শিল্পপার্কে প্লট বরাদ্দ, বিশ্বমানের পণ্য উৎপাদনের জন্য স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ব্যবস্থা করা, অন্তত ১০ বছরের জন্য এই সেক্টরের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও তৈরি পণ্যের শুল্ক্ক কাঠামোর ক্ষেত্রে শিল্পবান্ধব পদক্ষেপ নেওয়া, রপ্তানিযোগ্য পণ্যের আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পরীক্ষা ও অ্যাক্রিডেটেড সনদায়নের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, দেশীয় পণ্য কেনার ক্ষেত্রে সাব-কন্ট্রাকটিং গেজেট নোটিফিকেশন আইনে রূপান্তর করা, দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্যে ও আধুনিক প্রযুক্তির মেশিন ব্যবহারের জন্য বিদেশি প্রশিক্ষক এনে আমাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা ইত্যাদি। এসব সুবিধা পাওয়া গেলে এই খাতের রপ্তানি অন্য সব খাতকে ছাপিয়ে শীর্ষে চলে আসবে বলে আমরা মনে করি।