ঢাকা রবিবার, ১৯ মে ২০২৪

সাক্ষাৎকার

মানসম্মত পণ্য সহজলভ্য করেছে ওয়ালটন

মানসম্মত পণ্য সহজলভ্য করেছে ওয়ালটন

শাহ্‌জালাল হোসাইন লিমন, নির্বাহী পরিচালক, ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসি

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ০১ জুলাই ২০২২ | ১৪:৫৩

টেলিভিশন, ফ্রিজসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিকস পণ্য এক সময় বিলাসিতার ব্যাপার ছিল। দাম ছিল নিম্ন ও মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে। এগুলো পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় উপকরণ হলেও অধিকাংশ মানুষ কিনতে পারতেন না। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ওয়ালটন দৈনন্দিন ব্যবহারের এ পণ্যগুলো দেশেই উৎপাদন শুরু করে ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছে সাশ্রয়ী মূল্যে। দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি করায় মানসম্মত ইলেকট্রনিকস সামগ্রী সহজলভ্য হয়েছে। এখন বিশ্বজয়ের স্বপ্ন নিয়ে কথাগুলো সমকালকে বলেন ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসির নির্বাহী পরিচালক শাহ্‌জালাল হোসাইন লিমন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন লতিফুল ইসলাম

সমকাল: ইলেকট্রনিকস পণ্য এক সময় বিলাসিতার ব্যাপার ছিল। এগুলো সহজলভ্য করতে ওয়ালটন কীভাবে ভূমিকা রেখেছে?

শাহ্‌জালাল হোসাইন লিমন: দেশে এই পরিবর্তন ওয়ালটনের হাত ধরেই এসেছে। এক যুগ আগেও এসব পণ্য পুরোপুরি আমদানিনির্ভর ছিল। তাই উচ্চমূল্যের কারণে সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় এসব সামগ্রী ব্যবহার করতে পারতেন না। তবে ওয়ালটন এই বিলাসী পণ্যগুলো সবার সাধ্যের মধ্যে এনে দিয়েছে। আমাদের প্রতিষ্ঠান মান ঠিক রেখে নিজস্ব প্রযুক্তিতে দেশেই ইলেকট্রনিকস পণ্য উৎপাদন করায় দেশের টাকা দেশেই থাকছে। এখন দেশে প্রায় সবার ঘরে ওয়ালটনের ফ্রিজ, টেলিভিশন, এসি, মোবাইল ফোন, কম্পিউটারসহ বিভিন্ন পণ্য পাওয়া যায়। সরকারের শিল্পবান্ধব নীতি, শতভাগ বিদ্যুতায়ন এবং ওয়ালটনের শিল্পবিকাশ এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

সমকাল: বর্তমানে ওয়ালটনের জনবল কেমন? তাঁদের নিয়ে আপনাদের পরিকল্পনা কী?

শাহ্‌জালাল হোসাইন লিমন: এই প্রতিষ্ঠানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৩০ হাজার লোক কাজ করেন। এ ছাড়া আরও লক্ষাধিক মানুষ বিভিন্নভাবে এর সঙ্গে জড়িত। তাঁদের আমরা কখনও কর্মী হিসেবে বিবেচনা করি না, বরং ওয়ালটন একটি পরিবার, আর আমরা সবাই এর সদস্য। প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে নিজেদের ভাবনা শেয়ার করি, যে কোনো অর্জনের আনন্দ ভাগাভাগি করি এবং আমাদের ভবিষ্যৎ আমরা নিজেরাই গড়ি। সবার প্রচেষ্টায় ওয়ালটন ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি ব্র্যান্ডের মধ্যে অন্যতম হতে চায়। এই লক্ষ্য অর্জন কারও একার পক্ষে সম্ভব নয়, কেবল সম্মিলিত প্রয়াসে এই স্বপ্ন পূরণ হতে পারে। এ জন্য আমাদের প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সবাইকে বিশ্বমানের কর্মী হিসেবে গড়ে তুলতে নানা প্রশিক্ষণমূলক কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে।

সমকাল: ক'দিন পরই পবিত্র ঈদুল আজহা। এই সময়কে ফ্রিজ বিক্রির মৌসুম বলা হয়ে থাকে। এ উপলক্ষে ক্রেতা আকর্ষণে কেমন ছাড় বা অফার দিচ্ছেন?

শাহ্‌জালাল হোসাইন লিমন: দেশের মানুষ যেন সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্মত ইলেকট্রনিকস ও প্রযুক্তিপণ্য কিনতে পারে সে ব্যাপারে ওয়ালটন বরাবরই আন্তরিক। এরই ধারাবাহিকতায় এবার ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দারুণ কিছু অফার চলমান। এর মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় অফার হলো- ডিজিটাল ক্যাম্পেইন সিজন-১৫। এতে গ্রাহকরা ওয়ালটনের পণ্য কিনলে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্যাশব্যাক পেতে পারেন। এ ছাড়াও আছে লাখ লাখ টাকার লোভনীয় অফার। ক্যাম্পেইনে ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। অনেকেই লাখ লাখ টাকার পুরস্কার জিতছেন এবং ক্যাশব্যাক পাচ্ছেন।

সমকাল: দেশে ইলেকট্রনিকস পণ্য তৈরিতে কাঁচামাল আমদানি এবং উৎপাদনের পর রপ্তানির ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছেন কিনা?

শাহ্‌জালাল হোসাইন লিমন: বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নাজুক হওয়ায় কাঁচামাল আমদানি ও পণ্য রপ্তানিতে এর প্রভাব পড়েছে। ডলারের বিপরীতে টাকার দাম কমে যাওয়ায় এ সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের সংকট থাকায় এমনিতেই দাম বেশি। টাকার মূল্য কমে যাওয়ায় তা বোঝার ওপর শাকের আঁটি হিসেবে ভর করেছে। এতে আমদানি খরচ অনেক বেড়ে গেছে। এরপরও সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য বাজারজাতের চেষ্টা অব্যাহত আছে।

সমকাল: দেশি শিল্প বিকাশে ওয়ালটনের ভূমিকা কী?

শাহ্‌জালাল হোসাইন লিমন: দেশীয় শিল্প বিকাশে ওয়ালটনের ভূমিকা আজ সর্বজনবিদিত। ইলেকট্রনিকস পণ্যে আজ আমরা যে গর্বভরে 'মেইড ইন বাংলাদেশ' ট্যাগলাইন ব্যবহার করছি, এর যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০৮ সালে; স্বপ্নদ্রষ্টা ও রূপকার ওয়ালটনের পরিচালক এস এম আশরাফুল আলমের দৃঢ় প্রত্যয়, বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা ও ব্যবসায়িক নেতৃত্বে এ প্রতিষ্ঠানের রেফ্রিজারেটর উৎপাদনের কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে। ওয়ালটনের সম্মুখসারির কারিগররা শত প্রতিকূলতা-বাধা পেরিয়ে নীতি ও কৌশলগত উপায়ে সেবার আদর্শ হৃদয়ে ধারণ করে দেশকে শুধু ইলেকট্রনিকস পণ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতাই এনে দেননি, পাশাপাশি এসব পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে বহির্বিশ্বে লাল-সবুজের পতাকাকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করে চলেছেন। দেশেই রেফ্রিজারেটর, কম্প্রেসর, টিভি, ফ্রিজ, এসি, মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, কম্পিউটারসহ অনেক হাই-টেক পণ্য উৎপাদন, এমনকি রপ্তানি করা যায়- সেটা সম্ভব করে দেখিয়েছে ওয়ালটন। শেয়ারবাজারে দেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসির অবস্থান শীর্ষে। আমাদের প্রতিষ্ঠান দেশের সর্বোচ্চ করদাতাদের মধ্যে অন্যতম। এর মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতেও শক্তিশালী প্রভাব বজায় রাখছে ওয়ালটন। আমদানি বিকল্প পণ্য উৎপাদন করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রপ্তানি আয়ও বাড়ছে। একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে দেশকে বের করে আনার চেষ্টা চলছে।

সমকাল: ইলেকট্রনিকস সামগ্রীর জগতে ওয়ালটনের মার্কেট শেয়ার কত?

শাহ্‌জালাল হোসাইন লিমন: ইলেকট্রনিকস পণ্যের ক্ষেত্রে সিংহভাগ মার্কেট শেয়ার ওয়ালটনের দখলে। এর মধ্যে রেফ্রিজারেটরে ৭৪ শতাংশ, এসি, টিভি, ওয়াশিং মেশিনে ৩০ শতাংশের বেশি মার্কেট শেয়ার আমাদের আয়ত্তে। এ ছাড়া আমাদের অন্য যেসব পণ্য আছে সেগুলোতেও স্বাভাবিক মার্কেট শেয়ার রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

সমকাল: ওয়ালটনের অগ্রযাত্রায় সরকারি সুযোগ-সুবিধা কেমন পাচ্ছেন? কোনো প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছে কিনা?

শাহ্‌জালাল হোসাইন লিমন: স্থানীয় শিল্পের বিকাশ ও সুরক্ষায় সরকার খুবই আন্তরিক। বরাবরের মতো এবারও ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশীয় শিল্পবান্ধব এবং যুগোপযোগী বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। বিশেষ করে নিজস্ব শিল্পের বিকাশে আমদানি নিরুৎসাহিত করতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে আমদানি করা লিফটের ওপর শুল্ক বৃদ্ধি, বিদেশ থেকে আনা কম্পিউটার-ল্যাপটপে শুল্ক্ক বাড়ানো উল্লেখযোগ্য। এ সিদ্ধান্তগুলো দেশের হাই-টেক শিল্পের অগ্রযাত্রায় সহায়ক হবে। এভাবে সরকারের নানা উদ্যোগের ফলস্বরূপ ওয়ালটনসহ দেশীয় শিল্পে বৈপ্লবিক উন্নতি হয়েছে। যাত্রা করেছে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান। সরকারি সহায়তার ফলেই এখন আমরা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বৈশ্বিক বাজারে পা রেখেছি। ইতোমধ্যে বিশ্বের ৪০টি দেশে ওয়ালটনের পণ্য রপ্তানি করছি। এই সহায়তা অব্যাহত থাকলে এক সময় বিশ্ববাজারে ওয়ালটন নেতৃত্ব দেবে বলে আমরা স্বপ্ন দেখি।

সমকাল: সর্বশেষে ওয়ালটনের সোনালি উত্থানের গল্পটা যদি বলতেন।

শাহ্‌জালাল হোসাইন লিমন: ওয়ালটনের সর্ববৃহৎ কোম্পানিতে রূপান্তরের পেছনের গল্পটা অনেক বড়। টাঙ্গাইলের প্রথিতযশা শিল্পোদ্যোক্তা এস এম নজরুল ইসলামের প্রচেষ্টায় ১৯৭৭ সালে শুরু হয় পথচলা। পরে তাঁর সুযোগ্য পাঁচ ছেলে এস এম নুরুল আলম রেজভী, এস এম শামছুল আলম, এস এম আশরাফুল আলম, এস এম মাহবুবুল আলম এবং এস এম রেজাউল আলমের দূরদর্শী নেতৃত্বে ওয়ালটন পৌঁছে গেছে বিশ্বের ৪০টিরও বেশি দেশে। 'ভিশন গো গ্লোবাল ২০৩০'-এর রূপকার, অটোমেশন, সাসটেইনেবল বিজনেস ও গ্রিন ইন্ডাস্ট্রির স্বপ্নদ্রষ্টা তরুণ ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও গোলাম মুর্শেদ বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিকে সামনে থেকে দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

১৯৭৭ সাল থেকে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিভিন্ন সময়ে ব্যবসা সম্প্রসারণের দুই দশক পর ইলেকট্রনিকস ব্যবসায় যুক্ত হয় ওয়ালটন। দেশে তৈরি উচ্চমানের ইলেকট্রনিকস ও প্রযুক্তিপণ্য দিয়ে দ্রুতই প্রতিষ্ঠানটি ক্রেতার মন জয় করে। হয় দেশ ও দেশের বাইরের অন্যতম জনপ্রিয় ও বিশ্বস্ত ব্র্যান্ড। ২০০৮ সালে ওয়ালটন দেশেই চালু করে রেফ্রিজারেটর এবং এয়ার কন্ডিশনার তৈরির কারখানা। এর দু'বছর পর শুরু হয় টেলিভিশন এবং হোম অ্যাপ্লায়েন্স তৈরি। ২০১৭ সালে ওয়ালটন চালু করে দেশের প্রথম এবং একমাত্র কম্প্রেসর উৎপাদন কারখানা। ওই বছরই আমাদের কোম্পানি দেশে প্রথম মোবাইল ফোন উৎপাদন কারখানা চালু করে। পরের বছর দেশেই উৎপাদন শুরু করা হয় কম্পিউটার, ল্যাপটপসহ নানা আইসিটি পণ্য। ২০১৯ সালে বাণিজ্যিকভাবে এলিভেটর বা লিফট উৎপাদন ও বিক্রি শুরু করে ওয়ালটন। সম্প্রতি অর্ধশতাধিক বছরের ঐতিহ্যবাহী ইউরোপীয় তিনটি ইলেকট্রনিকস ব্র্যান্ড ওয়ালটন অ্যাকুয়ার করেছে। আন্তর্জাতিক বিডিংয়ে বেশ কিছু নামকরা বৈশ্বিক কোম্পানিকে হটিয়ে ব্র্যান্ডগুলোর সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ইনভার্টার এবং ফিক্সড স্প্রিড কম্প্রেসর ম্যানুফ্যাকচারিং প্লান্ট, গবেষণা ও উন্নয়ন, মেধাসম্পদ (প্যাটেন্ট, ডিজাইন এবং সফটওয়্যার লাইসেন্স), ৫৭টি দেশে ট্রেডমার্কসহ স্বত্ব লাভ করেছে ওয়ালটন। ব্র্যান্ড তিনটি হলো- এসিসি, জানুসি ইলেকট্রোমেকানিকা এবং ভার্ডিকটার। ইউরোপীয় এই তিন ব্র্যান্ডের কম্প্রেসর, ফ্রিজ, টিভি, এসিসহ অন্যান্য ইলেকট্রনিকস পণ্য দেশের অভ্যন্তরে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাজারজাত করবে ওয়ালটন। প্রতিষ্ঠানটির আজকের এ সফলতার পেছনে অনেক কারণ আছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো- উদ্যোক্তাদের স্বপ্ন দেখা ও বাস্তবায়নের দৃঢ় ইচ্ছা।

আরও পড়ুন

×