আমি একজন ভাষাসংগ্রামী, মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক। ১৯৭১ সালে বদরগঞ্জ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও শ্যামপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলাম।
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পর বদরগঞ্জ আঞ্চলিক সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তুলি। বদরগঞ্জের শ্যামপুরেও সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলা হয়। পাকিস্তানের শোষণ, অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে আমরা স্কুলছাত্রদের মুক্তিযুদ্ধের জন্য সংগঠিত করতে থাকি। যুবক-তরুণদের নিয়ে তাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিই। সেই সময় বদরগঞ্জ ও মিঠাপুকুর থানা থেকে মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রহ ও প্রশিক্ষণের দায়িত্ব ছিল আমার ওপরে। আমি নাগেরহাট, বদরগঞ্জ, তারাগঞ্জ, লালদীঘির বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য মানুষকে উদ্বুদ্ধ করি এবং মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রহ করি। ২৬ মার্চ রংপুর সদরের এমপি সিদ্দিক হোসেন আমার কাছে আসেন এবং মুক্তিযুদ্ধে মানুষকে সংগঠিত করতে বলেন। আমি শ্যামপুর সুগার মিল গেটে শ্রমিক-জনতাকে নিয়ে জনসমাবেশ করি।
২৬ মার্চ আমাদের আগে থেকেই রংপুর ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করার প্রস্তুতি ছিল। তখন ইপিআরের ক্যাপ্টেনের চার্জে ছিলেন নোয়াজেস নামে এক ব্যক্তি। নোয়াজেস সাহেব বলেছিলেন, স্বাধীনতাকামী বাঙালিরা এর মধ্যে আক্রমণ চালিয়ে ক্যান্টনমেন্ট দখলে নিতে পারবে। কারণ রংপুর ক্যান্টনমেন্টে পাঞ্জাবি সৈন্য কম আছে। আপনারা আক্রমণ চালালে পাঞ্জাবি সৈন্যরা অস্ত্র সারেন্ডার করবে। তাহলে ক্যান্টনমেন্ট দখলে নেওয়া সহজ হবে। সেই কথামতো আমরা পরিকল্পনা করি। ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাওসহ আক্রমণে আমার ওপর দায়িত্ব ছিল পশ্চিম এলাকায়। অ্যাডভোকেট গণির দায়িত্ব ছিল পূর্ব এলাকায়। মুক্তিযোদ্ধা তৈয়বুর রহমান তখন স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর প্রধান ছিলেন। তিনি দলবল নিয়ে শহর এলাকার দিক থেকে আক্রমণ চালাবেন। ২৮ মার্চ আমরা লোহানীপাড়ার সাঁওতালসহ ২০ থেকে ২৫ হাজার মানুষ নিয়ে ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করি। আমাদের কাছে অস্ত্র ছিল না, কেউ লাঠি, কেউ বল্লম নিয়ে এসেছিল। আর সাঁওতালদের হাতে ছিল তীর-ধনুক। আধুনিক অস্ত্র না থাকলেও আমাদের মনে প্রচুর জোর ছিল।
আমাদের অস্ত্র ছিল 'জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু', 'বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো', 'তোমার দেশ, আমার দেশ, বাংলাদেশ, বাংলাদেশ' স্লোগান। এই স্লোগান দিয়ে আমরা ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করতে নামি। বর্তমানে শতরঞ্জি কারখানা পার হয়ে উপশহরের দিকে আসতে ক্যান্টনমেন্ট থেকে গুলির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল। আমরা মনে করেছিলাম, বাঙালি সৈন্যরা মনে হয় আমাদের রিসিভ করছে। যখন ক্যান্টনমেন্টের কাছাকাছি আসি, তখন সেখানে থাকা পাকিস্তানি সেনারা গুলি ছুড়তে শুরু করে। সাঁওতালরা তীর-ধনুক ছুড়ে মারে। মানুষ বল্লম ছুড়ে মারে। তারা তখন ট্যাঙ্ক থেকে আমাদের ওপর গুলি করা শুরু করে। এতে দেড় হাজারের বেশি মুক্তিকামী মানুষ মারা যায়।
আমরা কয়েকজন ক্রলিং করে সেখান থেকে আত্মরক্ষা করি। রাত ১০টার দিকে পাগলাপীরের পানবাজার এলাকায় একজনের গোয়ালঘরে ঢুকে পড়ি। সেখানে সারারাত আমরা অবস্থান করে পরদিন বাড়িতে ফিরি। এসে শুনি, জিওসির নির্দেশে সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহতদের বর্তমানে যেখানে রক্তগৌরব বধ্যভূমি করা হয়েছে, সেখানে পুড়িয়ে ফেলে তাদের পুঁতে রাখা হয়েছে।
১ এপ্রিলে বাঙ্কার বানিয়ে বদরগঞ্জের যমুনেশ্বরী নদীর তীরে অবস্থান নিই। সেখানে আমাদের সঙ্গে বাঙালি সেনাবাহিনীর সদস্য ও আনসার বাহিনী ছিল। ওই বাঙ্কারে আহত মানুষদের চিকিৎসাও দেওয়া হতো। সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন আনোয়ার, আনসার বাহিনীসহ মুক্তিকামী মানুষকে সঙ্গে নিয়ে আমরা বদরগঞ্জকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীমুক্ত করে রেখেছিলাম। কয়েক দফা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধও হয়েছিল। ১ থেকে ৮ এপ্রিল পর্যন্ত পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বদরগঞ্জে ঢুকতে পারেনি প্রতিরোধের কারণে। ৮ এপ্রিল রাজাকারদের সহায়তায় পাকিস্তানি বাহিনী নতুন কৌশলে ভোরে আমাদের ওপর আক্রমণ চালায়।
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বদরগঞ্জের অনেক দোকানপাট পুড়িয়ে ফেলে। তখন দলবল নিয়ে ক্যাপ্টেন আনোয়ার ফুলবাড়ীতে গিয়ে ক্যাম্প করেন। আমি পরে ক্যাপ্টেন আনোয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করে হ্যান্ডগ্রেনেড নিয়ে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিতাম। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিতাম, কীভাবে গ্রেনেড ছুড়তে হয়, কীভাবে গেরিলা যুদ্ধ করতে হয়। ১৭ মের পর থেকে আমি আর বদরগঞ্জে থাকতে পারিনি। তখন ভারতে চলে গিয়েছিলাম। প্রথমে সীতাই বন্দরে গিয়ে সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের রিসিপশনিস্ট হিসেবে কাজ করেছি। সেখানে একদিন থাকার পর কুচবিহারে আমাকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কংগ্রেসের সভাপতি অরুণ বাবু আমাকে দায়িত্ব দেন সুভাষ পল্লির একটি পাটের গোডাউনে। সেখানে করা হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধাদের রিসিপশন ক্যাম্প। সেখানে এক মাসের মতো ছিলাম।
সে সময় আমি যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়ে চিলাহাটিতে যুদ্ধ করি। সেখানে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধ হয়। আমাদের কৌশলী আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনী পিছু হটে পালিয়ে যায়। ওই যুদ্ধে কেউ মারা যায়নি। এরপর আমার ছাত্র জয়নাল আবেদীন ও তার সঙ্গীরা পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালিয়ে ১৪ জন রাজাকার ও পাকিস্তানি বাহিনীকে হত্যা করেছিল।
এরপর আমি আবার ভারতে চলে আসি। টাপুরহাট ইয়ুথ ক্যাম্পে আমি সহকারী রিক্রুটিং অফিসার ও প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করি। অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে দেশে পাঠিয়েছি দেশের স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে। মাঝে মাঝে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের দেখাশোনা করতে হতো।
কোচবিহারের মহারাজার হাসপাতালে আমি ১০-১২ দিন ছিলাম। একদিন আহত এক যুবক মুক্তিযোদ্ধা ইশারা করে আমাকে ডাকল। তার নাম কাজী মকদুম হোসেন। কাছে যেতেই যুবক তার হাত আমার হাতের ওপরে দিয়ে বলল, স্যার কিছুক্ষণ পর তো আমি মারা যাব। যদি আপনি আমার ওয়াদাটুকু রাখেন। আমি বললাম, কী ওয়াদা? সে বলল, ওয়াদা করেন দেশ স্বাধীন না করা পর্যন্ত আপনি নিজের বাড়িতে যাবেন না।
আমি দু-তিন মিনিট চিন্তা করার পর ওই যুবক মুক্তিযোদ্ধাকে শপথ করে বলি, আমি দেশ স্বাধীন না করে বাড়ি ফিরে যাব না। এর পরপরই সেই যুবক মারা যায়। আমি নিজে তার জানাজা পড়িয়ে কবর খুঁড়ে দাফন করেছি। ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হয়। ২০ ডিসেম্বর আমি ইয়ুথ ক্যাম্পের চার্জ বুঝিয়ে দিয়ে রংপুরে আসি।
আমি স্বেচ্ছায় মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলাম ও মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছিলাম। এখন আমার বয়স ৯০ বছর। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আমার চাওয়া বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার।
লেখক ,ভাষাসৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধা
অনুলিখন ::মেরিনা লাভলী, স্টাফ রিপোর্টার, সমকাল

বিষয় : রক্তঝরা শপথের দিন

মন্তব্য করুন