পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে চালু হচ্ছে কয়েকশ নতুন ও বিলাসবহুল বাস। এ খাতে পরিবহন কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে অন্তত হাজার কোটি টাকা। এসব বাস সার্ভিস পুরোপুরি চালু হলে যাত্রীরা স্বল্প সময়ের মধ্যেই দূর-দূরান্তের গন্তব্যে পৌঁছতে পারবেন। পাবেন উন্নত যাত্রীসেবাও। আজ রোববার প্রথম দিন থেকেই বেশ কিছু নতুন বাস পদ্মা সেতু দিয়ে চলাচল শুরু করবে। ঈদুল আজহার আগে আরও নতুন নতুন বাস নামাবে নামিদামি পরিবহন কোম্পানিগুলো। এসব বাস চালু হলে খুব সহজেই রাজধানী থেকে কুয়াকাটা-পিরোজপুর-বেনাপোল-সাতক্ষীরার মতো দেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় খুব সহজেই যাতায়াত করা যাবে। দীর্ঘদিন ধরে চলা ফেরিঘাটের যন্ত্রণাও আর থাকছে না। এক কথায় দেশের পরিবহন জগতে বিপ্লব ঘটাতে যাচ্ছে স্বপ্নের পদ্মা সেতু।

জানা যায়, অনেক কোম্পানি নতুন বাসের জন্য রুট পারমিটের আবেদন করেছে। যেসব বাস পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ফেরিঘাট হয়ে যাতায়াত করত সেসব কোম্পানিও বাসের রুট পারমিট পরিবর্তনের আবেদন জমা দিয়েছে। অনেক বাস কোম্পানি নতুন বাসের জন্য আগে থেকেই রুট পারমিট নিয়ে রেখেছে। সেগুলো আজ থেকেই চলাচল করবে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্ল্যাহ বলেন, আমরা প্রস্তুত। এখন থেকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বেশিরভাগ গাড়িই পদ্মা সেতু দিয়ে চলবে। পুরোনো গাড়ির রুট পারমিট লাগবে না। নতুন গাড়ি নামালে রুট পারমিট লাগবে।

ফেরিঘাটের বিড়ম্বনার কারণে এতদিন বিলাসবহুল বাসগুলোকে চলাচল করতে নানা সমস্যায় পড়তে হতো। সেতু চালুর পর আর এই সমস্যা থাকছে না। কাজেই বিলাসবহুল বাস কোম্পানিগুলোও এ রুটে বিভিন্ন গন্তব্যে বাস চালানোর উদ্যোগ নিয়েছে। দেশের অন্যতম বিলাসবহুল বাস সার্ভিস গ্রিনলাইনের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, পদ্মা সেতু দিয়ে সার্ভিস বাড়াতে আপাতত ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০টি বিলাসবহুল বাস নামানো হচ্ছে। আগে ফেরিঘাটে বাসগুলোকে আটকে থাকতে হতো। এখন ডাবল ট্রিপও প্রয়োজনে চালানো যাবে। ঢাকা-খুলনা, ঢাকা-বরিশাল ও ঢাকা-বেনাপোল রুটে পাটুরিয়া ফেরিঘাট হয়ে যেত গ্রিনলাইনের বাসগুলো। এখন থেকে এসব বাস পদ্মা সেতু হয়ে যাতায়াত করবে। বরিশালের বাসগুলো কুয়াকাটা পর্যন্ত যাবে। খুলনার বাসগুলো সাতক্ষীরা পর্যন্ত যাবে।

হানিফ পরিবহনের জেনারেল ম্যানেজার মোশাররফ হোসেন বলছেন, পদ্মা সেতু দিয়ে চালানোর জন্য নতুন আরও ২০টি বিলাসবহুল বাস কেনা হয়েছে। অন্য ৬০টি বাসও এখন থেকে পদ্মা সেতু দিয়ে চলবে।

একই কথা জানান সোহাগ পরিবহনের সংশ্নিষ্টরাও। বেনাপোল, খুলনা ও সাতক্ষীরার ৪০টি বাস পদ্মা সেতু ব্যবহার করবে।

হানিফ পরিবহনের স্বত্বাধিকারী কফিল উদ্দীন বলেন, এতদিন ফেরি পারাপারের দুর্ভোগের কারণে সায়েদাবাদ থেকে পদ্মা পার হয়ে তাদের বিলাসবহুল বাসগুলো চালানো হয়নি। পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় বরিশাল ও খুলনা বিভাগের ২১ জেলায় চলাচল শুরু করবে হানিফ পরিবহনের বিলাসবহুল বাস।

মাদারীপুর জেলা বাস মালিক সমিতি নতুন করে আরও ২৫টি বাস যুক্ত করছে। 'সার্বিক পরিবহনের' ৫৭টি বাসের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আরও ২০টি চেয়ারকোচ ও ৫টি এসি বাস। এ ছাড়া সোনালি ও চন্দ্রা পরিবহনেও নতুন বাস যুক্ত করার কথা ভাবছেন বাস মালিকরা।

বরিশাল বাস মালিক গ্রুপ সূত্রে জানা যায়, আজ থেকেই পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে বরিশাল থেকে রাজধানীতে সরাসরি বাস চলাচল শুরু হবে। বরিশাল বাস মালিক গ্রুপ ৭০টি নতুন বাস প্রস্তুত রেখেছে। এ ছাড়া সাকুরা, শ্যামলী, গ্রিনলাইন, ঈগল, রাজধানী, ইউনিক, ওয়েলকাম ও সেন্টমার্টিন পরিবহনের পক্ষ থেকে বরিশালের নথুল্লাবাদ কেন্দ্রীয় টার্মিনালে কাউন্টার চাওয়া হয়েছে।

বরিশাল বাস মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক কিশোর কুমার দে বলেন, এখন পর্যন্ত ১০টি নামিদামি পরিবহন কোম্পানি নথুল্লাবাদ টার্মিনালে কাউন্টার বরাদ্দের জন্য আবেদন করেছে।

বরিশাল বাস মালিক গ্রুপের সভাপতি গোলাম মাসরেক বাবলু বলেন, এখন থেকে দিনরাত বিলাসবহুল গাড়িতে বরিশাল থেকে ঢাকার যাত্রাবাড়ী ও সায়েদাবাদ টার্মিনাল পর্যন্ত যাত্রী পরিবহন করা হবে। এ জন্য রুট পারমিট গ্রহণসহ নানা প্রস্তুতি নিচ্ছেন মালিকরা। বিএমএফ পরিবহনের বরিশাল থেকে ঢাকা পর্যন্ত রুট পারমিট নেওয়া আছে বলে জানান তিনি।

ঢাকা-বরিশাল-কুয়াকাটা রুটে চলাচলকারী জনপ্রিয় সাকুরা পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন কবির জানান, তাদের ৭৫টি বাস বরিশাল ও খুলনা বিভাগের বিভিন্ন রুটে চলাচল করে। সেতু উদ্বোধনের পর সাকুরার সব বাস পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে চলাচল করবে। তাদের বাস আর দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ফেরি পার হবে না।

বরিশালের রেন্ট-এ কার চালক বেলাল আহম্মেদ বলেন, ফেরিতে পদ্মা পার হতে লেগে যেত দুই-তিন ঘণ্টা। সেতু চালু হওয়ায় পাঁচ মিনিটেই পদ্মা সেতু পার হয়ে বরিশাল থেকে ঢাকায় পৌঁছতে লাগবে তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা।

শরীয়তপুরের পরিবহন মালিকরা এ রুটে প্রায় ২০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রস্তুতি নিয়েছেন বলে জানা গেছে। জেলার পরিবহন ব্যবসায়ীরা নতুন নতুন গাড়ি প্রস্তুত করছেন। শরীয়তপুরের বিভিন্ন উপজেলা ও বাজার থেকে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন গন্তব্যে এসব বাস চলাচল করবে। এসব বাসের মধ্যে ভলভোর মতো বিলাসবহুল বাসও থাকছে বলে জানা গেছে। শরীয়তপুর সুপার সার্ভিস কোম্পানি, পদ্মা ট্রাভেলস, শরীয়তপুর পরিবহন ও গ্লোরির মতো কয়েকটি বাস কোম্পানি আজ থেকেই এ রুটে বাস চালু করবে। শরীয়তপুর সুপার সার্ভিস প্রাইভেট কোম্পানি নামের একটি প্রতিষ্ঠান ৪০টি নতুন বাস প্রস্তুত করেছে। এরই মধ্যে আড়াইশর মতো বাস প্রস্তুত হয়ে গেছে। এসব বাসে প্রতিটিতে খরচ পড়েছে ৭০ লাখ থেকে কোটি টাকার বেশি।

সরকারি পরিবহন সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনও (বিআরটিসি) আজ থেকেই পদ্মা সেতু হয়ে বিভিন্ন গন্তব্যে নতুন বাস চালু করবে। এ রুটে চলাচলকারী বাস ছাড়াও আজ থেকেই ২৩ রুটে ৬৭টি নতুন বাস চালু হবে বলে সম্প্রতি জানিয়েছেন বিআরটিসির জেনারেল ম্যানেজার মেজর মোক্তারুজ্জামান। জানা যায়, বরিশাল, খুলনা ও গোপালগঞ্জ ডিপো থেকে মোট ৭৫টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস আজ থেকে চলাচল করবে। এ জন্য রাজধানীতে নতুন কাউন্টারও নেওয়া হয়েছে। বিআরটিসি সূত্র জানায়, মোট ২১টি জেলা থেকে এখন পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকায় যাত্রী পরিবহন করবে বিআরটিসি।