বাংলাদেশে এখনও পুরুষ নারীকে বিয়ে করে অনেক ক্ষেত্রে যৌতুক নিয়ে। হাট-বাজারে কাজের লোক কেনারও প্রথা চালু রয়েছে সেখানে। নারীকে কাজের লোকের মতো করে ব্যবহার করা হয় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে। অনেক নারী বাবার সম্পদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয় বিয়ের পরে। হিন্দু-মুসলিম বলে কথা নেই; নারীর প্রতি অবিচার এখনও বিরাজমান সেখানে। মজার ব্যাপার হলো, দেশটিতে বহু বছর ধরে নারীশাসন চলা সত্ত্বেও এসবের পরিবর্তন খুব একটি চোখে পড়ে না। এক নারী গল্প করছিলেন বাংলাদেশের আইন প্রসঙ্গে। তার বাড়ি ইতালি, গ্রামের নাম গায়েতা। বহু বছর তিনি বাংলাদেশে থেকেছেন, রবীন্দ্রসংগীত গাইতে পারেন। ইতালি চিকন এবং লম্বা একটি দেশ, চারপাশে সাগর। গায়েতা গ্রামে ছোট্ট একটি কফিশপ তার, বিশ্বের নানা দেশের মানুষের আনাগোনা সেখানে। আমি যে বসে আছি সেখানে সে খেয়াল তার নেই। জিজ্ঞেসও করেননি আমি কোন দেশের। কথা বলছিলেন আমেরিকান এক নারীর সঙ্গে, তারা বেশ তাল মিলিয়ে আলোচনা করে যাচ্ছিলেন। আমি বেশ কৌতূহলের ছলে বসে বসে সব শুনছি আর কফি পান করছি। আমার সঙ্গে আমার সহধর্মিণী মারিয়া। মারিয়া দু'বার বাংলাদেশে গেছে বটে তবে অনেক আগের কথা। তারপর তার জার্নি ছিল স্বল্প সময়ের জন্য। এত কিছু সম্পর্কে তার তেমন ধারণা না থাকারই কথা। তারপরও সে সব শুনছে এবং মাঝেমধ্যে আমাকে সুইডিশে বলছে, কই তোমার বাবাকে তো দেখিনি তোমার মাকে এমন করে ট্রিট করতে, যা ওই নারী বলছে? তোমারও তো তিনটি বোন আছে, কই এসব কথার সঙ্গে তো কোনোই মিল পাওয়া যাচ্ছে না? তুমি প্রতিবাদ করো, নইলে ওই নারী তোমার দেশের সম্পর্কে এভাবে ভুল তথ্য ছড়াবেন। আমি মারিয়াকে বললাম, আজ কোনো কথা নয়, কাল এখানে আসব। তখন তার সঙ্গে পরিচিত হবো এবং জানব কীভাবে তিনি এত তথ্য সম্পর্কে অবগত, আর কী তার উদ্দেশ্য। পরের দিন আবারও এসে হাজির, কিছু না বলতেই জিজ্ঞেস করলেন আমি কোন দেশের? বললাম, আমি বাংলাদেশি। তিনি শুরু করলেন বাংলাদেশের বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে নারী-পুরুষের ব্যবধান তারপর দুর্নীতি-অনীতি ইত্যাদি। যা আমি জানি, তিনিও তা জানেন, সেইসঙ্গে জানেন আরও অনেক তথ্য। বেশি কিছুতে দ্বিমত পোষণ করতে পারলাম না। পরে জানতে পারলাম তিনি বহু বছর বাংলাদেশে বসবাস করেছেন।
বিশ্বের সর্বত্রই কমবেশি অন্যায়, অপকর্ম, দুর্নীতি, দলীয় প্রভাব বিস্তারসহ নানা ধরনের অমানবিক কার্যকলাপ হয়ে থাকে। এ কারণে আইনি শাসনব্যবস্থা বিদ্যমান। কিন্তু বাংলাদেশে আইনের শাসন একটু ব্যতিক্রম। অনেকে অপরাধী হওয়া সত্ত্বেও ছাড়া পেয়ে আরও বেশি দুর্ধর্ষ ও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এরা সমাজে অমানবিকতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করছে। যার ফলে দেশ আজ এ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। সমাজে আজ কমবেশি এরকম বৈষম্য। প্রশাসনে অনিয়ম-দুর্নীতি লক্ষণীয়। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ ও বর্তমান বাংলাদেশের মধ্যে পার্থক্য কী এবং কী করণীয় রয়েছে আমাদের? আমাদের জাতির পিতার স্বাক্ষরিত দলিলটি, যা তিনি রেখে গেছেন, তা হলো বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধান। এখানে সবই বলা আছে- তিনি কী চেয়েছিলেন। জনগণ হবে ক্ষমতার মালিক। ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ হবে। শোষণমুক্ত দেশ হবে। ধর্ম ধর্মের জায়গায় থাকবে। ধর্ম নিয়ে কেউ রাজনীতি করবে না। বঙ্গবন্ধু এই সংবিধানে স্বাক্ষর করেছেন। এখানে আইনের শাসনের কথা আছে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা আছে। নারী-পুরুষ বৈষম্য নিরসনের কথা আছে। কিন্তু তা কি সঠিকভাবে সবাই মেনে চলছে?
জাতির পিতার স্বাক্ষরিত সংবিধান অনুসরণ করলেই সোনার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হবে। দেশের অনেক উন্নতি হয়েছে, এটা ঠিক। নারীশিক্ষা বেড়েছে, কিন্তু শিক্ষার মান বাড়েনি। বৈষম্য বেড়েছে গ্রাম ও শহরের মধ্যে। কিছু ধনী লোক বেড়েছে। এখানে সবারই খেয়ে-পরে বাঁচতে হবে। সংবিধানে এটা বলা আছে। এখন তো আমরা বলতে পারি, আসুন, সবাই মিলে সংবিধানটা বাস্তবায়ন করি। এখনও সময় আছে। এ কাজটিতে সবাইকে গুরুত্ব দিতে হবে। এটা করতে পারলে বঙ্গবন্ধুর প্রতি সত্যিকার অর্থে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হবে। দল-মত নির্বিশেষে সব সাধারণ ও ভিআইপি নারী-পুরুষকে একই মানদণ্ডে দেখতে চাই। যেখানে থাকবে না কোনো ধর্মীয় বা দলীয় বিচার-বিশ্নেষণ, বিবেচিত হবে না কে গরিব কে ধনী বা ক্ষমতাসীন, আর কে ক্ষমতাহীন। সবাই স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে ন্যায়বিচার পাবে।
সাবেক পরিচালক (প্রডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন

rahman.mridha@gmail.com

বিষয় : বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন

মন্তব্য করুন