মাটি মাঝে মধ্যে বেশ অদ্ভুত আচরণ করে থাকে। এমনিতে মাটি একটি কঠিন পদার্থ। তবে পানির সঙ্গে মিলে গেলে মাটি অনেক সময় তরল পদার্থের মতো আচরণ করে থাকে। মাটির এ রকম তরলের ন্যায় আচরণ করার ধর্মকে 'লিকুইফ্যাকশান' বলে। ভূমিকম্পের সময় মাটির এ তরল আচরণ বেশ ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। অনেক সময় পানির ওপর মাটি ঢেলে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মিত হয়। ভূমিকম্পের কাঁপুনিতে যদি ওপরের মাটির সঙ্গে পানি মিশে গিয়ে মাটিকে তরল করে ফেলে তাহলে মাটির আর ভারবহন করার শক্তি থাকবে না। ফলে স্থাপনাটি ধীরে ধীরে মাটিতে চলে যাবে বা উল্টে পড়বে। কোনো মাটির তরল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আসলে কতটা প্রবল এটি প্রকাশ করা হয় 'লিকুইফ্যাকশান পোটেনশিয়াল' দিয়ে। পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য মূলত চারটি স্থান নির্বাচন করা হয়; যার মধ্যে প্রধান দুটি ছিল পাটুরিয়া-গোয়ালন্দ ও মাওয়া-জাজিরা (মাওয়া-জাজিরাতেই শেষ পর্যন্ত পদ্মা সেতু নির্মিত হয়েছে)। পাটুরিয়া-গোয়ালন্দ সাইটের মাটি পরীক্ষা করে দেখা যায়, সেখানকার মাটিতে লিকুফ্যাকশান পোটেনশিয়ালের অস্তিত্ব রয়েছে, যা সেতুর জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। অন্যদিকে মাওয়া-জাজিরা প্রান্তে লিকুইফ্যাকশান পোটেনশিয়ালের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। এ অঞ্চলের মাটি অনেকটা সূক্ষ্ণ ধরনের, যাকে ক্লে (Clay) বা সিল্ট (Silt) বলা হয়ে থাকে। এটি বোঝায় এখানকার মাটিতে ২০ শতাংশের বেশি 'সূক্ষ্ণ কণা' বা ফাইন পারটিকেলস পাওয়া গেছে। অর্থাৎ এখানকার মাটিতে খুব মিহি মাটির কণার পরিমাণ বেশি। মাটির কণা যত সূক্ষ্ণ ও মিহি হবে ততই তাদের মধ্যে একে অন্যের সঙ্গে বেশ শক্ত বন্ধন করে থাকার সম্ভাবনা বাড়বে; যার মাধ্যমে লিকুইফ্যাকশনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমতে থাকবে। তা ছাড়া পদ্মা নদীতে কিন্তু নদীর তলদেশ থেকে প্রচুর পরিমাণে মাটি ক্ষয় হয়, যাকে 'স্কাউরিং' বলা হয়ে থাকে। স্কাউরিং ঘটার আগের অবস্থাকে 'প্রি-স্কাউরিং' বলে আর স্কাউরিং ঘটে যাওয়ার পরবর্তী অবস্থাকে 'পোস্ট-স্কাউরিং' বলে। এ দুই দশা বা অবস্থার কোনো একটিতে যদি লিকুইফ্যাকশান পোটেনশিয়ালের অস্তিত্ব প্রমাণ করা যায় তাহলে সেখানে আর কোনো সেতু নির্মাণ করা যাবে না। পাটুরিয়া-গোয়ালন্দ সাইটে প্রি-স্কাউরিং এবং পোস্ট-স্কাউরিংয়ে দুই দশাতেই লিকুইফ্যাকশান পোটেনশিয়ালের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়েছিল। যে কারণে শেষ পর্যন্ত মাওয়া-জাজিরা সাইটকে বেছে নেওয়া হয় পদ্মা সেতু নির্মাণ করার জন্য।