প দ্মা সেতুর বিষয়টিকে একসময় রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর বলেই মনে হতো। এই ধারণা আরও পোক্ত হয় যখন কোনো শীর্ষ রাজনীতিবিদ প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন যে তাঁরা ক্ষমতায় গেলে দুটি পদ্মা সেতু বানাবেন, একটি মাওয়া দিয়ে, আরেকটি পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া দিয়ে। দ্বিতীয় সেতুর অলীক ঘোষণা থেকে বিষয়টি আরও পোক্ত হয় যে এটি ছিল কেবলই রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর। ২০১০ সালেই জানা হয়ে গিয়েছিল যে পদ্মা সেতুর পরিকল্পনা কোনো অলীক কল্পনা নয়। বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, ২০১৪ সালে পদ্মা সেতু নির্মাণ হওয়ার পর বরিশাল ও যশোর জেলাকে রাজধানীর সঙ্গে যুক্ত করার জন্য রাজবাড়ীর পাঁচুরিয়া থেকে ফরিদপুরের পুকুরিয়া পর্যন্ত পঞ্চান্ন কিলোমিটার দীর্ঘ রেললাইনটিকে আবার চালু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই তথ্য থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে পদ্মা সেতুর স্বপ্টম্ন বাস্তবে রূপ নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল ততদিনে।
কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্টেম্নর এই সেতুর কাজ শুরু করার পর থেকেই প্রথম শঙ্কা তৈরি হয় ২০১১ সালে। প্রকল্পটি নিয়ে জল ঘোলা করা শুরু হওয়ার পরের ইতিহাস সবার জানা। প্রকল্পটির জন্য বিশ্বব্যাংকের প্রতিশ্রুত ১২০ কোটি ডলার ছাড়াও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ৬১ কোটি, জাইকা ৪০ কোটি এবং ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের দেওয়ার কথা ছিল ১৪ কোটি ডলার। এই ঋণের সুদ ছিল মাত্র দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং পরিশোধের মেয়াদ ছিল দশ বছরের রেয়াতি সময়সহ চল্লিশ বছর। বোঝা যায় ঋণটির প্রত্যক্ষ শর্ত ছিল খুবই সহজ ও নমনীয়। কিন্তু সম্ভাব্য দুর্নীতির কথা বলে শেষ পর্যন্ত এই ঋণ চুক্তি বাতিল করে দেয় বিশ্বব্যাংক। ঋণটি বহাল রাখার জন্য তারা যে পূর্বশর্ত দিয়েছিল, দেশের মর্যাদা রক্ষার খাতিরে সে শর্ত পূরণ করতে রাজি হয়নি বাংলাদেশ।
একথা সবারই জানা, প্রকল্পের নির্মাণকাজ তদারকির জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ প্রক্রিয়া চলাকালীন কানাডার একটি কোম্পানি এসএনসি-লাভালিনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনেছিল বিশ্বব্যাংক। বাংলাদেশ সরকারের কর্মকর্তা, কানাডার পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি ব্যক্তিদের মধ্যে যোগসাজশে বিভিন্ন সূত্র থেকে দুর্নীতির বিশ্বাসযোগ্য তথ্য-প্রমাণ তাদের হাতে এসেছে বলে অভিযোগ করে সংস্থাটি। এসব তথ্য-প্রমাণ খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের কাছে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য দাতা সংস্থা চুক্তি স্থগিত করে। ফলে কথিত দুর্নীতির অভিযোগে একজন মন্ত্রীকে পদ ছাড়তে হয়, কারাগারে যেতে হয় একজন সচিবকে। শেষ পর্যন্ত তাঁদের বিরুদ্ধে সব অভিযোগ কানাডার আদালতে 'গুজব' বলে প্রমাণিত হয়েছিল।
অবশ্য বিশ্বব্যাংকের এসব অভিযোগ প্রথম থেকেই প্রত্যাখ্যান করে আসছিল বাংলাদেশ। বিস্ময়করভাবে ২০১২ সালে এই প্রকল্প থেকে বিশ্বব্যাংকের সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেওয়ার আগের দিন দেশবাসী ও পুরো বিশ্বকে হতবাক করে দিয়ে মর্যাদার বৃহৎ প্রকল্পটি নিজস্ব অর্থায়নে করার ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই ঘোষণার মধ্যে রাজনীতি কিংবা বাগাড়ম্বর ছিল না, ছিল আত্মবিশ্বাস, দৃঢ়তা ও স্বনির্ভরতার আত্মস্বীকৃতি। কারণ, বিশ্বব্যাংকের সরে দাঁড়ানো কেবল জাতির জন্য চরম অমর্যাদাকরই ছিল না, অর্থনৈতিকভাবে দেশের জন্য ক্ষতিকরও ছিল। সেই অমর্যাদা ও অপমানজনক অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য আমাদের কাছে নিজ পায়ে দাঁড়ানো ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। দুর্নীতির অভিযোগ খারিজ করে দিয়ে কানাডার আদালতের অনুকূল রায় এবং নিজ খরচে সেতু প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত বিশ্বঅঙ্গনে আমাদের মুখ উজ্জ্বল করেছে বটে, তার সঙ্গে প্রমাণ করেছে যে আমাদের মতো সীমিত আয়ের দেশে একটা বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করার পদে পদে কত বাধা। তার ওপর দাতা সংস্থা যদি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর রাজনীতি ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে, তখন এমনকি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক কোনো প্রকল্পও বাস্তবায়ন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই ষড়যন্ত্র ও গোষ্ঠীস্বার্থের বড় প্রমাণ মেলে, যখন বিশ্বব্যাংকের নেতৃত্বে দাতা সংস্থা পদ্মা সেতু প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মসিউর রহমানকে দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে দেশত্যাগের পরামর্শ দেয়। এই প্রস্তাবে সম্মত হলে তাঁকে বিশ্বব্যাংক, এডিবি বা অন্য কোথাও তাঁর চাহিদা অনুযায়ী ভাতায় কনসালট্যান্সি কিংবা বিদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ জোগাড় করে দেওয়ার টোপও দেওয়া হয়েছিল। এই হাস্যকর ও স্ববিরোধী প্রস্তাবের মধ্য দিয়েই ষড়যন্ত্র ও মিথ্যা অভিযোগের বিষয়টি প্রমাণিত হয়। দুর্নীতির জন্য অভিযুক্ত কোনো ব্যক্তিকে কনসালট্যান্সি কিংবা শিক্ষকতার চাকরি দেওয়া হবে কেন? সুতরাং, বোঝা যায় তাদের উদ্দেশ্য দুর্নীতি ঠেকানো ছিল না, ছিল অন্য কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করা এবং এই প্রকল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত কিছু মানুষকে সরিয়ে নিজেদের আস্থাভাজন লোকজনকে বসানো। এই নীলনকশায় কার বা কাদের স্বার্থ রক্ষা করতে চেয়েছিল তারা, সেটি অধিকতর তদন্তের বিষয়, কিংবা হয়তো সেটা কখনোই জানবে না মানুষ। এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে ঢাকায় নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতের একটা বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য, তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, 'এটা ছিল বাংলাদেশের মানুষ এবং সরকারের প্রতি আস্থার অভাব।' কূটনৈতিক শিষ্টাচারের কারণে তিনি ষড়যন্ত্রের কথা না বললেও যে আস্থার অভাবের কথা তিনি বলেছেন, সেটিও মিথ্যা প্রমাণিত করেছে বাংলাদেশের মানুষ ও জনগণ। আজ এটা পরম স্বস্তি ও তৃপ্তির বিষয়, পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের এই অগ্নিপরীক্ষায় বাংলাদেশ কেবল সসম্মানে উৎরেই যায়নি, বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে দিয়েছে, একদা সাহায্যনির্ভর একটি দেশ কীভাবে নিজ পায়ে উঠে দাঁড়াতে পারে। এসব কারণে এই প্রকল্পটির রাজনৈতিক অর্থনীতি, উন্নয়ন অর্থনীতির ভবিষ্যৎ পাঠ্যতালিকায় স্থান পাওয়ার যোগ্য।
পদ্মা সেতুতে কথিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাংকের এই 'জেহাদ' হাস্যকর ঠেকবে যদি ওয়াশিংটনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর পলিসি স্টাডিজের সহযোগী সংগঠন ফরেন পলিসি ইন ফোকাস তাদের ২০১৯ সালের রিপোর্টে বিশ্বব্যাংক সম্পর্কে কী লিখেছিল সেটা পর্যালোচনা করা যায়। রিপোর্টের শুরুতেই উল্লেখ করা হয়, 'চুরি ও ভিন্ন খাতে সরিয়ে ফেলার মুখে অরক্ষিত ব্যাংকের তহবিল, এমন একটা অভ্যন্তরীণ রিপোর্ট ধামাচাপা দিতে চেয়েছিল ব্যাংক ব্যবস্থাপনা।' রিপোর্টে উল্লেখ করা হয় 'ব্যাংকের অধিকাংশ দুর্নীতিবিরোধী প্রয়াস বড় কর্তাদের ভাষণ ও বিশ্নেষণধর্মী সমীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে।...আইইজির [ইন্ডিপেনডেন্ট ইভ্যালুয়েশন গ্রুপ] রিভিউ অনুযায়ী আজ পর্যন্ত প্রকল্প রূপরেখায় জালিয়াতির ঝুঁকি নিরসনে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, প্রণয়ন করা হয়নি প্রকল্প তত্ত্বাবধান, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও কেনাকাটার কোনো নীতিমালা। এবং যদিও [বিভিন্ন দেশের] জাতীয় বাজেটের মধ্যকার ঘাটতি মোকাবিলায় ব্যাংকটির অর্থায়নে জালিয়াতি ও দুর্নীতি নিরূপণ করা প্রয়োজন ছিল, সেটি রয়েছে কেবল কাগজে-কলমে, বাস্তবে রয়েছে সামান্যই।' রিপোর্টে দুটো দেশের উদাহরণ তুলে ধরে মন্তব্য করা হয়, 'ব্যাংকের গত অর্থবছরে [২০১৮] ভিয়েতনাম ও ভারত ছিল আইডিএ ঋণের সবচেয়ে বড় গ্রহীতা- ভিয়েতনাম ১২০ কোটি ও ভারত ৮০ কোটি ডলার, অথচ ভিন্ন ভিন্ন পর্যালোচনায় উভয় দেশেই আগের চলমান প্রকল্পগুলোতে উচ্চমাত্রার দুর্নীতির আশঙ্কা নিরূপিত হয়েছিল।' রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, দুর্নীতির সমূহ আশঙ্কা সত্ত্বেও ভারতের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে অতিরিক্ত ৫২ কোটি ডলার এবং ভিয়েতনামের অবকাঠামো প্রকল্পে ৩২ কোটি ডলার ঋণ অনুমোদন করা হয়েছিল। এসব দুর্নীতির দায় কেবল গ্রহীতা দেশের সরকারের ওপর বর্তায় না, বিশ্বব্যাংকও তার ঋণ তহবিলের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিতে দুর্বলতার দায় এড়াতে পারে না। ভারত ও ভিয়েতনামের বিভিন্ন প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও সেখানে বিশ্বব্যাংকের ঋণপ্রবাহ না কমে বরং বৃদ্ধি পেয়েছিল, কিংবা অন্য দেশেও সেটাই ঘটে, এতেও প্রমাণিত হয় যে পদ্মা সেতু প্রকল্পে কথিত দুর্নীতির অভিযোগ ছিল অজুহাতমাত্র, এখানে ভিন্ন কোনো স্বার্থ জড়িত ছিল।
একটা অপ্রিয় সত্য স্বীকার করতেই হবে, স্বল্পোন্নত কিংবা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দেখা যায় উন্নয়ন কার্যক্রম এবং দুর্নীতি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। একটা দুর্নীতিপরায়ণ সমাজে উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে যে পরিমাণ অর্থের প্রবাহ সংঘটিত হয়, সেখান থেকে নানান কৌশলে দুর্নীতি বা উৎকোচের মাধ্যমে একটা বড় অংশ হাপিশ হয়ে যায়। দুর্নীতি অপ্রতিরোধ্য হলে সেটিকে প্রতিহত করার একমাত্র উপায় উন্নয়ন প্রকল্প হাতে না নেওয়া। অথচ দেশের প্রবৃদ্ধির জন্য উন্নয়ন প্রকল্প অপরিহার্য। সে কারণেই ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা দুর্নীতিকে উন্নয়নের বাধা হিসেবে গণ্য না করে বরং সহযোগী বলে মনে করতেন। রোমানিয়ার রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও লেখিকা এলিনা মুনজিউ এবং বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তা টিল হার্টম্যান তাঁদের যৌথ প্রকাশনা করাপশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট: অ্যা রিএপ্রেইজাল (২০১৯) গ্রন্থে লেখেন, উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা বলতে থাকেন যে, "আধুনিকায়ন ও উন্নয়নের প্রাথমিক পর্যায়ে দুর্নীতি সকল রাষ্ট্রের একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য। তথাকথিত সংশোধনবাদীরা যুক্তি দেখান যে দুর্নীতি অন্ততপক্ষে কখনও কদাচিৎ কখনও বা নিয়মমাফিকভাবে আধুনিকায়ন ও উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় একটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।" বিভিন্ন মতের উদ্ধৃতি দিয়ে তাঁরা লেখেন, "যেসব দেশের সরকার এবং আমলাতন্ত্র অর্থনৈতিক কার্যক্রমের অগ্রগতি সাধন করতে অনাগ্রহী কিংবা অক্ষম, সেসব দেশের ক্ষেত্রে দুর্নীতি অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য উপকারী হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে আমলাতন্ত্রের সহায়তা পাওয়ার জন্য দুর্নীতিকে ব্যবহার করে।"
দুর্নীতি ও উন্নয়নের মধ্যকার সম্পর্কের বিষয়ে শতাধিক দেশের ওপর ১৯৮৪ থেকে ২০১৬ সালের উপাত্ত নিয়ে পরিচালিত এক গবেষণাপত্রের ভূমিকায় সর্বানী সাহা ও কুনাল সেন লেখেন যে, স্পিড মানি দিয়ে আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা এড়াতে বিনিয়োগকারীদের সক্ষম করা এবং আদায় করা ঘুষ নিম্ন বেতনভোগী সরকারি কর্মচারীদের বেতনের সম্পূরক হলে আরও বেশি পরিশ্রমে উৎসাহী হওয়ার মাধ্যমে দুর্নীতি অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রবৃদ্ধি ঘটায়। তাঁরা বিভিন্ন সমীক্ষা উদ্ধৃত করে বলেন যে, উত্তর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো উচ্চমাত্রার দুর্নীতি সত্ত্বেও দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল। দুর্নীতি, উন্নয়ন ও শাসন ব্যবস্থার নিরিখে তাঁরা দেখিয়েছেন যে অগণতান্ত্রিক দেশগুলোতে উন্নয়ন ও দুর্নীতি পরস্পরের সহযোগী। তবে আবার আফ্রিকার কিছু স্বৈরতান্ত্রিক দেশের উদাহরণে তাঁরা দেখিয়েছেন যে সেসব দেশে দুর্নীতির ফলে উন্নয়ন আরও পিছিয়ে গেছে। গবেষকদের কেউ তাঁদের গবেষণাপত্রে দেখিয়েছেন যে কোনো কোনো দেশে দুর্নীতির হারের তুলনায় বেশি ছিল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার। তবে স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে উৎকোচ ইত্যাকার কারণে ব্যবসা কিংবা বিনিয়োগে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার গ্রন্থি যেমন খুলে যায়, তেমনি ব্যবসা করা কিংবা বিনিয়োগের খরচও বেড়ে যায়। দুর্নীতি রোগের অগণিত উপসর্গের মধ্যে এটিও অন্যতম একটা কুফল। তবে একাধিক গবেষণাপ্রসূত ওপরের আলোচনাকে কোনোক্রমেই দুর্নীতির পক্ষাবলম্বন বলে ধারণা করা যাবে না, গবেষকেরা উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাস্তবতা তুলে ধরেছেন মাত্র। এমনকি এসব প্রসঙ্গের অবতারণা পদ্মা সেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংকের কথিত দুর্নীতির অস্তিত্বকে স্বীকার বা প্রমাণিত করাও বোঝায় না। দেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামোগত প্রকল্পটিতে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংকের ঋণচুক্তি বাতিল করার পটভূমিতে এইসব সমীক্ষা নিতান্তই প্রাসঙ্গিক।
বিশ্বব্যাংক যখন দেশের একটি নির্দিষ্ট প্রকল্পের কথিত কিংবা সম্ভাব্য দুর্নীতি নিয়ে বিস্ময়করভাবে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখনও আমাদের দেশে তাদের দেওয়া ঋণে অন্য প্রকল্প চলমান ছিল। উল্লেখ্য, স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রায় বিশ্বব্যাংক প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি ডলার ঋণ সহায়তা মঞ্জুর করেছে। যে বছর পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়, সে বছরেও বাংলাদেশ ব্যাংকটি থেকে তিনশ কোটি ডলারের ঋণ পেয়েছিল, যার পরিমাণ ছিল যে কোনো এক বছরের জন্য সর্বোচ্চ। আমাদের দেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংঘটিত অনস্বীকার্য দুর্নীতির অভিযোগ সত্ত্বেও বিশ্বব্যাংক কোনো প্রকল্পে অর্থায়ন বন্ধ করেনি, যা ঘটেছে কেবল পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রে। সুতরাং এটি যে অন্য কারও ষড়যন্ত্র, সেটা বুঝতে কোনো গবেষণার প্রয়োজন পড়ে না।
একটা প্রাসঙ্গিক বিষয় উল্লেখ করতে হয়। বিশ্বব্যাংক এবং যে উন্নত বিশ্ব দুর্নীতির বিরুদ্ধে নানান বাগাড়ম্বর করে, সেসব দেশই আবার স্বল্পোন্নত দেশে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদের অভয়ারণ্য বলে চিহ্নিত এবং স্বীকৃত, এবং তাদের দেওয়া নিরাপত্তার কারণেই আমাদের মতো দেশের সম্পদ অবৈধভাবে সেসব দেশে পাচার হয়ে সুরক্ষা পায়। বেআইনিভাবে অর্জিত এই সম্পদের অবৈধ দেশান্তরের ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলো যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি লাভবান হয় উন্নত দেশগুলো। সে কারণেই দুর্নীতি বিষয়ে সেসব দেশের অবস্থান দ্বিমুখী। দুর্নীতিজাত পাচারকৃত অবৈধ অর্থ সুরক্ষায় উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সুযোগ-সুবিধা, আবার দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাদের কঠোর অবস্থান কেবল হাস্যকরই নয়, একধরণের বৈপরীত্য ও অসংগতি।
দুর্নীতি অবশ্যই একটা অপ্রতিকার্য ব্যাধি, আমাদের দেশের মানুষের ক্রমবর্ধমান ধর্মচর্চাও এই ব্যাধিটির বিস্তার রোধ করতে পারছে না। এসব অনস্বীকার্য অভিযোগ সত্ত্বেও শত প্রতিকূলতা, ঘরে-বাইরে সমালোচনা, অভিযোগ ও অবিশ্বাসের সব জাল ছিন্ন করে যে অবকাঠামোটি দেশের দুই প্রান্তের মানুষকে কাছাকাছি এনে দিচ্ছে, সেটি কেবল আমাদের অর্থনৈতিক বিজয় নয়, এদেশের মানুষের আত্মসম্মান ও মর্যাদার সমুন্নতিও। এই সেতুর অর্থনৈতিক গুরুত্ব কিংবা অবদান নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই, কিন্তু বিশ্বদরবারে দেশের ভাবমূর্তির যে উল্লম্ম্ফন ঘটছে, সেটির অর্থনৈতিক অবদান অপরিমেয়।
লেখক :প্রাবন্ধিক, অর্থনীতিবিদ