বাংলাদেশে প্রায় ৮০ মিলিয়ন ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ায় দ্রুগতিতে ইন্টারনেটের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়া অন্যতম দেশ। ১ হাজার ২৮১টি স্কুলে পরিচালিত জরিপের মাধ্যমে ইউনিসেফের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২৫ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর বয়স ১১ বছরের নিচে। এই শিশুদের ১১ শতাংশ নিজেদের কক্ষে একান্তভাবে অনলাইন ব্যবহারে আগ্রহী এবং হাল জামানার 'বেডরুম কালচার'-এর কারণে তারা অনলাইনে কী করছে বা দেখছে তা অভিভাবকদের পর্যবেক্ষণের বাইরে থেকে যাচ্ছে। এই জরিপ অনুযায়ী শিশু-কিশোরদের ৭০ শতাংশ ছেলে শিশু এবং ৪৪ শতাংশ মেয়ে শিশু স্বীকার করেছে, অনলাইনে তারা অপরিচিতদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছে। 'শিশুদের জন্য নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার' শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। গত ৩১ ডিসেম্বর দৈনিক সমকাল কার্যালয়ে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। সমকাল এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) যৌথভাবে এর আয়োজন করে
মুস্তাফিজ শফি

অনলাইন বন্ধ করা নয়; বরং এটার নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করাই আমাদের সবার দায়িত্ব। আমাদের তরুণরা নাসার প্রতিযোগিতা, রোবটিক অলিম্পিয়াড, জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সাফল্য দেখিয়েছে এবং এসব প্রতিযোগিতায় তারা অংশ নিয়েছে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করেই। ফলে অনলাইনের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত হলে বরং শিশুদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খোলা সম্ভব হবে। এখানে বলে রাখি, সমকাল বর্তমানে ছোট পরিসরে হলেও স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের অনলাইন ব্যবহারে সচেতন করে তোলার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার প্রত্যাশা রয়েছে। সারাদেশে রয়েছে সমকালের নেটওয়ার্ক। আঞ্চলিক অফিস, সুহৃদ সমাবেশের মাধ্যমে আমরা কাজ করে যাচ্ছি জেলা-উপজেলায়। এই নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে আরও বড় কর্মসূচি পালন করা সম্ভব। এক্ষেত্রে সমকালকে সহযোগিতা করছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সংস্থা ও সংগঠন। আমরা বিশ্বাস করি, শুধুমাত্র পত্রিকা প্রকাশের মধ্য দিয়েই গণমাধ্যমের কাজ শেষ হয়ে যায় না। এ জন্যই আমরা এগিয়ে এসেছি সামাজিক কর্মকা।ে এসব কাজে আমরা সংশ্নিষ্ট সবার আরও সহযোগিতা চাই, পৃষ্ঠপোষকতা চাই। সবাই মিলেই আমরা প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য দেশ প্রতিষ্ঠা করে যাব। বৈশ্বিক পরিম লে তাদের এগিয়ে দেবো।
মোহাম্মদ তবরাক উল্লাহ
জাতীয় জরুরি সেবা (৯৯৯) কার্যক্রমে প্রায় ৪০০ জন কাজ করছেন। ২০১৭ সালের ১২ ডিসেম্বর চালু হওয়ার পর বিদায়ী ২০১৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১ কোটি ৫৩ লাখ ২৩ হাজার কল ৯৯৯-এ এসেছে। দেখা যায়, এর মধ্যে যারা ফোন করছেন তার মধ্যে বিপুল সংখ্যক অপ্রয়োজনীয় ফোন কল রয়েছে। যিনি কল করছেন তিনি হয়তো জরুরি বিবেচনা করছেন। কিন্তু যিনি কল ধরছেন তিনি বুঝতে পারছেন, এটা জরুরি সেবা দেওয়ার মতো পরিস্থিতির কল নয়। আসলে নাগরিকদের অনেকেই বোঝেন না কোনটি জরুরি কলের বিষয় এবং কোনটি নয়। এই জরুরি সেবায় সাইবার অপরাধ বিষয়ক একটি বিশেষ শাখা আছে। সেখানে দুই বছরে প্রায় তিন হাজার সমস্যার কথা এসেছে। শুধু যে শিশুরা এর শিকার হচ্ছে, তা কিন্তু নয়। বিভিন্ন বয়সের মানুষ সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছে। তবে সাইবার অপরাধের ব্যাপারে বেশি কল ঢাকা থেকেই আসে। ঢাকার বাইরে থেকেও ফোন আসছে। ঢাকার হাজারীবাগ ও গোপালগঞ্জ থেকে আসা দু'জনের কল বিষয়ে আপনাদের বলতে পারি। ঢাকা থেকে যে মেয়েটি ফোন করেছিল, সে তার বাবার হাতে নির্যাতনের শিকার। এমন অনেক ঘটনার খবর আসে, যেগুলোর সমাধান দিতে আমরা খুবই সচেষ্ট। একটা কথা এ প্রসঙ্গে জোর দিয়ে বলতে হচ্ছে, যারা সাইবার অপরাধের শিকার, তাদের অধিকাংশ থানায় যাবেন না, জিডি করবেন না, মামলা করবেন না, বাবা-মাকে বলবেন না। তারা ফোন করে নিজেদের সমস্যার কথা বলেন। তারপর আইনগত পদক্ষেপ নিতে বললে তারা বেঁকে বসেন। বরং তারা বলেন, যদি কিছু করতে পারেন তাহলে করেন; না হলে আমি আত্মহত্যা করব। এ সময়ে তাদের যে কোনোভাবে রক্ষা করাটাই একটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
মাহমুদুল কবির
অনলাইনে শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টি এখন প্রধান উদ্বেগ ও আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে একটা বড় সমস্যা হচ্ছে, শিশুরা তাদের সমবয়সী বন্ধুদের কাছে যেটা বলে, সেটা বড়দের সঙ্গে শেয়ার করতে চায় না। এটা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে- ছোটরা বড়দের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে চায়। এ জন্য বড়দের অপরাধী না বলে বরং অসচেতন বলা যেতে পারে। তবে সাইবার বুলিংসহ কিছু অপরাধের ক্ষেত্রে অভিভাবক এবং শিক্ষকদেরও দেখা যাচ্ছে, তারা অবশ্যই অপরাধী। বাবা-মায়ের সঙ্গে আমাদের সমাজে সন্তানের দূরত্ব বহু পুরোনো। ছোটরা বড়দের ভয় পায়। এই ভয় পাওয়াকেই রীতি বলে মানা হয়। এখন পুরোনো ধ্যান-ধারণা বদলে বাবা-মা যদি সন্তানের বন্ধু হয়, সেটা অবশ্যই ভালো। এখানে বলে রাখি, বাংলাদেশে যথেষ্ট আইন আছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, পর্নোগ্রাফি আইনের বাইরেও অনেক আইন আছে, যেগুলো দিয়ে সাইবার অপরাধের বিচার করা সম্ভব। কিন্তু আইনি প্রস্তুতিই শেষ কথা নয়। যেটা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সেটা হচ্ছে সচেতনতা।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এসএম ফরহাদ
প্রথমে নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে শুরু করি। আমার সন্তানকে খাতায় লিখতে বলেছিলাম- বড় হয়ে কী হতে চাও? সে লিখল- 'স্মার্টফোন'। জানতে চাইলাম, তুমি কেন এমনটা হতে চাও? সে জবাব দিল, তার বাবা-মা সব সময় হাতের কাছে যেটা রাখে সেটি হচ্ছে স্মার্টফোন। সকালে অফিসে যাওয়ার আগে, নাশতার টেবিলেও দু'একবার স্মার্টফোন থেকে মাথা তুলে কথা বলে। কাজ থেকে বাসায় ফিরেও স্মার্টফোন নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকে। তারা সময় চাইলেও দু'একটা কথা বলে আবার স্মার্টফোন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। অতএব সে যদি স্মার্টফোন হয় তাহলে বাবা-মায়ের সঙ্গে বেশিক্ষণ থাকার সুযোগ পাবে। এই বাস্তবতায় আসলে আজকের শিশুদের সাইবার দুনিয়ায় নিরাপদ রাখার বিষয়টি অবশ্যই বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ বাবা-মা থেকে দূরে থাকা শিশুরা সাইবার দুনিয়ায় আসলে কী করছে, সেটা জানা না গেলে ঝুঁকির কারণ থেকেই যায়। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিশুদেরকে অভিভাবকদের বেশি সময় দিতে হবে। তারা কী চাচ্ছে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সচেতন হলে অপরাধপ্রবণতা যেমন কমবে, অপরাধ দূরে রাখাও সম্ভব হবে।
সুমন আহমেদ সাবির
বড়রা মাঝেমধ্যে এমন একটা ভাব করি, যেন আমরা ছোটবেলায় একেবারে সাধু ছিলাম, এখনও পবিত্র আছি। আগে নিজে ভাবুন, আপনি কতটা সৎ এবং নৈতিক। আপনি নিজে সৎ না হলে, নৈতিকতার মানদণ্ডের ভেতরে না থাকলে ছোটদের সামনে আদর্শ হবেন কীভাবে? আসলে নিজে সৎ না হয়ে আমাদের শিশুদের কাছ থেকে ন্যায়, সততা প্রত্যাশা করতে পারি না। বলা হচ্ছে, এত হাজার সাইট বন্ধ করা হয়েছে; এটা বড় সাফল্য। আসলে কি তাই? আমরা তো দেখি না, আগের চেয়ে ডাটা ট্রাফিক খুব বেশি কমেছে। এটা প্রমাণ করে- ভিপিএন এবং এ জাতীয় প্রযুক্তির মাধ্যমে বন্ধ করা সাইটে আগের মতোই ব্রাউজ হচ্ছে। ভিপিএন এখন খুব একটা জটিল প্রযুক্তিও নয়। এটা অনেক সহজলভ্য। আসলে বন্ধ করে কোনো কিছুর সমাধান হবে না। আপনাকে যেটা করতে হবে; শিশুদের সচেতন করার জন্য আগে আপনাকে সচেতন হতে হবে। আপনি যদি নিরাপদে অনলাইন ব্রাউজ করার বিষয়টি জানেন, আপনার শিশুও জানবে। আপনি যদি অনিরাপদ ব্যবহার করেন, আপনার শিশুরও সেটা করার বড় ঝুঁকি থেকে যাবে। অতএব শিশুদের সচেতন করার জন্যই তাদের অভিভাবকদের আগে সচেতন করা জরুরি।


ড. বিএম মইনুল হোসেন
আমরা একাডেমি পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, অনলাইনে নিরাপত্তার জন্য তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো হচ্ছে- কনটেন্ট, কনটাক্ট ও কনডাক্ট। কনটেন্ট হচ্ছে অনলাইনে কী দেখা হচ্ছে, কোন বিষয় দেখা হচ্ছে। কনটাক্ট হচ্ছে তারা কার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। আর কনডাক্ট হচ্ছে সেখানে তারা কোনো সমস্যায় পড়লে সেটাকে কীভাবে আমলে নেওয়া হচ্ছে। এ তিনটি বিষয় শুধু শিশুদের জন্য নয়, অনলনাইন ব্যবহারকারী সবার জন্য প্রযোজ্য। শিশুদের জন্য এ তিনটি বিষয়ে সচেতনতা সবচেয়ে বেশি দরকার। কারণ শিশুদের উপযোগী কনটেন্ট না হলে কিংবা এমন কোনো কনটেন্ট, যা অবচেতনেই অপরাধপ্রবণতা উস্কে দেয়, সেটা খুবই বিপজ্জনক। এর পর শিশুরা কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে, সে তার পরিচিত কি-না, সেটাও জরুরি বিষয়। গবেষণায় এসেছে, বড় সংখ্যায় শিশুরা অপরিচিত ব্যক্তিদের অনলাইনে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করছে। এটা ঝুঁকিপূর্ণ। অপরিচিতরা নানাভাবে শিশুদের শুধু সাইবার বুলিং নয়, অনৈতিক অনেক কাজেও ব্যবহার করতে পারে। এর পর যদি অপরাধের শিকার শিশুর সঙ্গে অনভিপ্রেত আচরণ করা হয়, তাহলে সেটা মারাত্মক ফল বয়ে আনে। শিশু আত্মহত্যার দিকে চলে যেতে পারে। এ জন্য সমস্যায় পড়া শিশুদের অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে কথা বলতে হবে, কাউন্সেলিং করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, বড়রা এ তিনটি বিষয়ে সচেতন থাকলে শিশুদেরও সচেতন রাখা সম্ভব। আজকের আলোচনায় শিশুরা থাকলে; তাদের কথা শুনলে ভালো হতো। তাদের শেখাতে হবে- তুমি সামনাসামনি যে কাজটা কর না, সেটা অনলাইনেও করবে না।
মোহাম্মদ গাজী সালাহউদ্দিন
আজকের যে বিষয়, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। ইন্টারনেট যেমন জীবনকে সহজ করেছে, তেমনি সমস্যাও নিয়ে এসেছে। এই সমস্যাগুলো ক্রমেই বড় হচ্ছে। এ কারণে সমস্যা মোকাবিলায় কার্যকর উপায় নির্ধারণ জরুরি। আমি মনে করি, সমস্যাকে সামাজিকভাবে দেখা দরকার। এখন ইন্টারনেটের মাধ্যমে পশ্চিমা দুনিয়ার সবকিছু একেবারে চোখের সামনে। কিন্তু পশ্চিমা সংস্কৃতিতে যা শোভন, তা আমাদের দেশের সংস্কৃতি অনুযায়ী শোভন কিংবা সঙ্গতিপূর্ণ কি-না, তা ভেবে দেখা দরকার। পশ্চিমা একটা সিনেমায় যে দৃশ্য সাধারণ মনে করা হয়, সেটা আমাদের দেশে অশ্নীল বিবেচনা করা হয়। ফলে পশ্চিমা সংস্কৃতির কতটুকু আমরা নেব, সেটা আগে ঠিক করতে হবে। আবার এটাও সত্যি, ইন্টারনেটের দুনিয়া উন্মুক্ত রেখে পশ্চিমা দুনিয়ার ছবি, সিনেমা দেখা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এ কারণে আমাদের সন্তানদের আগে নিজেদের সংস্কৃতি ও সামাজিক মূল্যবোধ সম্পর্কে শিক্ষা দিতে হবে। পশ্চিমা সংস্কৃতির সঙ্গে তফাতটা বুঝিয়ে দিতে হবে। এভাবে শুরু করলে তার পক্ষে বোঝা সম্ভব হবে, অনলাইনে নিজেকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

সাইদ নাসিরুল্লাহ
পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট সাইবার অপরাধ দমনে কাজ করছে। বিভিন্ন ধরনের সাইবার অপরাধের অভিযোগ আমরা পাচ্ছি। এসব অভিযোগ পেলে সে ব্যাপারে তদন্ত এবং ব্যবস্থা নেওয়ার কাজটি সাইবার ক্রাইম ইউনিট করে। বড়রা যেমন সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছে, তেমন শিশুরাও হচ্ছে। বিশেষ করে ১১ থেকে ১৮ বছরের অনেক শিশুই অপরাধের শিকার হচ্ছে। আমরা অবশ্যই শিশুদের ক্ষেত্রে শিশু আইন এবং এ সংক্রান্ত আদালতের নির্দেশনা অনুসরণ করে ব্যবস্থা নিই। শিশুদের বিষয় হলে প্রথমেই বিষয়টি সরাসরি আইন প্রয়োগের দিকে না গিয়ে তার সঙ্গে কথা বলা হয়। এটা অপরাধ এবং এটা শাস্তিযোগ্য- সেটা বোঝানো হয়। অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কাজ করতে গিয়ে আমারও মনে হয়, শিশুরা নিজেদের সমস্যা সম্পর্কে বাবা-মা বা বড়দের সঙ্গে শেয়ার করতে ভয় পায় বলেও তারা সমস্যা থেকে বের হতে পারছে না। বাবা-মা এবং অভিভাবকদের সঙ্গে শিশুদের সম্পর্ক আরও বন্ধুত্বপূর্ণ হলে সমস্যার সমাধান সহজ হবে।

মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম শামীম
সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলার সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ২০০। কিন্তু আপনাদের জানিয়ে রাখি, আদালতে বেশিরভাগ মামলা শেষ পর্যন্ত আপস রফা হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে অপরাধ প্রমাণ করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে। আদালতে মামলা চলার একটা পর্যায়ে গিয়ে ভিকটিম বলছে, আর মামলা চালাতে চায় না। আদালত তাকে জিজ্ঞেস করছে, কেন মামলা তুলে নেবেন? একাধিক ভিকটিম বলেছে, এলাকার চেয়ারম্যান বা নেতা বলেছেন, তাই। এখন এভাবে আপস করতে বাধ্য হলে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত হবে কীভাবে? আবার তদন্তে অনেক ক্ষেত্রেই অপরাধ প্রমাণ করা যাচ্ছে না। যে পোস্ট দেওয়ার কারণে মামলা হয়েছে, মামলার বিবরণে যে পোস্টের স্ট্ক্রিনশট পেয়েছে পরে দেখা যাচ্ছে পুলিশের তদন্তে সে পোস্ট পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ সেটা ডিলিট করা হয়েছে বা মুছে ফেলা হয়েছে। এখন মুছে ফেলা পোস্ট যে সত্যিই অভিযুক্ত ব্যক্তি দিয়েছেন- সেটা প্রমাণ করার মতো প্রযুক্তিগত সামর্থ্য নেই। ফলে অপরাধী পার পেয়ে যাচ্ছে। তবু আশার কথা, সাইবার ট্রাইব্যুনালের প্রথম দিকে খুব একটা মামলা আসত না। এখন মামলা আসছে। কারণ মানুষ জানতে পেরেছে, সাইবার অপরাধের বিচারে একটি সুনির্দিষ্ট ট্রাইব্যুনাল আছে। তবে তদন্তের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা না বাড়ালে বিচারপ্রার্থীর জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা দুঃসাধ্যই থেকে যাবে।

হোসেন সাদাত
গ্রামীণফোন ২০১৪ সাল থেকেই শিশুদের জন্য নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য কাজ করছে। ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ইউনিসেফের সঙ্গে ১৬ লাখ শিক্ষার্থীর কাছে নিরাপদ ইন্টারনেটের ব্যাপারে সরাসারি কথা বলার প্রত্যয় নিয়ে গ্রামীণফোন 'নিরাপদ অনলাইন কর্মসূচি' শুরু করেছে। এরই মধ্যে এই কর্মসূচি ৬২ শতাংশ সাফল্য অর্জন করেছে। গ্রামীণফোন একই সঙ্গে ডিজিটাল সেবাদাতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধ প্রতিষ্ঠান হিসেবে মনে করে, নিরাপদ ইন্টারনেট নিশ্চিত করা আর অনলাইনে নিরাপদ থাকার জন্য ব্যবহারকারীদের সচেতন করাও বড় দায়িত্ব। যেহেতু অনলাইন ব্যবহারকারীদের বড় একটা অংশ স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, এ কারণে গ্রামীণফোন শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির কর্মসূচি নিয়েছে এবং তা অব্যাহত থাকবে। 

মোহাম্মদ মুখলেসুর রহমান সোহাগ
বাংলালিংক ডিজিটাল সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী নিরাপদ ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে সচেষ্ট। বাংলালিংক সার্ভিস প্রোভাইডার হিসেবে যে ইন্টারনেট সেবা গ্রাহককে দিচ্ছে, প্রথমে তার নিরাপত্তা দেয়। একই সঙ্গে অনলাইনে নিরাপদ থাকার জন্য গ্রাহকদেরও সচেতন করে নানা ধরনের প্রচারের মাধ্যমে। আর বিটিআরসির যে গাইডলাইন আছে, সেটা সব সময় অনুসরণ করে। নিরাপত্তার কারণে বিটিআরসি কখনও কোনো লিংক বন্ধ রাখতে বললে সেটা বন্ধ রাখা হয়। আমার মনে হয়, শিশুদের অনলাইন থেকে ভালো যা কিছু তা গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করা দরকার। একই সঙ্গে তারা যেন খারাপ কিছুর সংস্পর্শে না আসে, সে জন্যও অভিভাবকদের সচেতন থাকা দরকার।
শাহেদুল আজম
এখানে একজন বললেন, বাবা-মায়েরা আজকাল শিশুদের শুধু ডিভাইস কিনেই দিচ্ছেন না; অ্যাকাউন্টও খুলে দিচ্ছেন। এটাকে আপনারা সমালোচনা করছেন। আমি এর সঙ্গে দ্বিমত করি। প্রথমত, আজকের দিনের বাস্তবতায় আপনি কিংবা আপনার সন্তান কেউই ডিভাইসের বাইরে থাকতে পারবেন না। পারা সম্ভবও নয়। যদি বাইরে থাকেন তাহলে আপনি পিছিয়ে পড়বেন। অতএব আপনাকে স্মার্ট ডিভাইসের সঙ্গে থাকতে হবে। আর আমার মনে হয়, অনলাইনে শিশুদের অ্যাকাউন্ট বাবা-মায়েরই খুলে দেওয়া উচিত। যেমন বাবার জি-মেইল অ্যাকাউন্ট দিয়ে ইউটিউব ব্রাউজ করলে শিশুরা কী দেখছে সেটা জানা সম্ভব হয় সহজেই। কারণ এখানে হিস্ট্রিতে এটা রেকর্ড থাকে। আবার স্মার্ট ডিভাইসেও কিন্তু এ ধরনের অপশন থাকে, যেখানে ব্রাউজিং রেকর্ড জানা যায়। অ্যাপল অপারেটিং সিস্টেমে প্যারেন্টাল কন্ট্রোল বলে একটা অপশন আছে। আপনার সন্তানকে আইফোন কিংবা ট্যাব দিয়ে সেখানে প্যারেন্টাল কন্ট্রোল অন রাখলে সেই ডিভাইস কিন্তু শিশুদের অনভিপ্রেত সাইটে যেতে দেবে না। এ কারণে বাবা-মায়ের তত্ত্বাবধানে রেখে ব্রাউজ করলে সেটাই শিশুদের জন্য নিরাপদ হবে বেশি।


জিয়ান শাহ কবীর
একটা সময়ে দেশে যখন টেলিযোগাযোগ আইন হয়, তখন নেটওয়ার্কটাই মূল কথা ছিল। অনলাইন সে সময় খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে সামনে আসেনি। আর অনলাইনে আজকের দিনের মতো সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফরম তো ছিলই না। ফলে সে সময় আইনে কিন্তু অনলাইন নিয়ন্ত্রণ, প্ল্যাটফরমের বিষয়গুলো সেভাবে আসেনি। এখন অনলাইন প্ল্যাটফরম নিয়ন্ত্রণে নতুন আইন হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, অনলাইনে ফেসবুক কিংবা ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফরম বিদেশে এবং যে দেশের কোম্পানি সে দেশের আইন অনুযায়ী পরিচালিত হয়। এ কারণে বিটিআরসির পক্ষে এসব প্ল্যাটফরমের ব্যাপারে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব নয়। তারপরও ফেসবুকের সঙ্গে বারবার আলোচনার পর ফেসবুক কিন্তু ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে বিটিআরসির চাওয়া অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছে। কিন্তু ফেসবুককে আবার এটাও দেখতে হয়, তার একজন গ্রাহকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কতটা সঙ্গত। কারণ গ্রাহকের কাছেও তার দায়বদ্ধতা আছে। এ কারণে অনলাইনে যদি আমাদের দেশেও এ ধরনের প্ল্যাটফরম হয়, তাহলে সেটা নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে। যেমন চীনে নিজেদের প্ল্যাটফরমই এখন জনপ্রিয় হয়ে গেছে। আমাদের দেশেও নিজেদের প্ল্যাটফরম তৈরি এবং তার বিস্তৃতির জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। সেটা অনেক বেশি নিয়ন্ত্রণযোগ্য হবে।

কাশিফ আলী খান
সাইবার অপরাধ দমনে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন অপরাধী কে, তা জানা। ফেসবুকে একটা পোস্ট দিয়ে সেটা সরিয়ে ফেলা হয়। ভুয়া একাউন্ট থেকে কাউকে অপরাধের শিকার করা হয়। এভাবে অনলাইনে অপরাধ করে নিজেকে আড়াল করার অনেক সুযোগ আছে। সেটা বিবেচনায় রেখেই অনলাইনে যথাযথভাবে অপরাধী শনাক্ত করার বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। যেমন বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে সিমকার্ড নিবন্ধন অপরাধ দমনে খুবই ফলদায়ক। এটা হওয়ার ফলে মোবাইল ফোন দিয়ে আগে যত অপরাধ হতো, তার অধিকাংশ কমে গেছে। এখন যদি ডিভাইসের আইএমইআই ডাটাবেজ করা যায়, তাহলে কোন ডিভাইস থেকে অপরাধ হচ্ছে, তা জানা গেলে অপরাধ দমন আরও সহজ হবে। এ বিষয়ে বিটিআরসির গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। বিশ্বের অনেকে দেশে ডিভাইসের আইএমইআই ডাটাবেজ আছে। এটা দিয়ে সুবিধা হচ্ছে, ঠিক কোন ডিভাইস ব্যবহার করে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, সেটা নিশ্চিত হওয়া যায়। ফলে অপরাধী শনাক্ত করাও সহজ হয়। একইভাবে বাবা-মা চাইলে ডিভাইসের রেকর্ড থেকে সন্তান কোন কোন সাইটে গেছে তা জানতে পারেন। এ কারণে এ বিষয়ে বড়দেরও সচেতন করার পাশাপাশি প্রশিক্ষিত করা দরকার।

রেজাউল করিম সিদ্দিকী
কোনটা অপরাধ আর কোনটা অপরাধ নয়, সেটা আগে বুঝতে হবে। এখন শিশুদের সঙ্গে বাবা-মায়ের দূরত্ব সৃষ্টিকে আমরা যদি অপরাধ হিসেবে দেখি তাহলে সেটা একটা বিষয়। আবার যদি এটাকে সমাজের রীতি হিসেবে দেখা হয়, সেটা আর একটি বিষয়। শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টি সবার আগে বাবা-মায়ের ওপরেই নির্ভর করে। একইভাবে অনলাইনে শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টিও প্রথমে বাবা-মায়ের ওপরে নির্ভর করে। এখন বাবা-মা যদি সচেতন না হন তাহলে সেই শিশুর জন্য সাধারণ জীবনে যেমন ঝুঁকি থাকে, অনলাইনেও থাকে। এরপর যেটা আসে সেটা হচ্ছে আইনের কাঠামোর ভেতরে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ। সে ক্ষেত্রে অপরাধ সুনির্দিষ্ট করতে হবে সবার আগে। কারণ অপরাধ সুনির্দিষ্ট করা গেলে তা নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়।

তানজিম আল ইসলাম
শুধু শিশুদের ক্ষেত্রে নয়, সমাজে সাইবার অপরাধ একটা বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিচ্ছে। আমরা যত বেশি অনলাইননির্ভর হচ্ছি, তত বেশি সমস্যা সামনে আসছে, সংকট বাড়ছে। আগেও আমাদের সামনে অনেক ধরনের সংকট ছিল। এখন নতুন সময়ে নতুন সংকট হচ্ছে সাইবার অপরাধের সংকট। এ কারণে বিশ্বের প্রায় সব দেশই আইন ও প্রযুক্তিগতভাবে এ অপরাধ মোকাবিলার জন্য সক্ষমতার সৃষ্টি করছে। আমাদের দেশেও আইনি প্রস্তুতি বেশ ভালোভাবেই নেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ কয়েকটি আইন আছে, যেগুলো সাইবার অপরাধ দমনে ভালো ভূমিকা রাখছে। কিন্তু উন্নত দেশে আইনগত বিষয়ের পাশাপাশি সচেতনতা সৃষ্টির জায়গায় অনেক দূর এগিয়ে গেছে। আমরা সে জায়গাতে পিছিয়ে আছি। বাস্তবতা হচ্ছে, আইনগত পদক্ষেপের চেয়ে সামাজিক সচেতনতায় বেশি জোর দিতে হবে। সামাজিকভাবে সচেতনতা না বাড়ানো গেলে শুধু আইনি ব্যবস্থায় ইন্টারনেট নিরাপদ হবে না।

জেনিফার আলম
সাইবার অপরাধে ভিকটিমের বেশিরভাগই সামাজিক বাস্তবতা, লজ্জার কারণে নিজেরা যে ঘটনার শিকার হয়েছে, তা প্রকাশ করতে চায় না। এটা আমরা কাজ করতে গিয়ে দেখেছি। অনলাইনে নারী-শিশুদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। বুলিং-এর শিকারও তারা বেশি হয়। অপরিচিত ব্যক্তিরা তো আছেই, পরিচিতরাও তাদের বুলিং করে। এমন উদাহরণ একটা নয়, বেশ কিছু দেওয়া সম্ভব। ফলে অনলাইনে অপরিচিতদের এড়িয়ে চললেই সমাধান তো হচ্ছে না। পরিচিত অপরাধীদের ক্ষেত্রে কী করবেন? আবার ১৫ থেকে ১৮ বছরের অনেকে নিজ বন্ধুদের বুলিং করছে। কিন্তু শিশুদের এই অপরাধপ্রবণতা থেকে ফেরাবেন কীভাবে? তাদের শাস্তি দিয়ে সংশোধন কেন্দ্রে পাঠালেই হবে না। কারণ সংশোধন কেন্দ্রের ভেতরের চিত্র কতটা ভয়ংকর, সেটা আমরা দেখেছি। এ কারণেই শিশুদের জন্য কাউন্সেলিং বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। এ বিষয়ে আরও বেশি কর্মসূচি নিতে হবে ও কাজ করতে হবে।

মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম
আসলে সবার আগে শিশুদের মনস্তত্ত্বটি বুঝতে হবে। যেমন শিশুরা প্রশংসা খুব পছন্দ করে। ওর ড্রেসটা খুব ভালো মানিয়েছে- এটা বললে দেখবেন খুব খুশি হচ্ছে। আর এটা কিন্তু বাবা-মা বা বড় কেউ বললে হবে না। ওর সমবয়সী বন্ধু কারও বলতে হবে। যেমন ধরুন আপনি বললেন, লাল জামায় তোমাকে দারুণ লাগছে। তখন সে তার পিআর বা বন্ধুকে বলবে, এটা ঠিক আছে কি-না। বন্ধু যদি বলে, ঠিক আছে তাহলে সে খুব খুশি; সব ঠিক আছে। তারপর ধরুন, এখনকার শিশুরা বন্ধুরা মিলে গল্প করতে চায়। বন্ধুরা যদি বলে, চল এখন শাহবাগে গিয়ে ট্রাফিক কন্ট্রোল করি, দেখবেন সবাই চলে গেছে। এ দৃশ্য তো আমরা দেখেছি। এখানেই গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়। শিশুদের বন্ধুত্ব ও সাহচর্যের মাধ্যমে শেখাতে হবে। আপনি খোঁজ নিন কোন বন্ধুদের সঙ্গে মিশছে। সেই বন্ধুদের বাবা-মার সঙ্গেও কথা বলুন; তারা সন্তানের ব্যাপারে কতটা সচেতন। আপনি, আমি সবাই যদি সচেতন হই, শিশুরা যদি নিজেদের বন্ধুদের ভেতরেই ভালো কিছু শেয়ার করতে পারে, নিজেদের আলাপ থেকে ভালো কিছু শিখতে পারে, সেটাই কার্যকর হবে বেশি। এ-টু-আই থেকে একটা কাজ করা হচ্ছে। অনলাইনে শিশুদের উপযোগী কনটেন্ট দেওয়া হচ্ছে। কারণ উপযোগী কনটেন্ট পেলে শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ সাইটে যাওয়ার প্রবণতা কমবে।

রাইসুল ইসলাম
এখন ডিভাইস থেকে কাউকে দূরে রাখা সম্ভব নয়। সময়টাই ডিভাইসের। স্মার্ট দুনিয়া। এ সময়ে প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকার কথা চিন্তাই করা যায় না। প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকা মানে পিছিয়ে পড়া। অতএব প্রযুক্তি বন্ধ করা, প্রযুক্তি দূরে রাখা কোনো সমাধান নয়। কিছু সময়ে ইন্টারনেট বন্ধ রাখা, সাইট বন্ধ রাখা হয়। এটা সাময়িক সমাধান হলেও স্থায়ী সমাধান নয়। স্থায়ী সমাধান হচ্ছে, শিশুদের অনলাইনে নিরাপদ ব্রাউজিং নিশ্চিত করতে হবে। আপনার আমার দায়িত্ব নিয়ে সেটা করতে হবে। পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করে শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহার বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে।

সারফুল আলম
আপনার শিশু যখন অনলাইনে ব্রাউজ করছে তখন খেয়াল রাখুন, সে যেন অনিরাপদ সাইটে না যায়। তার সঙ্গে কথা বলে, বুঝিয়ে তার অনলাইন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করুন। তার ভুল হলে সেটি শুধরে দিন। কারণ শিশুরা বড়দের কাছ থেকেই শেখে। বাবা-মায়ের কাছ থেকে শেখে। এ কারণে আপনাকে আগে অনলাইন বিষয়ে ভালো করে জানতে হবে। নিজেকে নিরাপদ রাখার শিক্ষাটা নিতে হবে। আপনি যখন জানবেন কোনটি অনিরাপদ, তখন অনলাইনে শিশুরা যেন অনিরাপদ সাইটে না যেতে পারে সেটাও নিশ্চিত করতে পারবেন। সেই সঙ্গে তাকে সচেতন করতেও পারবেন। আমার মনে হয়, শিশুদের জন্য নিরাপদ ইন্টারনেটের স্বার্থেই একই সঙ্গে বাবা-মাকে সচেতন করার কর্মসূচিও চালিয়ে যাওয়া উচিত।

মুয়িজ তাসনিম তকি
এখানে কথা হচ্ছে অনলআইনের বিষয় নিয়ে। অলাইনে যেতে হলে ডিভাইস লাগে, ইন্টারনেট লাগে। আর এটা কিন্তু ব্যয়বহুল। কারণ এই যে অনলাইনে নিরাপত্তার বিষয়, সেটা কিন্তু সচ্ছল ঘরের শিশুদের ক্ষেত্রে। আর তারা অনলাইনে গ্লোবাল কনটেন্ট দেখে বেশি। দেশীয় কনটেন্ট দেখে না। এখন এই গ্লোবাল কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ করবেন কীভাবে? আসলে আমার মনে হয়, ঘরের মধ্যে যদি ইনডোর গেমসের ব্যবস্থা যেমন আমি বাসার জন্য ক্যারম বোর্ড কিনে আনলাম। এখন অফিস থেকে ফিরে ডিনারের পর রাত ১০টা থেকে ১১টা এক ঘণ্টা ক্যারম বোর্ড চলে। আমার বাচ্চা এখন এই ক্যারম বোর্ড নিয়ে মহাউৎসাহী। এভাবে শিশুদের ঘরে এবং মাঠে খেলার ব্যবস্থা বেশি করতে পারলে অনলাইনে আসক্তি কমবে।

ইফতেখার আহমেদ
আমি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি। এই অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, সব পরিবারেই প্রতিবন্ধী শিশুদের কাছে ছোটবেলায় থেকেই বাবা-মা কিছু প্রত্যাশা করেন না। এ কারণে ছোটবেলা থেকেই তাদের হাতে কম্পিউটার, অন্যান্য ডিভাইস দেওয়া হয়। ফলে তারা ছোটবেলা থেকেই ডিভাইসে অভ্যস্ত এবং আসক্ত হয়ে পড়ে। এখানে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দরকার। শুধু প্রতিবন্ধী ব্যক্তি নয়, স্বাভাবিক শিশুদের ক্ষেত্রেও দেখা যায় বাবা-মা কান্না থামানোর জন্য বাচ্চাদের হাতে ডিভাইস তুলে দেন। এই শিশুরা ব্রাউজ করতে করতে কোথায় চলে যায়, সেটা তারা নিজেরাও জানে না। ফলে তারাও নিজেরা আসক্ত হয়ে যায়। এই আসক্ত যেন না হয় এবং আসক্তি দূর করার জন্য ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু এই আসক্তি কাটাতে গিয়ে কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানো কোনো ভালো বিষয় নয়। সংশোধনাগারগুলোর অবস্থা কতটা ভয়াবহ, সেটা যারা কাজ করেছেন প্রত্যেকেই জানেন। বরং প্রথম অপরাধের ক্ষেত্রে সেটাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য না করে একটা কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে ছেড়ে দিলে তারা অপরাধ থেকে দূরে থাকবে।

অম্বিকা রায়
আমরা দেখেছি, অনলাইনে নিরাপত্তার বিষয়টিতে গুরুত্ব না দেওয়া হলে শিশুদের সাইবার বুলিং-এর শিকার হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সাইবার বুলিং-এর শিকার হওয়া শিশুরা স্কুলে যায় না। এমনকি অ্যালকোহল ও মাদকাসক্ত হয়ে যায়। ধীরে ধীরে হতাশা বাড়লে এক পর্যায়ে ব্যাপারটা তাদের আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিতে পারে। এই ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনা করে আইন ও সালিশ কেন্দ্র এবং তাদের তিনটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান শিশুদের অনলাইনে যৌন হয়রানি এবং অন্যান্য ঝুঁকি থেকে রক্ষার জন্য একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। ঢাকা, কক্সবাজার, সাতক্ষীরা ও রাজশাহীতে বর্তমানে এ প্রকল্পের কাজ চলছে। এ প্রকল্পের আওতায় চারটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে- শিশুদের নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য একটি নির্দেশিকা বা হ্যান্ডবুক তৈরি; এই হ্যান্ডবুক পাঠ্যক্রমের অংশ করার জন্য জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে; নিরাপদ ইন্টারনেটের জন্য সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি কোড অব কন্ডাক্ট তৈরির জন্য টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করা হচ্ছে এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংস্কার করে অনলাইনে শিশুর নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে অন্তর্ভুক্তির জন্যও আলোচনা করা হচ্ছে।

মো. নূরুননবী শান্ত
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পক্ষ থেকে সবাইকে শুভেচ্ছা। আপনারা জানেন, আইন ও সালিশ কেন্দ্র মানবাধিকার নিয়ে কাজ করে। যেখানে যে কেউ নির্যাতনের শিকার হলে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে আসক তাদের পাশে দাঁড়ায়, আইনি সহায়তা দেয়। যেখানে কথা বলার দরকার, কথা বলে। যেখানে প্রতিবাদ করা দরকার, প্রতিবাদ করে। একই সঙ্গে সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন প্রকল্পও বাস্তবায়ন করে। এরই অংশ হিসেবে শিশুদের জন্য নিরাপদ ইন্টারনেটের ব্যবহার বিষয়ে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে আসক। এ প্রকল্পের মাধ্যমে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে শিশুদের নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার নিশ্চিত করতে জরুরি যেসব পদক্ষেপ নেওয়া দরকার তার জন্য চেষ্টা করছে। আজকের আলোচনা এ কারণেই। সমকাল দেশের প্রথম সারির গণমাধ্যম। সমকালের সঙ্গে এই গোলটেবিলের মাধ্যমে উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আলোচনা থেকে নিশ্চয় মূল্যবান মতামত ও পরামর্শ পাওয়া সম্ভব হবে। আমরা প্রত্যাশা করি, ডিজিটাল বাংলাদেশ হবে শিশুদের জন্য নিরাপদ, ঝুঁকিমুক্ত এবং শিশুবান্ধব।

রাশেদ মেহেদী
আমাদের শিশুরা আসলে বাস্তবে কী চায়? খেলতে চায়, মাঠে দৌড়াতে চায়। বন্ধুদের সঙ্গে হৈ-হুল্লোড় করতে চায়। ছোট বয়সের এটাই স্বাভাবিক প্রবণতা। অনলাইনেও কিন্তু শিশুরা তার খেলার উপকরণ চায়, তার নিজের মতো বিনোদন চায়। সেটা না পেলে তখন তার অনভিপ্রেত কিছুতে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। আমরা কিন্তু অনলাইনে শিশুদের জন্য কনটেন্ট সেভাবে বলতে গেলে কিছুই এখনও দিতে পারিনি। বরং আমাদের দেশ থেকে অনলাইনে সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক কনটেন্ট যাচ্ছে। রাস্তায় মারামারি, ইভ টিজিং-এর দৃশ্য এই ঢাকা থেকে বেশি আপলোড হচ্ছে। এখন ইউটিউবে ওয়াজ-নসিহতের নামে কিছু ব্যক্তির অত্যন্ত সমাজবিরোধী, নারীবিরোধী, সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে ভরা বক্তব্য বিপুল পরিমাণে ছড়িয়ে পড়েছে। এগুলো বড়দেরই অসুস্থ করে দিতে পারে; সেখানে শিশুদের সামনে দেশীয় কনটেন্ট হিসেবে এগুলো তুলে ধরলে সেটা কি আরও বেশি বিপজ্জনক হবে না? অনলাইনে শিশুদের উপযোগী কনটেন্ট দিলে শিশুদের বিপথগামী হওয়া থেকে ৬০-৭০ শতাংশ সুরক্ষা এমনিতেই নিশ্চিত করা যাবে।


সঞ্চালক
মুস্তাফিজ শফি
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
দৈনিক সমকাল
আলোচক
মোহাম্মদ তবারক উল্লাহ
অতিরিক্ত ডিআইজি
জাতীয় জরুরি সেবা (৯৯৯)

মাহমুদুল কবির
কান্ট্রি ডিরেক্টর
তেরে দেশ হোমস নেদারল্যান্ডস, বাংলাদেশ
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এসএম ফরহাদ
মহাসচিব, অ্যামটব

সুমন আহমেদ সাবির
তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ

ড. বিএম মইনুল হোসেন
সহযোগী অধ্যাপক
তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মোহাম্মদ গাজী সালাহউদ্দিন
উপ-পরিচালক, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন

সাইদ নাসিরুল্লাহ
সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার
সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগ
সিটিটিসি, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ

মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম শামীম
পাবলিক প্রসিকিউটর, সাইবার ট্রাইব্যুনাল

হোসেন সাদাত
হেড অব রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স
গ্রামীণফোন লিমিটেড

মোহাম্মদ মুখলেসুর রহমান সোহাগ
হেড অব রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড কানেক্টিভিটি বিজনেস, বাংলালিংক

ব্যারিস্টার শাহেদুল আজম
ভাইস প্রেসিডেন্ট
জুনিয়র চেম্বার ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ

জিয়ান শাহ কবীর
উপ-পরিচালক
সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস, বিটিআরসি

কাশিফ আলী খান
নির্বাহী পরিচালক
ইনসাইট বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন
রেজাউল করিম সিদ্দিকী
আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

তানজিম আল ইসলাম
আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
জেনিফার আলম
সভাপতি, ক্রাইম রিসার্চ অ্যান্ড
অ্যানালাইসিস ফাউন্ডেশন (সিআরএএফ)
মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম
এডুকেশন টেকনোলজি এক্সপার্ট
অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রকল্প
রাইসুল ইসলাম
প্রোগ্রাম অফিসার
নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ ন্যাশনাল হেল্পলাইন ১০৯, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়
সারফুল আলম
পরিচালক ও প্রধান কর্মকৌশল কর্মকর্তা
এসএসডিটেক
মুয়িজ তাসনিম তকি
অ্যাসোসিয়েট ভাইস প্রেসিডেন্ট, আর্নেস্ট অ্যান্ড ইয়ং
ইফতেখার আহমেদ
প্রোগ্রাম প্রধান, বি-স্ক্যান
মো. নুরুননবী শান্ত
টিম লিডার, শিশু অধিকার ইউনিট
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
রাশেদ মেহেদী
বিশেষ প্রতিনিধি, সমকাল

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন

অম্বিকা রায়
প্রোগ্রাম সমন্বয়ক
শিশু অধিকার ইউনিট, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)

বিষয় : শিশুদের জন্য চাই নিরাপদ ইন্টারনেট

মন্তব্য করুন