প্রশ্ন :আপনার ছোটবেলায় বঙ্গবন্ধুকে দেখার স্মৃতি বলুন।
উত্তর :বঙ্গবন্ধুকে ছোটবেলা থেকে দেখেছি। তবে খুব ছোটবেলার কথা তো তেমন একটা মনে নেই। ছোট ছোট স্মৃতি, একটু একটু মনে আছে। তখন আমরা বঙ্গবন্ধুর বাড়ি যেতাম আম্মা সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীনের সঙ্গে। বঙ্গবন্ধুও প্রায়ই আমাদের বাসায় আসতেন। বঙ্গবন্ধু আমাদের অনেক আদর-স্নেহ করতেন, খুব ভালোও বাসতেন। ১৯৬৬ সালে আমার বয়স যখন সাড়ে চার বছর, তখন আমার বাবা তাজউদ্দীন আহমদ গ্রেপ্তার হলেন। আরেকটু বড় হতে হতে জানলাম, বাবার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুসহ অন্য নেতারাও জেলে আছেন। '৬৯-এ আমার বয়স যখন ৭ বছর, তখন তারা জেল থেকে মুক্তি পেলেন। ওই সময় থেকেই মনে হতো, বঙ্গবন্ধু অসম্ভব রকমের উচ্চতাসম্পন্ন একজন বিশাল মাপের মানুষ। তাই ছোটবেলা থেকেই জেনে এসেছি, বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু মানেই সোনার বাংলা। '৭০ সালের স্মৃতিটা বলি। নির্বাচনী প্রচারে বঙ্গবন্ধু ও আমার বাবা তখন খুবই ছোটাছুটি করছিলেন। একদিন সাভারের কাছে বঙ্গবন্ধুর গাড়িতে আমার বাবাসহ তিনজন দুর্ঘটনায় পড়েন। বঙ্গবন্ধু গাড়িতে ছিলেন না। দুর্ঘটনায় গাড়ির ড্রাইভারের পাঁজরের হাড় ভেঙে যায়। আমার বাবাও আহত হন। দুর্ঘটনার পরদিনই বঙ্গবন্ধু বাসায় আসেন। উদ্বিগ্ন বঙ্গবন্ধু বাবাকে জড়িয়ে ধরে ছিলেন অনেকক্ষণ। আমার মনে হচ্ছিল, বাবার প্রতি বঙ্গবন্ধুর যেন খুব একটা মমতা। ঠিক যেন পরমাত্মীয়। আসলে আমাদের পরিবারের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর অসম্ভব একটা ভালো সম্পর্ক ছিল। আমার বাবার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর শুধু যে রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল, তা নয়; একটা আত্মিক সম্পর্কও ছিল। দু'জনকে মনে হতো যেন বড় ভাই, ছোট ভাই।
ওই সময়কার আরেকটা স্মৃতির কথা বলি। তখন আমি আর আমার বোন বাসার নিচে একসঙ্গে খেলতাম। আমাদের বাসার তিনটা বাসা পরে ছিল জিল্লুর রহমান (প্রয়াত রাষ্ট্রপতি) চাচার শ্বশুরবাড়ি। ওখানে মাঝেমধ্যে জিল্লুর চাচার ছেলে এখনকার সংসদ সদস্য নাজমুল হাসান পাপন আসত। ওখান থেকে পাপন আমাদের বাসায়ও আসত আমাদের সঙ্গে খেলতে। তখন দেখেছি, বঙ্গবন্ধু আমাদের বাসায় এসে হয় আমার বাবাকে সঙ্গে নিয়ে বের হয়ে চলে যাচ্ছেন, নয়তো বাবার পড়ার
ঘরে বসে দু'জনে মিলে অনেকক্ষণ ধরে কথাবার্তা বলছেন। ওই সময় আমরা তো এটাতে এক রকম অভ্যস্তই ছিলাম। বঙ্গবন্ধুর আমাদের বাসায় আসা মানেই ছিল বাবা আর তিনি আলাদা ঘরে বসে কথা বলছেন। এই আসা-যাওয়ার ফাঁকেই বঙ্গবন্ধু হয়তো বাইরে আমাদের দেখতে পেলেন অথবা খেলতে দেখলেন; তখন তিনি আমাদের মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করতেন। বলতেন, 'এই, তোরা সবাই এখানে কী করিস! সব খেলা না!' মাথার ওপরে বঙ্গবন্ধুর সেই যে হাতের স্পর্শ, সেটা যেন এখনও অনুভব করি। এটাও খুব সুন্দর একটা স্মৃতি আমার জীবনে।
একাত্তরের ৭ মার্চের জনসভায় আমার আম্মা সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীনের সঙ্গে বয়সে ছোট হলেও আমি ও আমার বোন গিয়েছিলাম। বয়স কম হওয়ায় বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য তেমন কিছু বুঝিনি। কিন্তু ওই যে গলার আওয়াজ, তার কণ্ঠস্বর- সেটা আমার মনের মধ্যেও একটা আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তারপর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো। আমরা শরণার্থী হয়ে ভারতে পৌঁছলাম। রেডিও ছিল আমাদের নিত্যসঙ্গী। প্রতিদিন বাংলাদেশ বেতারে বজ্রকণ্ঠ প্রচারিত হতো। খবর শুনতাম গভীর মনোযোগ দিয়ে। তখন তো রীতিমতো প্রতিদিনই দোয়া করতাম- বঙ্গবন্ধু যেন ভালো থাকেন। বঙ্গবন্ধুর জন্য খুব কান্নাও পেত।
সমকাল :মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধু দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিলেন। সে সময়কার স্মৃতি যদি বলেন।
সিমিন হোসেন রিমি :১৯৭৩ বা '৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু একবার আমাদের হেয়ার রোডের বাসায় এসেছিলেন। আমার বাবা তখন অর্থমন্ত্রী। আমার ভাই সোহেল অনেক ছোট। বঙ্গবন্ধু তাকে দেখে বললেন, 'সোহেল, তোমার কী পছন্দ বলো তো? কী চাও তুমি?' তখন সোহেল বলল, 'আমার খরগোশ চাই।' বঙ্গবন্ধুর কথাটা মনে ছিল। তারপর ১৯৭৫ সালে হঠাৎ একদিন বঙ্গবন্ধু আম্মাকে ফোন করে বললেন, 'সোহেলের তো খরগোশ খুব পছন্দ। ওর জন্য খরগোশ পাঠাচ্ছি।' পরে বঙ্গবন্ধু সুন্দর একটা কাঠের খাঁচায় দুইটা খরগোশ পাঠিয়েছিলেন। সেই খরগোশ দুইটাকে নিয়ে খুবই আনন্দ করতাম। ওদের আমরা গাজর ও কচি ঘাস খাওয়াতাম। আমার বাবাও পরম যত্ন নিয়ে খরগোশগুলোর দেখাশোনা করতেন। এটা যে তার মুজিব ভাইয়ের উপহার। খরগোশ দুইটা আমাদের বাসায় ছিল পঁচাত্তরের ট্র্যাজেডির সময়টা পর্যন্ত। তারপর তো ১৫ আগস্ট, ৩ নভেম্বর- সবকিছু লণ্ডভণ্ড, তছনছ করে দেওয়া হলো। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে শেখ কামাল ভাইয়ের বিয়ের স্মৃতিও খুব মনে পড়ে। আমরা ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি থেকে বরযাত্রী হয়ে অফিসার্স ক্লাবে গিয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধু নিজেই বিয়ের সবকিছু তদারকি করছিলেন। এসব স্মৃতি মাঝেমধ্যে মনে পড়লে আমার না চোখ দুটো ভিজে যায়।
সমকাল :'৭৫-এর ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার দিনটির কথা তো নিশ্চয় মনে আছে?
সিমিন হোসেন রিমি :১৫ আগস্ট খুব ভোরে প্রচণ্ড গুলির শব্দে ঘুম ভেঙে গেলে আমি দ্রুত ঘরের দরজা খুলে বারান্দায় আসি। দেখি, আমার বাবাও বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছেন। বাবা ছুটলেন ছাদের দিকে। আমিও পেছনে পেছনে। তখনও দুই-একটা গুলির শব্দ ভেসে আসছিল। তারপর সব চুপচাপ। বাবা নিচে এসে একের পর এক ফোন করার চেষ্টা করলেন। সম্ভবত কেউ ফোন ধরছিল না। প্রচণ্ড উৎকণ্ঠার মধ্যে বাবা আমাকে কয়েকটি নম্বর দেখিয়ে বললেন চেষ্টা করতে। কেউ ফোন ধরে না। হঠাৎ লাইন পেয়ে গেলাম তৎকালীন মন্ত্রী অধ্যাপক ইউসুফ আলীর মিন্টো রোডের বাসায়। তার মেয়ে বেবী বলল, ওদের বাসার কাছাকাছি কোথাও অনেক গোলাগুলি হয়েছে। ওর বাবা সম্ভবত নামাজ পড়তে গেছেন। আরও কিছুক্ষণ পর রেডিওতে হত্যাকারীদের দম্ভভরা ঘোষণা শুনতে পাই। এই ঘোষণা সবাইকে বাক্যহীন করে দেয়। বাবার এমন বিষণ্ণ চেহারা আমি কখনও দেখিনি। তিনি যেন নিজের মনেই বেদনাভরা কণ্ঠে বলে উঠলেন- 'মুজিব ভাই জেনেও গেলেন না কে তার বন্ধু ছিল আর কে শত্রু!' আরও কিছু সময় পর আর্মিরা আমাদের বাসা ঘিরে ফেলে। আমার বাবাকে গৃহবন্দি করা হয়। সঙ্গে আমরাও। এরপর কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যায় বাবাকে। সেখানে ৩ নভেম্বর হত্যা করা হয় বাবাসহ জাতীয় চার নেতাকে।


বিষয় : এখনও মাথার ওপর বঙ্গবন্ধুর হাতের স্পর্শ অনুভব করি

মন্তব্য করুন